ভাষার নামটি যখন বাংলা


ভাষার নামটি যখন বাংলা

বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা। চীনা ভাষা শুধুমাত্র চীন দেশের পরিসরে সীমাবদ্ধ হলেও সংখ্যাগণনার হিসাবে সবচেয়ে বেশী মানুষ এই ভাষাতেই কথা বলেন। সারা পৃথিবীতে বহুল ব্যবহৃত ইংরাজী রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।  এরপরই হিন্দীভাষীর সংখ্যা। চতুর্থ স্থানে স্প্যানিশ, সারা বিশ্বে প্রায় ২৩টি দেশের মাতৃভাষা হিসেবে। এরপরই আ মরি বাংলাভাষা। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা সহ বরাক উপত্যাকার শিলচর কাছার জেলার বিস্তৃত অঞ্চলে যে ভাষা মাতৃভাষা হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হল বিশ্বের এই পঞ্চম বৃহত্তম ভাষাটি কেমন আছে?

বাংলাভাষার উদ্ভব থেকে আজ পর্য্যন্ত সময়কাল অব্দি শতাব্দীর পর শতাব্দী অনেক ভাষার প্রভাব এই ভাষার উপর পড়েছে তবু বাংলা ভাষা নিজের পায়ের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে আজও। ফলে একথা বলাই যেতে পারে বাংলাভাষা সহজে বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। সত্যি। কিন্তু তবু এই ভাষার ভবিষ্যত কতটা উজ্জ্বল? অনেকেই হয়তো এই প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক বলে হেসে উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু বর্তমান আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির রূপরেখায় এই প্রসঙ্গটি কতটা প্রসঙ্গিক সেটা বুঝে নেবার সময় এসেছে আমাদের।

যে কোনো ভাষার গতি প্রকৃতি নির্ভর করে মূলত সেই দেশের দেশবাসির মতিগতির উপর। সেই দেশের আবহমান ঐতিহ্যের সাথে বিশ্বের সমকালীন আধুনিকতার নিরন্তর দেওয়া নেওয়ার উপর। বাংলাভাষার বর্তমান অবস্থাটা এবারে একটু ভালো করে দেখা যাক। বাংলার দূর্ভাগ্য আজ ছয় দশকের উপর বাঙলাভাষী অঞ্চলটি চারটি ভাগে বিভক্ত। স্বাধীন বাংলাদেশ ও ভারতের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অসম এর বরাক উপত্যাকা। বাংলাদেশের মুখ্য সরকারী ভাষা অবশ্যই বাংলা। সেখানে বাংলাভাষা জাতীয় গৌরবে অধিষ্ঠিত। আমরা জানি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা বাংলা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী, বাংলায় ৯ই ফাল্গুন যেখানে মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে প্রাণ দিয়ে ভাষা শহীদ হয়েছিলেন পাঁচ বাঙালি। বিশ্বে নিজ মাতৃভাষার জন্য শহীদ হওয়ার ঘটনা সম্ভবত সেই প্রথম। ভাষার জন্য এরপর ১৯৬১ সালে অসমের শিলচরে প্রাণ দেন ১১ জন তরতাজা বাঙালি। বাহান্নর সেই ভাষা আন্দোলনের সুদূর প্রসারী ফলে একাত্তরে পাকিস্তানের অধীনতা থেকে মুক্তি পায় স্বাধীন বাংলাদেশ। তাই সেখানে আজ আ মরি বাংলা ভাষা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জাতীয় ভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত, এবং আবিশ্ব স্বীকৃত। সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। কিন্তু ভারতের অংশ হিসেবে বাকি তিনটি অঞ্চলে বাংলাভাষার বর্তমান অবস্থানটি ঠিক কি। আগে সেটি দেখা যাক। ভারতবর্ষের হিন্দীবলয়ের চাপে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দীভাষার ব্যাপক প্রসার এই তিন অঞ্চলের উপরেই প্রবল প্রভাব বিস্তার করে চলেছে ক্রমান্বয়ে। সমাজের সর্বস্তরেই হিন্দী আদৃত। এবং সম্মানিত।  বিশেষত আন্তর্জাতিক সীমানা ঘেরা কাঁটাতারের এপারে বাংলাভাষার স্বীকৃতি রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে তো নয়, বাংলা এখানে একটি প্রাদেশিক ভাষা মাত্র। ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের মতোই বাংলার স্বীকৃতি তাই আঞ্চলিক ভাষারূপেই। সেটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনাও। সত্যিই তো বিশাল ভারতবর্ষের এক প্রান্তে  পড়ে থাকা খণ্ডিত পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ত্রিপুরার ভাষার, আঞ্চলিক ভাষারূপেই তো স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। হয়েওছে তাই। ঠিক যেমন তামিল তেলেগু মালায়লাম কর্ণাটকি ভাষা কিংবা অসমীয়া উড়িয়া গুজরাটী পাঞ্জাবি মারাঠী ভাষা। রাষ্ট্রভাষা আর আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে হয়তো কোন বিরোধ নাই, কিন্তু দেখতে হবে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাদেশে বাংলাভাষার যে গুরূত্ব,  এই বঙ্গে আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে বাংলার গুরুত্ব তার তুলনায় কতটুকু। কিংবা ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলার প্রকৃত অবস্থা ঠিক কিরূপ।

প্রথমতঃ জাতি হিসেবে বাঙালির নিজস্ব একটি প্রকৃতিই হলো, আমরা অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশি ক্ষমতাধর বিত্তশালী ও ধনৈশ্বর্য্যে উন্নত জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি খুব সহজেই অনুরক্ত হয়ে পড়ি। বাঙালির ইতিহাসে বরাবরই একথা প্রমাণিত সত্য। এবং আমরা সবসময়ই রাজভাষার পৃষ্ঠপোষোক। সেই কারণে বাংলাভাষায় এত বিদেশী শব্দের ছড়াছড়ি। আজকে দিল্লীর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের রাজভাষা হিন্দী তাই আমাদের হৃদয়ের এত কাছে স্থান পেয়েছে। এরই সূত্র ধরে হিন্দুস্থানী সংস্কৃতিকে আমরা আপনার বলে গ্রহণ করেছি সাদরে। বাংলার প্রেক্ষিতে হিন্দী যে ভিনদেশী ভাষা সে আমরা ভুলেছি।

দ্বিতীয়তঃ এই ধরণের মানসিকতার সূত্র ধরেই অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ব্যাপী সারা বাংলার সমস্ত অঞ্চলেই বোম্বাইয়ের হিন্দী সিনেমা এত জনপ্রিয়। প্রায় প্রতিটি শহরে নগরে মফঃস্বলে নব্বই শতাংশ হলেই হিন্দী সিনেমা চলে রমরমিয়ে। এই চিত্র চলে আসছে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে। হিন্দী সিনেমার এই বিপুল জনপ্রিয়তার হাত ধরেই সারা বাংলার সকল অঞ্চলেই হিন্দী এখন বাঙালির মুখের ভাষা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে হিন্দীভাষী টিভিগুলির বিপুল জনপ্রিয়তো। বহু বাঙালিই বাংলা ছেড়ে সারাদিন হিন্দীতে খবর শোনেন। টিভিতে বাংলা অনুষ্ঠানের নাম শুনলে নাক সিঁটকান অনেকেই। এবং হিন্দী গান, আপামর বাঙালির মননে অন্তরের পরমাত্মীয় হয়ে উঠেছে এই বাংলায়।

তৃতীয়তঃ  এই প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে অবাঙালিদের সংখ্যাধিক্যের কথাটিও। বৃটিশ আমল থেকেই শিল্পায়ণের হাত ধরে কলকারখানা ও ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসারের সাথে প্রচুর পরিমাণে হিন্দুস্থানী বাংলায় চলে আসেন স্থায়ী ভাবে। এবং এই প্রবণতা এখন চুড়ান্ত পর্যায়ে।  বিগত দশকগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে প্রধানত পশ্চিমবঙ্গের পার্শ্ববর্তী বিহার ও নবগঠিত ঝাড়খণ্ডের অধিবাসীরা সহ উত্তরপ্রদেশ গুজরাট রাজস্থান পাঞ্জাব প্রভৃতি রাজ্যের মানুষজন ব্যাপক ভাবে এই বঙ্গে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেছেন। সে তো তারা করতেই পারেন। আর ভারতবর্ষের নাগরিক মাত্রেই সারা দেশের যে কোনো প্রান্তেই পাকাপাকি ভাবে যে কেউ বসবাস করতেই পারেন। সকল ভারতবসীরই সেটি সাংবিধানিক অধিকারও বটে।  প্রশ্ন সেখানে নয়। দেখতে হবে এই প্রবনতা প্রতিটি রাজ্যের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির উপর কি প্রভাব ফেলছে ও কি ভাবে, এবং তাতে সেই সেই আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নতি  না অবনতি- কোনটা ঘটছে।  পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি শহরেই প্রচুর পরিমাণে অবাঙালি, এখন স্থায়ী অধিবাসী হয়ে গিয়েছেন। ফলে হিন্দীভাষী স্কুল কলেজের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। এবং পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসাবাণিজ্য বহুকাল থেকেই তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। ফলে বাঙালী চাকুরী থেকে ব্যবসায় শিল্পের শ্রমিক থেকে প্রশাসনে সর্বত্রই হিন্দীভাষীদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে হিন্দীকেই ব্যবহার করে সানন্দে। ফলে এরাজ্যের সর্বত্র হিন্দীই এখন বাংলার সহদোর হয়ে উঠেছে।

আমরা জানি স্বাধীনতার পর বিশেষত দক্ষিণ ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি তাদের স্ব স্ব রাজ্যে অতি সম্মানের স্থান ‌অর্জন করতে পেরেছে। যাঁদেরই দক্ষিণ ভারতে কিছুদিনের জন্যে বসবাসের অভিজ্ঞতা ঘটেছে, তারাই জানেন সেখানে প্রতিটি রাজ্যে, সেই সেই রাজ্যের ভূমিপুত্ররা তাঁদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কতটা গর্ব অনুভব করেন।  এবং তাঁদের আপন ভাষা ও সংস্কৃতিকে কি ভাবে বুক দিয়ে আগলিয়ে রাখেন ও সারা দেশে নিজ ভাষা সংস্কৃতির প্রসারে তাঁরা কতটা আবেগ প্রবণ। শুধু তাই নয়, প্রতিটি রাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার পরিসরেও সেই সেই আঞ্চলিক ভাষাগুলির গুরুত্ত কী অপরিসীম। পরাধীন মানসিকতার নাগপাশ কাটিয়ে উঠে তারা নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রচলন ও প্রসারে কতটা আপোষহীন ভাবে যত্নবান, সেটা কিছুদিন তাদের মাঝে বসবাস করলেই বোঝা সম্ভব কিন্তু। এমনটাই তো হওয়ার কথা। আবিশ্ব ইংরাজীর দাপট ও উত্তর ভারতের হিন্দিবলয়ের দাপটকে প্রতিহত করে কি ভাবে বিদেশী ভাষাকে সঙ্গে নিয়েও নিজের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে সদর্থক ভাবে লালন করে সমগ্র অঞ্চলের স্বজাতির উন্নতি ঘটানো যায়, সেই বিষয়ে তাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে আমাদের।

শেখার আছে হিন্দী বলয়ের রাজ্যগুলির থেকেও। তারাও স্বধীনতা উত্তর বিগত দশকগুলিতে নিজেদের মাতৃভাষাকে জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে বহুল পরিমাণেই প্রাসঙ্গিক করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। যার সুফল পড়েছে তাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। কিন্তু আমাদের এই বঙ্গের চিত্রটি ঠিক কিরকম? আসুন বরং একবার ভালো করে দেখে নেওয়া যাক সেটা।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ শব্দটি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে বিশেষ একটি জায়গা করে নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের আন্তর্জাতিক সীমানা দিয়ে নিরন্তর অনুপ্রবশ ঘটে চলেছে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে। রাজ্য রাজনীতিতে সেই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে অসরোষও নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দুটুকরো হওয়া বাংলার এক পার থেকে আন্তর্জাতিক সীমানা পেড়োলেই অনুপ্রবেশ। অনুপ্রবেশ বিদেশী নাগরিক হিসেবে সেই একই বাঙালির, যার ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদেরই ভাষা ও সংস্কৃতি। রাজনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যা ভয়ানক অপরাধ। কিন্তু এরই পাশাপাশি স্বাধীন ভারতবর্ষের নানান রাজ্যের নানান ভাষাভাষী নাগরিক, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের থেকে একেবারেই পৃথক ও ভিন্ন; তারা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে প্রতিদিন জায়গা জমি কিনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করলেও সেটা কোনোভাবেই অনুপ্রবেশ নয়। তারা আমাদের স্বজাতি না হলেও, কারণ তারও আমাদের মতো একই ভারতবর্ষের নাগরিক।

আর সেই অবাঙালি ভারতীয় নাগরিকরা সাংবিধানিক ভাবেই নিরন্তর এই বাংলায় স্থায়ী ভাবে প্রবেশ করছেন প্রতিদিন- ঝাঁকে ঝাঁকে। প্রশ্ন সেখানেও নয়। তারা তো অন্যায় কিছু করছেন না। পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকারের সীমাতেই তারা এরাজ্যে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করছেন। প্রশ্ন অন্যখানে। প্রশ্ন হল এই অবস্থার প্রেক্ষিতে এই রাজ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর ঠিক কিরকম প্রভাব পড়ছে। সেই প্রভাবে আমাদের ভাষা সংস্কৃতির বর্তমান অবস্থাটি ঠিক কিরকম? এরাজ্যে ভীড় করা অবাঙালিদের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দীবলয় ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলের অধিবাসী। স্বভাবতঃই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ প্রাপ্ত হিন্দী তাদের মাতৃভাষা হওয়াতে তারা এই রাজ্যে এসেও সেই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করতে পারছেন অতি সহজেই। বাস্তব এইটিই যে কি সরকারী কি বেসরকারী, দুই ক্ষেত্রেই কর্ম জগতে প্রবেশ ও উন্নতির ক্ষেত্রে হিন্দী ও ইংরাজীর গুরুত্ব অপরিসীম। ঠিক যেখানে আ মরি বাংলা ভাষার কোনো রকমের প্রাসঙ্গিকতাই স্বাধীনতার সাতদশকেও গড়ে ওঠে নি। সকল রকম গুরুত্বপূর্ণ সরকারী চাকুরীর পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র হিন্দী ও ইংরেজীতে হওয়ায় হিন্দীভাষী রাজ্যবাসী তাদের মাতৃভাষায় যত সহজে উৎরে যেতে পারে, এরাজ্যের বঙ্গসন্তানের পক্ষে কাজটি তত সহজে হয় না। সেই উৎরানোর কাজটি সম্পন্ন করতে গিয়ে তাদেরকে অনেকটা সময় ও পরিশ্রম করেই মোটামুটি ভালোভাবে বিদেশীভাষা ইংরেজীতে দখল অর্জন করতে হয়। যে কাজটি আপামর বাঙালির সন্তানের পক্ষে মোটেই সহজ সাধ্য নয়। ফলে দিনে দিনে সাধারণ মেধার বাঙালি ছাত্রছাত্রীরা সরকারী ও বেসরকারী ক্ষেত্রে পেশাগত ভাবে সাধারণ মেধার অবাঙালিদের থেকে পিছিয়ে পড়ছেই। আর সেই সুযোগেই অবাঙালিরা ব্যাপক ভাবে কাজে লাগিয়ে যত সহজে কর্ম জগতে প্রবেশ করতে পারেন ও সাফল্য অর্জন করতে পারেন বাঙালিরা আজ আর তা পারে না বলেই, পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত বেকারের সংখ্যার মধ্যে বাঙালি ও অবাঙালির অনুপাতটি ভয়াবহভাবেই ভারসাম্যহীন। বিষয়টি পরিস্কার বোঝা যেতে পারে যদি আমরা রাজ্যবাসীর মোট বাঙালির মধ্যে কতজন বেকার এবং মোট অবাঙালির মধ্যে কতজন বেকার; সেই অনুপাতটি সঠিক ভাবে খুঁজে বের করি। পরিতাপের কথা, এই ভাবে ভাবলেই সকলের অভিধানে সংকীর্ণ প্রাদেশিকতাদোষে দুষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় কেউই আজ অব্দি এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি মনযোগ দেননি। স্বভাবতঃই দেবেনও না। কিন্তু বাস্তব অতি কঠিন সত্যকেই প্রতিফলিত করে, আমরা সেই সত্যের দিক থেকে মনযোগ সরিয়ে রাখলেও। আমরা অধিকাংশ বাঙালিরাই এই বাস্তব সত্যকে প্রতিরোধ করা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করি বা সাচ্ছন্দ বোধ করি। বরং এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই আমরা আমাদের সন্তানদেরকে বেশী করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্ত্তি করতে রাত জেগে লাইনে দাঁড়াই। আমরা জানি ইংলিশে চৌখস না হলে জীবনে উন্নতি নাই। শুধু তাই নয়, ইংরেজীর সাথে হিন্দীতেও যে ছেলেমেয়েদের চোস্ত হওয়ার দরকার, আমাদের সেদিকেও খেয়াল থাকে এইযুগে। আর এর অবশ্যম্ভাবী পরিণামেই মাতৃভাষা বাংলাকে আমরাই আরও বেশী করে কোণঠাসা করছি দিনে দিনে অবহেলার চূরান্ত চর্চায়। আমাদের এই মানসিকতার হাত ধরেই সারা রাজ্যে দিনে দিনে বাংলা ভাষায় পঠন পাঠনের রেওয়াজ কমে আসছে। খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, নতুন নতুন যত স্কুল চালু হচ্ছে, তার অধিকাংশই কিন্তু হয় ইংরাজী মাধ্যম নয় হিন্দী। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলির উৎকর্ষতাও ক্রমহ্রাসমান, ভালো মেধার ছাত্র ও উপযুক্ত শিক্ষক উভয়েরই প্রবণতা ইংরাজী মাধ্যম স্কুল গুলির সাথে যুক্ত হওয়া। আর এই প্রবণতার সুদূরপ্রসারী ফল কিন্তু মারাত্মক। রাজ্য রাজধানী কলিকাতা সহ শিলিগুরি দূর্গাপুর আসানসোল শিল্পাঞ্চলের শহর ও শহরতলিগুলিতে এমন বহু হিন্দী মাধ্যম স্কুল রয়েছে যেখানে পঠন পাঠনের বিষয়ের মধ্যে বাংলার কোনোই স্থান নেই। ফলত এই স্কুলগুলি থেকে শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা এই রাজ্যের বাসিন্দা হয়েও রাজ্যের ভাষাটির সাথে পরিচিত হচ্ছে না। আমাদের জানা নেই ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলিতেও এইরকম অস্বাভাবিক কাণ্ডকারখানা প্রচলিত আছে কিনা। থাকলেও সেখানে সেই বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে চালানো হয় কিনা।

আর ঠিক এইটিই এই বাংলায় নিরন্তর ঘটে চলেছে, যা কিছু অস্বাভাবিক, তাকেই স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া। বস্তুত পশ্চিমবঙ্গ আজকে ভারতেরই যেন একটি ক্ষুদ্র সংস্করন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু:খের বিষয়, অনেক বাঙালিই তাতে শ্লাঘা বোধ করেণ। তারা ভেবে দেখেন না, এই ভাবে একটি রাজ্যে তার ভাষা ও কৃষ্টি প্রতিনিয়ত সঙ্কুচিত হতে থাকলে, সেদিন আসতে আর বেশি দেরি নাই, যেদিন বাঙালি তার রাজ্যেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। সে বড়ো সুখের সময় হবে না বঙ্গবাসীর জীবনে। আর এই প্রবণতার লক্ষ্মণ ইতিমধ্যেই অল্পস্বল্প ধরা পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদে অবাঙালিদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধির পথে। এরই সুত্র ধরে রাজ্যরাজনীতিতে তারাই অদূর ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা গ্রহণ করলেও আশ্চর্য্যের কিছু নাই। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা ও উন্নাসিকতার হাত ধরে ইংরাজী ভাষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং হিন্দীভাষা হিন্দুস্তানী সংস্কৃতি আয়ত্ব করার প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার এই বিস্তৃত পরিসরে মাতৃভাষা হিসেবে বাংলাভাষার ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার নিয়ে গর্ব করার মতো স্বদেশী আবেগ এই বাংলার বাঙালির মন ও মননে  কোনোদিনই গড়ে ওঠেনি, আর ওঠার কথাও নয়। কারণ ভারতীয় বাঙালি আগে ভারতীয় ও নেহাৎই দৈবাৎ বাঙালি। কোনো ভাবেই প্রাদেশিকতা দোষে দুষ্ট নয়।

এই প্রসঙ্গেই স্মরণে রাখা দরকার, বাংলাদেশে বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের মূল প্রেক্ষিতটা। সেই সময় বাংলা ভাষার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আবেগেই কিন্তু এই আন্দোলনের ব্যাপকতা গড়ে উঠেছিল না। সেই আন্দোলন গড়ে ওঠার মূল কারণ ছিল, তৎকালীন পাকিস্তানী প্রশাসনের, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দ্দুকে ঘোষণা করা। যে ঘোষণার নেপথ্যে ছিল পাকিস্তানী প্রশাসনের গভীরতর ষড়যন্ত্রমূলক দূরভিসন্ধি। সেদিনের বাংলাদেশের যুবসমাজ বুঝতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষা উর্দ্দু হলে সমস্ত সরকারী বেসরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে উর্দ্দু না জানলে কর্মজগতে প্রবেশ ও উন্নতি করা যাবে না। বরং পাকিস্তানের ছেলেমেয়েরাই মাতৃভাষা উর্দ্দুর সুযোগ নিয়ে একতরফা ভাবে অধিকাংশ কর্মস্থলে অভিষিক্ত হবে। বাঙালি পর্যবসিত হবে মূলত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে। তাই সেদিন বাংলাদেশের যুবসমাজ বাংলার ইতিহাসে সেই  প্রথম, মাতৃভাষার মূল গুরুত্বটি অনুধাবন করতে পেরেছিল। তারা বুঝেছিল জীবন জীবিকায় মাতৃভাষার স্থান না থাকলে সার্বিক ভাবে সমগ্র জাতির উন্নয়ন অসম্ভব। তাই প্রথমত পেটের তাগিদেই যে উর্দ্দুর বিরোধীতা শুরু হয়েছিল, অচিরেই তা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে বৃহত্তর আন্দোলন হয়ে দেখা দিল। এইখানেই বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

আর আমাদের এই পারে, পাকিস্তান প্রশাসন ঐ পারে যে ভুলটি করেছিল, ভারতবর্ষের প্রশাসন সেই ভুলটি কোনোদিনও করেনি। তারা বুঝতে পেরেছিলেন হিন্দীকে জবরদোস্তি রাষ্ট্রভাষা ঘেষণা করে সারা ভারতের উপর চাপিয়ে দিতে গেলে দেশ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদেশী ভাষা ইংরেজীর পাশাপাশি হিন্দীকে রেখে দিনে দিনে সুকৌশলে হিন্দীকে নানান ভাবে পোষকতা দিয়ে জনপ্রিয় করে তুলতে পারলেই একদিন কালক্রমে হিন্দীই রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর গত সাতদশকে ঠিক সেইটিই হয়েছে। এই বিষয়ে প্রথমাবধি বোম্বাইমার্কা হিন্দী বায়োস্কোপের জনপ্রিয়তা তাদের পরিকল্পনার পক্ষে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। পরবর্তীতে টিভির পর্দায় হিন্দী সিরিয়াল যে কাজটিকে আজ ব্যপক ভাবে সফল করে তুলেছে। আর এই ভাবেই হিন্দীবলয়ের বাইরেও ভারতবাসীকে হিন্দীমুখি করে তুলতে সক্ষম হয়েছে ভারতীয় প্রশাসন। তাই এই বঙ্গে হিন্দী আজ আর বিদেশী ভাষা নয়। অধিকাংশ বাঙালিরই মুখেরও ভাষা হয়ে উঠছে দ্রুত।

ফলত, রাজ্যের শহর ও গ্রাম সর্বত্রই হিন্দীবলয়ের মানুষের সাথে পাশাপাশি বসবাস করে একদিকে যেমন হিন্দীর প্রতি বাঙালি মাত্রেই একটি স্বাভাবিক আবেগ গড়ে উঠেছে, ঠিক তেমনই সিনেমা টিভির দৌলতে হিন্দী আজ এই রাজ্যের বাঙালির কাছে অন্যতম জনপ্রিয় ভাষা। আর কর্ম জগতে প্রবেশের জন্যে হিন্দীর প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধির সাথে সাথেই একই সঙ্গে সর্বত্র বাংলাভাষার কদর কমে চলেছে অতি দ্রুত থেকে দ্রুততর গতিতে। স্বভাবতঃই এই যে সার্বিক পরিস্থিতি, এরই প্রেক্ষিতে আজ আপামর বাঙালি তার মাতৃভাষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আদৌ আর ভাবিত নয়। সে জানে কর্মজীবনে জীবিকার ক্ষেত্রে বাংলাভাষা পুরোপুরি অপ্রসঙ্গিক ও অচল। বরং ইংরেজীতে সরগর হওয়ার সামাজিক সুবিধে অনেক। কিংবা বিকল্প হিসেবে হাতের কাছে অতি পরিচিত হিন্দী তো রয়েইছে। তাই এই রাজ্যের বাঙালির কাছে বাংলাভাষা আজ শুধু অপ্রসঙ্গিকই নয়, সম্পূর্ণ অচল আবেগ মাত্র।

বুস্তুত দীর্ঘকাল ধরেই মাতৃভাষার প্রতি আমাদের উদাসীনতা ও সমাজের প্রাগ্রসর শ্রেণীর এই ভাষাটি সম্বন্ধে  উন্নাসিকতা বাংলা ভাষার প্রসার ও প্রচলনে ধারাবাহিক ভাবেই বাধার সৃষ্টি করে এসেছে। এখন দেখা যাক বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে এই উদাসীনতা ও উন্নসিকতার সুদীর্ঘকালের প্রভাবটি কিভাবে ক্রিয়াশীল। সার্বিক ভাবে একদিকে ইংরেজী ভাষার প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও অন্যদিকে হিন্দীকে ভারতের প্রধান ভাষা বা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ধরে নেওয়া, আমাদের বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের বাংলা ভাষা সম্বন্ধে একটি হীনমন্যতা গড়ে তুলেছে। যার সরাসরি প্রভাবে আমরা যার যত বেশি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী, সেই নিক্তিতে নিজেদের শিক্ষিত প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ অপ্রয়জনীয় ভাবে হলেও নিজেদের স্বজাতির মধ্যেও পরস্পরে ইংরাজীতে বাক্যলাপে অধিকতর স্বচ্ছন্দ বোধ করে থাকি। সারা পৃথিবীতে এই মানসিকতার দৃষ্টান্তে আমরা বাঙালিরা সত্যিই অনন্য। অন্যদিকে এরাজ্য বসবাসকারী বিপুল পরিমাণ হিন্দীভাষী ও হিন্দী জানা অবাঙালিদের সাথে আমরা স্বতঃপ্রোণদিত হয়েই হিন্দীতেই যোগাযোগ রাখতে ভালোবাসি, কারণ ভারতীয় নাগরিক হিসাবে আমরা নিজেদেরকে আগে ভারতীয় তারপর দৈবাত বাঙালি বলে মনে করি বলে আমরা হিন্দীকেই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে দেখি। অনেকেই বলবেন তাতে কি হয়েছে। সারা ভারতের একটি সাধারণ ভাষা থাকলে তো ভালোই। ঠিক কথা। কিন্তু সেই জায়গায় হিন্দীকে তুলে ধরতে গিয়ে নিজের মাতৃভাষাকে কোণঠাসা করে বলি দেওয়ার কথা সারা ভারতে একমাত্র বাঙালি ছাড়া আর কেউই কিন্তু ভাবে না। ভাববেও না কোনদিন। অনন্য বাঙালি আর অনন্য তার মানসিকতা। ভূভারতে যার তুলনা নেই।

তিন শতকের বৃটিশ শাসনের ফলে সুস্থ সুন্দর মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত জীবনযাপন ও জীবিকা নির্বাহের সাথে ইংরেজী ভাষাটি সমার্থক হয়ে গিয়েছে। ইংরেজী জানা বাঙালি আর ইংরেজী না জানা বাঙালির মধ্যে সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণী বিভাজন তৈরী হয়েছে এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে। ফলে সমাজে উন্নততর জীবন যাপনের প্রধানতম শর্তই হলো ভালোভাবে ইংরেজী শিক্ষা।

যে কারণে সারা বাংলার সর্বত্রই ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশুনোর জন্য এত স্কুল কলেজ গড়ে উঠেছে। এবং যা অত্যন্ত ব্যায় বহুল। যার ফলে আর একবার বংশ পরম্পরায় অর্থনৈতিক শ্রেণী সৃষ্টির ধারা চালু হয়ে গেল। যেখানে ইংরেজী ছাড়া উচ্চশিক্ষার কোনো বন্দোবস্ত আজও গড়ে ওঠে নি, সেখানে এটাই নিদারুণ বাস্তব। কোনো ভাষা তখনই সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে যখন সেই ভাষায় উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা যায়, সেই ভাষা স্বদেশবাসীর জীবনজীবিকায় নির্ভরতা দেয় এবং সেই ভাষায় সৃষ্টি হওয়া উচ্চাঙ্গের সাহিত্য সংস্কৃতি স্বদেশবাসীর পুষ্টি নিশ্চিত করে বিশ্বমানবকেও পুষ্টি যোগাতে সক্ষম হয়।

দুঃখের বিষয় বাংলা ভাষার অবদান প্রথম দুইটির ক্ষেত্রে একেবারে শূন্য। এবং শেষেরটির ক্ষেত্রে আমরা যতটা আবেগপ্রবণ হয়ে বঙ্গ সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করি, বিশ্ব সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনে বঙ্গসাহিত্য সংস্কৃতি আজও ততটা বিখ্যাত তো নয়ই বরং বেশ পিছনের সারিতেই তার অবস্থান।  ফলে এই বাস্তব পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আজকের বাংলাভাষা। বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিশেষ প্রসঙ্গিক নয় আর।

অর্থাৎ বঙ্গ জীবনে ইংরেজী ও হিন্দীর ব্যাপক প্রয়োগ ও নিরন্তর ব্যবহারে দৈন্দিন বেঁচে থাকার কাজ থেকে জীবন গড়ে তোলা ও উন্নততর জীবন যাপনের জন্য বাংলা ভাষার কোনই উপযোগিতা অবশিষ্ট নেই আর। অর্থনৈতিক শ্রেণী বিভাজনের দুই প্রান্তে হয় হিন্দী নয় ইংরেজী জানতেই হবে জীবিকা নির্বাহের জন্য। উচ্চশিক্ষা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা; চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সুস্বাস্থ পরিসেবা; আইন আদালত থেকে প্রশাসনিক কাজকর্ম সবই ইংরেজী ভাষা নির্ভর। আর কলকারখানায় শ্রমজীবী বাঙালির কাছে হিন্দীবাসী সহকর্মীদের বলয়ে থেকে হিন্দী খুবই কার্যকরি ভাষা দৈনন্দিন জীবনের পরিসরে। দুই ক্ষেত্রই ব্রাত্য বাংলাভাষা। বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভ করার উপায় নেই। উপায় নেই জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার কোনো কার্যকরি ক্ষেত্র প্রস্তুত করার। কারিগরি শিক্ষায় এই ভাষা নেহাতই মূক ও বধির। শিল্পবাণিজ্যে বাংলাভাষার কোনোই কার্যকারিতা গড়ে ওঠেনি কোনোদিনই। বর্তমানের তথ্য প্রযুক্তির বিশাল অঙ্গনে বাংলা ব্রাত্য। জীবিকা নির্বাহে বাংলা কোনো সহায়তা দিতে নিতান্তই অপারগ। এইভাবে একটি দেশের সার্বিক উন্নয়েন যে ভাষার কোনো ভূমিকাই নেই সেই ভাষার ভবিষ্যত অভিমুখ যে দিকেই হোক, তা যে খুব উজ্জ্বল নয় তা বলাই বাহুল্য। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভোগবাদী দুনিয়ার বিশ্বায়নের মোহ। যে মোহর বাস্তবায়নে ইংরেজী ভাষাই একমাত্র চাবি কাঠি। ফলে আরমরি বাংলাভাষা আজ মর মর।

পশ্চিমবঙ্গে বাংলাভাষার এই পরিস্থিতির সাথে বরাক উপত্যাকা ও ত্রিপুরার যে খুব বেশি ফারাক আছে তা বলা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ভিন্ন এই কারণে যে বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসভায় সেই ভাষায় কথা বলা যেতে পারে। তা বিশ্বসভা স্বীকৃত। বাংলাদেশের সর্বত্র মাতৃভাষা জাতীয় আবেগের মূল অনুষঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধ মুলত বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের পরিণত রূপ। ফলে দেশের স্বাধীনতার ভিত্তিই হল বাংলাভাষা। এবং সেই সূত্রেই আবিশ্ব তার স্বাধীন সার্বভৌম পরিচিতি। কিন্তু এতো হল প্রদীপের শিখা। তার তলায় কতটা আলো অন্ধকারের খেলা সেটা বুঝতে গেলে পৌঁছাতে হবে রোজকার জীবন বাস্তবতার গভীরে।

বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রেও আধুনিক যুগের উপোযোগী বিত্তশালী হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান শর্ত ইংরেজী জানা। উচ্চশিক্ষার্জন ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ইংরেজী বিনা অসম্ভব। চিকিৎসা ও স্বাস্থ পরিসেবা ইংরেজী নির্ভর। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা সেখানেও অসহায় আজও। তবু প্রশাসনিক কাজকর্মে বাংলার প্রচলন থাকাতে বাংলার ব্যবহার অনেকটাই বিস্তৃত। কিন্তু ব্যবসা বাণিজ্যে সেই ইংরেজী নির্ভরতা থাকায় ইংরেজী ছাড়া গতিও নেই। এবং আবিশ্ব বিশ্বায়নের ঢেউতে বাংলাদেশের সর্বত্রই ইংরেজীর  গুরুত্ব বেড়ে গেছে ব্যাপক ভাবে। ফলে সেখানেও যত্র তত্র ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছড়াছড়ি। অর্থনৈতিক শ্রেণী বিভাজনে ইংরেজীর ভূমিকাই সমধিক।

অর্থনৈতিক এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও বোম্বাই সিনেমা ও টিভির দাপটে হিন্দীভাষা ঘরে ঘরেই আদৃত। হিন্দীবলয়ের জৌলুশে সেখানেও বিমুগ্ধ বাঙালি। এবং হিন্দীগানের প্রভাব সুগভীর। এরসাথে ধর্মীয় কারণে আরবীর প্রভাব তো আছেই। ফলে বাংলাভাষাকে সেখানেও প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে ভিনদেশী ভাষার বহুল ব্যবহারের সাথে। বঙ্গভাষা কেবল সাহিত্য সংস্কৃতির হাত ধরেই বিশ্বে সুপ্রতিষ্ঠ থাকবে এরকম একটা আবেগপ্রবণ মনোভাব বাংলাদেশে সক্রিয়।  আর এরই ফাঁক গলে প্রতিনিয়ত ইংরেজীর উপর নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে নজর এড়িয়ে। ধীরে ধীরে কিন্তু সুনিশ্চিত ভাবেই সঙ্কুচিত হচ্ছে স্বাধীন বাংলাভাষার নিজস্ব জমি।

ফলত এই সকল কারণে ত্রিপুরা ও বরাক উপত্যাকা সহ উভয় বঙ্গই সার্বিক ভাবে বাংলাভাষার জমিটি খুব সুদৃঢ় নয়। এবং প্রতিনিয়ত বাংলাভাষা ইংরেজী ও হিন্দীর দাপটে কোনঠাসা হয়ে চলেছে। একদিকে বাংলা কথ্যভাষার মধ্যে ইংরেজী ও হিন্দী শব্দের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং অন্যদিকে বক্তব্য প্রকাশে বাংলার উপর ক্রমহ্রাসমান নির্ভরশীলতা; এই দুই সাঁড়াশী আক্রমনে বাংলাভাষার বাঙালিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। বিশেষ করে বাংলা বাগধারা দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। আর একটা বড় প্রভাব পড়ছে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দীভাষী অধিবাসীদের বিপুল সংখ্যাধ্যিক্যের জন্য। এর সাথে বাংলা পঠন পাঠন যত কমছে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহার তত বিকৃতির দিকে ঝুঁকছে। এই রকম পরিবেশে বাংলাভাষার ভবিষ্যত খুব উজ্জ্বল নয়। শৈশব থেকে শিক্ষিত পরিবারে ছেলে মেয়েদের ইংরেজী শিক্ষার উপরই জোর দেওয়া হয়। যত্ন নেওয়া হয় না বাংলা শেখায়। যার ফলে মাতৃভাষার উপর বিশেষ কোনো ভালোবাসা গড়ে ওঠে না।

ফলে তারা তাদের কর্মজীবনে বাংলাভাষার উন্নতিতে কোনোই সদর্থক ভূমিকা নিতে পারে না। অন্যদিকে শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত শ্রেণীর শিশুরা সামাজিক পরিবেশ থেকেই হিন্দীর প্রভাবে হিন্দী ঘেঁষা বিচিত্র এক বাংলাভাষার মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকে। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের পরিসরে বাংলাভাষার যে চর্চা হয় এবং বঙ্গ সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনে বাংলাভাষার যে নিরন্তর চর্চা হয় সেই পরিসরের বাইরেই কিন্তু পড়ে থাকে বৃহত্তর বাংলা। সেই বাংলায় বাংলার অবস্থা অনাথ শিশুর মতোই।

বাংলাদেশের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও এখনো ইংরেজীর দাপটের কাছে পুরোপুরি মাথা তুলে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। বিশ্বায়নের প্রবল ঢেউতে আদৌ তা সম্ভব হবে কিনা নিঃসন্দেহে বলা যায় না।

প্রত্যেক উন্নত ভাষায় প্রামাণ্য অভিধানের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এবং সময়ের সাথে সাথে তার পরিমার্জন ও পরিশোধন করে ব্যবহারিক ভাবে তার প্রয়োগ করা হয় সামগ্রিক ভাবে। দুঃখের বিষয় চার খণ্ড বাংলায় এই সুবিধেটি না থাকায় বাংলা ভাষার অবস্থা প্রায় অভিভাবকহীন। বিভিন্ন খণ্ডের মধ্যে এই ব্যাপারে সংযোগ সাধন খুবই জরুরী। বাংলাদেশে বাংলাভাষার প্রতি আবেগটিকে আরও সদর্থক ভাবে ভাষার প্রসার ও উন্নতিতে কাজে লাগাতে হবে। এবং সেই আলোটুকু এসে পড়ুক এপারেও।

অনেকেই হয়ত বলবেন বাংলাভাষার ভবিষ্যত নিয়ে এখনই চিন্তার কিছু হয়নি। এত কোটি কোটি মানুষের মুখের ভাষা আপন শক্তিতেই টিকে যাবে। কিন্তু কথা টিকে যাওয়া নিয়ে নয়। বিষয়টা ভাষার সমৃদ্ধ স্বনির্ভরতা নিয়ে। প্রত্যেক ভাষায় অন্যান্য ভাষার প্রভাব পড়ে। সেই প্রভাবে কালের নিয়মে ভাষার গতিপথ বদলাতে থাকে। কিন্তু সেই বদল ঘটে ভাষার নিজস্ব নিয়মে ওপরের সজ্জায়। অন্যদিকে সেই বদল ভাষার  প্রকৃতির মধ্যে ঘটলেই সর্বনাশ। সেই কারণে সব উন্নত জাতি তার মাতৃভাষাকে সযত্নে রক্ষা করে চলে। আর বাংলাভাষার সমস্যা আরও জটিল। বাংলাভাষাকে আমরা আজও পরনির্ভর করে রেখেছি। পরনির্ভরতার এই অভিমুখ থেকে আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে না পারল ভবিয্যত ভয়াবহ।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষীত