মন খারাপের জানলা
মনের গতি কখন যে কোন দিকের কোন হাওয়া
উড়তে উড়তে হঠাৎ কোথায় গিয়ে কাটা ঘুড়ির মতো গোঁত্তা খেয়ে পড়ে। আগে থেকে অনুমান করা যায়
না। প্রতিদিন চারপাশে কতরকম ঘটনা আমাদের মনের ভিতে কাঁপন ধরানোর চেষ্টা করে তার ঠিক
নাই। বেশির ভাগ সময়ে আমরা কাজিরাঙার গণ্ডারের মতো ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ বলে নিজের
চরকায় তেল দিতেই ব্যস্ত থাকি। রুদ্রনীলের ভাষায়, ‘দাদা আমি সাতে পাঁচে থাকি না’। এই
সাতে পাঁচে না থাকার একটা সুবিধা আছে। তাতে ঘন ঘন মন খারাপের জানলায় এসে দাঁড়াতে হয়
না। নিজের মনে নিজের বেহালায় নিজেই সুর তুলি। তাতে শান্তি আছে। স্বস্তি আছে। কিন্তু
এই যে স্থবির শান্তি, যা আমাকে আমার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। সেই শান্তির ভ্যালিডিটি
বেশিদিন টিকবে এমন কথা নাই। নিজের চরকায় তেল দিতে দিতেই কোন এক অপয়া সকালে হয়তো দেখা
যাবে বিপদ আমার ঘাড়েই নিঃশ্বাস ফেলছে। নিজের যে মনটাকে খাইয়ে পড়িয়ে যত্ন করে দিব্বি
টেস্টেড আয়রনের মতো প্রতিক্রিয়াহীন করে রেখেছিলাম, সেই মনটাই তখন সকলের আগে বিগড়িয়ে
যেতে পারে। তার হড়েক রকমের কারণ আছে। কারণ যাই থাক না কেন, সেটা চিন্তার বিষয় নয়। পথে
ঘাটে বাসে ট্রামে এই যে হাজারো ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস আমাদের ক্রমাগত ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে
হাডুডু খেলার মতো, আমরা তো তার ভিতরেই আত্মরক্ষার ইমিউনিটি দিয়ে সাফল্যের সাথে নিজেকে
সুরক্ষিত করে রাখি। কোন ভাইরাস কতটা বিপদজনক। কোথায় কোথায় থাবা গেড়েছে, করোনারূপী যমদূতের
আগমনের আগে কে খেয়াল রাখতাম আর? ফলে বিপদ সেখানে নয়। বিপদ নিজের ভিতরে সেই ইমিউনিটির
ভিতে ফাটল ধরলেই। মন খারাপও ঠিক সেই রকম এক ঘটনা। ফাটলটা ধরে আপন মনেই। তখন মন খারাপের
জানলায় এসে দাঁড়ানো ছাড়া করার কিছুই থাকে না।
মন খারাপের
সেই জানলায় একলা একা নিজের সাথে থাকাই বিধির লিখন। সেই সময় কেউ যে এসে পাশে বসে মন
ভালো করে দেওয়ার মন্ত্র আউড়াবে, এমনটা আশা করা নেহাৎই কষ্টকল্পনা। কিন্তু তখন সেই কেউ
একজনের জন্যেই মনটা যেন ছটফট করে আমাদের। অনেকটা মাতৃস্তনের জন্য ক্ষুধার্ত শিশুর মতো।
খিদের জ্বালায় যেমন চোখ দিয়ে জল গড়াতো শৈশবের বারান্দায়, ঠিক তেমনি মন খারাপের জানলায়
কোন একজনের জন্য ভিজে উঠতে পারে চোখের পাতা। আমরা তখন সেই না দেখা দরদী মুখটার জন্য
মনের কল্পনায় স্বপ্নজাল বুনতে পারি। ইচ্ছা হলে। মন খারাপের বিরুদ্ধে সেটিই হতে পারে
একটা প্রতিষেধক খুঁজে ফেরার মতোন অবস্থা। মনের কষ্ট মন দিয়েই মোকাবিলা করা ছাড়া উপায়
কি? বুদ্ধির দৌড় কিছুটা চেষ্টা করে ঠিকই। তাকেই পরিভাষায় বলা যায় প্রবোধ দেওয়া। কিন্তু
তার কার্যকারিতা খুব উল্লেখযোগ্য হলে আর মন খারাপের জানলায় এসে দাঁড়াতে হতো না।
কিন্তু কি
ভাবে সম্ভব সেটি। মন দিয়ে মন ভোলানো? নিজেরই তো মন। মানুষ মাত্রেই একটি মনের অধিকারী।
দুই তিনটি কি একাধিক মন থাকে কি কারুর? থাকলে তো সুবিধেই হতো ইউজ এণ্ড থ্রোর মতো ব্যবহার
করা যেত। কিংবা একটাকে সারাতে দিয়ে এসে, অন্য কোনটি নিয়ে কাজ চালিয়ে দেওয়া যেত। তেমনটি
মনে হয় অতিবড় বুকের পাটা ওয়ালা পালোয়ানেরও নাই। তাই সেই কথা ভেবেও লাভ নাই। আমাদের
কাজ করতে হবে, একমেবাদ্বিতীয়ম আপন মনটিকে নিয়েই। কিন্তু এগোবার পথ কোথায়? কোনদিকে?
স্বাভাবিক ভাবেই এব্যাপারেও নানা মুনির নানা মত্। কোন ইউনিভার্সাল ফরমুলা নাই। যার
মন, তাকেই খুঁজে নিতে হবে পথ। বাইরে থেকে যে যাই পরামর্শ দিক না কেন, মন খারাপের সেই
জানলায় কোন পরামর্শই কাজে লাগে না। কাজে লাগে না, পাশে না বসলে। কাজে লাগে না, আহত
মনটিকে আদরের মাধুর্য্যে কাছে টেনে না নিলে। কিন্তু কার আর দায় পড়েছে? দায় পড়ে না কারুরই।
যার মন তার ঝামেলা। যার জানলা, তারই সমস্যা। সমস্যায় পড়লে পড়তে দেওয়াও সমস্যা থেকে
উঠে দাঁড়ানোর শক্তি জোগাতে পারে। হামাগুড়ি দেওয়া শিশু যখন প্রথম হাঁটার চেষ্টা করে
উঠে দাঁড়িয়ে। টলমল পায়ে কতবার পড়ে যায়। কিন্তু প্রতিবারই তাকে কোলে তুলে নিলে সর্বনাশ।
তার আর নিজের পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা নাও হতে পারে। মন খারাপের বিষয়টাও ঠিক সেই মতো। সামলাতে
দিতে হবে ভুক্তভুগীকেই। নয়তো সেই ফুলের ঘায়ে মূর্চ্ছা যাওয়া মন কোনদিনই আর স্ববশে থাকবে
না। শক্তপোক্তও হয়ে উঠবে না। মন খারাপের জানলাই হবে তার কয়েদ।
তাই মাঝে
মাঝে মন খারাপের জানলায় দাঁড়ানো ভালো। একটা অপরচ্যুনিটি। নিজের মনেরই ফাঁক ফোঁকর গুলি
সম্বন্ধে সজাগ হয়ে ওঠার। বেহুলার বাসর ঘরের ছিদ্রটি ঠিক কোথায় ছিল জানলে আর এত কাণ্ড
করতে হতো না। এও ঠিক তেমনই। আমাদেরও মনে নানান ধরণের দূর্বলতার ছিদ্র থাকে। স্নেহ মায়া
মমতা ভালোবাসার ছিদ্র। আর ঠিক সেই ছিদ্র দিয়েই মন খারাপের কালসর্পের প্রবেশ। তাই সেই
ছিদ্রের অবস্থান জানার জন্যেও মোহভঙ্গের ছোবল খাওয়া ভালো মাঝে মাঝে। তবেই না চৈতন্য
হয়। স্নেহ মায়া মমতা ভালোবাসা আসলেই জন্মান্ধ প্রতিবন্ধী। তাই সেই অন্ধত্ব কাটানোর
জন্যও মন খারাপের জানলায় এসে পৌঁছানো দরকার কখনো সখনো।
আসলে মোহভঙ্গ
না হলেই মন খারাপের অসুখের কবলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ষোলআনা। আর মোহভঙ্গ হওয়াই সেই
অসুখের একমাত্র প্রতিষেধক। সেই প্রতিষেধক পাওয়ার একমাত্র পথই ঐ মন খারাপের জানলায় গিয়ে
দাঁড়াতে বাধ্য হওয়া। তাই সেই মোহভঙ্গের কারিগর যিনি, আমাদের উচিৎ তাঁর কাছেই সমধিক
কৃতজ্ঞ থাকা। এই ভাবে একটি পর একটি মোহ ভঙ্গের পর্ব আসতেই পারে জীবনে। বার বার ছুটে
যেতে হতে পারে মন খারাপের জানলায়। তাতে হতোদ্যম হওয়ারও কিছু নাই। স্নেহ মায়া মমতা ভালোবাসায়
ন্যাড়া কবার বেলতলা যায়, বলা যায় না। জীবনের আর পাঁচটা বিষয় থেকে এইগুলি সম্পূর্ণ পৃথক।
মনের সাথে মনে মনে গাঁটছাড় এদের। তাই সেই গাঁটছাড় বারে বারেই ছিন্ন হতে পারে। হোক না
ক্ষতি কি। ধীরে ধীরে মনের মোহভঙ্গের সিঁড়ি বেয়ে ততই আমরা সমদর্শী হওয়ার শক্তি অর্জনের
পথে এগোবো। সেও বড়ো কম কথা নয়। মোহের বন্ধন না কাটাতে পারলে তো আর সমদর্শী হয়ে ওঠা
সম্ভব নয়। বরং সেই মোহের বন্ধন যত কাটে ততই মঙ্গল। যিনি বা যাঁর হাতে কাটে, তিনি আমাদের
থেকে যত দূরেই চলে যান না কেন, যাওয়ার আগে আমাদেরই মস্ত উপকার করে দিয়ে যান। মন খারাপের
জানলায় তাই তাঁর উদ্দেশেই অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানানো দরকার। অন্তত পারি আর নাই পারি,
মন খারাপের জানলা যে আমাদেরকে সেই এক মস্ত সুযোগ করে দেয়, সেটা যেন অন্তর থেকে স্বীকার
করতে পারি। নয়তো ঠকানো হয় নিজেকেই।
আর একবার
যদি সেটি সম্ভব হয়। অর্থাৎ মন খারাপের জানলায় বসে মোহভঙ্গের কাণ্ডারীকে যদি জানাতে
পারি অন্তরের একান্ত কৃতজ্ঞতা তবে তো কথাই নাই। মন খারাপ উধাও এক নিমেষেই। ঝরঝরে প্রফুল্ল
অন্তরে কৃতজ্ঞচিত্তে আমরা সমদর্শী হওয়ার পথে এগোতে পারি এক পা এক পা করে। মনের খুঁটিতে
তখন আর বেদনার পতকা ওড়ে না। ওড়ে মনুষ্যত্বেরই জয়পতাকা এক। হিংসা দ্বেষ প্রতিহিংসা প্রতিশোধস্পৃহা
ক্রোধ ক্ষোভ বিক্ষোভ আর কোন ভাবেই আমাদেরকে কব্জা করতে পারে না তারপর। আমাদের অন্তরে
এক বোধিবৃক্ষের জন্ম হয়। অন্তত হতে পারে তখনই। মন খারাপের সেই জানলা থেকেই। যদি পারি
কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতে মোহভঙ্গের সেই কান্ডারীকে। মনের অন্তরতম অন্তর্দেশ থেকে। আপন
অন্তরের সেই বোধিবৃক্ষের বেদীতেই তখন আমাদের মনুষ্যত্বের পূর্ণ উদ্বোধন। সেদিন আর মন
খারাপের দিন নয়। সেইদিনটি আমাদের উৎসবের দিন।
৪ই জুলাই’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

