বাংলা আছে বাংলাতেই লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বাংলা আছে বাংলাতেই লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বাংলা আছে বাংলাতেই



বাংলা আছে বাংলাতেই

আহা কি আনন্দ চ্যানেলে চ্যানেলে। রিমোর্ট হাতে একের পর এক চ্যানেল ঘুরে রাজ্যবাসীর দিলখুস। অনেকদিন পর এমন রগড় দেখার সৌভাগ্যে চাপাহাসি মাপা তর্কে সান্ধ্যটিভির মৌতাত রাজ্যজুড়ে। বাইশ বছরের বিবাহিত দাম্পত্য জীবন পেরিয়ে স্বামীস্ত্রীর পারস্পরিক কলহ ও পরকীয়া নিয়ে তর্জায় উন্মুখ দর্শক শ্রোতাও। কে সত্যি বলছে, কে মিথ্যা বলছে, বিষয় সেটি নয়। কে কার সম্বন্ধে ঠিক কি বলছে কতটা বলছে। আনন্দ সেখানেই। কতটা হাঁড়ির খবর উদলে হচ্ছে বিষয় সেটাই। সাংবাদিকের প্রশ্ন যত বেশি উস্কানিমূলক তত বেশি টিআরপি বৃদ্ধি চ্যানেলের। আর তত বেশি উৎসুক আমরা। আমজনতা। ভোটার লাইনে দাঁড়ানো পাবলিক। পরের ঘরের কেচ্ছা কাহিনী শোনা ও জানার মতো সুখ আর নাই। সে পাশের বাড়ীর ঘটনাই হোক আর মেয়রের বাড়ীর ঘটনাই হোক। কবি বেঁচে থাকলে বোধকরি খুশিই হতেন দেখে যে কত বড়ো বেদবাক্য দিয়ে গিয়েছিলেন, ‘রেখেছো বাঙালি ক’রে মানুষ করো নি’। কে চায় মানুষ হতে, এমন রগড় ফেলে?

না ভালোমানুষ মেয়র যখন তোয়ালে জড়িয়ে নারদার টাকা নিচ্ছিলেন স্টিং ক্যমেরার সামনে, মানুষ তাতে কোন কেচ্ছার গন্ধ পায়নি। মন্ত্রীত্বও যায়নি। মেয়রের চেয়ারও যায় নি উল্টিয়ে। দুহাত ভরে ঢেলে ভোট দিয়ে মানুষ আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে যে যেখানে ছিল, সেখানেই। কিন্তু সেই মেয়রের সংসারে আগুন লাগাতেই মানুষ কেচ্ছার গন্ধ পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে এবার। ভোট বড় বালাই। তাই মন্ত্রীত্ব ও মেয়রের চেয়ার খোয়াতে হয়েছে মহানাগরিককে। কেননা সামনেই ২০১৯! সাবধানের মার নাই। কোর্টে কেস চলছে। কে জেতে কে হারে কে জানে। অযথা রিস্ক না নেওয়াই ভালো। বরং জনমানসে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার শর্টকার্ট পথটা ধরে রাখাই ভালো। এখন আর ‘আমরা সবাই চোর’-এর মতো আমরা সবাই পরকীয়ায়, এমন কোন প্ল্যাকার্ড মিছিল করার সময় নয়। উপায়ও নাই। উচিতও নয়। কে জানে হয়তো পদত্যাগ পত্রে সেই কারণেই, ‘বাধ্য হয়ে পদত্যাগে’র কথা বলতে হয়েছে পদত্যাগের সময়।

পদ গিয়েছে। গদি গেল। ক্ষমতার আলোকবৃত্তের বাইরে বেড়িয়ে এখন অনেকটাই হালকা বোধ করতে পারেন তিনি। দায়মুক্ত হয়ে আইনি লড়াইয়ে মনোনিবেশ করতে সুবিধাও হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাকস্টেজে দল যতক্ষণ পাশে থাকবে সক্রিয় ভাবে। কিন্তু লড়াই কার বিরুদ্ধে? বাইশ বছরের জীবনসাথীর বিরুদ্ধে। আপন সন্তানের জননীর বিরুদ্ধে। বাইশ বছর পর। কবি লিখেছিলেন ‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার- তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!’ কিন্তু তার আগেই একি কাণ্ড! বাইশ বছর পর কেউ আর কারুর মুখ দেখতে চাইছেন না। তা নাই চাইতে পারেন। বরং চাইছেন পরস্ত্রী পরপুরুষের মুখ দেখতেই হয়তো। সে তাঁদের ব্যক্তিগত মর্জ্জি। ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। কিন্তু সেখানে আমজনতার কি? এই যে টিভির জানলা খুলে বসে বসে উপভোগ করা, এও কি বিকার নয়?

সেই বিকারেরই অপর নাম বাঙালিত্ব। আমরা অন্যের সর্বনাশে আমোদ পেতেই অভ্যস্থ। পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে আমার বড়ি আলোকিত হয়। সেটাই আমাদের কাছে অধিকত সত্য। টিভি চ্যানেলগুলি সেটা বিলক্ষণ জানে। আর জানে বলেই সাংবাদিকদের উপর ভার পড়েছে, টিআরপি বাড়ানোর। যত বেশি উস্কানিমূলক প্রশ্ন তত তীব্র মন্তব্য। আর তত বেশি তীব্রতর প্রতিক্রিয়া উল্টোপক্ষের। নারদ নারদ বলে এর মন্তব্য ওকে শুনিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া শোনার জন্যে মাইক্রফোন এগিয়ে দেওয়া মুখের কাছে। উদ্দেশ্য পরিস্কার। যে যত বেশি মুখর হয়ে উঠবে, যার প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠবে যত বেশি মুখরা, তত বেশি দর্শক ধরে রাখা যাবে চ্যানেলে। আর সেখানেই তত বেশি সাংবাদিকের কৃতিত্ব। কি আশ্চর্য্য!

কিন্তু টিভি ক্যামেরার সামনে সাংবাদিকের উস্কানিমূলক মাইক্রফোনে ঘরের কথা রাষ্ট্র করে মনের বিষ উগড়িয়েই বা দিচ্ছেন কেন এঁরা? নিশ্চয় দর্শক মনোরঞ্জনের জন্যে নয়? তাহলে! কোর্টের কেস কোর্টের চৌহদ্দীতেই তো রাখা যেত। আমজনতার ঘরে ঘরে সেই তরজা পৌঁছিয়ে দেওয়ারই বা কি প্রয়োজন পড়লো এনাদের। মূল প্রশ্নটা এইখানেই। সত্যের পক্ষে থাকলে, আইন ও আদালতই তো যথেষ্ট। তার বাইরে আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রকাশ্যে অন্দরের কথা বাইরে আনার সত্যই কি দরকার পরে? নাকি আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিগুলি আলগা বোধ করলেই এইভাবে প্রকাশ্যে কলহ করার প্রয়োজন দেখা দেয়? আর তখনই গুলিয়ে যেতে থাকে সুযুক্তি আর কুযুক্তি। গুলিয়ে যেতে থাকে কে সৎ আর কে অসৎ। গুলিয়ে যেতে থাকে কোনটা শোভন আর কোনটা অশোভন। পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির আবহে কদর্য হয়ে ওঠে সামজিক পরিসর। সামগ্রিক পরিবেশ। কবি বলেছিলেন নবজাতকের জন্যে প্রাণপনে জঞ্জাল সরানোর অঙ্গীকারের কথা। আর আজকে আমরা জঞ্জালের মধ্যেই পুঁতে দিচ্ছি মানুষের ভবিষ্যৎ।

কি দেখে বেড়ে উঠছে আমাদের শিশু কিশোর তরুণ? কোন আদর্শের দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছি আমরা তাদের জন্যে? অথচ সময়ে অসময়ে আমরাই বেশি করে নবীন প্রজন্মের উপর আঙুল তুলি মূল্যবোধের অভাবজনিত অভিযোগে। এইখনেই আমাদের বাঙালিদের দ্বিচারিতা। মানুষের ব্যক্তি পরিসরে একজন মানুষ তাঁর বিবাহিত জীবনসাথীর সাথে কতটা সময় কাটাবেন, আর তার বন্ধুর সাথে কতটা। কিভাবে কখন এবং কোথায়, সেটা একান্তই তাঁর ও তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। কিংবা কে কখন তাঁর দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে ইতি টানতে চাইবেন, আর কে তাতে কিভাবে বাধা দিতে উঠে পড়ে লাগবেন, সেও তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার। সেই বিষয়ে যে ধরনেরই জটিলতার সৃষ্টি হোক না কেন, সেটা তাঁরাই ঠিক করে নেবেন। না পারলে আইন আদালতের দারস্থ হবেন। কিন্তু সেটাই যখন সামাজিক চৌহদ্দিতে উৎকট রগড় হয়ে দেখা দেয়, বা সেই রগড় নিয়েই ব্যবসা শুরু হয়ে যায়, তখনই সমাজের মূল ক্ষতই বেআব্রু হয়ে ধরা পরে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এটাই, এইরকম অসুস্থ সময়ে সমাজিক সেই অসুখ সম্বন্ধে আমরা কেউই আর সচেতন নই। আমরা হয় কারুর না কারুর পক্ষ নিয়ে নীতিবাক্য শোনাচ্ছি। না হয় নারদ নারদ করে সমগ্র রগড় উপভোগ করছি। এখানেই বাঙালির আত্মপরিচয়।

আমাদের কর্ম আমাদের ধর্ম আমাদের প্রকৃতি সেই আত্মপরিচয়কেই প্রকাশ করে থাকে। আর সেখানেই বিশ্বের উন্নত জাতিসমূহের থেকে আমাদের মূলগত প্রভেদ। তাই এদেশের নেতা থেকে জনতা সকলেই সমান। পণ্ডিত থেকে মূর্খ সকলেই এক। ভালো থেকে মন্দ পার্থক্য শুধু সাহসে আর ভয়ে। আমরা পরকীয়ার নিন্দা করি মুখে, আর পরকীয়ার স্বপ্ন লালন করি বুকে। দাম্পত্যের জয়গান করি প্রকাশ্যে, আর দাম্পত্যকে অসহ্য করে তুলি নিজের ঘরেই। অন্যের কেচ্ছায় মিটমিট করে হাসি আর নিজের কেচ্ছা সমালাতে না পারলেই প্রকাশ্যে মুণ্ডুপাত শুরু করি ঘরেরই প্রিয়জনের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক ও সমাজিক দুর্নীতিগ্রস্তদের বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে ক্ষমতায় বসাই, আবার দুইবেলা দেশটা রসাতলে গেল বলে বিলাপ করতে থাকি। এটাই আমাদের প্রকৃতি। এটাই বাঙালির ধরন। তাই কবির ভাষাতেই বলতে হয় শুধু কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই নয়, বাংলা আছে বাংলাতেই।

২৭শে নভেম্বর’ ২০১৮

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত