মরাকান্নার রোল
কান্না বেশ ছোঁয়াচে রোগ। দশজনকে
কাঁদতে দেখলে, অনেকেরই কান্না পায়। পাবে। অন্তত পাওয়ার কথা। খুব বেশি পাষণ্ড না হলে।
কিন্তু মড়াকান্না, সে এক মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। প্রায় দাবানলের মতো লকলক করে সংক্রমিত
করে ফেলে বাকিদের। আর কান্না হাসির দোল দোলানোর ফেসবুকের পালায় সেই সংক্রমণ দিগ্বিদিক
হারা হয়ে ছুটতে পারে ওয়াল থেকে ওয়ালে। সম্প্রতি বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষের সৌজন্যে পাঁচিল
কাণ্ডে বাংলা জুড়ে এক মড়াকান্নার রোল উঠেছে। বিশেষত এখনো যাঁরা রাবীন্দ্রিক সংস্কৃতির
নামাবলী গায়ে জড়িয়ে চলা ফেরা করে থাকেন। তাঁদের বক্তব্য পরিস্কার। কবিগুরু বিশ্বভারতীর
প্রতিষ্ঠাই করেছিলেন, সব ধরণের পাঁচিল থেকে মুক্ত একটা পরিসর তৈরী করার উদ্দেশেই। উদার
মানবিক সংস্কৃতির দিগন্তে প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত জীবনের উদ্বোধনের যে শিক্ষা, সেই
শিক্ষার চর্চা করতেই রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা। সেই চর্চায় কোথাও কোন পাঁচিলের
অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। কবির বিশ্বভারতীতে সেই শিক্ষারই উন্মোচন করে গিয়েছিলেন কবি,
তাঁর জীবদ্দশায়। খুবই সত্য কথা। মানুষের সাথে মানুষের চলাচলের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের
পরিসরে কোন ধরণেরই পাঁচিলকে বরদাস্ত করতে পারতেন না এই মানুষটি। একশবার সত্য। জনজীবনের
সাথে সহজ মেলামেশার ভিতর দিয়েই শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে চেয়ে ছিলেন কবি। তাই পৌষমেলার
মাঠে কর্তৃপক্ষের পাঁচিল তোলায় বাংলা জুড়ে মড়াকান্নার রোল উঠেছে চারিদিকে।
রবি ঠাকুরকে
সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে বাঙালি কি এই প্রথম পাঁচিল তুলছে? রবীন্দ্রনাথকে ধুলায় মাড়িয়ে
দিয়ে বাঙালি এর আগে পাঁচিল তোলে নি? যে রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বঙ্গসংস্কৃতির
ভিত্তিমূল করতে রাখীবন্ধন চালু করে ছিলেন। যে মানুষটির কলম হৃদয়ের সমস্ত আর্তি ঢেলে
আহ্বান করে ছিল, ‘বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন এক হউক এক হউক এক হউক’ বলে। সেই মানুষটির স্বপ্নের
সোনার বাংলাকে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট ভাগ করে দুই পারের মধ্যে পাঁচিল তোলে নি বাঙালি? সেদিন
তো কই রাবীন্দ্রিক সংস্কৃতির নামাবলী গায়ে চড়িয়ে কাউকে কাঁদাকাটি করতে দেখা যায় নি?
একটা জাতির
একেবারে গোড়ায় কুঠারাঘাত করে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়ে স্বাধীনতার উন্মত্ত আনন্দে দুই
পারের ভিতরে বাংলার শিরদাঁড়া বরাবর পাঁচিল তুলতে তো কই কোন অসুবিধা হয় নি। সেদিন কোথায়
ছিলেন আমাদের বাপ ঠাকুরদাদারা? রবীন্দ্রনাথের আজীবন সাধনাকে ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রদর্শনের
মাথায় পদাঘাত করে আজও যে কাঁটাতার দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটা গোটা জাতির বুক চিরে। সেই কাঁটাতারের
তথাকথিক আন্তর্জাতিক পাঁচিল নিয়ে তো কোন পারের বাঙালিরই কোন অসুবিধা দেখি না। আজ অনেকেই
বিশ্বভারতীয় পাঁচিল নিয়ে মড়াকান্না জুড়েছেন। রবি ঠাকুরের সাধের বিশ্বভারতীর এ কোন দশা
হলো বলে। কই একবারও তো কাউকে বিলাপ করতে দেখা যায় না, রবি ঠাকুরের সোনার বাংলা টুকরো
টুকরো হয়ে রয়েছে বলে। যে জাতি রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষার জন্ম দেয়, সেই জাতি আবার দুই
টুকরো হয়ে পরস্পরের ভিতরে পাঁচিল তুলে মহানন্দে থাকতে পারে। তাতে কারুর কোন অসুবিধা
দেখা যায় না। বরং সময়ের সাথে নিজেদের ভিতর পাঁচিলের এপারে ওপারে ক্রমাগত আমরা ওরা বিভাজনকে
সর্বাত্মক করে দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিভাজনের ঐতিহ্যকে উত্তরাধিকারে পরিণত করে
দিয়ে যেতেই সকল উদ্যম ও অধ্যবসায়। সেটাই বাঙালির জাতীয় চরিত্র। পাঁচিলের এপারে ওপারে।
তখন কিন্তু বাংলা জুড়ে মড়াকান্নার রোল ওঠে না কোথাও।
হ্যাঁ,
রবি ঠাকুর আজীবন পাঁচিল বিরোধী মানুষ ছিলেন। ছিলেন বলেই তিনি আমাদের এত কিছু সম্পদ
দিয়ে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু আপামর বাঙালি মাত্রেই তো ঘোর রবীন্দ্রবিরোধী এবং পাঁচিলপন্থী।
আমাদের জীবনের পরতে পরতেই আমরা এই পাঁচিল তোলা সংস্কৃতিকেই সুদৃঢ় ভিত্তিতে কায়েম রেখে
চলেছি। কেননা এই সংস্কৃতি হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য। শত শত প্রজন্ম ধরে উত্তরাধিকার
সূত্রে প্রাপ্ত। আসলে পাঁচিল তোলা সংস্কৃতি বাঙালির ডিএনএ’র ভিতরেই বর্তমান। সেই সংস্কৃতিতেই
আমরা দিনভর বছরভর বাঙালির সমাজ ও রাষ্ট্রীক জীবনে হিন্দু মুসলিম বিভাজন করে চলি। পাঁচিলের
একটিই কাজ। সেই কাজটি হলো বিভাজনের রাজনীতি করে চলা। বাঙালির সমাজ জীবনে বর্ণভেদের
অপসংস্কৃতি চালুই হয়েছিল, এই পাঁচিল তোলার রোগ থেকে। ফলে পাঁচিল আমরা কয়েক হাজার বছর
ধরেই তুলে চলেছি। আর আমাদের ভালোবাসার কবি সেই পাঁচিলকে অস্বীকার করতেই গড়ে তুলে ছিলেন
বিশ্বভারতী। তারও কয়েক শতাব্দী আগে আর এক বাঙালি যুবক সেই পাঁচিল ভাঙতেই গড়ে তুলতে
চেয়েছিলেন ভক্তিরসের আন্দোলন। কল্পনা করেছিলেন, ভক্তিরসের প্লাবনে ভেসে দূর হয়ে যাবে
বাঙালির সমাজ ও জীবন থেকে সব ধরণের পাঁচিল। না, শ্রীচৈতন্যও পারেন নি। রবীন্দ্রনাথও
পারেন নি। পাঁচিল ভাঙতে। তার একটাই কারণ দুজনের কেউই বাঙালির ডিএনএ’র মজ্জায় বাসা বেঁধে
থাকা রোগটাকে আগে নির্মূল করতে পারেন নি। রোগটাকে নির্মূল না করতে পারলে, যত পাঁচিলই
ভাঙার চেষ্টা করা যাক না কেন, ভাঙবে তো নাই’ই বরং আরও বেশি করে নতুন নতুন পাঁচিল উঠতে
থাকবে।
১৯৪৭-এর
১৪ই আগস্ট সেই এক নতুন পাঁচিল তুলে দুই পারের বাঙালিই স্বাধীনতার উৎসব উদযাপন করেছিল।
সেদিন রবীন্দ্রনাথের বাংলাকে ভাগ করা হলো বলে কাউকে মড়াকান্না কাঁদতে হয় নি। কিন্তু
আজকে, বিশ্বভারতীর মাঠে পাঁচিল তোলায় অনককেই মড়াকান্নার মিছিলে ছুটতে দেখা যাচ্ছে।
না, মড়াকান্নার মিছিলে পা মেলানো সকলেই যে বেদম স্বার্থপর। তাও নয়। আসলে বাঙালির ভগবান
যেমন মন্দিরে থাকেন। বাঙালির আল্লাহ যেমন মসজিদে থাকেন। বাঙালির গড যেমন গীর্জায় থাকেন।
ঠিক তেমনই বাঙালির রবীন্দ্রনাথও বিশ্বভারতীতে আর জোড়াসাঁকোয় থাকেন। তাই বাঙালির এই
দুই পবিত্র ভুমিতে অরাবীন্দ্রিক কিছু ঘটলে, বাঙালি তো মড়াকান্না জুড়ে দেবেই। যে জাতি
নিজের সমাজ ও জীবনের প্রতিটি স্তর থেকে সজ্ঞানে সচেতন ভাবে রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসিত
করে রেখেছে। সেই জাতির কাছে রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব শুধুমাত্র বিশ্বভারতী আর জোড়াসাঁকোতেই
সত্য। তাই আঘাতটা সেইখানে হলে, রাবীন্দ্রিক নামাবলী গায়ে জড়ানো পাবলিকের কষ্ট তো হবেই।
কিন্তু
সেই একই পাবলিক, সেই একই বাঙালি যখন শিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্বকে পায়ে ঠেলে, প্রথম
শ্রেণী থেকে ইংরেজি পড়ানোর দাবিতে পথে নামে, রবি ঠাকুরের শিক্ষা ও সাধনা, চিন্তা ও
দর্শনকে কাঁচকলা দেখিয়ে। তখন তাদের কারুর কোন কষ্ট হয় না। চোখ দিয়ে মড়াকান্নার জল গড়ায়
না। সারা বাংলা জুড়ে দুই পারেই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ইংলিশ মিডিয়ামের দৌড়াত্মে
বাংলা মাধ্যমের স্কুলের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকলেও কোন বাঙালির রবীন্দ্রনাথের কথা
মনে পড়ে না। মনে পড়ে না, কেন তিনি ব্রিটিশের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিপ্রতীপে
শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন। মনে পড়ে না, রবীন্দ্রনাথ কোন শিক্ষা
ব্যবস্থার পত্তন করে ছিলেন। আর আজ বাংলা জুড়ে ইংলিশ মিডিয়ামের হাত ধরে এ কোন শিক্ষা
ব্যবস্থার পত্তন হয়েছে। তখন কারুর মনে রবীন্দ্রনাথের জন্য এতটুকুও কষ্ট হয় না। কষ্ট
হয়, সন্তান সন্ততির জন্য রাতভোর জেগে লাইনে দাঁড়িয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তির ফর্ম
ঠিকমতো তুলতে না পারলে। এই হলো বাঙালির জাতীয় চরিত্র। কি হিন্দু কি মুসলিম। কি এপারে
কি ওপারে। তারাই আজ মড়াকান্না জুড়েছে বেশি করে। গেল গেল সব গেল। বিশ্বভারতী থেকে রবীন্দ্রনাথকেই
নির্বাসিত করা হলো মনে করে। আর জাতি হিসাবে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট থেকে যে ধারাবাহিক
ভাবে রবীন্দ্রনাথকে বাংলা ও বাঙালির সমাজ ও জীবনের পরতে পরতে নির্বাসিত করে রাখা হয়েছে।
সযতনে সজ্ঞানে সচেতন ভাবে? তার জন্য কারুর কোন মাথা ব্যথা আছে কি?
২৯শে
জুলাই’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

