অপারেশন শীতলকুচি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অপারেশন শীতলকুচি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

অপারেশন শীতলকুচি

 


জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি হবে। হুমকি দেওয়া হলো প্রাকাশ্য দিবালোকে। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের চতুর্থ দফার শেষে। সামনে আরও চার দফা ভোট গ্রহণ বাকি। ছবিটা পরিস্কার। শীতলকুচি শুধুই একটা জনপদের নাম নয় এখন আর। শীতলকুচি এখন থেকে একটা পদ্ধতিরও নাম। একটা রাজনৈতিক সমীকরণ। যে সমীকরণ জুড়ে রয়েছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতিরই সাথে। শীতলকুচি এখন একটা লোম খাড়া করে দেওয়া হুমকিও বটে। অনেকটা জয়শ্রীরামের মতোই। একজন রাজনৈতিক নেতা, যিনি আবার রাজ্য শাখার সভাপতিও বটে। তিনি স্বয়ং যখন সেই হুমকি দেন। তখন বিষয়টা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি হবে। শীতলকুচিতে সিআইএসএফের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল চার যুবকের দেহ। তারা এসেছিল ভোট দিতে। এখন জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি করার যে হুমকি শোনা যাচ্ছে, তাতে আরও কত তাজা প্রাণ অকালে কেড়ে নেওয়া হবে? এমনই হাড়হিম করা হুমকিতে?


কিন্তু হঠাৎ কেন শীতলকুচি করতে হলো? কি এই শীতলকুচি পদ্ধতি? জানতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে ভোটের বাজারে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির বিষয়টা। বুঝতে হবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাউণ্ড রিয়ালিটি। বুঝতে হবে একুশের নির্বাচনে জনতার পাল্লা ভারী কোনদিকে এখনো। বুঝতে হবে নির্বাচনের পর নির্বাচনে পদ্মশিবিরের ক্ষমতা দখলের চাবিকাঠির ণত্ব ষত্ব। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার একুশের নির্বাচনে এখন অব্দি পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে রাজ্যে মহিলা এবং সংখ্যালঘু জনসমর্থন এখনো রাজ্য সরকারের পক্ষেই রয়েছে। তাই রাজ্য সরকারের পক্ষে থাকা ভোটের এই অংশই এখন পদ্মশিবিরের মূল মাথা ব্যাথা। সরকার ফেলে দেওয়ার ডাকে তাদের পক্ষে যেটুকু জনসমর্থন দেখা যাচ্ছে, সরকার গঠন করার ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে সেটুকু আদৌ যথেষ্ঠ নয়। এখন সংখ্যালঘু ভোটকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সরাতে তাদের রাজনৈতিক কৌশল যথেষ্ঠ কার্যকর হয়ে ওঠেনি। মিম এই রাজ্যে যে দলটিকে খাড়া করার চেষ্টা করেছে, সেই ইণ্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট এখনো হামাগুড়ির পর্যায়ে। তারপর বামফ্রন্টের রাজনৈতিক কৌশলে তারা সংযুক্ত মোর্চার কব্জায়। এদিকে সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় নব্বই শতাংশই এখনো রাজ্যসরকারের পক্ষেই নিজেদের সমর্থন জ্ঞাপন করছে। এই ভোটই মাথা ব্যাথার অন্যতম কারণ পদ্ম শিবিরের। তাই এই ভোটকে কিছুটা হলেও বুথ অব্দি যাওয়া আটকাতে রাজনৈতিক হিংসার পরিবেশ তৈরী করা জরুরী। ফলে দেখা যাচ্ছে মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথগুলির চারপাশেই সহিংসতার ফাঁদ পাতা হচ্ছে। অত্যন্ত সুকৌশলে। যত বেশি হিংসা ছড়াবে। ভোট তত কম পড়বে। আর সকলেই জানে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথগুলিতে ভোট কাদের পক্ষে গিয়ে জমা হবে। হয়। ফলে এই ভোটগুলি আটকাতে পারলে ভোট শতাংশের হারে একটা সুবিধেজনক অবস্থানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়।


এখন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথগুলিতেই যদি হিংসা ছড়াতে থাকে বেশি, তবে রাজ্যে সংখ্যালঘু সমস্যা নিয়ে পদ্মশিবিরের প্রচারকে আরও বেশি মাত্রায় ছড়ানো যেতে পারে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতিকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলা যায়। বিশেষ করে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে। ফলে সংখ্যাগুরুদের চেতনায় সংখ্যালঘু বিদ্বেষকে আরও সর্বাত্মক করার কাজটা বেশ সহজ হয়ে যায়। নিরন্তর প্রচারে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, দেখো এই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথগুলিতেই যত সমস্যা। সেখানেই যত বেশি হিংসাত্মক ঘটনাগুলি ঘটছে। রাজনৈতিক হিংসা ছড়িয়ে এইভাবে সংখ্যালঘু বিদ্বেষের একটা ফাঁদ পেতে রাখলে, তাতে সংখ্যাগুরু ভোটের একটা বড়ো অংশ ধরা পড়তে বাধ্য। অনেকেরই মনে হবে। একদম। ঠিক কথা। ঠিকই তো। যেখানেই সংখ্যালঘু নামাজী, সেখানেই যত গণ্ডগোল। তাই কেন্দ্রীয় বাহিনীর বুলেটে সংখ্যালঘুরা মারা গেলে, অনেকেরই মনে খুশির তুফান উঠতে পারে। মনে মনে তারা নিশ্চয় বলছে, বেশ হয়েছে। এবার বুঝুক ঠ্যালা। এইভাবেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বীজ বপনের পালা চলছে পশ্চিমবঙ্গে। আর তখনই, এই যে যাদের মনে মনে, বেশ হয়েছে বেশ হয়েছে’র বাজনা বাজা শুরু হয়েছে। স্বভাবতই তাদের সব ভোট একটি নির্দিষ্ট প্রতীকেই যে ঝরে পড়বে, সে কথা বলাই বাহুল্য। এটাই ভোটের অংক। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথগুলির চারপাশে রাজনৈতিক হিংসার পরিবেশ তৈরীর ফলে একদিকে যেমন সেখানে সংখ্যালঘু ভোটের হার কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে রাজ্যব্যাপী সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের এই সাফল্যে সংখ্যাগুরু ভোটের একটা বড়ো অংশকেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের পাতা ফাঁদে ধরা সম্ভব হবে।


শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর চালানো গুলিতে যদি হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে ভোটার মারা যেত, তাহলে ভোটের এই অংক খাটতো না। উল্টে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপরে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়েরও ক্ষোভ পুঞ্জীভুত হতে শুরু করতো। যার ফলে ধরাবাঁধা ভোটও হাতছাড়া হয়ে যেত। এই কারণেই শীতলকুচির সেই বুথই বেছে নেওয়া হয়েছিল, যেখানে নব্বই শতাংশের বেশি ভোটারই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। অর্থাৎ গুলি চালানোর আগেই তারা নিশ্চিত ছিল, মারা যাবে শুধুই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারই। এটাই সেই শীতলকুচি পদ্ধতি। যার প্রয়োগ জায়গায় জায়গায় ঘটানোর হুমকি দিয়ে রাখা হয়েছে শীতলকুচির ঘটনার পরপরই। না এই হুমকি আদৌ ফাঁকা আওয়াজ নয়। এই হুমকির আরও একটি কারণ রয়েছে। পরবর্তী চারদফার ভোটে এই হুমকির সুফল ফলতে বাধ্য। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির সফল প্রয়োগে এই হুমকি সংখ্যাগুরুদের ভিতরে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে আরও উদ্দীপ্ত করে তুলবে। যার ফলে নতুন নতুন ভোট আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীকে। আগামী চার দফার ভোটে শীতলকুচি’র প্রভাব যাতে সর্বাত্মক হয়ে ওঠে, পদ্মশিবির তার জন্যেই মরিয়া। এখন প্রশ্ন, একটি শীতলকুচিই পরবর্তী চার দফা ভোটের জন্য যথেষ্ঠ, নাকি আরও কয়েকটি শীতলকুচি না করলে ক্ষমতা দখল অধরাই থেকে যাবে।


রাজ্যসরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সফল ভাবেই সংখ্যালঘু তোষণের বিষয়টা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মস্তিষ্কে ভালো ভাবেই গেঁথে দেওয়া গিয়েছে। এখন এই শীতলকুচি পদ্ধতির সফল প্রয়োগে সংখ্যাগুরু ভোটের একটা বড়ো শতাংশকে কব্জা করতে পারলেই কাম্য আসন বাঁধা। না, কাম্য আসন মানেই নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়। নির্বাচনে কাম্য আসন সেটাই। যে সংখ্যার ভিত্তিতে ঘোড়া কেনাবেচা করে নির্বাচনে জয়ী দলের বিধায়ক ভাঙিয়ে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা যায়। বিগত সাত বছরে ভারতীয় রাজনীতিতে এই কাম্য আসনের সফল প্রয়োগ বার বার দেখা গিয়েছে। সেই কাম্য আসনই পদ্ম শিবিরের পাখির চোখ। একুশের বিধানসভার নির্বাচনে। শীতলকুচি পদ্ধতি সেই কাম্য আসন নিশ্চিত করারই এক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।


এই শীতলকুচি পদ্ধতি’র সুযোগটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজই পদ্ম শিবিরের হাতে তুলে দিয়েছেন। ভোটদানে বাধা পেলে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘিরে ধরে অবরোধ করা ডাক দিয়ে তিনি নিজেই পদ্ম শিবিরের কাজটা অনেক সহজ করে দিয়েছেন। সেটাই কেন্দ্রের সরকারের হাতে আজ তুরুপের তাস। সেই তাসটিই সফল ভাবে খেলার নামও শীতলকুচি। কিন্তু কিভাবে খেলতে হয় এই খেলা। দেখা যাক বরং শীতলকুচির ঘটনাক্রম অনুসারেই। শীতলকুচির সেই ১২৬ নম্বর বুথের ৩৫০ মিটার দূরত্বে স্থানীয় বাজারে ক্লাস এইটের স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী মৃণাল হককে আচমকা অকারণে কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক সদস্য ঘাড় ধরে অকথ্য ভাবে পিটাতে থাকে। হঠাৎই আচমকা এইভাবে নিরস্ত্র নিরীহ স্কুল পড়ুয়ার উপরে সরকারী ফৌজের হামলায় চারপাশের মানুষ প্রথমে হতচকিত হয়ে পড়ে। স্বভাবতই তারপরে তারা এর প্রতিবাদে সমিল হন। আর সেই প্রতিবাদের একটা ভিড়ের বড়ো দরকার ছিল এই শীতলকুচি খেলার কারিগরদের। সেই ভিড়ের সুযোগেই নির্বিচারে সমবেত প্রতিবাদী জনতার উপরে গুলি চালানোর পরিকল্পনা। গুলি চালনার অজুহাত হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী’র সেই নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রয়োজনে ঘেরাও করার ডাককেই বুমেরাং করে ফিরিয়ে দেওয়াও গেল। এই হলো শীতলকুচি খেলার প্রক্রিয়া। দেশব্যাপী প্রচার করারও একটা সুবর্ণ সুযোগ পাওয়া গেল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই কিভাবে জনতাকে সহিংস হওয়ায় উস্কানি দিচ্ছেন। তাঁর এই উস্কানিই শীতলকুচির ঘটনার পিছনে আসল কারণ বলে আজ্ঞাবহ প্রচারযন্ত্রের সহায়তায় দেশময় রটিয়ে দেওয়া সহজও হলো। আর যেকোন রাষ্ট্রশক্তিই আত্মরক্ষার গল্প ফেঁদে মানুষ খুনের দায় ঝেড়ে ফেলার সাংবিধানিক অধিকার প্রাপ্ত। ফলে সাতখুন মাপ। সাপও মরলো। অথচ লাঠিও ভাঙলো না। না, শীতলকুচি খেলার এই প্রক্রিয়া নতুন কিছু নয়। দেশকাল নিরপেক্ষ ভাবে এটাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কার্যকরি ছদ্মবেশ। স্থান কাল পাত্র ভেদে নামের বদল হয় শুধু। প্রক্রিয়া একই রকম থাকে।


১২ই এপ্রিল’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত