২০২১এর নির্বাচন কোন পথে পশ্চিমবঙ্গ? লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
২০২১এর নির্বাচন কোন পথে পশ্চিমবঙ্গ? লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২০২১এর নির্বাচন কোন পথে পশ্চিমবঙ্গ?




২০২১’এর নির্বাচন কোন পথে পশ্চিমবঙ্গ?

২০২১’এর লক্ষ্য বাংলা দখল। ত্রিপুরা দখল সম্পূর্ণ। এবার বাকি রইল পশ্চিমবঙ্গ। আসাম সহ উত্তরপূর্বাঞ্চল নিজেদের কব্জায়। পশ্চিমবঙ্গের দখল পেলেই গোবলয়ের পরিধি একলাফে বেড়ে যাবে অনেকটাই। সারা ভারতে অধিকাংশ রাজ্যই হাতছাড়া হয়ে গেলেও বাংলা দখলই এখন পাখির চোখ। এর নেপথ্যে অনেকগুলি উদ্দেশ্য বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস এমন একটা সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে যে গোবলয়ের কুশীলবরা সেই সুযোগটি কোন ভাবেই হাতছাড়া করতে চান না। তাঁরা জানেন শুভস্যশীঘ্রম। বিশেষত কেন্দ্রীয় সরকারে থাকতে থাকতে পশ্চিমবঙ্গকে গোবলয়ের রাজনীতির সাথে একবার জুড়ে দিতে পারলেই হল। তাহলেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাগুলির সফল রূপায়ণ সময়ের অপেক্ষা মাত্র। গোবলয়ের হর্তা কর্তা বিধাতারা সেই বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। এবং তারা পশ্চিমবঙ্গবাসী বাঙালিমানসের একটা সঠিক ম্যাপও তৈরী করে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন অনেকদিন হলো। সেই ম্যাপকেই তুরুপের তাস করে এগিয়ে চলতে প্রয়াসী তারা।

কি সেই তুরুপের তাস? কেমন সেই জনমানসের ম্যাপ। কিভাবে সেই ম্যাপকে গাইড করে রাজনৈতিক জমি দখলের পরিকল্পনাকে সফল করা সম্ভব? এই সকল উত্তরই লুকিয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে। চারপাশে একটু ভালো করে নজর দিলেই একে একে উঠে আসতে পারে চমকপ্রদ সব সত্য। তাই এই উত্তরগুলি খুঁজে পেতে গেলে আমাদেরকে শুরু করতে হবে ১৯৪৭ সাল থেকে। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে ১৯৪৭’এর দেশভাগ একটা মাইলস্টোন। যার ফলে কোটি কোটি উদবাস্তু ভিটে মাটি সহায় সম্পদ ছেড়ে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আশ্রয় নেয় আসামেও। আসামে গোবলয়ের পরিচালকরা সেই সূত্রকেই হাতিয়ার করে অহমীয় অস্মিতাকে উস্কিয়ে দিয়ে অসমীয়া ও বাঙালি জাতিদ্বন্দ্বকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগিয়ে আসামের রাজনীতির দখল নিতে সক্ষম হয়েছিল। বাঙালি হিন্দু মনে করেছিল গোবলয়ের হিন্দুত্বের পক্ষে ভোট দিলেই আসামে বাঙালি হিন্দুর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে। অসমীয়রা মনে করেছিল, সেই একই শিবিরের পক্ষে থাকলেই আসাম থেকে সরকারী মদতে বাঙালি খেদানো সহজ হবে। ফলে এই দুই পক্ষই দুই হাত খুলে ভোট দিয়ে গোবলয়ের হিন্দুত্বের স্বঘোষিত ঠিকাদারদেরকে সরকারে অধিষ্ঠিত করেছিল আসামে।

আমাদের পশ্চিমবঙ্গের সমীকরণটা এতটা সরল নয়। সরল না হলেও গোবলয়ের হিন্দুত্বের স্বঘোষিত ঠিকাদাররা খুব ভালো করেই জানে বেহুলার বাসর ঘরের ছিদ্রটা ঠিক কোথায়। তারা জানে এই রাজ্যের বাঙালি মানসের মানচিত্রের সম্পূর্ণ নকশাটা কেমন। তারা জানে, ১৯৪৭ সালের আগে থেকে বসবাস করা বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিমের অধিকাংশের মননের গভীরে পূর্ববাংলা থেকে আগত উদবাস্তুদের বিষয়ে যথেষ্ট ক্ষোভ বিদ্যমান। দশকের পর দশক জুড়ে অবদমিত এবং পুঞ্জীভুত এই ক্ষোভকে ঠিক মতো উস্কিয়ে দিতে পারলেই হলো। আর রাজনীতির কাজই তো তাই। দাও দুই পক্ষে বিভক্ত করে। দাও পরস্পরের ভিতরে লড়িয়ে। আর ঠিক সেই কারণেই গোবলয়ের হর্তাকর্তা বিধাতাদের ও তাদের এই রাজ্যের এজেন্টদের মুখনিঃসৃত বাণীর অনেকটা জুড়েই অনুপ্রবেশের তত্ব। তারা জানে অনুপ্রবেশের এই তত্বকে ঠিকমত রাজনৈতিক ছকে প্রচার করতে পারলেই, ১৯৪৭ সালের আগে থেকে এই রাজ্যে বসবাসকারী বাঙালি হিন্দু এমনকি বাঙালি মুসলিমের ভোটও তাদের পক্ষে চলে আসতে পারে।

কিন্তু শুধু এই একটি পক্ষের ভোটেই রাজ্যের ক্ষমতা দখল করা সম্ভব নয়। তাই অনুপ্রবেশের তত্বের সাথেই তাদের হাতে রয়েছে সাপ্রদায়িকতার তাস। আর সেই তাসটি ঠিকমত সময়ে ঠিকমত জায়গায় ফেলতে পারলেই পূর্ববঙ্গ থেকে আগত বাঙালি উদবাস্তুদের বর্তমান প্রজন্মের ভিতরে লুকিয়ে থাকা পুঞ্জীভুত মুসলিম বিদ্বেষকে উস্কিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। সেটি সম্ভব হলেই তথাকথিত বাঙালদের ভোটের একটা বড়ো অংশই গোবলয়ের কাণ্ডারীদের ঝুলিতে ঢুকে যাবে। বাংলাভাগের দগদগে স্মৃতিকে উস্কিয়ে দিয়ে দেশভাগের জন্য বিশেষ একটি সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় তুলে দিতে পারলেই একটা বড়ো অংশের ভিতরে নতুন করে মুসলিম বিদ্বেষের চাষ করা সম্ভব। আর সেই কাজের জন্যেই এতগুলি দশকের পর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে এমন টানাটানি। ইতিহাস বিস্মৃত বাঙালিকে বর্তমান প্রোপাগাণ্ডায় বিভ্রান্ত করা সবচেয়ে সহজ কাজ। তাই বাংলাভাগের অন্যতম কাণ্ডারী শ্যামাপ্রসাদকেই পশ্চিমবঙ্গের জন্মদাতা বলে প্রচার করে রাজনৈতিক ফয়দা তোলা এই বাংলাতেই সম্ভব। একটি জাতি যদি নিজে থেকেই ইতিহাস বিস্মৃত হয়। তবে বিজাতীয় শক্তি সবসময়েই সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবিস্তার করবে। একদিন করেছিল সমুদ্রপারের ব্রিটিশরা। আজকে করার চেষ্টা করছে গোবলয়ের হর্তাকর্তা বিধাতারা।

তাই শ্যামাপ্রসাদ। দেশভাগের আট দশক পরের প্রজন্মের কাছে শ্যামাপ্রসাদকে তুলে ধরা হচ্ছে মুসলিম সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে বাঙালি হিন্দুর রক্ষাকর্তা হিসাবে। তিনি না থাকলে বাঙালি হিন্দুকে আজও মুসলিমদের পায়ের তলায় পড়ে থাকতে হতো। এই প্রোপাগাণ্ডার সুফল ফলতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। বিভিন্ন সোশ্যাল সাইটের আলাপ আলোচনায় কান পাতলে তার প্রমাণ মেলে। বিশেষত পূর্ববঙ্গ আগত বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের বর্তমান প্রজন্মের ভিতরে মুসলিম বিদ্বেষ এতটাই তীব্র হয়ে উঠছে দিনে দিনে যে, অনেকেরই ভাষ্য একটাই। সাম্প্রদায়িক ভাগবাটোয়ারার পরে বাঙালি মুসলিমরা কেন পশ্চিমবঙ্গের ঘাড়ে চেপে বসে থাকবে।

অনুপ্রবেশতত্বের সফল প্রচারে ঠিক যেমন ১৯৪৭’এর আগে থেকে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত বাঙালি হিন্দু এমনকি বাঙালি মুসলিমদের মনেও গেঁথে দেওয়া সম্ভব হয়েছে আর একটি জলন্ত ক্ষোভ। পূর্ববঙ্গ আগত অনুপ্রবেশকারীরাই পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের জমি জায়গা ও পেশায় ভাগ বসিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এটাই রাজনীতি। একদিকে অনুপ্রবেশ তত্বে সমাজের একটি শ্রেণীকে বেঁধে ফেলা। আর এক দিকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের উস্কানীতে সমাজের আর একটি অংশকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।

এবার একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসের মানচিত্রে। এই মানচিত্র কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। একদিকে পূর্বে উল্লেখ করা বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান। যাদের বসবাস ১৯৪৭ সালের আগে থেকেই। আর একদিকে পূর্ববঙ্গ আগত ১৯৪৭ পরবর্তী উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দু। যাদেরকে এক কথায় আজকে অনুপ্রবেশকারীর তকমায় চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে। আর সেটি সম্ভব হচ্ছে ২০০৩ সালের সেই কুখ্যাত নাগরিক সংশোধনী আইনের বলে। যে আইনে সংযুক্ত করা হয়েছে একটি বিশেষ দিন। ১৯৪৮ সালের ১৯শে জুলাই। যেদিন রাত্রি ১২টার পর বর্তমান ভারতীয় ভুখণ্ডে পদার্পণ করা সকলেই অনুপ্রবেশকারী। যদি না তার কাছে ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দেওয়া নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট থাকে। বস্তুত কোটি কোটি বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের কাছেই সেই সময় বা তার পরবর্তী সময়ে এই পারে এসে আশ্রয় নেওয়া বাঙালি হিন্দুদের কাছে সেই সার্টিফিকেট ছিল না। ফলে ২০০৩ এর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বলে কোটি কোটি বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুদের বর্তমান প্রজন্ম আজকে ভারতীয় নাগরিক নয়। প্রসঙ্গত, এই বেনাগরিক বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার টোপই হলো ২০১৯’এর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। যে আইন পাশ করিয়েই ২০২১’এ রাজ্যে ক্ষমতা দখলকে সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছে গোবলয়ের হর্তাকর্তা বিধাতারা।

এই দুটি ভাগের সাথে আরও দুটি ভাগে বিভক্ত পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসের মানচিত্র। একদিকে অবাঙালি হিন্দু ও অন্য দিকে অবাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠী। প্রথম অংশের মুখের ভাষা মূলত হিন্দী সহ ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা। আর দ্বিতীয় পক্ষের মুখের ভাষা স্বভাবতই উর্দ্দু। স্বাধীনতার আগে থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মূলত রোজগারের আশাতেই লক্ষ লক্ষ অবাঙালি কি হিন্দু কি মুসলিম এই রাজ্যে বসবাস শুরু করে। কিন্তু স্বাধীনতার পরে তাদের অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পেতে থাকে দিনে দিনে। এবং বিগত চার দশকে অস্বাভাবিক দ্রুতহারে তারা পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ করে জমি জায়গা কিনে এবং নানাবিধ পেশায় সংযুক্ত হয়ে স্থায়ীভাবে রাজ্যবাসী হয়ে পড়ছে। এদের ভিতরে অবঙালি হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। গোবলেয়ের হর্তাকর্তা বিধাতারাই যাদের নয়নের মণি। ফলে এদের সমস্ত ভোটই ২০২১’এ গোবলয়ের হিন্দুত্বের স্বঘোষিত ঠিকাদারদের পক্ষেই পড়তে চলেছে। তার সাথে বাঙালি হিন্দু কি ঘটি কি বাঙাল তাদের ভোট যোগ দিলে সংখ্যাটা আস্ফালন করার মতোই। সাথে বাঙালি মুসলিমদের একটা অংশের ভোট যুক্ত হলে, সেটি সোনায় সোহাগা।  

২০২১’এ আসন্ন নির্বাচনে এটাই গোবলয়ের পরিচালক গোষ্ঠীর তুরুপের তাস। সেই তাসই ঠিক মতো খেলে চলেছে তারা। ২০১৬’র রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে। একেবারে সুনিপুণ রাজনৈতিক কৌশলে। কিন্তু আমরা যদি মনে করে থাকি, ২০২১’এ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখলই এদের আসল লক্ষ্য, তাহলে অবশ্যই মূর্খের স্বর্গে বাস করছি আমরা। পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসের যে মানচিত্রের উল্লেখ করা হয়েছে পূর্বেই, তার ভিতরে একটি গূঢ় সত্য লুকিয়ে রয়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশই অবাঙালি জনগোষ্ঠী। যাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পশ্চিমবঙ্গের কোন যোগ নাই। তারা মূলত গোবলয়ের বাসিন্দা। সেখানকার সংস্কৃতিই স্বাভাবিক ভাবে তাদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। এবং তারা এই বিষয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিকের মতোই গর্বিত এবং নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষার বিষয়ে নিবেদিত প্রাণ। পুরুষানুক্রমিক ভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাস করেও তারা সচেতন ভাবে বাংলা ও বাঙালির ভাষা সংস্কৃতি খাদ্যাভ্যাস পোশাক পরিচ্ছদ কোন কিছুই গ্রহণ করেন নি। বরং নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করে চলেছেন প্রকৃত স্বাজাত্য বোধ থেকে। এবং এই বিষয়ে তারা একেবারেই বাঙালির উল্টো প্রকৃতির জনগোষ্ঠী।

পশ্চিমবঙ্গের সমাজবাস্তবতায় এই অবাঙালি জনগোষ্ঠী চিরকালই ব্যাবসা বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রকের ভুমিকা পালন করে এসেছে। ফলে রাজ্যের অর্থনীতি এদেরই ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এই ঐতিহ্য এই ভুখণ্ডের শতাধিক বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু বর্তমানে এই অবঙালি জনগোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের প্রায় সর্বত্র পা রাখতে সক্ষম হয়েছে। পেশগত ভাবে। অফিস কাছারি ব্যাংক সর্বত্র এরাই অধিকারিক পদগুলি দখল করে নিয়েছে। মূলত তাদের মাতৃভাষা হিন্দী হওয়ার সূত্রে। কি লিখিত কি মৌখিক উভয় পরীক্ষাই তারা নিজ মাতৃভাষায় দেওয়ার সুযোগে বাঙালি প্রতিযোগীদের পিছনে ফলে দিয়ে এগিয়ে যেতে পারছে সহজে। এবং শারীরীক গঠনে বাঙালির থেকে অধিক শক্তিশালী হওয়ার কারণে পুলিশ ও মিলিটারীতে এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাঁটাতার বরাবর সীমান্তরক্ষী বাহিনী থেকে শুরু করে বিভিন্ন থানার অধিকারিক ও পুলিশ প্রশাসনের উচ্চতম পদগুলিতে আজকে অবাঙালি জনগোষ্ঠীরই প্রাধান্য। এর একটা প্রবল প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলার সমাজ জীবনে। প্রসঙ্গত বিভিন্ন অসামাজিক কাজেও অবাঙালি দুস্কৃতিরাই বাঙালি দুস্কৃতিদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। ফলে সমাজের পরতে পরতে এই অবঙালি জনগোষ্ঠি পশ্চিমবঙ্গের সমাজ বাস্তবতায় আজ নিয়ন্ত্রকের ভুমিকায়। সমাজের অভ্যন্তরীণ এই চালিকা শক্তি একবিংশ শতকে এসে রাজ্যরাজনীতিতেও প্রবেশ করেছে বাঙালির হাত ধরেই। কিন্তু বাঙালির ধারণাও নাই। এমন একদিন সামনে আসতে চলেছে, যেদিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ আর কোন ভাবেই বাঙালির হাতে থাকবে না। সেই নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে অবাঙালি জনগোষ্ঠীর হাতেই। এবং বাঙালিই তাদের হাতে সেই নিয়ন্ত্রণ তুলে দেবে। এটাই এরাজ্যের ভবিতব্য।

আর এটাই আসল পাখির চোখ গোবলয়ের হর্তাকর্তা বিধাতাদের। কোন বাঙালিই এই সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম নয় আজ। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার আসল উদ্দেশ্যই হলো রাজ্যের জনসংখ্যা থেকে সরকারী আইন অনুযায়ী বাঙালরি সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে বাঙালি অবাঙালি অনুপাতকে প্রায় সমান সমান করার দিকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু কিভাবে সম্ভব সেটি? গোবলয়ের হর্তাকর্তা বিধাতাদের সামনে কিভাবে আসতে চলছে সেই সুযোগ? এবার নজর দেওয়া যাক সেই দিকেই। প্রথমত ১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাইয়ের দিনকে অনুপ্রবেশকারী চিহ্ণিত করার তারিখ হিসাবে ধরলে এই বাংলায় কম করে হলেও তিরিশ শতাংশের উপরে বাঙালি হিন্দু ভারতীয় নাগরিকত্ব হারাবে। ২০১৯’র গালভরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের সাহয্য নিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া সম্ভব হতে পারে খুব বেশি হলে দুই কি তিন শতাংশের মতোন মানুষের। নাগরিকত্ব দেওয়ার তথাকথিত সাংবিধানিক ধারাগুলি খুব ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলে পৌঁছানো যাবে সেই সত্যে। ফলত বিপুল পরিমাণ বাঙালি হিন্দু এবং একটা বড়ো অংশের দরিদ্র্য মুসলিম জনগোষ্ঠী, যাদের হাতে কোন কাগজ পত্র নাই, তারা রাজ্যের জনবিন্যাসের সরকারী হিসাব থেকে বাদ পড়ে যাবেন। তাদের ঠাঁই ডিটেনশন ক্যাম্পেই হোক আর যেখানেই হোক। রাজ্যের আদমশুমারীর পরিসংখ্যান থেকে তারা ছাঁটাই হয়ে যাবেন। কোটি কোটি বাঙালিকে এইভাবে সরকারী হিসাব থেকে বেনাগরিক করে ছেঁটে ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। রাজ্যের বাঙালি অবাঙালি অনুপাতের বর্তমান ভারসাম্যকে উল্টো দিকে কাৎ করে দেওয়া অনেক সহজ হবে। না, এসবই যে একদিন হবে তা নয়। সবটাই একটা দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া।

রাজ্যে বাঙালি অবাঙালি অনুপাতের ভারসাম্য রাজনৈতিক কুটকৌশলে টলানোর এই পরিকল্পনার সাথে আরও একটা সত্য তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোবলয়ের হর্তাকর্তা বিধাতাদের কাছে। সেটি হলো, স্বাধীনতা পরবর্তী দশক গুলিতে বরাবরই বাঙালির সংসারে সন্তান সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। তারপর উচ্চশিক্ষিত পরিবারের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই সেই একটি দুটি সন্তান বাংলার বাইরেই জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে বিভিন্ন প্রদেশ ও নানান দেশেই স্থায়ী ভাবে বসবাস করে ও বংশ বিস্তার করে। কখনোই আর বাংলায় ফিরে আস না। কিন্তু বাংলায় স্থায়ী ভাবে বসবাসকারী অবাঙালি জনগোষ্ঠীর সন্তানসন্ততিরা অন্য কোন প্রদেশ বা দেশে পারি দেয় খুব কম। বরং এই রাজ্যেই তারা জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে এবং গণ্ডায় গন্ডায় সন্তান সন্ততির জন্ম দিয়ে দ্রুতহারে বংশবিস্তার করে। এই জনগোষ্ঠীর গড় বিবাহের বয়স বাঙালির গড় বিবাহের বয়সের তুলনায় বেশ কম। ফলে বাঙালায় অবাঙালি জনগোষ্ঠী অনেক বেশি দ্রুতহারে বংশ বিস্তার করে চলেছে বিগত আট দশক ব্যাপী সময় সীমাতেই। বংশবিস্তারের হারে প্রতিটি দশকেই বাঙালি জনগোষ্ঠী অনেকটা করে পিছিয়ে পড়ছে। এর সুদূরপ্রসারী ফলে এমনিতেই একদিন বাঙালি অবাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত পাল্টিয়ে যেত বাধ্য। কিন্তু গোবলয়ের হর্তাকর্তা বিধাতারা ততদিনের জন্য আর অপেক্ষা করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নন। বিশেষ করে ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী অইনের বলে, রাজনৈতিক ক্ষমতায় জনবিন্যাসের অনুপাত যখন মাখনের ভিতরে ছুরি চালানোর মতো করে পরিবর্তন করে দেওয়া সম্ভব। তখন বেল পাকার অপেক্ষায় বসে থাকে কোন আহাম্মক।

এই যখন পরিস্থিতি। তখন ২০২১এ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করাই তো অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। বিশেষ করে গোবলয়ের পরিচালকবর্গের হাতে আরও একটি সুন্দর সুযোগ যখন বর্তমান। সেটি হলো এই। আজকের বাংলায় বাঙালি মাত্রেই ভাষা হিসাবে বাংলার গুরুত্বকে স্বীকার করতে আর রাজি নয়। জীবন জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য তারা হিন্দিী ও ইংরেজীর উপরে পুরোপুরি নির্ভর করায় বিশ্বাসী। তাই কোন বাংলা স্কুলের ভর্তির ফর্ম তুলতে অভিভাবকদের লাইন পড়ে না। পড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ইংরেজি স্কুলের কাউন্টারেই। বিশেষ করে বিগত তিন দশক জুড়ে এই প্রবণতা এমন মারাত্মক আকার নিয়েছে যে প্রায় দুই একটি প্রজন্মই দাঁড়িয়ে গিয়েছে। যাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষা থাকলেও বাংলাভাষার কোন শিক্ষা নাই। এই অবস্থা প্রতিটি বছরে আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধিই পেয়ে চলেছে। এরসাথে ইস্কুল কলেজের সীমানায় প্রবেশ করতে না পারা বাঙালিদের ভিতরে পেশগত ও পরিবেশগত কারণে দ্রুতহারে হিন্দীর প্রসার ঘটে চলেছে। ফলে পশ্চিমবাংলায় বাঙালির জীবন জীবিকায় ও আবেগে ভাষা হিসাবে বাঙালর কোন স্থান নাই। সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে শিক্ষিত শ্রেণীর ভিতরে ইংরেজী ও হিন্দী। আর অশিক্ষিত শ্রেণীর ভিতরে হিন্দী ভাষা।

২০২১এ রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা একবার দখল করতে পারলেই এমন সোনায় সোহাগা জমিতে হিন্দী ভাষার চাষটিকে সর্বাত্মক প্রায়োরিটি দি‌য়ে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ হয়ে উঠবে। বেশ কয়েক দশকের জন্য হিন্দী ভাষার সেই চাষটাকে সরকারী স্তর থেকে বিশেষ যত্নে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারলেই, একটা বড়ো অংশের বাঙালি, হিন্দীকেই মাতৃভাষা বলে জাহির করতে উঠে পরে লাগবে। পরিবর্তীত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তখন হিন্দীকে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ভাষার তকমা দিয়ে দেওয়া, আজকে যতই কষ্টকল্পনা বলে মনে হোক না কেন; সেদিন কিন্তু বাস্তব সত্য হয়েই দেখা দেবে। তারপর একটাই ফলশ্রুতি অবশিষ্ট থাকার কথা। ফারাক্কার উত্তরের পশ্চিমবঙ্গের বিহারের সাথে সংযুক্তি। আর দক্ষিণ অংশের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়খণ্ডের সাথে সংযুক্তির। পশ্চিমবঙ্গের গৌরব ডঃ বিধানচন্দ্র রায় সেই পঞ্চাশের দশকেই যেটি করতে চেয়েছিলেন। কথায় বলে বাঙালি আজ যা ভাবে ভারত ভাবে তা কাল। সত্যিই বাংলা ও বাঙালির গর্ব বিধানচন্দ্র রায় আজ থেকে সাত দশক আগে যা ভেবে ছিলেন। গোবলয়ের হর্তাকর্তা বিধাতারা এতদিন বাদে সেই পরিকল্পনাকে সার্থক করতেই ঝাঁপাতে চাইছেন ২০২১’র নির্বাচনে। রাজ্য রাজধানী বিভক্ত হয়ে পাটনা ও  রাঁচীতেই থাকবে। বাণিজ্য রাজধানী হিসাবে অস্তিত্ব রক্ষা করবে বাঙালির সাধের কলকাতা। বাণিজ্যের সাথে এই বাংলার বাঙালির যোগ কস্মিনকালে না থাকলেও। সেটাই আমাদের আত্মশ্লাঘা পুরণের জন্য যথেষ্ঠ বলে বিবেচিত হবে সেদিন।  

গোবলয়ের পরিধি বিস্তারের এই নীলনকশা নিয়ে বাঙালির কোন মাথা ব্যথা নাই। থাকবেই বা কেন? যারা বাংলা ও বাঙালিত্বে বিশ্বাসীই নয়। গর্বিত হতেই লজ্জা অনুভব করে বলে, আমি ভারতীয়। প্রাদেশিক নই। তাদের তো মাথা ব্যথার কোন কারণই নাই। শুধু যেভাবেই হোক ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের একটা কাগজ হাতে থাকলেই হলো। বাংলা ও বাঙালি রসাতলে যাক না কেন। বাংলা তো ভারতেই থাকবে। চিন্তা কিসের? আর যারা এখনো বাংলা ও বাঙালিত্বের ঐতিহ্যকে নিয়ে সভা সমিতি করে পাদপ্রদীপের আলো খুঁজে বেড়ায়, তাঁরাও নিশ্চিন্ত। এত শতাব্দীর একটা ভাষা ও সংস্কৃতি। প্রবল পরাক্রান্ত মোঘল থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পর্য্যন্ত যাকে ধ্বংস করতে পারে নি। তার অস্তিত্ব সংকট কষ্টকল্পনা মাত্র। স্বকল্পিত আইভরী টাওয়ারে বসে তাদের সুখনিদ্রার ব্যাঘাত ঘটার কথা নয়। যতদিন না ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গ পাল্টিয়ে গিয়ে ঝাড়খণ্ড কিংবা বিহার হয়ে যাচ্ছে। যেদিন যাবে। সেদিন তাদের ঘুম ভাঙলেও তখন হিন্দী শেখার লাইনে দাঁড়িয়ে অস্তিত রক্ষার লড়াইয়ে নামতে হবে। আপাতত বাঙালির জনমানস নিজ নিজ গোষ্ঠী স্বার্থের রাজনীতির ভিতরেই ব্যস্ত থেকে নানান রকম বিচিত্র সমীকরণের ভিতর দিয়েই অনুভব করতে থাকবে বাঙালা ও তার বাঙালিত্বকে।

২রা সেপটেম্বর' ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত