পরস্পরকে ভালোবেসে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পরস্পরকে ভালোবেসে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

পরস্পরকে ভালোবেসে



পরস্পরকে ভালোবেসে


ভালোবাসা শব্দবন্ধটি আমাদের কাছে দুইজন নরনারীর ব্যক্তিগত সম্বন্ধের বাইরে সত্যিই কি আর পা রাখতে পারলো? ভালোবাসা বললেই তার অনিবার্য পরিণতি হিসাবে ছাদনাতলার সানাই বেজে ওঠে যেন। নয়তো বাড়ি পালিয়ে বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে রেজেস্ট্রি ম্যারেজ। নয়তো যাও বাপু কালিঘাটে। সকলেই জানি, সেই সব ভালোবাসার শেষ পরিণতি সবসময়েই যে ভালো হয় হবে তার কোন গ্যারান্টি থাকে না। ভালোবাসার সাথে নরনারীর যৌবন ও যৌনসত্তা যত বেশি সম্পৃক্ত থাকে হৃদয়ানুভুতিও যদি ততটাই সম্পৃক্ত থাকতো, তবে সংসার সুখের হতো ভালোবাসার গুণে। কিন্তু তাই কি হয়? হলে অনেক উকিলেরই ভাত মারা যেত। পুলিশেরও একটু বেশি বিশ্রাম জুটতো। তা হয় না। তবু ভালোবাসার মোহের বাঁধনে আমরা সকলেই কম বেশি জড়িয়ে আছি আস্টেপৃষ্টে। সুন্দরী রূপসী দেখলে স্মার্ট হ্যণ্ডসাম যুবক দেখলে যৌবনে ছেলে মেয়েদের বুকের ভিতর যেভাবে মোচর দিয়ে ওঠে, সেটাকেই আমরা ভালোবাসা বলে থাকি। সেই অনুভুতি সত্যিই অনির্বচনীয়। চোখের ভাষা ও ঠোঁটের কম্পনে ব্যক্ত হতে পারে শুধু। না, বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কথা থাক। সেটা জীববিজ্ঞানের বিষয়। আমাদের আলোচনা হৃদয়ানুভুতির পরিসরেই সীমাবদ্ধ।

সেই হৃদয়ানুভুতির পরিসরটিকে ব্যক্তিগত জীবন যৌবন যৌনআবেগের বাইরেও যদি একটু বেশি করে চর্চা করতে পারতাম আমরা, তবে আমাদের প্রতিদিনের চেনা পৃথিবীটাই সত্যি করে আলোপৃথিবী হয়ে উঠতো সন্দেহ নাই। প্রতিদিন যে কেউ নিয়ম করে কবিতা পড়ে থাকে তা নয়। আমরাও পড়ি না। কিন্তু আজ ইচ্ছে হলো বিজনঘরের নির্জন কবি জীবনানন্দের কয়টি পাতা উল্টাতে। লটারির মতোই প্রথমেই উঠে এলো যে কবিতাটি, নাম তার “আলোপৃথিবী”। বহু পঠিত। বহু চর্চিত। নতুন করে তাকে পিষে পিষে ছিবড়ে করলেও হয়তো আর নতুন কোন রস নিসৃত হবে না। কিন্তু কবিতা তো আর আঁখ নয়। একবার ছিবড়ে করে দিলেই সে আর রস দেবে না। নতুন আঁখের ছাল ছাড়াতে হবে। কবিতার ধর্ম আঁখের থেকে ভিন্ন। জীবনানন্দের পাঠক মাত্রেই জানেন সেকথা। তাই ফিরে ফিরে বার বার ঢুঁ মারতেই হয় তাঁর কবিতায়। জীবনানন্দ দাশের কাল থেকে আমরা যদিও অনেক দূরবর্তী আজ, তবু জীবনানন্দের ভুবন থেকে হয়তো বেশি দূর দৌড়াতে পারি নি আজও। না পারলেও ক্ষতি কি? পুরানো মদের স্বাদই আলাদা। মাতাল হওয়া দিয়ে কথা। তাতে পুরানো মদে মৌতাত বেশি জমলে ক্ষতির বদলে লাভই ষোলআনা।

ইতিহাসের অমোঘ আবহ থেকে ধনুকের তির ছোঁড়ার মতোই ক্ষিপ্র গতিতে ও নিপুণ লক্ষ্যে শুরু করলেন কবি কবিতাটি। মানুষের অতীত সবসময় কথা বলে। বর্তমান সময় সময় ঘাপটি মেরে নিশ্চুপে চারিদিকের জল মাপে হয়তো। কিন্তু ইতিহাসের সেই দায় নাই। তাই ইতিহাস সচেতন কবি শুরু করলেন একেবারে কুরুক্ষেত্র রোম ট্রয়ের সময় থেকেই। মানুষের মানুষের ভালোবাসার যে অভাব ও গ্লানি, তার শিকড় অতটাই গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে আজকে যখন দিল্লীর সাম্প্রতিক দাঙ্গায় উস্কানি দিতে গোলি মারো সালো’কো বলে রণহুঙ্কার তোলা হয়, ভালোবাসা প্রীতির বিপ্রতীপে সেই দ্বেষ হিংসারও রয়েছে হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার সংস্কৃতি। এই গত শতাব্দীর নাৎসী জার্মানীর সেই বীভৎসতা আজ সকল দেশের সেরা আমার জন্মভুমিতেই অবগুন্ঠন খুলে বেআব্রু হচ্ছে দিনে দিনে। দিল্লীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, তেলেনিপাড়ার দাঙ্গা সেই বীভৎসতারই হিংস্র দাঁতনখের কারুকাজ। ইতিহাস একদিন তার হিসাব নেবে নিশ্চয়। পার পায়নি মুসোলিনী হিটলারও। কবি তাই দ্ব্যর্থহীন ভাবেই বলছেন পৃথিবীভরা আলো থকলে কি হবে হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের পথরেখা ধরে মানুষের পাপ ক্রমেই ঘনিয়ে উঠল আরও বেশি করে দিনে দিনে।

কিন্তু সেই পাপে নিমজ্জিত এই বিশ্বের টিমটিম করে জ্বলতে থাকা আলোয় কবির বিশ্বাসে এতটুকু চির তো ধরেই নি, বরং তিনি গভীর ভাবে আশাবাদী, মানুষের সব গরল মানুষ ও মনীষীরা এসে মোকাবিলা করবে ঠিকই। এখনে লক্ষ্যনীয়, কবি শুধু মনীষীদের কথাই বলছেন না। সাথে মানুষের কথাও বলছেন। কবি জানেন, মনীষীদের অভাব হয় নি কোনদিন। অভাব হয়েছে মানুষেরই। তা যদি না হতো, তবে গৌতম বুদ্ধই হোক যিশু খ্রিষ্টই হোক কিংবা হজরত মহম্মদ। তাঁদের যাবতীয় প্রয়াস এই ভাবে মাঠে মারা যেত না। মনীষীরা ঠিকই আসেন যুগে যুগে তাঁদের কাজ করে দিয়ে যেতে। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষরা তাঁদের সেই কাজকে কোনভাবেই নিজেদের জীবধর্মের ভিতর দিয়ে ক্যারি ফরোয়ার্ড করে নিয়ে এগিয়ে চলি না। চললে পৃথিবী আজ সত্যই নবজাতকের বাসযোগ্য হয়েই উজ্জ্বলতর আলোর বিচ্ছরণ ছড়াতো চারিদিকে। তাই শুধু মনীষীদের সাধনাই শেষ কথা নয়। শেষ কথা সেই সাধনায় মানুষের অংশগ্রহণ। কিন্তু কিভাবে সম্ভব মানুষের অংশগ্রহণ? সেই কথাও জীবনানন্দ জানিয়ে দিচ্ছেন আমাদের। “আজ তবু কন্ঠে বিষ রেখে মানবতার হৃদয় স্পষ্ট হতে পারে পরস্পরকে ভালোবেস”।

কন্ঠের বিষ কন্ঠেই রাখি তবে আসুন। সেই বিষ আর উগরিয়ে কাজ নাই। রাজনীতিবিদরা ধর্মগুরুরা সাম্রাজ্যবাদীরা যতই সেই বিষ উগরিয়ে দিতে প্রলুব্ধ করুক না কেন, আমরা সাধারণ মানুষরাই পারি কিন্তু সেই বিষ কন্ঠেই আটকিয়ে রেখে না উগরিয়ে দিয়ে, আমাদের মানবতার হৃদয়কে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর করে তুলে ধরতে। আর সেটাই সম্ভব হতে পারে একমাত্র তখনই, যখন আমরা সকলেই পরস্পরকে ভালোবেসে পরস্পরের অসুবিধেগুলির দিকে নজর দেবো। নরনারীর ব্যক্তিগত ভালোবাসার বাইরেও এই তবে ভালোবাসার আর একটি অভিমুখ ও ভুমি হতে পারে। যেখানে আমরা ধরে তুলতে পারি সমগ্র মানবসভ্যতাকে। কবি আমাদের সেই অভিমুখেই দিকনির্দেশ করছেন অত্যন্ত সহজ সরল ভাবে। ভালোবাসাই যার একমাত্র মন্ত্র।

কবির দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের এই বানিয়ে তোলা ফেনিয়ে ওঠা সভ্যতার বাঁদরামির বাইরেও আরও এক জগৎ বর্তমান। বর্তমান এই মাটি পৃথিবীর কোলেই। যেখানে “মৃত্যুর আগে হয় না মরণ”। কবি নিশ্চিত নন পুরোপুরি। কোন সেই শর্টকার্ট পথ, যে পথে আমরা পৌঁছিয়ে যেতে পারি “অবিনশ্বর আলোড়ন”-র সেই জগতে। তিনি শুধু জানেন, সেই দেশ রয়েছে এই মাটি পৃথিবীর কোলেই। যেখানে হৃদয় হৃদয়কে অবহেলা করে না কখনো। এখানকার মতো। কবি জানেন, আমাদের ফেনিয়ে তোলা বুদ্ধির দৌড় আমাদেরকে কেবলই বিচ্ছিন্ন করে তোলে পরস্পর থেকে। সেই নিঃসঙ্গতার মানবজীবনও যদি হতে চায় অন্য কোন আলোর মর্মের সন্ধানী আজ, তবুও সব গ্লানি, ইতিহাস জুড়ে হিমালয় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই গ্লানি কাটবে না তবু। একদিনে। কিন্তু নতুন দিনের শপথের ঝলক দেখা যেতে পারে হয়তো তখনই। এতটাই আশাবাদী কবি। দিন বদলের এই গান, খেয়াল করলে জীবনানন্দের কবিসত্তার জুড়েই প্রত্যক্ষ হবে আমাদের। শুধুই বন্দুকের নল থেকেই দিন বদলের গান শুরু হয় না। আত্মসমীক্ষার পথে, আত্মশুদ্ধির পথে বিশ্ববিক্ষার পথেই হয়তো শুরু হতে পারে দিন বদলের গান। আর জীবনানন্দ বারবার তাঁর কবিতায় আমাদেরকে সেই মন্ত্রের ধুয়ো ধরিয়ে দেন। যে মন্ত্র্রের ভিতরে বুলেটের থেকে অনেক বেশি শক্তি। সে মন্ত্রই পরস্পরকে ভালোবাস।

কবি তাই আবারো দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলছেন। “বুদ্ধির বিচ্ছিন্ন শক্তি, শতকের ম্লান চিহ্ন ছেড়ে দিয়ে যদি/ নরনারী নেমে পড়ে প্রকৃত ও হৃদয়ের মর্মরিত হরিতের পথে”- তাহলেও ব্যক্তিজীবনের ব্যর্থতা বেদনা নিস্ফলতা মরণ যাই থাকুক না কেন, তার ভিতর দিয়েই সত্য হয়ে উঠবে মানবতার কল্যাণ রূপের অখণ্ড মাধুর্য্য। এই জগত থেকে দূরে গিয়ে নয়। এই সময় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়। এই জীবনকে অস্বীকার করেও নয়।। এই সব কিছুর মধ্যে থেকেও আমরা শুধু পরস্পরকে ভালোবেসে যদি কন্ঠের বিষয় উগাড়ানো থেকে নিজেদের রক্ষাটুকু করতে পারি। তাহলেই জগতজুড়ে ঘটে যেতে পারে এক নিঃশব্দ বিপ্লব। বন্দুকের নল থেকে নয়। হৃদয়ের উৎসারিত ভালোবাসা থেকেই প্রকৃত বিপ্লবের জন্ম দেওয়ার ডাক দিয়ে গেলেন, আমাদের বিজনঘরের নির্জনবাসী কবি জীবনানন্দ। কোন মনীষীর জন্য বসে থেকে লাভ নাই। তাঁরা যা দেওয়ার দিয়ে গিয়েছেন। সেই সম্পদগুলিকে আপন উত্তরাধিকার ধরে নিয়েই আমরা কবির মন্ত্রে যদি দীক্ষা নিতে পারতাম, তবেই ঘটিয়ে দিতে পারতাম এই নিঃশব্দ বিপ্লব। পরস্পরকে ভালোবেসে। পরস্পরকে ভালোবাসার সেই আলোপৃথিবীতে পৌঁছানোর অমোঘ ডাক দিয়ে গেলেন আমাদের প্রিয় কবি। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা শুনলাম কি? শুনছি কি? আদৌ শুনবো তো!

১৪ই আষাঢ়’ ১৪২৭

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত




আলোপৃথিবী

জীবনানন্দ দাশ

ঢের দিন বেঁচে থেকে দেখেছি পৃথিবীভরা আলো
তবুও গভীর গ্লানি ছিল কুরুবর্ষে রোমে ট্রয়ে;
উত্তরাধিকার ইতিহাসের হৃদয়ে
বেশি পাপ ক্রমেই ঘনালো।

সে গরল মানুষ ও মনীষীরা এসে
হয়তো বা একদিন ক’রে দেবে ক্ষয়;
আজ তবু কন্ঠে বিষ রেখে মানবতার হৃদয়
স্পষ্ট হতে পারে পরস্পরকে ভালবেসে।

কোথাও রয়েছে যেন অবিনশ্বর আলোড়নঃ
কোনো এক অন্য পথে- কোন্‌ পথে নেই পরিচয়;
এ মাটির কোলে ছাড়া অন্য স্থানে নয়;
সেখানে মৃত্যুর আগে হয় না মরণ।

আমাদের পৃথিবীর বনঝিরি জলঝিরি নদী
হিজল বাতাবী নিম বাবলার সেখানেও খেলা
করেছে সমস্ত দিন; হৃদয়কে সেখানে করে না অবহেলা
ফেনিল বুদ্ধির দৌড়;- আজকের মানবের নিঃসঙ্গতা যদি

সেসব শ্যামল নীল বিস্তারিত পথে
হ’তে চায় অন্য কোনো আলো কোনো মর্মের সন্ধানী,
মানুষের মন থেকে কাটবে না তা হ’লে যদিও সব গ্লানি
তবু আলো ঝল্কাবে অন্য এক সূর্যের শপথে।

আমাদের পৃথিবীর পাখালী ও নীলডানা নদী
আমলকী জামরুল বাঁশ ঝাউয়ে সেখানেও খেলা
করেছে সমস্ত দিন;- হৃদয়কে সেখানে করে না অবহেলা
বুদ্ধির বিচ্ছিন্ন শক্তি;- শতকের ম্লান চিহ্ন ছেড়ে দিয়ে যদি

নরনারী নেমে পড়ে প্রকৃত ও হৃদয়ের মর্মরিত হরিতের পথে-
অশ্রু রক্ত নিস্ফলতা মরণের খণ্ড খণ্ড গ্লানি
তাহ’লে রবে;- তবু আদি ব্যথা হবে কল্যাণী
জীবনের নব নব জলধারা- উজ্জ্বল জগতে।