আদরের নৌকা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আদরের নৌকা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

আদরের নৌকা




আদরের নৌকা

ভোর হলো দেহ তোলা। চোখ খুলে দেখো রে। তরতাজা দেহমন রাতভোর আদরে। সকালের সূর্য ততটাই দীপ্ত হয়, যতটা পরিতৃপ্ত শরীর নিশিরাত আদরে। একথা কে না স্বীকার করবে। বরং উল্টোটা হলে, ভোরের আলো চোখে পড়লে বিরক্তির রূপরেখা শরীর জুড়ে ধ্যাৎতেরির মানচিত্র এঁকে দিয়ে যেতে পারে। জীবন ও যৌবন আদরের কাঙাল। সেই আদর সকলের ভাগ্যেই যে ননীমাখনের মতো প্রতিদিন ঝরে পড়বে তার নিশ্চয়তা নাই। এমন কি পাশে প্রতিদিনের জীবনসঙ্গীটি পাশ ফিরে শুয়ে থাকলেও। সে এক দিন দিন ছিল। বাড়ি জুড়ে ঘরের অভাব ছিল না। গণ্ডায় গণ্ডায় বংশধারা বাড়াতে বাড়াতে একসময় ক্ষান্ত হয়ে থামতে হতো। কর্তা গিন্নীর শোয়ার ঘর আলাদা হয়ে যেতে দেরী হতো না। বংশরক্ষার কাজ শেষ। এবার প্রতিপালনের সময়। এখন ওয়ান হাউজ টু রুম ফ্ল্যাট মডেল। বংশ রক্ষার কাজ এখন দুই একবারের প্রয়াসেই মিটে যায়। তারপর প্রতিপালনের পালা। কর্তাগিন্নীর পারস্পরিক আদরের রুটিন ও ছন্দ সন্তানকোলে বিবর্তিত হতে থাকে দিনে দিনে। সন্তানের বোধবুদ্ধির বিকাশের সাথে সাথে। সারাদিনের শরীর মনের ধকলের পর মধ্যরাতের বিশ্রামের আদরের সোহাগও দিনে দিনে একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। অভ্যাসে প্রয়োজন মেটে ঠিকই। কিন্তু মাধুর্য্যের পাল্লাটা হালকা হতে থাকে দিনে দিনে। ফলে পাশাপাশি থেকেও রাতভোর আদরের অভিযান স্তিমিত হয়ে আসে ধীরে ধীরেসংসারে পাকা মাথার মানুষের অভাব নাই। তাঁরা জানেন এটাই বাস্তব। এর ভিতর দিয়েই ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টির লীলা চালিয়ে নিয়ে যান। বংশরক্ষার কাজে আদরের ভুমিকা সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করে সৃষ্টিকর্তার ইশারায় কবেই যে অন্তর্হিত হয়ে যায়, টের পাওয়া যায় না, প্রতিদিনের অভ্যস্ত জীবনেও। তাই পাশাপাশি শুয়ে রাত পার করলেও রাতের ওম সকালের শরীরে সুরভি ছড়াবেই এমন নিশ্চয়তা থাকে না বেশিদিন।

অচেনা হৃদয় আজানা মন। অদেখা জীবন গহন বন। সেই গহন বনের গভীরে যখন আমরা পা রাখতে ঢুকি, আদরের মাধুর্য্য তখন যে পরিমাণে যে বিপুল আনন্দের আতিশয্যে বিচ্ছরিত হতে থাকে, অরণ্যের দিন রাত্রির সব রহস্য দিনের আলোর মতো প্রস্ফূটিত হয়ে গেলে সেই মাধুর্য্যও যেন দিনের শিশিরের মতো নাগালের বাইরেই চলে যায়। তাই সন্তানের বড়ো হয়ে ওঠার সাথে পারস্পরিক আদরের জোয়ার ভাটায়, ভাটার টান যে অধিকতর, সে আর বলার অপেক্ষা রাখে কি? কিন্তু গল্প কি সব সেখানেই শেষ হয়ে যায়। এই সমাজ এই সংসার যদিও তেমনটিই দাবি করে, তবুও সমাজ সংসারের ভ্রূকুটি চোখরাঙানির ণত্ব বিধান ষত্ববিধান উপেক্ষা করে এরপর যদি তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশ ঘটে সংসারের চারদেওয়ালের বাইরেই? তখন? তখনই নাটকের দ্বিতীয় অংকের শুরু। না সকলের ভাগ্যে সে শিকে ছেঁড়ে না। যাঁদের কপালে নতুন প্রেমের সৌভাগ্য প্রজাপতির মতো পাখা মেলে উড়ে এসে জুড়ে বসে, সে আনন্দের স্বাদ তাঁরাই শুধু অনুভব করতে পারেন। ফিরে আসে আদরের হারিয়ে ফেলা মাধুর্য্য নতুন রঙের ঘোমটা টেনে। অবগুন্ঠিত সোহাগের পরতে পরতে হিলল্লিত আবেগের জোয়ারে তখন শুধুই ভেসে যাওয়ার পালা। আদরের নৌকায় তৃপ্তির পাল খাটিয়ে।

অবশ্যই এরপর ঝড়ঝঞ্ঝার পালা। কার আদর কে খাচ্ছে তার হিসাব নিকাশের যুদ্ধ। না সেই বিষয়ে আমাদের আগ্রহ নাই। সেটা ভদ্রজনচিত হবে না। আমাদের বিষয় আদর। কিন্তু সেই আদরের মূল্য কি, কতটা? লাভ লোকসানের হিসাব নিকাশই বা কি? রাতভোর স্বামীর আদর খেয়েছেন। শরীর আইঢাই। সকাল সকাল ডেলি প্যাসেঞ্জারের ট্রেন ধরাতে হবে। গরম গরম রাঁধা ভাত খায়িয়ে টিফিনের কৌট হাতে ধরিয়ে দিন। তারপর ছেলে মেয়ের স্কুল। নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসা। দুরন্ত দস্যিদের সামলানো। খাওয়ানো পড়ানো। ঘরদোর ঠিকঠাক রাখা। কাজের কি আর শেষ আছে। সন্ধ্যায় একটু সাজগোজ রূপটানের কারুকাজ। সারাদিন পরিশ্রমের পর বাড়ি ফিরবে মানুষটি। তারপর মধ্যরাতের আয়োজন। ভালোবাসার শরীরই জানে তার মূল্য।

না সারাদিন এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা রোজগার আপনি অমনি অমনি করছে না মশাই। প্রতিটি টাকার হিসাব আছে আপনিও জানেন। রাতভোর আদর খাবেন আর বৌকে সাজাবেন না? খাটনি তো করতেই হবে। সংসারের ভার নিয়েছেন। এবার ভারবাহী বলদ ভাবলে হবে নিজকে? হাসি হাসি মুখে সব আব্দার মিটিয়ে দিন। দেখুন আদরের মৌতাত বাড়বে বই কমবে না। সকালে উঠে ডবল এনার্জি ফিরে পাবেন। আর মালুম হবে সংসার সুখের হয় উপার্জনের বহরে।

তাই পরস্পর আদরের জমিদারী ঠিক ঠাক রাখতে মেহনত করতেই হয় দিনভর। কিন্ত আদর কি শুধুই দেহ সর্বস্ব? অনেক বিতর্ক উঠবে তাই নিয়ে। অনেকেই নিজেদের দাম্পত্যজীবন মেলে ধরে প্রতিবাদে সরব হবেন হয়তো। না, আদর আদৌ দেহ সর্বস্ব নয়। এটা মনের মাধুর্য্য ইত্যাদি। দেহের যৌবন আর কতদিন? কিন্তু আদরের যৌবন যে আরও বেশিদিন সেকথাই সপ্রমাণে উঠে পড়ে লাগবেন অধিকাংশ মানুষই। আমরা সেই নিয়ে তর্ক করবো না। যার কাছে আদরের রূপ যৌবন যেমন, তার কাছে সেটাই সত্য। সেটাই বরং মেনে নিতে প্রয়াসী হব আমরা। আমরা এটাই দেখতে চাইছি, নরনারীর ব্যক্তি জীবনে আদরের শর্তগুলি কি কি? না কি আদর আসলেই নিঃশর্ত সমর্পন পরস্পরের কাছে? আদরের অস্তিত দৈহিক না মানসিক সেই তর্ক আমাদের নয়। সে তর্ক জীববিজ্ঞানের। দাম্পত্য জীবনে কিংবা প্রেমের সম্পর্কে নিঃশর্ত সমর্পনের ভিতর দিয়ে যে আদরের জন্ম, তার স্বাদ কি সকলের ভাগ্যেই জোটে?কি বলবেন অধিকাংশ মানুষ?

অনেক দাম্পত্যেই কি দেখা যায় না, সন্তানের অভাব আদরের নৌকায় ফাটল ধরিয়ে দেয়? এই যুগেও। আগে একান্নবর্তী সংসারে বহুবিবাহের যুগে যে ফাটল দিয়ে কপাল পুরতো অনেক দুয়োরাণীরই। যদি সেটাই হয়, তাহলে আদরের একটা শর্ত হতেই পারে বংশরক্ষায় নারীর সন্তান ধারণের সামর্থ্য। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে যেটি পুত্র সন্তান প্রসবের পথ ধরে মসৃণ হয়ে সচল থাকে। সেখানে নিশ্চয়ই আমরা নিঃশর্ত আদরের দাবী করতে পারি না। কিংবা স্বল্প রোজগেরে স্বামীর সংসারে অভাব অনটনের অন্তরকলহের দাম্পত্যে দারিদ্র্যের অভিশাপ যখন ফণা তুলে দাঁড়িয়ে যায়, আদরের নৌকা কি দিকহারিয়ে কাত হয়ে পড়ে না? জোর দিয়ে বলতে পারি কি আমরা। না পড়বে না। অর্থাৎ আদরের আরও একটি শর্ত হতে পারে আর্থিক সাচ্ছন্দ। স্বচ্ছল অর্থনীতির হাত ধরে যা সুজলা সুফলা থাকে কিছু কিছু ঘরে, দাম্পত্য অভিসারের নিবিড় একান্তে।

তাহলে একদিকে নারীর উদ্ভিন্ন যৌবন যৌনতৃপ্তি দেওয়ার সক্ষমতা ও সন্তান ধারণ এবং অন্যদিকে পুরুষের আর্থিক কৌলিন্য ও সহায় সম্পদের প্রাচুর্যই আদরের নৌকাকে ভাসমান রাখার অন্যতম শর্ত। আমাদের ঘরে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলে এই সত্যই কি সপ্রমাণ হয় না? এই দুই শর্তই যখন ঠিকমত পুরণ হতে ব্যর্থ হয়, আদরের নৌকার অবস্থা তখনই কিন্তু টালমাটাল হয়ে পড়ে। বাংলার সমাজ সংসারের এই চিত্র নতুন কিছু নয়। বলতে পারি আদি ও অকৃত্রিম। আশা করি এবারে নির্দ্ধিধায় বলা যেতেই পারে নরনারীর দাম্পত্য জীবনে আদরের নৌকার চালিকা শক্তি নেহাতই জৈবিক। ফেল কড়ি মাখো তেল।

না, আমদের ইংগিত ইশারা সংসারের দাম্পত্য চৌহদ্দির বাইরে যাবে না। চিন্তা নাই। মুশকিলটা আরও সেখানেই। বিশুদ্ধ প্রেমের যে গল্প শুনতে অভ্যস্ত আমরা, সেই বিশুদ্ধতার ঢাকের ফুটোগুলি ধরা পড়লেই তাল বেতাল হয়ে যাওয়ার সমূহ বিপদ। সেই কারণেই সমাজ অনেক রকম কৌশল অবলন্বন করে সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে নানান রঙের বাহারি নকশাকাটা চাদরে ঢেকে রাখতে চায়। সেই চাওয়ার ঐতিহ্য নিজেদের ঘর থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করি আমরা। সব কথা বলা যায় না। বলতে নাই। অপ্রিয় সত্য হলে তো নয়ই। তাই ঠোটকাটা মানুষরা ব্রাত্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়। সেটা তো খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু সম্পূর্ণ নিঃশর্ত আবেগে আদরের নৌকায় পরস্পরের শরীরে সওয়ার হয়ে পরস্পরের দেহ মন আত্মাকে এই ভব সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে চলার যে শক্তি, সেই শক্তি আছে কি আমাদের? কে দেবে সেই শক্তি? কোথায় পাবো তারে? সেই অনন্ত খোঁজের পথের পথিক যাঁরা, তাঁরা কি দেখা পায় পরস্পরের কোনদিন কখনো। জীবনের কোন পর্বে? না কি যদিও বা পায়, ততদিন যৌবন পার হয়ে যায় কুড়ি কুরি বছর পার। অসমর্থ্য দেহ অশক্ত মনের ভারে নুব্জ বিশ্বাসের টলে যাওয়া ভিতে দাঁড়িয়ে তখন আর সম্ভব হয় না পরস্পরের আদরের নৌকায় সওয়ার হওয়া। সেদিনটিই হয়তো মানুষের জীবনের সবচাইতে বড়ো করুণ ট্র্যাজেডি।

১৪ই আষাঢ়’ ১৪২৭

কপিরাইট  শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত