মার্কসবাদ কি ভুলে ভরা? লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মার্কসবাদ কি ভুলে ভরা? লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মার্কসবাদ কি ভুলে ভরা?

 

মার্কসবাদ কি ভুলে ভরা?

মার্কসসিজম কি ভুলে ভরা? তবে কি এই ভুলে ভরা একটি মতাদর্শের অভিঘাতে বিশ্বময় এত আলোড়ন সৃষ্টি হলো গত কয়েক শতক ব্যাপী? হাজার হাজার মানুষ প্রাণের বিনিময়ে এই মতাদর্শকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে অকারণেই বলিদান দিলেন নিজেদের? এবং ভুলে ভরা এই মার্কসসিজমকে ঠেকাতেই বিশ্বজুড়ে ধনতন্ত্রের এত অতন্দ্র প্রহরা? বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের পাতা ফাঁদে মানুষকে ফাঁসিয়ে ধনতন্ত্রের বিশ্বজয়, সে’তো এই মার্কসসিজমকেই পরাস্ত করে। ভুলে ভরা একটি মতাদর্শকে ঠেকাতে এতটা কাঠখড় পোড়াতে হলো তবে? অন্তত ধনতন্ত্রের রক্ষকরাও কি মার্কসসিজমকে ভুলে ভরা একটি মতাদর্শ বলে মনে করেন? না বোধহয়। করলে মার্কসসিজম নিয়ে ধনতন্ত্রের শতাব্দীব্যাপী এই আতঙ্ক কেন?


আজ সকালেই প্রথিতযশা এক অধ্যাপিকা কিন্তু ঠিক এই কথাটিই বললেন। বললেন মার্কসসিজম ভুলে ভরা। এখন মুশকিল হলো, ব্যক্তিগত ভাবে কার্ল মার্কসের লেখার সাথে পরিচয় না থাকা কোটি কোটি মানুষের ভিতরে আমিও একজন। ফলে মার্কস কি লিখেছিলেন। কি বলে গিয়েছেন। কি দিকদর্শন দিয়ে গিয়েছেন। সেসবের কিছুই আমাদের মতো কোটি কোটি মার্কস নিরক্ষর মানুষের জানা নেই। জানা থাকে না। ফলে আমদের পরের মুখে ঝাল খাওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এটা ঠিক, আমরা সাধারণ মানুষ। আমরা মার্কসসিজমের অ আ ক খ কিছুই জানি না। ফলে সেই মতাদর্শ ভুল কি ঠিক। সেই বিষয়ে আমাদেরকে নির্ভর করতে হয় নানা মুনির নানা মতের উপরেই। যার যাঁকে বিশ্বাস। তার, তার উপরেই নির্ভরতা। সে তার উপরেই নিজের মার্কসবাদ তৈরী করে নেয়।


ফলে একবর্ণ মার্কসবাদ না জানলেও। জন্মাবধি আমাদের নিজেদের ভিতরে এক এক রকমের মার্কসবাদ তৈরীর একটা চলন সচল থেকেই যায়। গোটা বিশ্বের লেখাপড়া জানা শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষ সম্বন্ধেই হয়তো একথা সত্য। আর এই বিষয়ে মিডিয়ার একটি সর্বাত্মাক প্রভাব রয়ে গিয়েছে। সোভিয়েত আমলের বিশ্বে মিডিয়ার দুই রকমের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। মার্কসবাদের পক্ষে এবং বিপক্ষে। আর আজ পাশ্চাত্য মিডিয়ার সর্বাত্মক দখলদারিতে একটিই প্রভাব টিকে রয়েছে। সেটি মার্কসবাদের বিপক্ষে। এবং সেই অনুপাতেই নানা জনের চেতনায় নানারকম মার্কসবাদের অবস্থান আজও বিদ্যমান।


আমাদের যখন ছেলেবেলা। সেটি সোভিয়েত আমল। গোটা বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত। ধনতন্ত্র আর সমাজতন্ত্র। পারিবারিক ঐতিহ্যের আবহাওয়ায় সমাজতন্ত্রের ভিতরে মানবতাবাদের ঐকান্তিক স্বরূপে আমাদের ভিতরে এক ধরণের মার্কসবাদের জন্ম হয়ে গিয়েছিল সেই তখনই। কৈশোরের কল্পলোকে গোটা বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার আশায় আমরা তখন বিভোর। যেখানে যুক্তির ধারের থেকে আবেগের ভার ছিল অনেক বেশি ওজনদার। ধনের অসম বন্টনই যে সকল বৈষম্যের মূলে। সেকথা তখন আমরা বুঝতে শুরু করে দিয়েছি। ফলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। ধন বন্টনের ভিতরে অসাম্য দূর করাই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায়। আর তাকিয়ে থেকেছি সোভিয়েতের দিকে। মাও সে তুঙের দিকে। তাকিয়ে থেকেছি কিউবার দিকে। তাকিয়ে থেকেছি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সম্মুখ সমরে পরাজিত করার একমাত্র কৃতিত্বের অধিকারী সেই ভিয়েতনামের দিকে। ভরসা করতে শুরু করেছি ফিদেল কাস্ত্রোর ধনতন্ত্রকে প্রতিহত করতে থাকার অসম কিন্তু শক্তিশালী লড়াইয়ের উপরে। আর কল্পনার ডানায় ভর করে পৌঁছিয়ে গিয়েছি একটি নামে। চে গুয়েভারা। ফিনিক্স পাখির মতো মানুষ আবারও ঘরে ঘরে জন্ম দেবে চে গুয়েভারাদের। বিশ্বজুড়ে বন্ধ হবে ধনতন্ত্রের বদমায়েশি। প্রতিষ্ঠা হবে সাম্যের। প্রতিষ্ঠা হবে সমাজতন্ত্রের। জয়ী হবে মার্কসবাদ।

 

এই যে একটি মার্কসবাদ। বিশ্বাসের জোরে একটি ভরসার আশ্রয়। যেখানে ধনের সম বন্টনের ভিতর দিয়ে মানুষের সাথে মানুষের বাদবাকি সব ভেদাভেদ এবং বৈষম্য অবলুপ্ত হয়ে যাবে। এটাই আমাদের ছেলেবেলার মার্কসবাদ। হয়তো অনেকটা সেই ছোটদের রামায়ণ। ছোটদের মহাভারতের সংস্করণের মতো। এই সংস্করণ কিন্তু কোন মিডিয়ার তৈরী করা বাজারি প্রোডাকশন ছিল না। ছিল না কোন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রচার মাধ্যমের তৈরী করে দেওয়া গণচেতনাও। নিতান্তই পারিবারিক আবহাওয়ায় গড়ে ওঠা মানবতাবাদী এক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার মাত্র। আগেই বলেছি। যেখানে যুক্তির ধারের থেকে আবেগের ভার ছিল অনেক বেশি ওজনদার। সেই আমাদের ছেলেবেলা। সেই আমাদের মার্কসবাদ। বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে, আমার মার্কসবাদ।


সেই মার্কসবাদই প্রথম ধাক্কা খেল, আমি যখন একটু উচ্চ শ্রেণীতে। হাতে এল জীবনবিজ্ঞানের নতুন বই্। নতুন ক্লাসের। বছরের প্রথমেই নতুন বইয়ের গন্ধ আর নতুন নতুন বিষয় জানার অদম্য আগ্রহে গোটা বইয়ের সব পাতা উল্টিয়ে দেখার আনন্দ। সেই আনন্দেই দেখা হয়ে গেল হঠাৎ মহামতী ডারুইনের সাথে। পরিচয় হলো তার কয়েকটি তত্ত্বের সাথেও। সেই যেখানে তিনি বলছেন। পৃথিবীর সম্পদ সীমিত। কিন্তু মানুষের চাহিদা অনন্ত। আর যেখানে তিনি বলছেন। সারভাইভ্যাল অফ দ্য ফিটেস্ট। ব্যাস। দুই আর দুইয়ে চার করে নিতে দেরি হলো না মোটেই। সীমিত সম্পদ আর অনন্ত চাহিদার ভিতরে সীমিত সম্পদের দখল নিতে যে প্রাণান্তকর লড়াই, সেই লড়াইয়ে জযী হবে সেই’ই যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। যে সবচেয়ে বেশি বলশালী। সেই তো বিজয়ী হওয়ার যোগ্যতা রাখবে। সেই জয়ী হবে। সীমিত ধনের উপরে প্রতিষ্ঠিত হবে তারই দখলদারী। ডারুইনের মতে এটাই পৃথিবীর মূল ইতিহাস। এবং সত্য ইতিহাস। সবচেয়ে প্রামাণ্য মূলক ইতিহাস। যা অখণ্ডনীয়। কৈশোরের সেই অমলিন দিনেই দুই আর দুইয়ের যোগফলে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গেল।


তাহলে বিষয়টা দাঁড়ালো এইরকম। সীমিত সম্পদ আর অনন্ত চাহিদার ভিতরেই লুকিয়ে রয়েছে অসাম্যের ভুবন। এটাই পৃথিবীর প্রাকৃতিক নিয়ম। সমস্ত জীবকুলের ভিতরেই এই নিয়ম বলবৎ রয়েছে। মানুষও এর বাইরে নয়। বরং জীবকুলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ জমিয়ে রাখার রেওয়াজ নেই তেমন। কিন্তু মানুষের সেটাই মূল প্রকৃতি। ফলে জীব জগতের টিকে থাকার লড়াইয়ের থেকেও মানুষের সমাজে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের টিকে থাকার লড়াই অনেক বেশি তীব্র। এবং আরও বেশি প্রাণঘাতী। আর সেখান থেকেই সৃষ্টি হলো ধনের অসম বন্টন ব্যবস্থার। গড়ে উঠলো মানুষের সভ্যতা। জোর যার মুলুক তার। রাষ্ট্রপুঞ্জের নামে ধোঁকাবাজি আর কতদিন চলবে? রাষ্ট্রপুঞ্জের জন্মই তো এই জোর যার মুলুক তার সংস্কৃতিকে নিরঙ্কুশ ভাবে টিকিয়ে রাখার ধান্দায়। এই সোজা সত্যটুকু না বুঝলে আমি আপনি মুর্খের স্বর্গে বাস করছি মাত্র।


সীমিত সম্পদ আর অসীম চাহিদার এই পৃথিবীতে ‘জোর যার মুলুক তার’ এই সংস্কৃতিতে যে ধনের সম বন্টনের কোনরূপ নিশ্চয়তার সম্ভাবনা নেই। থাকতে পারে না। সেটি বুঝতে ডারুইনের এই দুইটি তত্ত্বই যথেষ্ঠ বলে মনে হয়। অন্তত কৈশোরের সেই সময়ে স‌োভিয়েত আমলের বিশ্বেই তেমটি মনে হয়েছিল। আর সেইদিনই আমাদের নিজস্ব সেই মার্কসবাদের দুর্বলতার ক্ষেত্রটিও উন্মোচিত হয়েছিল। হয়েছিল তার আরও একটি বড়ো কারণ এই যে। কার্ল মার্কস ডারুইনের এই তত্ত্বকে তাঁর মতবাদে ঠিক কি করে সামলিয়ে ছিলেন। বা আদৌ সামলিয়ে ছিলেন কিনা। মার্কস নিরক্ষর এক কিশোরের পক্ষে সেটি জানা সম্ভব ছিল না। জানা না থাকায়, সম্পদের সম বন্টন ব্যবস্থা কিভাবে এই অসম লড়াইয়ে বিজয়ী হবে সে বিষয়টি নিজের মতো করেই কল্পনা করে নিতে হয়েছিল। আর কিশোর চেতনায় সেইদিন একটি রফাসূত্রে পৌঁছাতে হয়েছিল। রফাসূত্রটি এইরকম। সীমিত সম্পদ আর অসীম চাহিদার নিরন্তর লড়াইয়ে যোগ্যতম যে। সেইই সবসময়ে জয়ী হবে। ডারুইনের এই তত্ত্ব নির্ভুল ধরে নিয়েই ইতিহাসের দিকে তাকালেই আমরা টের পাই। আমাদের সেই নিজস্ব মার্কসবাদও কোথাও না কোথাও নিরন্তর সেই লড়াইয়ে মার খেতে খেতেও কখনো সখনো আপন যোগ্যতায় বিজয়ী হয়ে উঠবে। উঠবেই। ডারুইন তত্ত্ব সমর্থিত ধন বৈষম্যের এই বিশ্বে শোষন আর বঞ্চনা যত বেশী তীব্র এবং শোচনীয় হয়ে উঠবে। ততই শোষিত এবং বঞ্চিতেরা জোট বাঁধা শুরু করবে। করতে বাধ্য। টিকে থাকা এবং বেঁচে থাকার মরিয়া প্রয়াসেই এই জোট বাঁধতে বাধ্য হবে সাধারণ জনতা। যুথবদ্ধ সেই জনতাই তখন কখনো লেলিন, কখনো মাও সে তুঙ। কখনো বা গুয়েভারা কাস্ত্রো’র হাত ধরে পৌঁছিয়ে যাবে ধনের সম বন্টনের চৌহদ্দিতে। অন্তত কয়েক দশকের জন্য হলেও। অন্তত সামান্য কয়েকটি হাতে গোনা দেশে হলেও। মনে রাখতে হবে। তাপে আর চাপে নিম্নচাপের ঘূর্ণিঝড় বেশিক্ষণ স্থায়ীও হয় না। অনেকটা বেশি অঞ্চলেও আছরিয়ে পড়ে না। কিন্তু তাপ আর চাপের বিশেষ তারতম্য হলেই নিম্নচাপের ঘূর্ণিঝড় উঠবেই। তাকে ঠেকানো সম্ভব নয় কোনভাবেই। সীমিত সম্পদ আর অসীম চাহিদার বিশ্বে জোর ‘যার মুলুক তার’ এই ঐতিহাসিক সত্যই মার্কসবাদকে কোনদিনও অপ্রাসঙ্গিক করে দেবে না। অন্তত আমাদের সেই নিজস্ব মার্কসবাদ। যে মতাদর্শ ধনের সম বন্টনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। যে মতাদর্শ ধন বৈষম্যজাত সকল ভেদাভেদ দূর করার প্রতিশ্রুত লক্ষ্যে অবিচল কাজ করে যায়। যে মতাদর্শে আবিশ্ব না হলেও, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই মানুষ যুথবদ্ধ সংগ্রামে ব্রতী হয়। ধনের সম বন্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য। ধন বৈষম্য যত বেশি তীব্র এবং ভয়ংকর হয়ে উঠবে। মানুষ তত বেশি লড়াইয়ে সামিল হবে। ধন বৈষম্যকে পরাস্ত করতে। অন্তত ডারুইন তত্ত্ব যতদিন সত্য থাকবে। ততদিন।


মার্কসবাদ কেন ভুলে ভরা। কিংবা আদৌ ভুলে ভরা কিনা। সেটি মার্কসবাদ বিশেষজ্ঞদের গবেষণার বিষয়। আমরা যারা নিজেদের মতো করে নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা মার্কসবাদে অবিচল। তাদের বিশ্বাসে মার্কসবাদও, ডারুইনের ‘সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টে’ এর এই বিশ্বে টিকে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের অন্যতম বড়ো আয়ুধ। আরও বড়ো কথা। এই মার্কসবাদের আতঙ্কই যে আবিশ্ব ধনতন্ত্রকে নিরন্তর তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। সেই সত্য বিগত একশ বছরের বিশ্ব ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেই স্পষ্ট মালুম হয়। মার্কসবাদ ভুলে ভরা হোক। মার্কসবাদ নির্ভুল হোক। ধনতন্ত্রের পয়লা নম্বর শত্রু যে মার্কসবাদই। সে বিষয়ে কোন ভুল নেই। ভুল নেই সেই ধনতন্ত্রই গোটা বিশ্বের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে আজকে। ভুল নেই মার্কসবাদ আপাতত অনেকটাই ব্যাকফুটে। বস্তুত লড়াইয়ের ময়দানের প্রায় বাইরে। এই বিষয়ে আরও একটি কথা বলবো। বেশ কয়েক দশক আগের কথা। ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’র একটি প্রচ্ছদ কাহিনী। কার লেখা কোন বিষয়ে। স্মরণে নেই। স্মরণে আছে শুধু একটি উক্তি। ‘কমিউনিজম উইল ডিফিট ইটসেল্ফ’। না, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে প্রকাশিত কোন সংখ্যায় নয়। পতনের বেশ আগেই এই উক্তিটি উক্ত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। উক্তিটি ছিল জওহরলাল নেহেরুর। জীবন বিজ্ঞানের সিলেবাসে ডারুইনের সাথে পরিচিত হওয়ার পর এই উক্তিটি চিন্তার ভুবনে আবার একটা আলো দিয়েছিল। তখনও বিশ্বজুড়ে মানুষের শেষ ভরসা সোভিয়েত ইউনিয়ন। তখনও ধনতন্ত্রের সর্বগ্রাসী থাবার সামনে কমিউনিজম অন্তিম ঢাল। এখন যখন আমরা সোভিয়েত আমলের দিকে ফিরে তাকাই। তখন এটা পরিস্কার। কোন পথে কমিউনিজম হ্যাড ডিফিটিডে ইটসেল্ফ।


সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা থাক। আমরা কেউ সেই ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলাম না কোন কালে। আমাদের বাস এই বাংলায়। ব্রিটিশদের বদান্যতায় ছেঁড়া কাঁথার মতো এক টুকরো পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৭৭ সাল। ষাটের দশকের যুক্ত ফ্রন্টের সাময়িক প্রচেষ্টার পরে বামফ্রন্টের নিরঙ্কুশ শাসন। কমিউনিজম আর মার্কসবাদের বিজয়ের দিন। এই বাংলায়। যার হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। বর্ণভেদের ইতিহাস। শ্রেণী বিভক্ত সমাজের ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকারের ইতিহাস। নিম্নবর্ণের উপরে উচ্চবর্ণের শোষন আর অবিচারের ইতিহাস। সম্পদের অসম বন্টনের ইতিহাস। শোষন আর বঞ্চনার শ্রেণী বিভক্ত জনগোষ্ঠীর দেশ। এবং নিয়তিবাদের পীঠস্থান। একদিকে রেসিজম আর এক দিকে কমিউনালিজমের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। হংস মধ্যে বক যথা। সেই বাংলায় শাসন ক্ষমতায় বামফ্রন্ট। ভারতীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয়। সোনার পাথরবাটিই হোক আর কাঁঠালের আমসত্ত্ব! বামফ্রন্ট রাইটার্সে! আর সাইনবোর্ডে কমিউনিজম। সম্পদের সম বন্টন? ভারতবর্ষের অঙ্গরাজ্যে? হ্যাঁ জনহিতকর অনেক কাজ শুরু হলো। পঞ্চায়েত স্তর অব্দি মানুষ শাসনকার্যে সামিল হওয়ার সুযোগ লাভ করলো। জমির উপরে বর্গাদারদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পেল। জোতদারদের শোষণের পথ সঙ্কুচিত হলো। কিন্তু ধনের সম বন্টন ব্যবস্থা পত্তন করা একটি অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতিতে সম্ভব ছিল না। হয়ও নি। কেউ চায়ও নি। ফলে ধন বৈষম্যের ব্যবস্থা অটুট থাকলো। শোষণ বঞ্চনায় একটু লাজলজ্জা এলো। সরকারী সুযোগ সুবিধের একটা অংশ তৃণমূল স্তর অব্দি মানুষের কাছে গিয়ে পৌঁছানো শুরু হলো। ভালো বাংলা সিনেমায় হল গুলি হাউসফুল হতে থাকলো করমুক্ত এক টাকার টিকিটে। আর নির্বাচনের পর নির্বাচনে বামশক্তির নির্বাচনী জয় নিশ্চিত করতে গড়ে উঠলো এক নতুন রাজনীতি। সমাজের উপরে পার্টির দাদাগিরি। সেই দাদাগিরি’র দৌলতে কিছু কিছু বুদ্ধিমান কমিউনিস্টরা আখের গোছাতে শুরু করলেন। তাদের ভিতর এক শ্রেণী’র আঙুল ফুলে কলাগাছ দশা হতে থাকলো। পার্টি আর রাজনীতি সমার্থক হয়ে গেল। রাজনীতি আর আখের গোছানো পরিপুরক হয়ে উঠলো। ধনের সম বন্টনের বদলে, ধনের অসম বিভাজনে অর্থনৈতিক শ্রেণীভেদ যেখানে ছিল। সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো। অকমিউনিস্ট আমল আর কমিউনিস্ট আমলের পার্থক্য দাঁড়িয়ে থাকলো শুধু পতকার রঙে। আর নির্বাচনী প্রতীকে। আর হ্যাঁ অবশ্যই বামপন্থী মর্য্যাদায়। কিন্তু ডানপন্থী সুবিধের বিষয়ে বামপন্থী মর্য্যাদায় বিশেষ কোন ছুৎমার্গ দেখা দিল না। মাঝখান থেকে কয়জন আদর্শবাদী নেতানেত্রী আর কর্মী সমর্থকরাই সারাজীবন বামপন্থী মর্য্যাদার নিত্য আরাধনায় জীবনপাত করে অস্তমিত হতে থাকলেন যাঁর যাঁর আয়ুর কোঠায়।


সাড়ে তিন দশকের শাসনে ধনের অসম বন্টনে সর্বাহারাদের একদল অনেকটা আখের গুছিয়ে ভদ্রলোক হয়ে উঠলো। আর বাকিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে কমিউনিস্ট বিরোধী হয়ে পড়লো। মার্কসবাদের বদলে সুবিধেবাদের অপরিমিত চর্চায় রাজ্যজুড়ে দুইটি শ্রেণী দাঁড়িয়ে গেল। এক পক্ষে স্তাবক। আর এক পক্ষে বিক্ষুব্ধ। স্বভাবতঃই সংখ্যার গণিততত্ত্বের বিচারে বিক্ষুব্ধ শ্রেণীর লোকবল বৃদ্ধি পেতে থাকলো দিনে দিনে। এবং পুঞ্জীভুত ক্ষোভ ক্যাশ করতে মাঠে নেমে পড়লো আগমার্কা কমিউনিজমের শত্রুরা। জনদরদী মঞ্চের দখল তখন তাদের হাতে। সোভিয়েতের পতনের গল্পটা হয়তো কেন, ঠিক এইরকম নয়। কিন্তু সেখানেও সর্বহারাদের হাতে ক্ষমতা গেলেও। ক্ষমতাচর্চার কেন্দ্রে যাঁরা। আর ক্ষমতাচর্চার কেন্দ্রের বাইরে যাঁরা। তাদের ভিতরে নতুন করে শ্রেণী চরিত্রের পুনর্বিন্যাস হতে থাকল। এই যে পুনর্বিন্যাস। এর হাত ধরে ক্ষমতাধর আর ক্ষমতাহীন এই নতুন দুই শ্রেণীর উদ্ভবে বিবর্তিত হতে থাকলো সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থা। সম্ভবত নেহরু এই ঘটনার ভিত্তিতেই তাঁর সেই প্রফেটিক উক্তিটি করে গিয়েছিলেন। ধনের সম বন্টনের যে ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনা আর জনগণের হাতে থাকলো না। থাকার কথাও নয়। থাকা সম্ভবও নয়। হাতবদল হয়ে সেই ক্ষমতা গিয়ে পড়লো আমলাতান্ত্রিক শ্রেণীর হাতে। এই আমলাতন্ত্রই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রধান স্থপতি বলে অনুমান করা যায়। আমলাতন্ত্রের হাত ধরে গড়ে ওঠা ধন বৈষম্যের নতুন পথরেখা এবং দুর্বল অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উপরে ভিত্তি করেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সুচনা হয় বলে অনুমান করা যায়। এবং সত্য হয় নেহেরুর করে যাওয়া উক্তিটি।


মার্কসবাদ ভুলে ভরা হোক। আর নির্ভুল হোক। তার প্রয়োগের দায়িত্ব যে মতাদর্শের জনকের উপরে বর্তায় না। আশা করা যায়, এই বিষয়ে কোন বিতর্ক থাকতে পারে না। মহামতী লেলিন যখন সেই মার্কসবাদকে সোভিয়েত বিপ্লবের ভিতর দিয়ে সত্য করে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ শুরু করলেন। তখন কিন্তু পিলে চমকে গিয়েছিল ধনতন্ত্রেরই। ধনতন্ত্র সেইদিন সাক্ষাৎ যমের দর্শন পেয়ে হতচকিত হয়ে উঠেছিল যে, সন্দেহ নাই। সন্দেহ নাই এই কারণেই যে। আত্মরক্ষার্থেই ধনতন্ত্র তার পরপরেই ওয়েলফেয়ার ইকোনমির জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছিল। ধনতান্ত্রিক দুনিয়া জুড়ে আজ যে ওয়েলফেয়ার ইকনমির সুবিধা পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। সেই ইকনমির জন্মই হতো না। যদি না মহামতী লেলিন সেদিন সোভিয়েত বিপ্লব সফল করে তুলতে পারতেন। এবং স্ট্যালিন কঠোর হাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাল ধরতে পারতেন। ইতিহাসের পর্যবেক্ষকরা খুব ভালো করেই জানেন। লেলিনের আকাল মৃত্যুর পরে স্ট্যালিন না থাকলে সো‌ভিয়েত ইউনিয়ন এবং কমিউনিজম ধনতন্ত্রের বিপদ ঘন্টা বাজিয়ে যেতে পারতো না।


হ্যাঁ এটা ঠিকই। সোভিয়ত ইউনিয়নই ধনতন্ত্রের বিপদ ঘন্টা বাজিয়ে তুলেছিল। ধনতন্ত্রের রক্ষকরা সেই বিপদ ঘন্টায় হতচকিত না হয়ে সচকিত হওয়ার পরিণতিই এই ওয়েলফেয়ার ইকনমি সিস্টেমের পত্তন। তারা এটা বুঝে গিয়েছিলো। মার্কসবাদের অশ্বমেধ ঘোড়াকে প্রতিহত করতে হলে। সাধারণ মানুষের অন্ন বস্ত্র বাসস্থান এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। না হলে জনতা দিনে দিনে সংঘবদ্ধ হতে থাকবে। এবং ধন বৈষম্যের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ লড়াই ও সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে। যার পরিণামে দিকে দিকে এবং দেশে দেশে কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত হতে বাধ্য। এটাই ছিল আজ থেকে এক শতাব্দী আগে ধনতন্ত্রের বিপদ ঘন্টা। যার সুফল আজ অব্দি ধনতান্ত্রিক দুনিয়ার সাধারণ মানুষরাই পাচ্ছে। পাচ্ছে ওয়েলফেয়ার ইকনমির নামে। আবিশ্ব মানুষের কাছে মার্কসবাদের সুফলকে এইভাবেই পৌঁছিয়ে দিয়ে গিয়েছেন মহামতী লেলিন। এবং তাঁর যোগ্য সহযোদ্ধারা। সতীর্থরা।


সেই মার্কসবাদ ভুলে ভরা হোক। না হোক। সেই চর্চার অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান সময়ে আরও প্রবল ভাবেই রয়েছে। কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলা আমাদের নিজেদর মার্কসবাদ নিয়ে যাঁদের ভিতরে এখনো কোন সংশয় দানা বাঁধেনি। তাঁদের কাছে সেই মানুষটির অপরিমেয় মূল্য রয়েছে বই কি। ইতিহাস যাঁকে কার্ল মার্কস নামে পুজো করে থাকে। মার্কস তাঁর মতাদর্শ দিয়ে গিয়েছেন। তাঁর কাজ তাঁর আয়ুর সীমানায় শেষ হয়ে গিয়েছে। তাঁর সেই মতাদর্শকে বহজনে বহুভাবে আরাধনা করেছেন। লেলিনের মতো মহাপুরুষরা তাঁর মতাদর্শে সমাজ বিপ্লব ঘটিয়ে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেছেন। ধনতন্ত্রের রক্ষকরা তাঁর মতাদর্শের সাফল্যের আতঙ্কে ওয়েলফেয়ার ইকনমির প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছে। দুনিয়া জুড়ে আজও শোষিত এবং বঞ্চিত জনতার শেষ ভরসাস্থল সেই মার্কসবাদ। অন্তত যতদিন না। মার্কসবাদের বিকল্প কোন মতাদর্শের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। যে কোন মতাদর্শই স্থান কালের চেতনায় পরিমিত। তেমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। মার্কসবাদকেও সেই আলোতে বিচার করা দরকার হয়তো। পরিবর্তিত সময় বাস্তবতায়, মার্কসবাদকেও দরকারে চলমান সময়ের উপযোগী করে নিয়ে প্রয়োগ করে দেখা যেতেই পারে। তাতে কার্ল মার্কসের সম্মানহানি হয় না। তাতে আমাদের মতো মার্কস নিরক্ষর মানুষজনেরও কোন অসুবিধে হয় না। জরুরী কথা এইটুকুই। জারি থাকুক নিরন্তর মার্কসচর্চা। অন্তত যতদিন না উন্নততর এবং শক্তিশালী কোন বিকল্প মতাদর্শের সন্ধান পাচ্ছি আমরা। যতদিন আমাদেরকে সর্বগ্রাসী ধনতন্ত্রের সামনে নতজানু হয়ে পড়ে থাকতে হচ্ছে। ততদিন অন্তত আমাদের ঘরে ঘরে আমাদের নিজেদের মার্কসবাদ হলেও। চর্চাটুকু সজীব থাকুক। ভরসাটুকু অটুট থাকুক। প্রত্যয়টা দৃঢ় থাকুক।

৩০শে মে’ ২০২২

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত