ব্লগার নিধন বর্ষ ২০১৫
কি হচ্ছে বাংলাদেশে! শাহবাগ চত্বর অস্তমিত।
ইসলামের হেফাজতে চাপাতিতে শান দিচ্ছে ধার্মিক প্রজন্ম। নাস্তিক নিধনের লাইসেন্স
পেয়ে গিয়েছে চাপাতির মালিকরা। যে যত বড়ো ধার্মিক তার চাপাতি তত বেশি ধারালো। যার
চাপাতিতে যত বেশি টাটকা রক্ত লেগে, তার বেহস্তের টিকিট তত বেশি কনফার্ম্ড!
চারিদিকে ধর্ম রক্ষার উল্লাসে মাতোয়ারা ধর্মীয় ঠিকাদারা। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির প্রচ্ছন্ন ও প্রত্যক্ষ মদতে এই
যে একটি ধর্মীয় উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে দেশ জুড়ে; ‘ধর্ম
রক্ষার্থে চাপাতিই সঠিক দাওয়াই এবং শেষ ভরসা’, লক্ষ্য করার
বিষয়, দেশবাসীর এক বৃহৎ অংশের ব্যাপক সমর্থনও রয়েছে নতুন এই
উন্মাদনায়। অনেকেই স্পষ্ট বলছেন বাংলাদেশে নাস্তিকের স্থান নেই। ইসলাম সম্বন্ধে
অন্ধ আনুগত্যই ধর্মের শেষ কথা।
কিন্তু ইসলাম তো আরবের ধর্ম। ঠিক যেমন ইংরেজী
ইংল্যাণ্ড আমেরিকার মাতৃভাষা। বাঙালির সংস্কৃতির সাথে তো বিদেশী এই
দুটি ধর্ম ও ভাষার কোনো মিল নেই। কিন্তু সুদীর্ঘ হাজার বছরের পরাধীনতার
অভিশাপে প্রথমে ইসলাম ও পরে ইংরেজী বাঙালির জাতীয় জীবনে প্রধান ধর্ম ও ভাষা হয়ে
দেখা দিয়েছে শতকের পর শতক ব্যাপি পরাধীনতার চর্চায়। আজকের বাঙালি যেন ভুলেই গিয়েছে
যে, সে একটি বিদেশী ধর্ম ও একটি বিদেশী ভাষার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে গিয়েছে। যাঁরা
মনে করেন ইংরেজী ভাষা ছাড়া বাঙালির শিক্ষিত হওয়ার আর কোনো পথ নেই, ইংরেজ আমেরিকানদের আদব কায়দা নকল করার মধ্যেই আধুনিকতা; বৃটিশ ও মার্কিণ প্রেসের প্রচারিত বার্তাই কেবল অভ্রান্ত; আবিশ্ব মার্কিণ তাঁবেদারির এই শতকে পেন্টাগনের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলাই
আঁতলামো: তারাই একটি মৌলবাদী বিশ্বাসের গণ্ডীতে বেঁধে নেন নিজেকে। ও প্ররোচিত করেন
বাকিদেরকেও সেই গণ্ডীতে আবদ্ধ হয়ে পড়তে। যাঁরা
মনে করেন বাংলাদেশ শুধুমাত্র মুসলিমদের দেশ, যাঁরা মনে
করেন ইসলাম সম্বন্ধে প্রশ্ন তোলার এক্তিয়ার কোনো মানুষেরই নেই, যাঁরা মনে করেন ধর্মগ্রন্থের প্রতিটি কথাই অভ্রান্ত, ও কেবলমাত্র অন্ধঅনুগত্যে ধর্মগ্রন্থকে অনুসরণ করাই প্রকৃত মুসলমানের
দায়িত্ব ও কর্তব্য- তাঁরাও নিজেদেরকে তেমনই একটি মৌলবাদী গোঁড়ামীর শৃঙ্খলে বেঁধে
ফেলেন। আর বাকিদেরকেও সেই শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলার কাজটিকেই প্রকৃত ধার্মিকের কাজ বলে
মনে করতে থাকেন। মনে করতে করতে সেই অপকর্মটিকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন দৃঢ় ভাবে।
আর সেইটি একদিন হয়ে ওঠে তাঁর ধর্ম বিশ্বাস!
শতকের পর শতক বিদেশী শক্তির অধীনস্ত থাকতে থাকতে
বাঙালির নিজস্ব শিরদাঁড়াটিই ক্ষয়ে গিয়েছে। সে বিদেশী ধর্ম ও ভাষা আর আদব কায়দার
নকল করতে করতে হারিয়ে ফেলেছে নিজের আত্মপরিচয়টাই। তাই মুসলমান মাত্রেই ভাবে তার
রক্তে বইছে খাঁটি আরবের রক্ত! হিন্দু মাত্রেই ভাবে সে আজও বয়ে নিয়ে চলছে আর্য
রক্ত! আর ইংরাজীতে কথা বলতে পারলেই বাঙালির পরিচয় সে শিক্ষিত! আদতে কোথায় তার শিকড়
সে কথা বাঙালি আজ আর বলতে পারে না। কিন্তু একটু হলেও ইতিহাসের পাতা কটি একবার
ওলটালেইতো বোঝা যায় বাঙালির শিকড় ইসলামে নয়! বাঙালির শিকড় ইংরেজীতে নয়! বাঙালির
শিকড় নয় আর্যরক্তের গরীমাতেও! এই সহজ সত্যটাও আজকে আর স্বীকার করতে রাজী নয় কেউ।
বরং ভিনদেশী ধর্মকেই নিজের ধর্ম ও ভিনদেশি ভাষাকেই শিক্ষার মাপকাঠি ভাবতে বাঙালি
মাত্রই আজ গর্ব অনুভব করে। যে কোনো জাতির পক্ষেই এ এক চুড়ান্ত অভিশাপ! আর সেই
অভিশাপের কারণেই বাঙালি কোনোদিনের জন্যেই নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ নয়। চিরকালই
বিদেশী সংস্কৃতিকে নকল করার মধ্যেই সে শ্লাঘা বোধ করে থাকে। আর ঠিক সেই কারণেই
গীতা কোরাণ আর অকস্ফোর্ড কেম্ব্রীজের ডিকশনারীর মধ্যেই সে নিজেকে বেঁধে ফেলল আর এই
বেঁধে ফেলার বিষয়ে শুরু হল এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। কে কত বেশি ধার্মিক আর কে কত
বড়ো পণ্ডিত।
তাই বিশুদ্ধ ইংরেজী বলতে না পারলেই মূর্খ, আর
অন্ধআনুগত্যে কোরাণকে মেনে না নিলেই বিধর্মী নাস্তিক! এই তো হল অবস্থা। তাই ব্লগার
নিধনও সমর্থন পেয়ে যায় সমাজের একটা বড়ো অংশের। তাঁরা বিদেশী একটি ধর্মগ্রন্থের
প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যে অন্ধ হয়ে ভুলে যান একটি ভিনদেশী সংস্কৃতির হয়ে ওকালতি
করতে গিয়ে তাঁরা সমর্থন করে ফেলেন তাঁরই স্বজাতি কোন একজনের নৃশংস চাপাতির
আস্ফালনে তাঁরই স্বজাতি আর একজনের মর্মান্তিক মৃত্যুকেই। এই যে আত্মঘাতী মানসিকতা,
হ্যাঁ দুঃখের বিষয় হলেও; এইটিই বাঙালির মৌলিক
ধর্ম! ভিনদেশী সংস্কৃতির জন্যে, ভিনদেশী ধর্মের জন্যে বাঙালি
তাঁর নিজের ভাইকেও খুন করতে দুবার ভাবে না। ঠিক যেমন বিদেশী শাসকের স্বার্থ রক্ষার
জন্যে নিজের মাতৃভুমিকেও দুটুকরো করতে সেদিন পিছপা হন নি তাবড় তাবড় বঙ্গীয়
নেতৃবৃন্দ! এটাই তো বাঙালির আসল ধর্ম!
ইসলাম শুধুমাত্র একটি আধ্যাত্মিক ধর্ম নয়। ইসলাম
মূলত একটি সমাজ ব্যবস্থা। আবার সে যুগে আরবের সমাজ বাস্তবতায় ইসলামের ধর্মগ্রন্থ
কোরাণ মূলত একটি রাষ্ট্রিক সংবিধানও বটে।
আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংবিধানের যে
গুরুত্ব ও বাধ্যবাধকতা,
বস্তুতু প্রায় দেড় হাজার বছর আগে থেকে মধ্য প্রাচ্যে কোরাণেরও সেই
ভুমিকা। তখন কোরাণের মূল গুরুত্বই ছিল তার সাংবিধানিক ভূমিকাতেই। কোরাণের
নির্দেশেই পরিচালিত হতো সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সেই সব শতাব্দীর রাজনৈতিক পরিসরে
সেটাই ছিল একমাত্র বিকল্প! তারপর ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে আবিশ্ব আধুনিক
যুগ প্রবাহের সৃষ্টিতে, শতাব্দী ব্যাপি নানান পরীক্ষা
নিরীক্ষার মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্রিয় ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশের নিজস্ব মৌলিক
সংবিধানের যৌক্তিকতা স্বীকৃত হওয়ায় কোরাণ রয়ে গেল মূলত ধর্মগ্রন্থ হিসেবেই। কিন্তু
কোরাণের এই সাংবিধানিক ভূমিকা ও তার গুরুত্বের কথা ভুলে গেলে ভুল রয়ে যাবে আমাদের
চিন্তা ভাবনার গোড়াতেই। তাই ঐতিহাসিক ভাবেই যেহেতু একসময়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রিক
কাঠামোয় ও সমাজ বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নির্দেশিকা হিসেবে কোরাণের মূল
ভুমিকা, সেই কারণেই এ কথা সহজেই বোঝা যায় যে এর সাথে আমাদের
বাংলার সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক কোনো সংযোগ নেই। আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রিক পরিসরে
কোরাণের মূল পরিচয় বিদেশী ধর্মগ্রন্থ হিসেবেই। সেই গ্রন্থের সাথে ঐতিহাসিক ভাবেই
বাংলার সমাজ ও সংসারের কোনোই সাযুয্য নেই। ছিলও না। আজকে যদি মার্কীণ সংবিধানকেই
বাংলার সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভুমিকায় গ্রহণ করা হয়, তাহলে
বিষয়টি যেমন বিদেশী আধিপত্যবাদ বলে মেনে নিতে হবে, বাংলার
সমাজ সংসারে কোরাণের ভূমিকাও অনেকটা সেইরকম। অনেকটা এই কারণে যে, কোরাণের সাংবিধানিক ভুমিকার বাইরেও আধ্যাত্মিক একটি বড়ো পরিসর আছে। যে
পরিসরে বিশ্বের যে কোন প্রান্তের মানুষই মানসিক বিশ্রাম লাভ করতে পারেন। এইখানেই
কোরাণের বিশেষ বৈশিষ্ট। কিন্তু কোরাণের যে সাংবিধানিক গুরুত্ব, তার সাথে বাংলার জল হওয়া, ভাষা ও সংস্কৃতির, তার ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের কোনোই সংযোগ নাই। আর নেই বলেই প্রায় হাজার বছর ব্যাপি এদেশে
ইসলামের প্রসার ঘটলেও বঙ্গসংস্কৃতি ও দেশাচারের আদলে কোরাণের একটি অক্ষরও
পরিবর্তিত হয়নি বা প্রভাবিত হয়নি আরবের ইসলাম ধর্ম! কারণ ইসলাম আরব তথা মধ্য
প্রচ্যের নিজস্ব সংস্কৃতি জাত একটি ধর্ম। যে সংস্কৃতি বাঙালির কাছে সম্পূর্ণ
ভিনদেশী সংস্কৃতি। আর ঠিক সেই কারণেই ইসলাম বাঙালির কাছে একটি বিদেশী ধর্মের বেশি
কিছু নয়। ঠিক যেমন বিদেশী ইংরেজী নয় আমাদের মাতৃভাষা। আমরা যে যত বড়োই ইংরেজীতে
পণ্ডিত হই না কেন, ইংরেজি কোনোদিনই আমাদের মাতৃভাষা হয়ে
উঠবেনা। আমরাও যে যত বড়োই মুসলিম হই না কেন, ইসলামও আমাদের
কাছে চিরকালই মধ্যপ্রাচ্যের ধর্ম হয়েই রইবে। পরিচালিত হবে মক্কা মদীনা থেকে। ঢাকা
কলকাতা থেকে নয়!
আর তাই আজকে বাঙালিকে ভাবতে হবে বিদেশী একটি
ভাষার জন্যে, বিদেশী একটি ধর্মের জন্য নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে নিজেদের
মধ্যে এই হানাহানির পথই ধর্মের প্রকৃত পথ কিনা! শিক্ষার প্রকৃত পথ কিনা! ইসলামের
প্রতি অন্ধ আনুগত্য না থাকলেই সে কাফের বা নাস্তিক, ইংরেজীতে
দক্ষ না হলেই সে মূর্খ ও অশিক্ষিত, এই যে পরাধীন মানসিকতা,
যা প্রকৃত পক্ষে এক ধরণের জাতিগত অসুস্থতা: এই নিদারুণ শৃঙ্খল থেকে
আপামর জাতি কবে বেড়িয়ে আসবে! ভাবতে হবে বাঙালিকেই। নয়ত ব্লগার নিধন করে করেও
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়েও বাঙালি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। তাকে বুঝতে হবে
ধর্মীয় ভাবাবেগে অন্ধ হয়ে; আন্তর্জাতিক রাজনীতির যে চরম
ষড়যন্ত্রের ফাঁদে সে পা দিতে চলেছে, তার পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর
সে কথা যখন সে বুঝতে পারবে, তখন দেখবে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ
নেই হয়ে গিয়েছে বাংলাস্তান!
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

