পশ্চিমবঙ্গ একটি ভাগাড়ের নাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পশ্চিমবঙ্গ একটি ভাগাড়ের নাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

পশ্চিমবঙ্গ একটি ভাগাড়ের নাম



পশ্চিমবঙ্গ একটি ভাগাড়ের নাম

ভাগাড় আর চিল শকুনের অভয়ারণ্য নয়। ভাগাড়ের ভাগ নিয়ে টানাটানি মনুষ্যকুলেরও। বন্ধুবান্ধব আত্মীয় পরিজন নিয়ে শহরের নামী দামী রেঁস্তরায় খেতে গিয়েছেন। খাওয়া দাওয়ার শেষে পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বাড়ি ফিরে নিশ্চিন্তে ঘুম। কিন্তু জানতেও পারেন নি, উদরস্থ করে ফেলেছেন বজবজের ভাগাড়ের মরা পশুর পচা মাংস। না শুধুই বজবজের ভাগাড়ও নয়, কলকতা শহরতলীর কোন ভাগাড়ই বাদ নাই ভাগাড়ের মাংস সাপ্লাইয়ের তালিকা থেকে। পুরসভার কর্মী থেকে শুরু করে নামীদামী রেঁস্তরার মালিক, হিমঘরের মালিক থেকে সাপ্লায়ার, মাংসের দোকানদার কে নেই এই চক্রে? কয়েকশ পরিবারের উপার্জন থেকে রোজকার জীবনধারণই নির্ভর করছে শুধু এই ভাগাড়ের মরা পশুর মাংসের উপরেই। বেশ একটা ভাগাড়শিল্পই গড়ে উঠেছে শহর কলকাতাকে কেন্দ্র করে। ফলে এটা ঠিক কলকাতাবাসীর অনেকেই এখন কুকুর বিড়ালের মাংসও হজম করে ফেলছেন চোখবুঁজে।

সত্যিই একটা সরকার ও তার প্রশাসন কতটা চোখবুঁজে থাকলে এই রকম ভাগাড়শিল্প গড়ে উঠতে পারে একটি রাজ্যে? আমি আপনি শহরের চাকচিক্যে নিশ্চিন্তে পকেটের টাকা খসিয়ে যে মাংস খাচ্ছি ও খাওয়াচ্ছি, সেই মাংসের উৎপত্তি যে শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন ভাগাড়, সে কথা জানার কথা তো আমার আপনার নয়। এত বিস্তৃত একটা ব্যাবসা তো আর প্রশাসনের চোখের আড়ালে দিনে দিনে এমন রমরমিয়ে ফুলেফেঁপে উঠতে পারে না। এবং মনে রাখতে হবে এটা একুশ শতকের ডিজিটাল যুগ। যেখানে প্রতিটি মানুষের উপর অদৃশ্য নজরদারীর সকল রকমের বন্দোবস্ত পাকা। সেখানে এইভাবে বিভিন্ন মড়া পশুর পচা মাংসের কারবার কিন্তু একদিন হঠাৎ গজিয়ে উঠতে পারে না। এরও নিশ্চয় একটি ইতিহাস রয়েছে। হ্যাঁ পরিবর্তনপন্থী থেকে পরিবর্তনের সুফলভোগকারীরা হয়তো সমস্বরে গলা মেলাবেন বিগত চৌত্রিশ বছরের অপশাসনের ফিরিস্তি নিয়েই। ভালো। কিন্তু প্রায় সাত বছর রাজত্বকালেও নতুন প্রশাসনের নজরেই পড়লো না এমন একটি বীভৎস এবং সাংঘাতিক কারবারের? এও যদি মেনে নিতে হয় অম্লান বদনে, তবে তো বলতেই হবে এটা সরকার ও প্রশাসনের অপদার্থতারই জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত।

সরকার ও প্রশাসনের অন্যতম বড়ো কাজ সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে সুদক্ষ নজরদারীর ব্যবস্থা করা। যে যে বিভাগের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে এই নজরদারীর ব্যবস্থাগুলি রয়েছে, সেই সেই বিভাগগুলি যদি ঠিকঠাক কাজই করবে, তবে তার মধ্যে দিয়ে বছরের পর বছর এমন জঘন্যতম অপকর্ম ঘটতে পারে কি করে? সত্যই কি সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা যায় না? এরই সাথে আরও একটি বিষয় উঠে আসে। আজকের পশ্চিমবঙ্গে যেখানে তোলাবাজীর শিকার না হয়ে কোন ধরণেরই কাজ কারবার চালানো যায় না, সেখানে এই ধরণের কাজকারবার যত বেশি চলবে, তোলাবাজদেরও যে তত বেশি রমরমা হবে সে কথা বলাই বাহুল্য। ফলে সরকার ও প্রশাসনের নজর এড়িয়েও যে এই কাজ কারবার দিনের পর দিন চলতে পারে না, সেটা কিন্তু সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়। অর্থাৎ সকল রকম নৈতিকতা সততাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই এই সব কাজ কারবার চলছে চলবে এই রাজ্যে।

না শুধু সরকার বা প্রশাসনই যে চোখ বুঁজে আছে, ও থাকবে তাও নয়। আমরা সাধারণ নাগরিকরাও কি চোখবুঁজে নেই? যত রকমের অন্যায় অবিচার শঠতা সম্ভব চোখের সামনে ঘটতে দেখেও কি আমরা ভদ্রলোকের মতো পাশ কাটিয়ে চলে যাই না? সত্যিই ভদ্রলোকের অর্থই হয়ে গিয়েছে চুপচাপ সইয়ে নেওয়া। বিনা প্রতিবাদে সবকিছু মেনে নেওয়ার নামই যেন ভদ্রতা। আর সেই ভদ্রতার খাতিরেই আমাদেরকে চোখবুঁজেই ভোটের লাইনেও দাঁড়াতে হয়। দাঁড়াই। আর দাঁড়াবোও। একটা জাতি যখন এমনই এতটাই ভদ্র হয়ে ওঠে, তখন সেই জাতির কপালে ভাগাড়ের কুকুর বিড়ালের পচা মাংস জুটবে না তো কার কপালে জুটবে? ভদ্রলোকেদের এই ভদ্রতাই শঠ আর দূর্বৃত্তদের পক্ষে পোয়াবারোর বিষয়। প্রতিটি অন্যায় অবিচার মুখ বুঁজে সইয়ে নিতে নিতে আজ এই অবস্থায় পৌঁছিয়ে গিয়েছে গোটা সমাজ। সমাজ ব্যবস্থা। শঠ আর দূর্বৃত্তদের দুর্নীতিই হয়ে উঠেছে আজকের রাজনীতির চালচিত্র। কারণ কোন না কোন ধরণের রাজনৈতিক আশ্রয় ছাড়া শঠতা আর দূর্বৃত্তায়নের এমন বাড়বাড়ন্ত ঘটতে পারে না। কখনোই নয়। ফলে এই শট ও দূর্বৃত্তরাই নিয়ন্ত্রণ করছে আজকের সমাজ ও রাজনীতিকে। করছে বলেই এভাবে ভাগাড়ের মড়া পশুর পচা মাংস খাওতে পারছে আমাদের। তারপরেও আমরা চোখবুঁজে দাঁড়িয়ে পড়বো ভোটের লাইনে সুবোধ ছাত্রের মতো। এতটাই ভদ্র হয়ে উঠেছি আমরা। সাধারণ নাগরিকবৃন্দ।

আজকে যখন সারা বিশ্বের সামনে কলকতা তথা রাজ্যের এই ভাগাড়চিত্র সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো, তখন একজন বাঙালি হিসাবে আবিশ্ব মানুষের কাছে আমাদের আর মাথা তুলে দাঁড়ানোর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকল কি? আমরা যারা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে চোখ বুঁজে বিশ্বাস করেছিলাম কলকাতা এবার পরিবর্তনের ঢক্কা নিনাদে নিশ্চয় লণ্ডন হয়ে উঠবে, তখন আমাদের নিয়তি হয়তো মুচকি হেসে ছিলেন আমাদের বিদ্যাবুদ্ধির বহর টহর দেখে। এরপরেও কিন্তু আমরা রাতের বাতি নিভিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। এটাই আমাদের শক্তির দৃষ্টান্ত। প্রলয়ের সময়েও বাঙালি অবিচল থাকতে পারে। তার নিশ্চিন্ত ঘুমের কোন ব্যাঘাত ঘটে না। আর ঘটবেই বা কি করে? আমরা যে পরস্পরকে দোষারোপ করেই ক্ষান্ত। কেউ বলবো বিগত চৌত্রিশ বছরে রাজ্যটার কি অবস্থা করে গিয়েছে এঁরা দেখুন! কেউ বলবো এই তো পরিবর্তনের নমুনা। আর কেউ তাকিয়ে থাকবো নতুন কোন দলের দিকে। না কোন বিষয়েই আমাদের কোন দায়ও নাই দায়িত্বও নাই। কারণ আমি আপনি অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আমরা যখন কোন পতাকা ঘাড়ে করে পথ হাঁটি না তখন এইগুলি সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলির দেখার বিষয়। আমাদের নয়। এটাই বাঙালিত্ব।

তাই বাংলায় কোন সমাজিক আন্দোলন হয় না। হবে না। এখানে সবটাই রাজনৈতিক। রাজনৈতিক দলের নির্দেশ মোতাবেক। আর সেই রাজনীতির পরিসর বাদ দিয়ে আমার আপনার কোন সামাজিক দায়ও নাই, দায়িত্বও নাই, কর্তব্যও নাই কিছু। এইভাবেই আমরা ভাবি। ভেবে থাকি। এই বিষয়ে বাংলায় বাঙালির কোন শ্রেণীভেদও নাই। সব শ্রেণীর মানুষই এই বিষয়ে এক। একই মনোবৃত্তির শরিক। আর তাই শঠ আর দূর্বৃত্ত, সুযোগসন্ধানী আর লোভীদের পোয়াবারোর সময় এখন। আমরা শুধু দেখবো আমার বাড়ির কারুর যেন ক্ষতি না হয় কোন। একে ধরে তাকে ধরে যদি আরও একটু গুছিয়ে নেওয়া যায় সবকিছু, তাহলেই আমাদের বিপ্লব শেষ।

ফলে আমাদের প্লেটে যে ভাগাড়ের কুকুর বিড়াল মরে পড়ে থাকবে সে আর বিচিত্র কি? তারপর ডাক্তার প্রেসক্রিপশানে লিখে দেবে অজানা জ্বর। নার্সিং হোম থেকে হাসপাতাল। ইনসিওয়েন্স স্কিম থেকে ঘটি বাটি। দক্ষিণের ট্রেনে তৎকাল কেটে ভেলোর কিংবা চেন্নাই। তারপর বাড়ী ফিরে একবার দক্ষিণেশ্বর কিংবা তারাপীঠ। এটাই দুর্নীতি আর সুবিধাবাদ স্বার্থপরতা আর আখেড় গোছানো জীবনদর্শনের পীঠস্থান পশ্চিবঙ্গের ভাঙা বাংলা। যেখানে চিল শকুনও উপোষী থেকে দেখতে থাকে আমাদেরকে তাদেরই খাদ্য খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুড় তুলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে।

একটা গোটা রাজ্যই যেন আস্ত একটা ভাগাড়। আমাদের সমস্ত নৈতিকতা, সততা, দায় দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ, স্বাদেশিকতা, দেশপ্রেম সব মরে পড়ে আছে এই ভাগাড়ে। আর সব শঠ দূর্বৃত্তদের ব্যবসা বাণিজ্য আর রাজনীতি সেই ভাগাড়কে ঘিরেই পুষ্ট হয়ে উঠছে দিনে দিনে। বছর ভর। তাদের সেই কাজকারবার যাতে ঠিকঠাক চলতে পারে, তারই জন্যে ভোটের লাইনে দাঁড়াতে হয়, হবে আমাদের নিয়ম করে। গণতন্ত্রের জয়ঢাক বাজবে। জনগণ তাল দেবে তালে তালে। দূর থেকে বিলুপ্তপ্রায় চিল শকুন নতুন দিনের গণতান্ত্রিক চিলে শকুনদের বাজিমাত দেখতে দেখতে মিলিয়ে যাবে একদিন নিঃশব্দে। পড়ে থাকবে কিছু বাজে শব্দের কঙ্কাল শুধু। আমার আপনার। এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বল মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি……….

কপিটাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত