নো সমালোচনা অনলি প্রশসংসা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নো সমালোচনা অনলি প্রশসংসা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

নো সমালোচনা অনলি প্রশসংসা


নো সমালোচনা অনলি প্রশসংসা

প্রতিদিনই প্রায় আমরা কবিতা লিখছি। বন্ধুদের পড়াচ্ছি। খুব একটা ভালোমন্দ বিচার করার বিষয়ে যে আমরা সচেতন, তেমনটা ঠিক বলা যায় না। বরং নিজের লেখার ভুয়সী প্রশংসা শুনতেই আমাদের অপেক্ষা থাকে বেশি। বিশেষ করে নিজের কবিতার বিরুদ্ধ সমালোচনাকে আমরা প্রায় সকলেই কম বেশি এড়িয়ে চলতে পচ্ছন্দ করি। আর সেই কথা সকলেই জানি বলে কেউই প্রায় বন্ধু বান্ধবীর কবিতার বস্তুনিষ্ঠ সাহিত্যিক সমালোচনায় অগ্রসর হই না। হই না বলেই হয়তো বন্ধুবৃত্তের বন্ধন অটুট থাকে। তাই নিজের লেখা কবিতার প্রশংসায় আমরা সকলেই আহ্লাদে আটখানা হই। রাতের ঘুমটাও বেশ জম্পেশ হয় তাই। এইভাবেই আমাদের কাব্যচর্চার পরিসর চক্রবৎ ঘুরতে থাকে। থাকে এইসময়ের যুগধর্মের ভরকেন্দ্রকে কেন্দ্র করেই।

অর্থাৎ এই সময়ের যুগধর্মই হলো বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা থেকে দূরবর্তী থেকে পছন্দের মানুষের যাবতীয় কর্মকেই দুইহাত তুলে অভিনন্দিত করা। এই অভিনন্দিত করতে থাকার পরিসরেই বন্ধুবৃত্ত অটুট থাকার চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে। এবং আমরা প্রায় প্রত্যেকেই এই যুগধর্মের রীতিনীতিকে আত্মস্থ করে ফেলেছি। অর্থাৎ নিজের নিজের ব্যক্তি পরিসরে আমরা প্রত্যেকেই ছোটখাটো এক একটি হিটলার। আপনি আমার প্রশংসা করুন। আমাকে অভিনন্দিত করুন। তাহলেই আপনি মানুষ ভালো। কিন্তু আপনি আমাকে অভিনন্দিত না করে আমার বিরুদ্ধ সমালোচনা করলেই আপনি কিন্তু মানুষ সুবিধার নন। নিশ্চয়ই আপনার গূঢ়তর কোন খারাপ অভিসন্ধি আছে। না হলে বাকি সকলেই যখন আমাকে দুই হাত তুলে অভিনন্দিত করছে, সে আমি কবিতাই লিখি, আর নির্বাচনেই জিতি; আপনি খামোকা আমার কবিতা লেখা বা নির্বাচনে জেতার পদ্ধতির রকমসকম নিয়ে সমালোচনা করতে শুরু করবেন কেন? হয় আপনি নিজে কবিতা লিখে দেখান নয়তো নির্বাচনে জিতে প্রমাণ করুণ আপনার জনপ্রিয়তা। অন্যের সফল্যে ঈর্ষান্বিত হলেই এইরকম বিরুদ্ধ সমালোচনা করার মনোবৃত্তি জায়মান হয়। হ্যাঁ এইটিই এই সময়ের যুগধর্ম। কবি থেকে রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি থেকে বুদ্ধিজীবী, পাঠক থেকে জনগণ সকলেরই এই যুগধর্মের পরিসরেই চলাচল।

না, কোন রকম সমালোচনা নয়। হয় অভিনন্দিত করে প্রশংসায় ভরিয়ে দিন, না হলে চুপচাপ পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে চলুন। তাহলেই সমাজ সংসারে সাহিত্য বাজারে শান্তি বিরাজ করবে। নয়তো অশান্তির আগুনে পুড়তে হবে যদি আপনি কোনভাবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন। ঠিক এই কারণেই কেউই আমরা প্রায় সংখ্যালঘু হয়ে পড়তে রাজি নই। নই বলেই সকলেই যেদিকে গড়ায়, যেভাবে গড়ায়, আমরাও গড়াতে থাকি সেইভাবেই সেইদিকেই।

আমরা যারা কবিতা নিয়ে সাহিত্য নিয়ে দুইবেলা ওঠবোস করি, খুব স্বাভাবিক ভাবেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আবহাওয়া থেকে নিজেদের দূরবর্তী রেখে নিজেদের একটি অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট থাকি সর্বদা। এটা যেন অনেকটা সেই ধোপদুরস্ত বাবুশ্রেণীর মানসিকতার মতো। সেজেগুজে পথচলার সময়ে নোংরা আবর্জনাকে সভয়ে এড়িয়ে চলার প্রয়াস। পাছে নিজের পোশাকে ময়লা লেগে যায়। আমরাও তাই দুই বেলা কাব্যসাহিত্যচর্চার পরিসরে ভুলেও রাজনীতির সমসাময়িক ব্যাপারে নাক গলাই না। প্রতিদিন পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অব্যাহত মৃত্যমিছিলও আমাদের দৈনন্দিন কাব্যচর্চার বিন্দুমাত্র বিঘ্ন হয় না। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, আমাদের কাব্যচর্চার ণত্বষত্বে সমসাময়িক উত্তেজনার বিন্দুমাত্র আঁচও লাগে না। আমাদের আজকের লেখা কবিতা পড়ে কারুর বোঝারও সাধ্য হবে না, ঠিক কিরকম সমাজবাস্তবতার মধ্যে দিয়ে চলেছে আমাদের আজকের সময়। এইখানেই আমাদের সাহিত্যচর্চার বিশেষত্ব।

এখন এই নিয়েই যদি কেউ আমাদের কাব্যচর্চার ধরণ উল্লেখ করে সমালোচনায় প্রবৃত্ত হয়, স্বভাবতঃই গোঁসা হবে আমাদের। আমি কি নিয়ে কবিতা লিখব, কেমন ভাবে লিখব সেটি নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। তাই নিয়ে সমালোচনা তো বরদাস্ত করবো না। কেন আমার কবিতায় সমসাময়িক সমাজবাস্তবতার চিত্র অনুপস্থিত সেই কৈফিয়ত দিতেই বা যাবো কেন? কবিতা লিখি বলে তো আর দাসখৎ লিখি দিই নি কাউকে, যে আমার কবিতা আমি কিভাবে লিখবো সেটিও সমালোচনার বিষয় হয়ে উঠবে অন্যের কাছে। রাজনৈতিক হানাহানির মৃত্যমিছিলে চোখের জল ফেলবো কি ফেলবো না, সেটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। সেই চোখের জল আমার কবিতার শব্দে ছলকে পড়বে কি পড়বে না, সেটিও আমার কবিসত্ত্বার স্বাধীনতার বিষয়। কিন্তু তাই নিয়ে এই সময়ের কবিতা জীবন থেকে দূরবর্তী বলে কেউ যদি সমালোচনায় অগ্রসর হয়, তবে নিশ্চয়ই সহ্য করবো না।

হ্যাঁ এইটিই এইসময়ের যুগধর্ম। আমাদের প্রতিদিনের কবিতাচর্চাও সেই যুগধর্মেরই প্রতিফলনতাই সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিই হোক, আর তোষণবাদী রাজনীতিই হোক। সুবিধাবাদী কার্যক্রমই হোক, আর পলায়নবাদী মানসিকতাই হোক এই যুগধর্মের দৌলতে সমালোচনা হজম করতে কেউই রাজি নয়। সে আমরা কবিই হই, কিংবা রাজনীতিবিদ হই। প্রত্যেকেই ঠিক হিটলারের মতোই সমালোচনা শুনতে রাজি নই। শুধু প্রশংসা আর অভিনন্দন, তোষামদ আর চাটুকারিতাকেই শুধু গ্রহণ করবো। অন্য কিছু নয়।

১০ই আষাঢ়’ ১৪২৬

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত