প্রভু প্রজা সিনড্রোম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রভু প্রজা সিনড্রোম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

প্রভু প্রজা সিনড্রোম

 

রাজনীতির ঝুলিতে প্রায় পাঁচ শতাংশ ভোট নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট তথা সিপিআইএম রাজ্য রাজনীতিতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে। সদ্য গঠিত বিধানসভায় প্রবাশাধিকারও হারিয়ে ফেলেছে। অনেকেই এই ঘটনায় উল্লসিত। নিশ্চিন্ত। যাক আপদ বিদায় হয়েছে। বিশেষত বিশ্বজুড়ে নিও লিবারেলিজম সমর্থকবৃন্দ। এবং  জাত পাত ধর্ম সম্প্রদায়ের বিভাজনকামী শক্তি’র অক্ষ। এছাড়াও চৌঁত্রিশ বছরের শাসনে যারা সিপিএমের দাদাগিরিতে ক্ষতিগ্রস্ত ও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তারাও। এ যেন এক মধুরেণ সমাপায়েৎ। রাজ্যের সদ্য গঠিত বিধানসভা সিপিএম মুক্ত আজ। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বজুড়ে সাম্যবাদের পতনের পর ওয়েস্টার্ন মিডিয়া জুড়ে সাম্যবাদ বিরোধী লাগাতার প্রচার ও আবিশ্ব নিও লিবারেলিজম অধিপত্যের নিরঙ্কুশ বিস্তারে বাংলার অনেকেই এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন। ভারতবর্ষে গত সাত বছরে হিন্দুত্বের উত্থান, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে হানাহানি ও দাঙ্গার রামরাজত্যের প্রতিষ্ঠায় আশান্বিত হয়ে অনেকেই রাজ্যে বাম রাজনীতির শিকড় সুদ্ধ উৎপাটনের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের স্বপ্নের সুনার বাঙ্গালেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবৃক্ষ রোপণে তারা আজ দারুণ ভাবে সফল। রাজ্য বিধানসভায় সম্পূর্ণ প্রান্তিক এবং অপাংতেয় অবস্থান থেকে তারাই বর্তমানে একমাত্র বিরোধী শক্তি হিসাবে উঠে এসেছেন। মাত্র পাঁচ বছরে ১০ শতাংশ ভোট ও তিনটি আসন থেকে, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ৩৮.১৩% ভোট ও সাতাত্তরটি আসন দখল করা প্রায় এক সামাজিক বিপ্লব বলা যেতে পারে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও দাঙ্গার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকা একটি রাজ্যে এইরকম দ্রুতবেগে উত্থান সত্যিই ঈর্ষনীয় সন্দেহ নাই। অর্থাৎ এই দুটি ঘটনা, দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান এবং সাম্যবাদী বামপন্থী রাজনীতির প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসা একই ঘটনার দুটি আলাদা পিঠ মাত্র।


অনেকেই বিশ্বাস করছেন ২০১৬ সালের পর থেকে ক্ষয়িষ্ণু বাম ভোটের একটা বড়ো অংশই দক্ষিনপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির ঝুলিতে গিয়ে জমা হতে থেকেছে। এই অংশ মূলত ২০১১ সালের পরিবর্তন ও তার পরবর্তী রাজ্যরাজনীতিতে বামদলগুলির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে মূলত আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির আশ্রয়ে পা বাড়ায়। যেহেতু ২০১১ সালের নির্বাচনী ভরাডুবির পর প্রায় তিনদশকের রাজ্যপাট হারিয়ে বামদলগুলি রাজ্য রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভুমিকা গ্রহণে অস্বীকৃত হয়, ফলে স্বভাবতঃই সেই ফাঁকা শূন্যস্থান পুরণের সুবর্ণ সুযোগ নিতেই এগিয়ে আসে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিটি। তাদের হাতের সেই তুরপের তাস, সাম্প্রদায়িক বিভাজন বিদ্বেষ বিভেদের রাজনীতি নিয়ে। যার এক হাতে ধরা থাকে হিন্দুত্বের পতাকা। আর অন্য হাত রঞ্জিত থাকে দাঙ্গার রক্তে।


সাড়ে তিনদশক ক্ষমতার অক্ষে দাপিয়ে বেড়াতে বেড়াতে, বাম দলগুলি ক্রমাগত জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে। ফলে জনগণের স্বার্থরক্ষায় গণআন্দোলনের যে রাজনৈতিক পরিসর। সেই পরিসরটি তারা সজ্ঞানেই হাতছাড়া করে ফেলে। কারণ ক্ষমতায় থাকতে থাকতে যে ঔদ্ধত্ব জন্মায়, সেই ঔদ্ধত্বকে যদি ঠিক মতো নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে স্বভাবতঃই জনগণকে কেবল মাত্র বুথের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া আমাদের ভোটার হিসাবেই ভাবা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। প্রতিবছর জনগণকে সেই বুথের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া আমাদের ভোটর হিসাবে ধরে রাখার অংক কষা ছাড়া সাড়ে তিন দশক জুড়ে বাম দলগুলির আর কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল না। ঠিক এই কারণেই ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ফলে তারা সেই ঔদ্ধত্যেরই শিকার হয়ে নতুন করে জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা ভাবতেই পারেনি। তাদের আত্মমর্যাদায় লেগেছিল বিষয়টা। সাড়ে তিন দশক ক্ষমতায় থাকার ফলে যে প্রভু প্রজা সিনড্রোমের শিকার হওয়ার একটা ঝুঁকি থাকে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাম‌ফ্রন্ট তথা সিপিআইএম দলটির ক্ষেত্রে ঠিক সেইটিই ঘটেছিল। তারা নিজেদেরকে প্রভুর জাত ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল। ক্ষমতা হারিয়ে সেই প্রভু কি করে কোন মুখে তারই ভুতপূর্ব প্রজার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে? এও কি হয়? হতে পারে? না, পারে না বলেই হয়ও নি। ঠিক সেই কারণেই ২০১৩ সালেই মাত্র দুই বছরের ভিতরেই যখন সারদা কাণ্ডে মা মাটি মানুষ সরকারের মুখোশ খুলে গেল। সেই রকম একটি চরম দুর্যোগের সময়েও মাত্র দুই বছর ক্ষমতা হারানো বামফ্রন্ট তথা সিপিআইএম দলটির পক্ষে জনতার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো সম্ভবই হলো না। কারণ সেই প্রভু ও প্রজার সিনড্রোম থেকে তারা তখনো বার হতেই পারে নি। মাঠে ময়দানে নেমে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে জনতার স্বার্থে সরকার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে গেলে আগে জনতাকে আপন বলে অনুভব করার শক্তি অর্জন করতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতার প্রাসাদে থেকে সেই শক্তি অর্জনের আর উপায় থাকে না নতুন করে। জনতাকে আর তখন জনতা বলে দেখার চোখ থাকে না। প্রজা বলেই মনে হতে থাকে। অভ্যাস জিনিসটি এমনই মারাত্মক এক বিষয়। একবার কোন একটি বিষয়ে বিশেষ ভাবে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, সহজে আর সেই অভ্যাস থেকে বেড়িয়ে আসা যায় না।


জনগণের চুড়ান্ত দুর্যোগের সময়েও জনতা যদি বিরোধী আসনে বসে থাকা কোন রাজনৈতিক শক্তিকে বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরে নিজের পাশে না পায়, তাহলে সময় ও সুযোগ পেলেই জনতা সেই বিশেষ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে রাজনীতি থেকেই উৎখাত করে দিতে পারে দিনে দিনে। উল্টো দিকে শক্তিশালী একটা বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অভাবে রাজনৈতিক পরিসরে একটা ফাঁকা শূন্যস্থানের সৃস্টি হতে বাধ্য। ক্ষমতাসীন শক্তি সেই সুযোগে ক্ষমতার মদমত্ততায় ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে। কিন্তু কোন শূন্যস্থানই চিরস্থায়ী নয়। সেই শূন্যস্থানে বেনোজল ঢোকার মতোই দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তিও যদি ঢুকে পড়ে জনতার দিকে হাতছানি দিতে শুরু করে। জনতা সেই হাতছানিতেই ভুলতে চাইবে। এটাই স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। আমাদের এই রাজ্যে বিগত এক দশকে এটাই ঘটে গিয়েছে।


দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে যে প্রভুত্বের প্রকৃতি গ্রাস করে ফেলে, সেই প্রকৃতিই আর পথে নেমে গণআন্দোলন সংগঠিত করার প্রবৃত্তি শক্তি এমনকি সাহসও যোগায় না। এর ফল কিন্তু মারাত্মক। বিগত এক দশকে বাম দলগুলি সহ সিপিআইএম দলের নেতানেত্রীরা এই রোগের স্বীকার হয়ে জনতার পাশে গিয়ে গণআন্দোলন সংঘটিত করার বদলে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার খেলায় মেতেছেন। তারা আশা করেছেন ক্ষমতাসীন দলকে গদিচ্যুত করে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি একবার ক্ষমতা দখল করলে জনতা হাড়ে হাড়ে টের পাবে কত ধানে কত চাল। এই সেই প্রভু ও প্রজার সিনড্রোম। প্রজা যখন সাড়ে তিনদশকের প্রভুকে ক্ষমতাচ্যুত করে ছেড়েছে। তখন প্রজারও টের পাওয়ার দরকার আছে বই কি। কে মন্দ, কে মন্দতর। আর কে মন্দের ভালো। এই যে এক মনস্তাত্বিক অবস্থান। রাজ্যের বামশক্তি এই অবস্থান থেকে একদশক সময়ে আর বেড়োতে পারে নি। ফলে বিগত নির্বাচনগুলির সময়ে তাদের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে এই মনস্তত্ব অনুসারেই। এই মনস্তত্বেই ২০১৯ এর লোকসভায় সম্ভবত উপর মহলের নির্দেশেই মুখ্যমন্ত্রীর বিয়াল্লিশে বিয়াল্লিশের আশা চুরমার করতেই নিজের নাক কাটার বন্দোবস্ত করেছিল বাম দলগুলি। তারা ঢেলে ভোট দিয়েছিল সেই দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই। যারা বাম আমলে রাজ্য রাজনীতিতে কোনদিন কল্কে পায় নি। ফলে ফলেছিল হাতেনাতে। আঠারোটি আসন নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল সেই শক্তি। মুখ্যমন্ত্রীর বিয়াল্লিশে বিয়ল্লিশের আশায় জন ঢেলে দিতে পেরে বাম শক্তি সেদিন নিশ্চয় আহ্লাদে আটখানা হয়ে রাজ্যে তাদের ভোট শতাংশ সাতাশ থেকে সাতে নেমে যাওয়াতেও কোন কষ্ট অনুভব করে নি। আজ সেই শতাংশ পাঁচে নেমে এসে তাদেরকে বিধানসভা থেকেই বহিষ্কার করে দিয়েছে। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে গিয়ে এই তো তাদের পরিণতি।


ফলে তাদের কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার চেষ্টা এবারে সফল হলো না। ভোট পর্বে হওয়ায় ভাসছিল। একুশে রাম ছাব্বিশে বাম। বামেরা টের পেয়েছিল। সরাসরি মা মাটি মানুষের সরকারকে ফেলার মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা তাদের আর নেই। দলগুলির অনেক রথী মহারথীরাই পারিষদ সহ হয় তৃণমূলে নয় বিজেপিতে নাম লিখিয়ে বসে রয়েছে। ফলে প্রায় ঢাল নেই তরোয়াল নেই অবস্থা। সেই অবস্থায় সম্মুখ সমরে এগোনোর পথ বন্ধ। তাই তাদের স্ট্র্যাটেজি ছিল বিজেপি বিরুদ্ধ অবস্থান থেকে সরে এসে সরাসারি তৃণমূল বিরোধী অবস্থান তুলে ধরা। তাদের আশা ছিল, প্রবল পরাক্রান্ত বিজেপির পক্ষে তৃণমূলকে ধরাশায়ী করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে একদশকের তোলাবাজি কাটমানি সারদা নারদা সহ নানাবিধ দুর্নীতির খতিয়ানে শাসক দলের প্রতি মানুষের যাবতীয় বিরূপতা বিজেপিকেই ক্ষমতায় নিয়ে আসবে। তারা ভেবে দেখেনি, তৃণমূল শাসনে এক শ্রেণীর মানুষ নানাবিধ সরকারী ভাতায় যেভাবে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে। তারা সেই সুযোগ থেকে সহজে বেড়িয়ে আসতে চাইবে না। তারা ভেবে দেখেনি, বাংলায় দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে গোটা মুসলিম সম্প্রদায় সহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষজনও তৃণমূলকেই তাদের শেষ আশ্রয় ভাবতে পারে। বামফ্রন্টের হয়তো আশা ছিল আইএসএফের হাত ধরে মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে গেলে বিজেপি ক্ষমতায় এসে যাবে। তাই তারা আইএসএফের সাথেও জোট করেছিল। মুসলিম ভোট ব্যাংকে ভাঙন ধরানোর জন্য। কিন্তু শুধুই মুসলিম সম্প্রদায় নয়। হিন্দু সম্প্রদায়েরও বহু বামপন্থী সাধারণ মানুষ দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকেতে ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও তৃণমূলকেই ভোট দিতে বাধ্য হয়েছে। এর একটা বড়ো কারণ, এই রাজ্যে অধিকাংশ মানুষই এখনো মনে প্রাণে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরোধী। ফলে তাদের কাছে বিজেপি’র বিপদটা এতটাই বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছিল যে, তারা তৃণমূলের মতো একটি দলকেও লেসার ইভিল মনে করে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছে। বাধ্য হয়েছে কারণ বামদলগুলির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনায় কেউই আর বামশক্তির উপরে কোনরকম ভরসা রাখতে পারে নি।


মানুষের পাশে না থেকে, মনুষের মুক্তির জন্য গণআন্দোলনের পথে লড়াই শুরু না করে, মানুষকে আসল মজা টের পাওয়ানোর আশায় বসে থাকা আসলেই রাজনৈতিক ভাবে আত্মহত্যারই সামিল। বাম দলগুলির মনোবৃত্তি স্পষ্ট। মানুষ তৃণমূলের ফুটন্ত কড়াই থেকে বাঁচার জন্য বিজেপির জলন্ত উনুনে ঝাঁপ দিলেই একদিন টের পাবে ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা কি মারাত্মক ভুল হয়েছিল। সেইদিন অর্থাৎ বাম দলগুলির হিসাবে মতে ছাব্বিশে মানুষই চাচা আপন প্রাণ বাঁচা বলে তৃণমূল আর বিজেপির হাত থেকে বাঁচতে বামফ্রন্ট সহ সিপিআইএমকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হবে। সেই লক্ষপুরণের নিমিত্তেই হওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল একুশে রাম ছাব্বিশে বাম, এই মন্ত্র। আমরা এই রোগটিকেই প্রভু প্রজা সিনড্রোম বলে চিহ্নিত করতে চাইছি। বাম দলগুলি সেই সাড়ে তিনদশকের রাজত্বের ঔদ্ধত্যে আজও বাংলার জনগণকে প্রজা না ভেবে থাকতে পারে না। তাই তারা সেই প্রজার, ফুটন্ত কড়াই থেকে জলন্ত উনুনে ঝাঁপ দেওয়া অব্দি অপেক্ষায় বসে ছিল। কিন্তু তাদের হিসাবে দুইটি জায়গায় গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল। এক, মুসলিম সম্প্রদায় স্পষ্ট জানতো বাংলায় সাম্প্রদায়িক শক্তিকে একবার ক্ষমতায় বসতে দিলে তার কি পরিণাম হতে পারে। তাই তারা ঠিক ভোটের মুহুর্তেই আইএসএফ গড়ার চক্রান্তে জল ঢেলে দিতে এককাট্টা হয়ে তৃণমূলের দিকেই ঝুঁকেছে। মুসলিম ভোট ভাগ হতে দেয়নি। দিলে আজ ক্ষমতায় দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তি গদীয়ান হয়ে যেত। এবং দুই, এখনো এই বাংলায় যারা সুস্থ ভাবে ভাবার মতো জায়গায় রয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছিল, বাম দলগুলির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনায় হাতে আর কোন তৃতীয় বিকল্প নাই। রাজ্যে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান একটা বাস্তব ঘটনা। ফলে ভোটের ময়দানে মাত্র যে দুইটি দল দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের ভিতর লেসার ইভিলকে বেছে নেওয়াই সময়ের দাবি। সেই দাবি মেনেই, যে ভোট বাম শক্তিকে দেওয়ার কথা ছিল। তারা সেই ভোট তৃণমূলকেই দিতে বাধ্য হয়েছে। না দিলে রাজ্যের সমূহ সর্বনাশ হয়ে যেত। ঠিক যে সর্বনাশের আশায় বাম দলগুলি সহ সিপিআইএমও অপেক্ষায় দিন গুনছিল। রাজ্যবাসিকে ফুল টাইট দেওয়ার জন্য। ফলে গোটা মুসলিম সম্প্রদায় ও এই লেসার ইভিলের প্রবক্তরা সম্মিলিত ভাবে বাম শক্তির আশায় জল ঢেলে দিয়ে একুশে রামের হাত থেকে রাজ্যটিকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে।


বাংলায় একটা কথা রয়েছে। সখাত সলিল। রাজ্যের বাম শক্তি সেই সখাত সলিলে আজ নিজেদের আত্মবিসর্জন দিয়ে ফেলেছে। এই ঘটনায় তিন থেকে সাতাত্তরে পৌঁছানো দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তি যার পর নাই উল্লসিত। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে। রাজ্যে একমাত্র বিরোধী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গুরুত্ব কি। এবং তার সাথে তারা এটিও জানে, তৃণমূল দলটির আয়ু তার শীর্ষনেত্রী যতদিন। ঠিক ততদিন। এদিকে কংগেস ও সিপিএম মুক্ত বাংলায় তাদের সামনে এখন একজনই প্রতিবন্ধক। স্বয়ং তৃণমূলনেত্রী। একটি সংগঠিত শক্তির সামনে একজন ব্যক্তির প্রতিরোধ বেশিদিন স্থায়ী হতে পারে না। এটি ইতিহাসের বিধান। ফলে বাম শক্তির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনায় আজ পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্য সত্যি করেই রামের হাতে গিয়ে পড়ার অপেক্ষায়। সদ্যসমাপ্ত ভোটের ফল যাই হোক না কেন। অন্তত তৃতীয় কোন বিকল্পের জন্ম না হওয়া অব্দি।


১৬ই মে’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত