বই পড়া ও না পড়া
না, আজকে আমি কোন বই পড়ি নি। আশা
করি অধিকাংশ বাঙালিই আজ সিলেবাসের বাইরে, পরীক্ষার বাধ্যবাধকতার বাইরে নিছক বই পড়ার
আনন্দ পেতেই কোন বই পড়েননি। আমাদের দুই বাংলা জুড়েই অবশ্য শিক্ষিত অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন
বাঙালির সংখ্যা কোটি কোটি। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী প্রাপ্ত। শিক্ষিত চিন্তাশীল
মানুষের সংখ্যাও কোটি কোটি। কিন্তু একশ জন শিক্ষিত বাঙালির ভিতর নিয়মিত বা এমন কি অনিয়মিত
বই পড়ার অভ্যাস আছে, এমন পাঠকের সংখ্যা কি দুই সংখ্যায় পৌঁছাবে? জানি না। নিশ্চিত করে
বলার মতো পরিস্থিতিও কি আছে আমাদের? মনে হয় না। অনেকই এতটা হতাশগ্রস্ত নন নিশ্চয়ই।
তাঁরা যথেষ্ঠ আশাবাদী হয়েই এই কথার বিরোধীতা করবেন। করতেই পারেন। কিন্তু তাঁদেরকেও
যদি প্রশ্ন করা যায়, গত এক বছরে কি কি বই পড়েছেন আপনি? গত ছয় মাসে? কিংবা এই সপ্তাহে?
এমন কোন বই পড়লেন, যে বইটি পড়ে আপনার আরও কিছু বই পড়ার আগ্রহটুকু নতুন করে বেড়ে গেল?
না, নির্দিষ্ট কোন শ্রেণীর বই নয়। বিষয়টি বইয়ের উৎকর্ষতা অপকর্ষতা নিয়েও নয়। বাজারে
বহু নিকৃষ্ট মানের বই প্রচুর বিক্রী হয়। হোক। আমাদের জিজ্ঞাস্য একটিই। আমাদের বই পড়ার
অভ্যাস, কতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে আজকে? সে যেমনই বই হোক না কেন?
জানি অনেকেই সুন্দর একটা
অজুহাত দেন এই সময়ে। হাতে ধরে বইই যে পড়তে হবে তার কি মানে রয়েছে। এটা তথ্য প্রযুক্তির
বিপ্লবের যুগ। নেট থেকেই ডিজিটাল বই পড়ে নেওয়া যায়। অবশ্যই যায়। তাছাড়াও নেট জুড়ে কত
কি পড়ার রয়েছে। বহু মানুষ নেটেই পড়ার কাজ সেরে নিতে পারে। অবশ্যই পারে। বই পড়া দিয়ে
কথা। সেটি হাতে ধরেই হোক। কিংবা মাউসে ক্লিক করেই হোক। কোন বইটি পড়ে শেষ করলেন তবে
আজ? না। অনেকেই বিব্রত বোধ করবেন জানি এই প্রশ্নে। আর তখনই দ্বিতীয় যে অজুহাত বিন্ধ্যাচলের
মতো খাড়া দাঁড়িয়ে পড়ে, সেটি হলো। বই পড়ার সময় কোথায় এই যুগে? এটা তো আর ঠাকুর্দাদার
বাবার আমল নয়। যে কু ঝিক ঝিক করে সারা দিনে দুটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন পাস হবে স্টেশন
দিয়ে। আর গরুর গাড়ী করে বাবু বিবিরা সেই ট্রেন ধরতে বেরোবেন বাড়ি থেকে। বছরে এক দিন।
ফলে এই আরও একটি অজুহাত রয়েছে আমাদের হাতের কাছে। সময় কোথায়। বই পড়ার সময় আর নাই। পেশা
আর সংসারের দায়িত্ব সামলিয়ে বাঙালির হাতে সত্যিই বই পড়ার সময় নাই।
সময়ের অভাবটা হেসে উড়িয়ে
দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু নিজের প্রতি কিছুটা সৎ থাকলেও সেটি সম্ভব নয়। সত্যিই আমাদের
সময়ের অভাব আছে জানি আমরা সকলেই। কিন্তু তার ভিতরেও একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, কিছু
কিছু মানুষ দিব্যি বই পড়ার একটা সময় তার ভিতরেও বার করে নিতে পারেন। না, এটা মনে করার
কারণ নাই। তাঁরা পিসি সরকারের জাদু জানেন। কিন্তু তাঁরা জানেন কোন কোন কাজটা বাদ দেওয়া
যায়। আমাদের চব্বিশ ঘন্টায় আমরা যে অনেক ধরণের অপ্রাসঙ্গিক কাজের সাথেও জড়িয়ে থাকি।
প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয় কাজের সাথে। সেটা আমাদের অধিকাংশ সময়েই খেয়াল থাকে কি? যাঁদের
থাকে, তাঁরা সেই অপ্রাসঙ্গিক কাজগুলিকে দূরে সরিয়ে রেখেই প্রতিদিনের জন্য না হলেও,
ছুটিছাটার ফাঁকে, বই পড়ার একটা সময় সুযোগ করে নেন। কারণ বিষয়টা হলো, অন্তরের তাগিদ
ও মনের আগ্রহের। আমরা সেই সব কাজেই সময় কম পাই, যে সব কাজে আমাদের আগ্রহই কম। আর যে
সকল কাজে আমাদের যত বেশি আগ্রহ, সেই কাজে আমাদের তত কম সময়ের অভাব হয়।
একটু ভালো করে ভেবে দেখুন
তো। আমাদের বই পড়ার মূল আগ্রহটা কেমন বুক থেকে টুক করে ফেসবুকে চলে গিয়েছে। আজকে আমি
কোন ধরণেরই বই পড়ার সময় পাইনি। এই কথা বলার মতো শিক্ষিত মানুষ কোটি কোটি। কিন্তু আজকে
আমি সময়ের অভাবে ফেসবুকে লগইন করি নি। বা হোয়াটসআপে প্রয়োজনীয় অপ্রোজনীয় প্রাসঙ্গিক
অপ্রাসঙ্গিক এমনকি সম্পূর্ণ বস্তাপচা পোস্টও ফরওয়ার্ড করি নি- এমন কথা বলার মতো শিক্ষিত
অক্ষরজ্ঞান মানুষের সংখ্যা কি লক্ষ অব্দি পৌঁছাবে? অবশ্য সেই পরিসংখ্যান আমাদের হাতে
নাই। সেই পরিসংখ্যানের মালিকও আমরা নই। মালিক বিদেশীরা। বিদেশী বহজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি।
তাই খুব জোর দিয়ে কিছু বলতে না পারলেও। ঘরে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলে। কিংবা নিজের ঘরেই
নিজে উঁকি দিয়ে দেখলে। একটা পরিস্কার ছবি নিশ্চয় খুঁজে পাওয়া যাবে। হ্যাঁ আপনি বলতে
পারেন। যে যুগের যা ধরণ। মানুষের রুচির বদল ঘটে সময়ের সাথে। প্রযুক্তির বদলের সাথেও
মানুষের আগ্রহের বিষয়গুলি নতুন করে বিন্যস্ত হতে পারে। হওয়াই স্বাভাবিক। এই তো সেদিনের
কথা। ব্রিটিশের কাছে পদানত হওয়ার আগের কাল অব্দি, বাঙালির ঘরে ঘরে বই পড়ার চল ছিল নাকি
আদৌ? হাতে লেখা পুঁথির মালিক হাতে গোনা কয়েকজনই ছিলেন। হ্যাঁ বই পড়ার চল ছিল না ঠিক।
কিন্তু কথকথার চল ছিল। চল ছিল পাঁচালী পড়ার। একজন পড়তেন। অনেকে মিলে জড়ো হয়ে শুনতেন।
একজনের পাঠে বা বলায় বহু জনের মনশ্চক্ষের পাঠ হয়ে যেত। ব্রিটিশের হাত ধরে গড়ে ওঠা বইয়ের
সংস্কৃতি সেই ধারা থেকে আমাদের বার করে নিয়ে আসে। অন্তত শিক্ষিত বাঙালির জনসমাজে। ফলে
বইও কোন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল না। সেই বই পড়ার ধারাও আজকে যদি যুগসন্ধিক্ষণে পৌঁছিয়ে
পাল্টিয়ে যেতে থাকে। তবে আশ্চর্য্য হওয়ার কিছু নাই অন্তত। অন্তত সেই কথা নিয়ে কাউকে
দায়ী করা যেতে পারে না, মশাই আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ হয়েও বই পড়েন না কেন শুনি? না
তোমন প্রশ্ন করার মতো কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে নাই আমরা।
প্রশ্নটা যদি একটু ঘুরিয়ে
দেখা যায়, তবে কেমন হয়? বই পড়ি কেন আমরা? সিলেবাসের বাইরের বইয়ের কথাই আমাদের আলোচনার
বিষয়। জানি কোন একটি নির্দিষ্ট উত্তরও হয় না এর। এক একজন পাঠকের কাছে এক একরকম উত্তর
রয়েছে এই প্রশ্নের। কিন্তু বিবিধের মাঝে মিলন মহানের মতো একটা নির্দিষ্ট বিষয় কিন্তু
দাঁড়িয়ে থাকে, বই পড়ার ভিতর। সেটি হলো, ক্রমাগত আমাদের চিন্তাশক্তিকে আলোড়িত করে সঞ্চালিত
করে রাখা। চিন্তাশক্তি যেন মেকানিক্যাল প্রকোষ্ঠবদ্ধ না হয়ে যায়। চিন্তাশক্তিতে যেন
স্থবিরতা গ্রাস না করে। বই আমাদেরকে, আমাদের চিন্তাশক্তির ধার বাড়িয়ে দিয়ে, সাহায্যই
করে। এখানেই বই পড়ার মূল প্রাসঙ্গিকতা। তাই আমাদের চিন্তাশক্তিতে নিয়মিত শান দিয়ে যেতে
বইয়ের জুড়ি নাই। না, সেই কাজ সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে বসে থেকে পোস্টের পর পোস্ট
স্ক্রল করে গেলেও হয় না। হবে না। উল্টে বেশিরভাগটাই তোতাকাহিনীরই একটা অত্যাধুনিক রকমফের
হয়ে উঠবে মাত্র। আমরা অদৃশ্য কোন না কোন শক্তির দ্বারা চালিত হয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীবদ্ধ
শিবিরের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়তে পারি। ইচ্ছা থাক আর না থাক। স্যোশাল মিডিয়ায় যত সহজে মানুষের
ব্রেনওয়াশ করা যায়, একটা বই লিখে আর ছাপিয়েও তত সহজে মানুষকে অন্ধভক্ত বানিয়ে বশীভুত
করা যায় না।
এমন নয় যে, এসব কথা আমরা
জানি না। নতুন কোন তত্ব আবিষ্কার হলো এইমাত্র। আসলে আমরা এসব জেনেও, একটা গড্ডালিকা
প্রবাহে ভেসে থাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। যে সময় আমাদের কাছে যেটা দাবি করে, আমরা
দুই হাত তুলে সেই দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করেই নিশ্চিন্ত বোধ করি। ভাবি, এইতো আমি বাকি
সকলের সাথেই সংযুক্ত রয়েছি। তাদের মতো করেই চলছি। ভাবছি। এই চিন্তা আমাদের মনে একটা
সুরক্ষার বলয় তৈরী করে দেয়। আমিও আর পাঁচজনের মতো সুস্থ স্বাভাবিক। অন্তত দলছুট নিঃসঙ্গ
কোন অস্তিত্ব নই।
বই পড়া আসলেই একটি পরিশ্রমের
কাজ। আসল কথা হলো প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নতি আমাদেরকে পরিশ্রম বিমুখ করে তোলে। প্রযুক্তির
এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব। বুক নিয়ে পড়ে থাকার যে পরিশ্রম। ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকার মধ্যে
তার ছিটেফোঁটাও নাই। মাউস আর টাচ। ক্রমাগত একটা বিষয় থেকে নতুন একটা বিষয়ে দৌড়াচ্ছিও
আমরা। কখনো একঘেয়ে লাগছে না। নিত্যনতুন বিনোদনের অফুরন্ত ভাঁড়ার হাতে মুঠোয়। এই প্রলোভন
জয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এতে আরও একটা বড়ো পরিশ্রম বাঁচে। সেটি হলো ভাবনা করার
পরিশ্রম। চিন্তা করার পরিশ্রম। মনে মনে যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করার
পরিশ্রম। প্রযুক্তি আমাদেরকে এমন ভাবেই পরিশ্রম বিমুখ করে তুলেছে যে, আমরা আর পরিশ্রমের
ভিতরে থাকতে রাজি নই। একটা আলতো টাচ। একটা ছোট ক্লিক। এর বেশি পরিশ্রমে আমাদের আর কোন
আগ্রহ নাই।
আজকে যে আমি কোন বই পড়লাম
না। আপনিও পড়লেন না। এটাই তার আসল কারণ। বাকি সব নিজেকে ভোলানোর গালগল্প শুধু। প্রতিদিনের
আত্মপ্রবঞ্চনার এক স্বনির্বাচিত মেকানিজম। তার বেশি কিছু নয়। বিষয়টা সময়ের অভাব নয়।
বিষয়টা আগ্রহের অভাব। বিষয়টা পরিশ্রম করার মানসিকতার অভাব। বিষয়টা আসলে আলস্যের। বই
পড়া অলস মানুষের কাজ নয়। প্রযুক্তি আমাদেরকে যত বেশি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, তত বেশেই
অলস করে তুলছে আমাদেরকে। আমাদের জীবন থেকে বই পড়ার সংস্কৃতি দিনে দিনে হারিয়ে যাওয়ার
এই এক ইতিহাস।
২১শে শ্রাবণ’ ১৪২৭
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

