কবির ধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবির ধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

কবির ধর্ম




কবির ধর্ম

কথায় আছে, রোম নগরী যখন পুড়ছিল সম্রাট নীরো তখন বেহালা বাজাচ্ছিলেন। অনেকেই মনে করেন কবির কাজ কবিতা লেখা। আর আবেগের স্বতষ্ফুর্ত প্রকাশই কবিতা। সমাজ রাজনীতি সামাজিক আন্দোলন ইত্যাদি বিষয়গুলি কবির পক্ষে মানানসই নয়। তিনি নিরালা নির্জনে সাহিত্যসাধনায় মগ্ন থাকবেনসাময়িক কোলাহল তাঁকে স্পর্শ করবে না। যা কিছু শাশ্বত সুন্দর, তিনি হবেন তারই বীণাবাদক। তবেই রচিত হবে কালোত্তীর্ণ সাহিত্য। খুব ভালো তাই যদি হয়, তবে বেহালাবাদক শিল্পী নীরো তো স্বধর্মই পালন করছিলেন। ঠিক তেমনই অস্থির সময় ও রাজনীতির ঘূর্ণীপাকে স্থির ও অটল থেকে সাময়িক উত্তেজনা ও কোলাহল থেকে দূরবর্তী থেকেই একজন কবি চিরন্তন সাহিত্যসৃষ্টির সাধনায় আত্মমগ্ন থাকবেন। এমনটাই মনে করেন অনেকেই। অনেকেই মনে করেন, কবি যদি তাঁর স্বধর্মচ্যুত হয়ে সাময়িক উত্তেজনা ও কোলাহলে উন্মত্ত হয়ে প্রতিবাদে কলম ধরেন, তবে আর যাই হোক সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে না। তা রাজনৈতিক মতবাদের প্রচারপত্র হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ কবিকে হতে হবে নিরাসক্ত ধ্যানী। বর্তমান নয়, কালাতীত সময়কে ধারণ করবে তাঁর লেখনী। তবেই হয়ে উঠবেন তিনি প্রকৃত কবি।

আর ঠিক এরই বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে উচ্চকন্ঠে জানিয়ে দিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, বর্তমানের কবি আমি ভাই ভবিষ্যতের নই নবী। আরও বলেছিলেন, অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু যাহারা আছো সুখে। এবং অনেকেই ঠিক এই কারণেই কাজী নজরুলকে খুব একজন বড়ো কবি বলে মনে করেনও না। তাঁদের কথায় নজরুলের কবিতা নির্দিষ্ট কালসীমায় আটকা পড়ে আছে। সেই দিন সেই সময় সে কবিতার কদর থাকলেও পরিবর্তীত কাল ও সময়ে সেই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে গিয়েছে। তাই আজকের পাঠক আর নজরুলের কবিতায় আশ্রয় পায় না। এমনটাই অভিমত অনেক কাব্য সমালোচকের।

প্রশ্ন হলো তবে কোন পথে এগোবেন একজন কবি? তিনি কি সময়ের কোলাহল থেকে দূরবর্তী হয়ে শাশ্বত কালের ধ্যানে বসবেন তাঁর কাব্য সাধনায়। নাকি তাঁর পরিপার্শ্বের সমাজবাস্তবতার কোলাহলে প্রমত্ত হয়ে অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদে শব্দ সংযোজনের যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন? অর্থাৎ প্রশ্নটা হলো কি করবেন বেহালা বাদক নীরো? রোম নগরীর আগুন নেভাতে ছুটবেন, না কি বেহালাই বাজাতে থাকবেন ধ্যানস্ত আত্মমগ্নতায়? যুক্তির জাল বিস্তার করে অনেকে বলতেই পারেন, নীরো তো শুধুই বেহালা বাদক শিল্পীই নন। তাঁর মূল পরিচয় তিনি রোম সম্রাট। তাই রোম নগরী পুড়তে থাকলে সম্রাটের দায়িত্ব পালনই তাঁর কাছে প্রত্যাশীত। কিন্তু একজন কবি কখনোই সমাজসংস্কারক নন। সমাজবদলের দায়িত্বও তাঁর নয়। তাই সাময়িক কোলাহল রাজনৈতিক ডামাডোলের অস্থির সময়ে প্রতিবাদের কলম চালানো বা বিক্ষুব্ধ সমাজের মুখপাত্র হওয়া কবির কাজ নয়। যুক্তির জাল যতদূর টানা যায় ততদূরই বিস্তৃত হতে থাকে। তাই ঠিক পাল্টা যুক্তিও খাড়া করে দেওয়া যায় এই বলে যে, বেহালা বাদক নীরোর মূল পরিচিতি যেমন রোমের সম্রাট হিসাবেই, ঠিক তেমনই একজন কবিরও মূল পরিচয় একজন সমাজমনস্ক সংবেদনশীল মানুষ হিসাবেই। বস্তুত সমাজমনস্কতা, সংবেদনশীলতা, মানবিক প্রত্যয়, রাজনৈতিক দর্শন ছাড়া কখনোই একজন বড়ো কবি হয়ে ওঠা যায় না। তাই রাজনৈতিক ডামাডোলের অস্থির সময়ে বিক্ষুব্ধ উত্তাল সমাজবাস্তবতার আড়ালে দাঁড়িয়ে কাব্যসাধনা কবির কাছেও প্রত্যাশীত নয়

অবশ্যই কবি কি করবেন কোন পথে এগোবেন, সেটা ব্যক্তি বিশেষে এক একজন কবি তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতায় আত্মদর্শনের প্রেক্ষিতেই ঠিক করবেন। সেই বিষয়ে কারুর কিছুই বলার থাকতে পারে না। কিন্তু সাহিত্যের পাঠক হিসাবে একজন প্রকৃত পাঠক দেখতে চাইবেন, একজন কবি ঠিক কিভাবে মোকাবিলা করছেন এই উভয় সংকটের। অর্থাৎ বিশুদ্ধ কাব্যসাধনা ও সমাজমনস্ক সংবেদনশীলতার ভিতর কিভাবে সামঞ্জস্য বিধান করছেন কবি। কিভাবে সমন্বয় সাধনা করছেন শাশ্বত কাল ও তাঁর পরিপার্শের সময়ের সংঘটনের ভিতর। এই যে একটা সঠিক ভারসাম্যের অভিমুখে যাত্রা, সেই যাত্রার ভিতর দিয়েই চেনা যায় একজন প্রকৃত কবিকে। এবং সেখানেই একজন কবি তাঁর সময়ের দাবিকে মিটিয়েই চিরন্তন বাণীর রূপকার হয়ে উঠতে পারেন। সেটাই কবির আত্মপরিচয়। সেখানেই কবির অমরত্ব।

সেই পথে এগোতে হলে যে কোন কবিইকেই তাঁর সময়ের নাড়ীর স্পন্দনকে ধরতে হবে সুস্পষ্ট ভাবে। সমসাময়িক সমাজবাস্তবতার সারবত্তাকে অনুধাবন করতে হবে নিবিঢ় ভাবে। বর্তমানের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে অনুধাবন করতে হবে ইতিহাসের অর্জন ও অবক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে। একমাত্র তবেই আবহমান ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের ফাঁকফোঁকড়গুলির সাথে তার শক্তি ও দুর্বলতার দিকচিহ্নগুলিও সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়ে উঠবে কবিচেতনায়। আর তখনই কবি তাঁর সময়কে শাশ্বত সময়ের পটে উপলব্ধি করতে পারবেন অনেক গভীরে ও অনেক বিস্তৃত পরিসরে। এবং সেখান থেকেই উঠে আসবে তাঁর কবিতা। গড়ে উঠতে থাকবে তাঁর কবিতার ভুবন। যেখানে আশ্রয় পাবেন প্রকৃত অনুভবী পাঠক। যেখানে পথ খুঁজে পাবে পরবর্তী প্রজন্ম সামনের দিকে এগিয়ে চলার। সেখানেই সার্থকতা একজন কবির কাব্য সাধনার। সেখানেই কবির মূল পরিচয়।

৭ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত