পাবলিকের মার
কবি বলেছিলেন কলকাতা আবার
কলোল্লিনী তিলোত্তমা হবে। কিন্তু তাই বলে চলন্ত ট্রেনে দুরন্ত চুম্বন? হলিউড না বলিউড
সিনেমা?
এ যে
নিতান্তই কোলকাতার প্রকাশ্য দিবালোকে এক কামরা যাত্রীর চোখের সামনে ঘটা। কি
ন্যাক্কারজনক ব্যাপার। না, আপনি প্রাপ্তবয়স্কই হোন কিংবা কলিকাতা মহানগরীর নাগরিকই
হোন, অথবা একবিংশ শতকের
নব্য যুবক যুবতীই হোন, আপনি আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা, বন্ধু বা বান্ধবী, এমনকি স্বামী বা
স্ত্রী- কাউকেই আমাদের চোখের সামনে চুমু খেয়ে চলে যাবেন সেটি হচ্ছে না। আপনারা
দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে আদর করবেন আর চোখের সামনে আমরা নিজেদের শুকনো উপোসী ঠোঁট
চাটবো,
সেটি
হবে না কিছুতেই। কই আমরা তো কাউকে এভাবে চলন্ত ট্রেনে চুমু খেতে পারছি না, তবে আপনারা খাবেন
কোন যুক্তিতে শুনি। ভরদুপুরে চুমুই যদি খেতে হয়, তবে ঘর থেকে বেরোনো কেন মশাই? এই গরমে হাঁসফাঁস
করতে করতে গলদঘর্ম হয়ে রোজ বাড়ি থেকে বেরোনো, তার মধ্যে এমন উত্তেজক দৃশ্য
চোখ পিটপিট করে দেখে যেতে হবে? কেন আমরাও কি চুমু খেতে জানি না? না কি চুমু খাওয়ার মতো কেউ নাই
আমাদেও ঘরে?
তাই
বলে চুমু খাওয়ার জন্যে পাতালে নামতে হবে নাকি? কই আমাদের তো কারুর এমন বাই
নাই। তবে আপনাদেরই বা থাকবে কেন? না ওমন বাই থাকা চলবে না। চলতে দেবো না। আমরা যা পারি না, সেটা অন্য কাউকে
চোখের সামনে পারতে দেখলে কার না পিত্তি জ্বলে ওঠে বলুন তো! কি রসাতলে যাচ্ছে
দেশটা! ট্রেনে চলতে চলতেও দুলতে দুলতে দুলকিচালে চুমু খেয়ে যাবে, তাও আবার আমাদেরই
চোখের সামনে?
কেন
আমাদের হাত পা নাই নাকি? ঘাড়ে পিঠে দু তিন ঘা বসিয়ে দিয়ে আপাদমস্তক ক্যালানি দিতে
পারি না নাকি আমরাও? মুখের তোড়ে অন্যের চৌদ্দপুরুষের গুষ্টি উদ্ধার করতেই বা কিসে কম যাই।
কি ভেবেছে কি এরা! যার যা খুশি যখন যেভাবে খুশি তখন তাই করে যাবে? দেশে কোন আইনকানুন
নাই? সমাজের ভয়ও নাই? তবে দ্যাখ পাবলিকের
মার কেমন লাগে।
সত্যই
তাই পাবলিকের মার যে এখনো মরে যায়নি, সেটাই দেখা গেল অবশেষে। পাতালরেলের ভিড়ে ঠাসা
কামরায় প্রাপ্তবয়স্ক যুগলের চুম্বনদৃশ্য সহ্য করতে পারেনি পাবলিক। তাই অকথ্য
গালিগালাজ থেকে বেধড়ক মার কোনটাই বাদ যায় নি, কলোল্লিনী কলকাতায়। আপনি ভাবছেন, ভালোই তো সমাজেরও
একটা দায় আছে বইকি। সমাজিক নজরদারী শাসনের অভাবেই না সমাজটা দিনে দিনে উচ্ছন্নে
যাচ্ছে দ্রুত। বিশেষ করে যেখানে সমাজিক শাসনের ঐতিহ্যটাই উঠে গিয়েছে বাংলার
সমাজজীবন থেকে। গেড়ে বসেছে রাজনৈতিক দলের দাদাগিরি। আপনার স্মরণে চলে আসছে, বাপ ঠাকুর্দার আমলের
কথা। যখন রাজনৈতিক দলের আধিপত্য ছিল না সমাজের চৌহদ্দিতে। পাড়ার চণ্ডীপণ্ডপেই যখন
সামাজিক বিষয়গুলির নিষ্পত্তি হতো। যখন পাড়ার জ্যাঠামশাই কাকাদের শাসনের আওতার
মধ্যে দিয়েই বড়ো হয়ে উঠতো ঘরের ছেলেপুলেরা। বিপথে চলে যাওয়ার কোন উপায় ছিল না।
সামাজিক নজরদারী শৃঙ্খলার একটা সংস্কৃতিই রক্ষা করতো সমাজিক সুস্থতা। এটাই না
বাংলার সমাজজীবনের ঐতিহ্য। আর আজকে সেই কথা ভেবেই না হাহুতাশ করতে হয়, কোথায় গেল সেইদিন।
কোথায় গেল সমাজ। কোথায় এসে পৌঁছালো বঙ্গসংস্কৃতি! আর সেকারণেই, সামাজিক চোখরাঙানির
যে বিশেষ দরকার আছে সমাজে, সে কথা আপনি স্বীকার করবেন। নয়তো আজকের নতুন প্রজন্ম
গোল্লায় যাবে। জানেন আপনি। তাই পাবলিকের মার সমর্থন পেয়ে যাবে আপনারও। হয়তো আপনার
হাতদুটিও উশখুস করতে পারে দুই চার ঘা বসিয়ে দিতে পারলে বেশ হতো ভেবে।
সত্যইই
বেশ হতো জানেন,
পাবলিকের
মারের এই ভয়টাই যদি সব ঘুষখোরদের থাকতো! রাস্তায় ট্রাক থামিয়ে ঘুষ খাওয়ার
রেওয়াজটাই হয়তো উঠে যেত। কিংবা পথে ঘাটে যত্রতত্র যারা তোলাবাজি করে বেড়ায়, ভাবুন তো আপনাদের এই
পাবলিকের মারের ভয়ে সব তোলাবাজরা নেতানেত্রীদের আঁচল ছেড়ে দিয়ে সুবোধ বালকের মতো
বাবামায়ের কোলে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। আর বেকার ভাতার লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কিংবা এই যে
সম্প্রতি সারা বাংলা জুড়ে উন্নয়নের তাণ্ডবে প্রায় ত্রিশ শতাংশ আসনে বিরোধী পক্ষ
থেকে কেউ প্রার্থীই দিতে পারলো না; পাবলিকের মারের এই ভয় থাকলে পারতো কি বিডিও এসডিও অফিসের
সামনে সব মশারি খাঠিয়ে বসে থাকতে? নাকি পারতো দিনদুপুরে পুলিশের চোখের সামনেই এতগুলো লাশ
ফেলে দিতে?
থাকতো
যদি এমন পাবলিকের মার? আবার ভাবুন পাবলিকের মারের ভয় নাই বলেই না সারদা নারদার কুশীলবরা
কেমন দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে আর জনগনকে লেকচার দিয়ে যাচ্ছে। তাই পাবলিকের মারের
দরকার আছে বই কি। সামাজিক চোখরাঙানিরও দরকার আছে বইকি।
কিন্তু
ভাবুন এবার ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে পাবলিক এমন রেরে করে তেড়ে যাচ্ছে! তোলাবাজরা দলীয়
অফিস থেকে চোঁচোঁ দৌড় দিচ্ছে তেড়ে আসা পাবলিকের মারের ভয়ে। সারদা নারদার কুশীলবরা
আদালতে গিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজের নিজের দোষ কবুল করছে। অন্তত জেল হয়ে গেলে
পাবলিকের মারের থেকে বাঁচা যাবে ভেবে। পাবলিকের মারের ভয়েই, প্রশাসন থেকে
ব্যবসাদার হাসপাতাল মালিক থেকে ওষুধ কোম্পানি শিক্ষক থেকে নেতানেত্রী সব সিধে হয়ে
গিয়ে জনসেবা শুরু করে দিয়েছে? ঠিক এমনটাই যদি হতো!
না
তেমনটা কিন্তু হয় নি। হয় না। হয়ওনি কোনদিন কোনকালেই। তাই হবেও না কোনদিন কোলকালেও।
জানেন আপনিও। জানে সেই পাবলিকও যে পাবলিক চলন্ত ট্রেনে দুলন্ত চুম্বন ঠেকাতে রেরে
করে তেড়ে উঠেছিল দলমত নির্বিশেষে। তেড়ে উঠেছিল কারণ, দুলন্ত চুম্বনের হাতে গুলি বোমা
বন্দুক ছিল না। দলীয় রাজনীতির রঙিন ঝাণ্ডা ছিল না। আশে পাশে ছিল না স্তাবক থেকে
শাকরেদের দল। ছিল না জেডপ্লাস ক্যাটাগরির তীব্র সাইরেনও। সেটা জেনে বুঝেই রেরে করে
তেড়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল সেইসব সামাজিক জ্যাঠামশাইদেরই, যাঁদের সামাজিক নীতিবোধের চোখ
সারাদিন নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। চোখের সামনে গণধর্ষণ হতে দেখলেও যাঁদের
বিবেক চোখকান বুঁজে ইস্টনাম জপতে জপতে রাস্তা পার হয়ে চলে যাবে। প্রতিদিন
সান্ধ্যখবরে গ্রাম বাংলা জ্বলতে দেখলেও যাঁদের হাত পা রেরে করে তেড়ে ওঠে না। সেই
সব সামাজিক জ্যাঠামশাইরাই কিন্তু চলন্ত ট্রেনে দুরন্ত চুম্বন মুখ বুঁজে হজম করে নেবে
না। এটাই আমার আপনার বাংলা। এটাই বাংলার আবহমান ঐতিহ্য। শক্তের ভক্ত নরমের যম।
আবার এইসব সামাজিক জ্যাঠামশাইরাই কিন্তু মাল্টিপ্লেক্সের টিকিট কেটে সিনেমার
পর্দায় পথেঘাটে বেআব্রু নায়ক নায়িকার দুরন্ত প্রেমের দৃশ্যে মনে মনে সিটি দিতে
থাকবে। আর সিনেমার শেষে পয়সা উশুলের আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরবে হইহই করে।
ইংরাজিতে
একটি খুব দামী শব্দ রয়েছে। পার্ভারশন। আমাদের বাঙালিদের চরিত্রের হুবহু প্রতিশব্দ
এইটিই। যেখানে পাবলিকের মারের দরকার সেখানে পাবলিক নাই। সেখানে পাবলিকের টিকিও
দেখা যায় না। শুধুই নানান রঙের দলীয় পতাকার সারি। আর যেখানে পাবলিকের কোন কাজ নাই, কোন দায় নাই।
দায়িত্ব নাই,
সেখানেই
সুযোগ পেলে,
সুবিধা
পেলেই হলো একবার। পাবলিক মনের সুখে দুচার ঘা হাতের সুখ করে নিতে দুবার ভাববে না।
দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারে, হ্যাঁ সময়ে অসময়ে পাবলিকও সামিল হয়ে যায় তাতে, কোনরকম রাজনৈতিক
কিংবা সাম্প্রদায়িক প্ররোচনা ছাড়াই। এখনেই বাঙালির আবহমান ঐতিহ্যের নোঙর।
আবার এই
পাবলিকই সোশ্যাল মিডিয়াতে ঝড় তুলে দিচ্ছে ধর্ষণের প্রতিবাদে, কিন্তু কিভাবে কোন
কোন জাদুতে একটি সমাজ গণ্ডায় গণ্ডায় ধর্ষকের জন্ম দিতে থাকে, সে কথা হাজার বার
বলেও এই পাবলিককেই বোঝানো যাবে না। যে সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক নরনারীর স্বাধীন
স্বতঃস্ফূর্ত অবাধ মেলামেশার পরিসরই নাই, সেই সমাজেই যে ধর্ষণের ভাইরাস সবচেয়ে মারাত্মক
ভাবে ছড়িয়ে পরে,
সেই
সত্য অনুধাবন করার মতো বৌদ্ধিক চেতনা আমাদের সমাজের এই পাবলিকের থাকলে আজকের
সমাজব্যবস্থার রূপ ও বিকাশ অন্যরকম হতো। তাই এদেশে পাবলিকের মার মানেই জাগ্রত
জনসচেতনতা নয়। এই সমাজে পাবলিকের মার বন্ধ্যা সমাজব্যবস্থারই অন্যতম কুফল। তাই
চলন্ত ট্রেনের দুরন্ত চুম্বনে অস্থির হয়ে উঠেছেন একদল। তাঁরাই সমাজটা আর কত রসাতলে
যাবে ভেবেও শিউরিয়ে উঠছেন। তাঁদের দৃষ্টিশক্তি যদি ঝাপসা না হয়ে যেতো; তবে অনুধাবন করতে
পারতেন সমাজটা রসাতলে চলে গিয়েছে বলেই পাবলিকের মার আজ নিরীহ নিরস্ত সুস্থ মানুষের
উপর গিয়ে পড়ছে। পড়ছে সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে। অনৈতিক এবং অসামাজিক ভাবে। পাবলিকের এই মার ঠেকাতে পাবলিককেই জাগিয়ে তুলতে
হবে। কিন্তু সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ।
১লা
মে ২০১৮
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

