পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের
নরমেধ যজ্ঞের আগুন এখনো নেভেনি। বা বলা ভালো নিভতে দেওয়া হয় নি। এই না দেওয়ার পিছনে
নানাবিধ রাজনৈতিক সমীকরণ বর্তমান। সমীকরণ যাই হোক না কেন। মারা পড়ছে সাধারণ মানুষ।
প্রান্তিক মানুষ। দারিদ্র্যসীমায় আটকিয়ে থাকা মানুষ। দিন আনতে পান্তা ফুরানোর মানুষ।
আর রাজনৈতিক ফয়দা তুলছে নেতা মন্ত্রী সাংসদ বিধায়ক। এটাই এখন রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
এই সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। রাজ্য রাজনীতির বহু দশকের ঐতিহ্য। কিন্তু এবারের এই রাজনৈতিক
নরমেধ যজ্ঞে সাম্প্রদায়িক রঙ লাগানোর যে প্রয়াস শুরু হয়েছে। সেই প্রয়াসটা রাজ্য রাজনীতিতে
নতুন। এবং এই প্রয়াসের প্রয়োগ একবার সাফল্য পেয়ে গেলেই কেল্লাফতে। পশ্চিমবঙ্গকে গোবলয়ের
অন্তর্ভুক্ত করার যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, সেই পরিকল্পনার সাফল্য অর্জনের জন্যেই
রাজনৈতিক নরনেধ যজ্ঞে সাম্প্রদায়িক রঙ লাগানো এতটা জরুরী। তাই এবারের নির্বাচন ও নির্বাচন
পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছিয়ে গিয়েছে।
প্রধানত মিথ্যে খবর ও
গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক হিংসা মারামারিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার এক সংগঠিত কার্যক্রম
চলছে। স্বভাবতঃই সেই গুজবে মানুষ বিচলিত হচ্ছে। ও মিথ্যা খবরে বিভ্রান্ত হয়ে সাম্প্রদায়িক
বিভাজনের ফাঁদে পা বাড়িয়ে দিচ্ছে। যারা এই মিথ্যার ফাঁদ পেতে রাখার খেলাটা চালিয়ে নিয়ে
যাচ্ছে, তাদের অর্থবল ও বাহুবল দুটোই প্রবল। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের
এই ষড়যন্ত্রের হাত ধরে শুরু হয়ে গেল এক নতুন যুগের। ফলে এই ফাঁদ থেকে রাজ্য রাজনীতির
বেড়িয়ে আসা সহজে সম্ভব নয়। বিশেষ করে একুশের নির্বাচনে জনতার রায় সেইরকমই। অনেকেই এই
রায়কে রাজ্য রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার রঙ লাগানোর বিরুদ্ধে জনাদেশ বলে বিশ্বাস করতে
চাইছেন। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে, বিষয়টা এতটাই সরলরৈখিক নয়। ভোটের অঙ্কে
একটি দল বিজয়ী। কিন্তু তার মানে এই নয়, রাজ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বপক্ষে কোন
জনসমর্থন নেই। বরং দুইটি দলের প্রাপ্ত ভোটশতাংশের দিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে কত শতাংশ
রাজ্যবাসী সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির পক্ষে রায় দিয়েছেন। এবং মাত্র পাঁচ বছরে
এই জনসমর্থনের পরিমাণ প্রায় কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা এই মুহুর্তে অশনিসংকেত স্বরূপ।
রাজ্য রাজনীতিতে এর প্রভাব যে কতটা মারাত্মক ভাবে পড়তে চলেছে, সেই বিষয়টি টের পাওয়া
যাবে অচিরেই। সাম্প্রদায়িক রাজীনীতির বিষবৃক্ষ একবার ফলদায়ক হতে শুরু করলে, সেই বিষবৃক্ষ
সমূলে উৎপাটন করা সহজে সম্ভব নয়।
এখন একটা বিষয়ে নজর দেওয়া
বিশেষ ভাবেই প্রয়োজন। রাজ্য রাজনীতিতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক হিংসা ও নরমেধ
যজ্ঞের ঐতিহ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উত্তরাধিকার। কংগ্রেসের
হাত থেকে সিপিএম বামফ্রন্ট হয়ে সেই ঐতিহ্যের অধিকার বর্তমানে তৃণমূল ও বিজেপি’র হাতে
গিয়ে পৌঁছিয়েছে। বা বলা ভালো তারা সেই উত্তরাধিকার কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের হাত থেকে
ছিনিয়ে নিয়েছে। এবং এবারের বিধানসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিন্যাসেও তার সার্থক
প্রতিফলন ঘটে গিয়েছে। সকলেই জানেন। এই সেই ঐতিহ্য, রাজনৈতিক হিংসার ঐতিহ্য। যে ঐতিহ্যে
আজকে সাম্প্রদায়িক রঙের মোটা আস্তরণ ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে একেবারে সংগঠিত ষড়যন্ত্রে।
নিপুণ কৌশলে। কিন্তু প্রতিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক হিংসার এই ঐতিহ্য থেকে
পশ্চিমবঙ্গ যদি মুক্ত হতো। তাহলে তো রাজনৈতিক হিংসাকে সাম্প্রদায়িক হিংসা বলে চালিয়ে
দেওয়ার কাজ সহজ হতো না আদৌ। এবং রাজনৈতিক হিংসা মুক্ত সেই বাংলায় সাম্প্রদায়িক হিংসার
জন্ম দেওয়াও সহজ হতো না। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা অত্যন্ত
জরুরী একটি হাতিয়ার। ফলে রাজ্য রাজনীতিতে এই যে নতুন একটি যুগের শুরু হলো। সাম্প্রদায়িক
বিভাজনের রাজনীতি। সেই রাজনীতির সাফল্য কিন্তু পুরোপুরিই নির্ভর করবে সাম্প্রদায়িক
সহিংসতার উপরেই। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতাকেই যদি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বলে চালিয়ে দেওয়া
যায়। তবে তো সোনায় সোহাগা। আর একবার সেই কাজে সাফল্য পেয়ে গেলেই প্রকৃত সাম্প্রদায়িক
সহিংসতায় রাজ্যকে বিপর্যস্ত করে তোলার কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে।
সদ্য সমাপ্ত একুশের নির্বাচনী
ফলাফল প্রকাশের সময় থেকেই রাজ্য জুড়ে যে রাজনৈতিক সহিংসতার শুরু। সেই সহিংসতাকে সাম্প্রদায়িক
রঙে রঞ্জিত করতেই এই কারণে এত মিথ্যা খবর ও গুজব ছড়ানোর বিশেষ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
ফলে রাজনৈতিক দিক থেকে এই গুজব ও মিথ্যা খবর রটনা করার বিশেষ তাৎপর্য বর্তমান। এই তাৎপর্য
সম্বন্ধে সচেতন না হলে সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতই শক্তিশালী করে তোলা হবে। তাদের পাতা
সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ফাঁদেই পা বাড়িয়ে দেওয়া হবে। আর একবার সেই ফাঁদে পা দিয়ে দিলে
সেই পা তুলে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। হবেই।
যে রাজনৈতিক সহিংসতার
ঐতিহ্যের সুযোগ নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার কাজ চলছে।
সেই রাজনৈতিক সহিংসতার মূল আমাদের সমাজ জীবনের অনেক গভীরে গিয়ে পৌঁছিয়েছে। না আপনা
আপনি পৌঁছায়নি। রাজনৈতিক পরিকল্পনায় অত্যন্ত সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতার
সংস্কৃতিকে। এবং এই কাজ চলছে বহ দশক ধরেই। আমরা আগেই বলেছি কোন কোন রাজনৈতিক শক্তি
এই কাজে অংশ নিয়ে ফেলেছে। আর কোন কোন শক্তি বর্তমানে সেই কাজের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই রাজনৈতিক হিংসার সংস্কৃতিতে এমন ভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে
যে, সে এই সংস্কৃতিকেই রাজনীতির সমার্থক ধরে নিয়েছে। আর সেটাই রাজ্যবাসীর পক্ষে সলিল
সমাধি’র নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এটা ঘটনা। আমদের সমাজ, রাজনীতি আর রাজনৈতিক সহিংসতাকে
সমার্থক বলে ধরে নিয়েছে। এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দলই তার থেকে রাজনৈতিক ফয়দা তুলতে মরিয়া।
ঠিক এই কারণেই প্রতিটি নির্বাচন ক্রমান্বয়েই আরও হিংসাত্মক হয়ে উঠছে। মানুষের মৃত্যু
মিছিল বেড়েই চলেছে। এবং মানুষ অর্থাৎ জনতা ক্রমান্বয়েই আরও বেশি পরিমাণে উদাসীন হয়ে
পড়ছে। খবরের কাগজের পাতা খুললে কিংবা টিভিতে লাইভ হিংসার ছবি দেখলেও আমাদের কোন ভাবান্তর
হয় না। আমরা জেনেই গিয়েছি। ধরেই নিয়েছি। বিশ্বাসও করে ফেলেছি। এটাই স্বাভাবিক। এটাই
রাজনীতি। সাধারণ মানুষের লাশের উপরেই রাজনৈতিক দলগুলির শক্তিবৃদ্ধি নির্ভর করে। এই
যে একটি ফর্মুলা। আপামর রাজ্যবাসীই এই ফর্মুলায় দীক্ষিত।
সমাজ যখন কোন একটি রোগকে
জীবনের স্বাভাবিক বিকাশ বলেই ধরে নিতে থাকে। তখন সেই সমাজ থেকে সেই রোগকে আলাদা করা
আর সম্ভব নয়। রোগমুক্ত সমাজ গড়তে হলে প্রথমেই রোগযন্ত্রণার অনুভুতিকে সজাগ করা দরকার।
কিন্তু আমরা যদি শুধু নিজেদের ভিতরেই পারস্পরিক আয়নায় নিজেদের শ্রীমুখে উঁকি দিই, দেখতে
পাবো রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে আজ আর কোন ক্ষোভ নেই। আমাদের ক্ষোভ
সহিংসতার বিরুদ্ধে নয়। আমাদের ক্ষোভ গোষ্ঠীর কেউ হতাহত হলে। যার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই
হলো সহিংস বদলা নেওয়ার মানসিকতা। ফলে চক্রবৃদ্ধি হারে এই খুনোখুনির পর্ব ভাঙচুরের পর্ব
চলতেই থাকে। চলতেই থাকবে। রাজনৈতিক সহিংসতায় অভ্যস্থ রাজ্যবাসী’র চিন্তা চেতনায় এই
খুনোখুনি কোন রকম মানসিক যন্ত্রণা কিংবা কষ্টের জন্ম দেয় না। আমরা স্বাভাবিক ভাবেই
খবরের কাগজের পাতা উল্টাই। সংবাদ চ্যানেলের খবরে চোখ রাখি। এবং এই রাজনৈতিক সহিংসতার
সংস্কৃতিতে যাদের রাজনৈতিক কেরিয়ার সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তাদেরকেই বার বার ভোট দিয়ে যেতে
থাকি। নির্বাচিত করে করে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে থাকি। অম্লানবদনে। নির্বিকার চিত্তে।
বুথে বুথে ভোট দেওয়ার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আমাদের একবারও মনে হয় না, যাকে ভোট দিচ্ছি।
যাদের ভোট দিচ্ছি। তারা এই রাজনৈতিক হিংসার সংস্কৃতিকেই হাতিয়ার করে রাজনীতির ময়দানে
দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। হয় না বলেই সদ্য সমাপ্ত একুশের নির্বাচনে আমরা ঠিক তাদেরকেই ভোট দিই
নি। যারা এখনো এই সহিংসতার রাজনীতিতে হাত পাকিয়ে উঠতে পারে নি। কিন্তু তাদেরকেই ঢেলে
ভোট দিয়েছি। যারা ভোটের আগে পড়ে এই লাশের রাজনীতি করে নিজেদের রাজনৈতিক জমি বাড়িয়ে
নেওয়ার খেলায় মত্ত। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতার খেলা কিন্তু চলছেই। চলবে। কারণ জনতা সেই
খেলায় অভস্থ হয়ে গিয়েছে। জনতা সেই খেলার নির্বিকার দর্শকে পরিণত হয়ে গিয়েছে। একুশের
নির্বাচন সেই খেলায় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সংস্কৃতিকে যুক্ত করার প্রথম পদক্ষেপ। তফাৎ
শুধু এইটুকুই। কিন্তু ফল তার আরও মারাত্মক। অন্তত সামনের দিনগুলিতে।
৮ই মে’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

