এনআরপি এনআরসি ও
রাজ্য সিপিআইএম
অনেকেই মনে করেন সিপিআইএম দলটি
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে ঠাঁই নিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক লোকসভা
নির্বাচনে এই দলের প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ সাতে নেমে যাওয়ার পরপরই এই বদ্ধমূল ধারণার
বশবর্তী এখন অনেকেই। বামফ্রন্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ধারাবাহিক ভাবেই এই দলের
কর্মী সমর্থক এমন কি নেতানেত্রীর সংখ্যাও দ্রুতবেগে ক্রমহ্রাসমান। তার সরাসরি
প্রভাবে পাড়ায় পাড়ায় এই দলের রাজনৈতিক কোন কর্মকাণ্ড আর বিশেষ কিছুই দেখা যায় না।
সারদা নারদার মতো ভয়াবহ কাণ্ডের সময়েও পাড়ায় পাড়ায় প্রতিবাদ প্রতিরোধের কোন
আন্দোলন চোখে পড়ে নি। অথচ, বামফ্রন্টের আমলে যদি সারদা নারদার মতো ঘটনা ঘটতো, তাহলে তৎকালীন
বিরোধী দলনেত্রী রাজ্যব্যপি কোন পর্যায়ের আন্দোলন সংঘটিত করতেন, সেটি রাজ্যবাসী
মাত্রেই কল্পনা করতে পারবেন। তাহলে কি এটাই ধরে নিতে হবে যে, সাড়ে তিনদশক ক্ষমতায়
থেকে তারপর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ফলে সিপিআইএম সহ বামদলগুলির আন্দোলন সংগঠনের শক্তিতে
জং ধরে গিয়েছে?
ময়দানে
জনসভা করা আর কলকাতা কেন্দ্রিক দৈবাৎ এক আধবার আইন অমান্য করা আর রাজ্যব্যপি
লাগাতার আন্দোলন সংগঠিত করা দুইয়ের ভিতর বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সেটি যে কোন
রাজনৈতিক দলই জানে। সিপিআইএমও তার ব্যতিক্রম নয়।
না
সিপিআইএম কোথাও কোন প্রতিবাদ করছে না, বা রাজপথে এই দলের কোন চিহ্নই নাই, বিষয়টা এমনও নয়।
বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে ও মফঃস্বলে মানুষের পাশে লাগাতার না থাকলে রাজনৈতিক অস্তিত
রক্ষা করা যে কত কঠিন, সেটি এইদলের কর্মী সমর্থক মাত্রেই জানেন। এর ভিতরই বাজারে গুজব, রাজ্যে তৃণমূলের
শক্তি হ্রাস করার পরিকল্পনা হিসাবেই সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে দলে দলে কর্মী
সমর্থক বিজেপিকে ভোট দিয়ে রাজ্যে বিজেপির হাত শক্ত করেছে। যার সরাসরি ফল দেখা
গিয়েছে,
রাজ্য
থেকে বিজেপির নির্বাচিত সাংসদ সংখ্যা এক লাফে দুই থেকে বেড়ে আঠারোয় পৌঁছিয়ে
যাওয়াতে। ঠিক যে কারণেই রাজ্য থেকে লোকসভার মোট বিয়াল্লিশটিই আসন জিতে নেওয়ার
তৃণমূলের পরিকল্পনাতে জল ঢেলে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এবং যার ফলে লোকসভা নির্বাচনে সিপিএমের প্রাপ্ত
ভোটের শতাংশ এক লাফে সাতাশ থেকে নেমে সাত হয়ে যায়। গুজব যদি সত্যই হয়, তাহলে নিজের নাক
কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের এতবড়ো নজির ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম। এখন দেখার তৃণমূলের
যাত্রা কতটা ভঙ্গ হয় কিংবা সিপিআইএম দলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব কতটা খোঁড়া হয়ে যায়।
অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, এটি একটি রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজির অংশ। আসন্ন বিধানসভা
নির্বাচনে,
বিজেপিতে
চলে যাওয়া সিপিএমের সব ভোটই আবার দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ফিরে আসবে। লাভের
মধ্যে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের দখলদারি আধিপত্য কিছুটা হলেও ধাক্কা খাবে, এবং যার ফলে
তৃণমূলের ভোটশেয়ারের অনেকটা অংশ বামদলগুলির ঝুলিতে চলে আসবে। অনেকে আবার বিগত
লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধিতে পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ী
হওয়ার বিষয়েই বেশি আশাবাদী। এর ভিতরেই মাত্র সাত শতাংশ ভোট শেয়ার নিয়ে সিপিআইএম
দলটিকে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধ্বজা তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। যার
ভরকেন্দ্র অনেকটাই কলকাতা কেন্দ্রিক লম্ফঝম্ফের ভিতরেই সীমাবদ্ধ।
এই
পরিস্থিতিতেই রাজ্যব্যাপি এনআরসি বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে মাঠে সিপিআইএম। তাদের
বিরোধিতার মূল লক্ষ্য বিজেপি এবং তৃণমূল। কারণ তৃণমূলের হয়ে দলের দলনেত্রী নিজেই
অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে সকলের আগে সরব হয়েছিলেন লোকসভা অধিবেশনেই। সে আজ থেকে বছর
চৌদ্দ আগে। এনআরসির প্রথম ধাপ হিসাবে এনপিআর শুরু করার জন্য সরকারী স্তরে প্রাথমিক
কাজ অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে রাজ্যসরকার। হ্যাঁ অবশ্যই কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ
অনুযায়ীই। সেই কারণেই এনআরসি’র বিরোধীতায় তৃণমূলের ভুমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে
রাজ্যের সিপিআইএম। দলের পক্ষ থেকে নেতানেত্রীরা এই বিষয়ে রাজ্যবাসীকে সতর্ক করে
দিতে চাইছেন। সেই সাথেই তাদের বিরোধীতার অন্যতম নিশানা কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও
বিজেপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরেই। এই আবর্তেই তাঁরা মানুষকে এনআরসি’র পিছনে
বিজেপির আসল উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সচেতন করতে পথে নেমেছেন।
তাঁরা
বোঝাতে চাইছেন,
মানুষকে
এনআরসি’র লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে, দেশবাসীর উপর নামিয়ে আনা অর্থনৈতিক বঞ্চনাগুলিকে আড়াল
করাই সরকারের আসল উদ্দেশ্য। তাঁরা এও বলছেন, বিগত ছয় বছরের যাবতীয় ব্যার্থতা
ও ধোঁকাবাজি ঢাকতেও এই এনআরসি। তাঁরা বলছেন, দেশীয় সম্পদকে জলের দরে
নির্বাচিত শিল্পপতিদের হাতে বেচে দেওয়ার দিকে যাতে মানুষ নজর দিতে না পারে, তার জন্যেই দেশে
সাম্প্রদায়িক বিভাজন উস্কে দিয়ে এই এনআরসি। ইত্যাদি ইত্যাদি। মানুষের সচেতন হয়ে
ওঠার দরকার। এটাই তাঁদের বক্তব্য।
সিপিআইএম
নেতৃত্ব আশা করছেন মানুষ এইসব বিষয়গুলির বিষয়ে যত বেশি সচেতন হয়ে উঠবে, ততই মানুষের ভোট
তাঁদের অভিমুখে ফিরে আসবে। তাই তাঁরা বারবার কেন্দ্রের বিজেপি ও রাজ্যের তৃণমূলের
দিকেই অভিযোগের মূল তীর তাক করে বসে রয়েছেন। সিপিআইএম নেতৃত্বের ধারণা, মানুষ দেশের অর্থনীতি, দেশের বাণিজ্যনীতি
দেশের শিল্পপতিদের হিডেন এজেণ্ডা, শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদদের অশুভ আঁতাত, ইত্যাদি বিষয়গুলি
সম্বন্ধে যত বেশি সচেতন হয়ে উঠবে, ততই মানুষের সমর্থন বামপন্থী দলগুলির দিকে ফিরে আসবে। আর
তাঁদের এহেন বিশ্বাসের উপর রয়েছে অগাধ ভরসা। সেই কারণেই তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না, সম্প্রতি পাশ হওয়া
সিটিজেনশীপ এমেণ্ডমেন্ট এক্ট নিয়ে সরকারের প্রচারে অধিকাংশ বাঙালি হিন্দুই সরকারের
কথা বিশ্বাস করছেন নিশ্চিন্তে। করছেন কারণ, সরকারী দলের প্রচারে বলা হচ্ছে, অত্যাচারিত শরণার্থী
হিন্দুদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যেই তো এই আইন। বলা হচ্ছে, রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা
করার কথা। যেখানে হিন্দুদেরই প্রাধান্য। তলায় তলায় হিন্দু সাম্প্রদায়িকতায় ধুনো
দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য একটিই, রাজ্যের পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে বাঙালি হিন্দুদের
বেশির ভাগ ভোটকেই নিজেদের দিকে নিয়ে আসা। তারা জানে, এই বাঙালি হিন্দুদের ভোটের
বেশিরভাগটাই যদি নিজেদের দিকে টেনে নিয়ে আসা যায়, তাহলেই কেল্লাফতে। কারণ রাজ্যে
বসবাসকারী অবাঙালি হিন্দু ভোট তাদের দিকেই থাকবে। ঠিক এই কারণেই রাজ্যের বিজেপি
সিটিজেনশীপ এমেন্ডমেন্ট এক্টকেই তুরুপের তাস করতে চাইছে।
এনআরসি
বিরোধী আন্দোলনকে সিপিআইএম গোটা ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়েই
রাজ্যের বিজেপির কাছে দ্রুত জমি হারিয়ে ফেলছে। বাঙালি হিন্দু তা সে শরণার্থীই হোক
আর নাই হোক,
এনআরসিকে
হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হিসাবেই দেখতে চাইছে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে
হাতিয়ার করে বিজেপি যে রাজনৈতিক ফয়দা তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে, বাঙালি হিন্দু
স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেই পরিকল্পনায় গলা বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে রাজ্য সিপিআইএম
এনআরসি’র বিষয়টা দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের সাথে জড়িত বলে, তাদের এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের
মূল অভিমুখকে সেই দিকেই তাক করে রয়েছে।
এনআরসি’
পক্ষে বলা হচ্ছে, এতে উপকৃত হবে পশ্চিমবঙ্গ। কারণ কোটি কোটি বাংলাদেশী অবৈধ
অনুপ্রবেশকারীকে এবার ভাগানো যাবে। চাঙ্গা করে তোলা যাবে, রাজ্যের অর্থনীতিকে। সমাধান হবে
বেকার সমস্যা,
ইত্যাদি।
সুরক্ষিত হবে ভারতবর্ষ। আর যাঁরা সত্যকারের শরণার্থী তাঁদের কথা চিন্তা করেই
কেন্দ্র সরকার সিটিজেনশীপ এমেণ্ডমেন্ট এক্ট চালু করে তাঁদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব
দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। ফলে বাঙালি হিন্দুর এনআরসি নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছুই নাই।
স্বভাবতঃই আহ্লাদে আটখানা হিন্দু বাঙালি। মুসলিম তাড়ানোও যাবে, আবার ভারতীয়
নাগরিকত্বের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। সিপিআইএম নেতৃত্ব ঠিক এই বিষয়টি সম্বন্ধে
কতখানি ওয়াকিবহাল সন্দেহ সেখানেই। যদি তাঁরা সত্যিই ওয়াকিবহাল হন, তবে তাঁদের প্রধান
কাজ হওয়া উচিৎ,
সিটিজেনশীপ
এমেন্ডমেন্ট এক্টে শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি যে কত দূরূহ, সেইটি জনে জনে বোঝানো।
রাজ্যের মানুষ দেশের অর্থনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় না। দেশের সম্পদ কোন কোন
শিল্পপতিদের হাতে জলের দরে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেটি নিয়ে সাধারণ জনতার কিসের
মাথাব্যাথা থাকতে পারে? ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রই হোক আর
দৈনিক শ্রমঘন্টা বাড়ানোই হোক, তাতে সাধারণ মানুষের বিশেষ হেলদোল থাকে না। কারণ মানুষ
অত তলিয়ে দেখতে যায় না। তার ঘাড়ের উপরে যতক্ষণ না বিপদের খাঁড়া নেমে আসছে, ততক্ষণ সাধারণ
মানুষকে জাগানো কঠিন।
অত্যন্ত
দুর্ভাগ্যের বিষয়, রাজ্য সিপিআইএম নেতৃত্ব জন মানুষের মনস্তত্বের এই দিকটি সম্পূর্ণ
উপেক্ষা করে থাকে। তাঁদের ভাবনা গোটা ভারতবর্ষের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে। আর ঠিক এই
কারণেই তাঁদের সকল বক্তৃতাই মানুষের মাথার উপর দিয়ে বেড়িয়ে যায়। যাচ্ছে। এদিকে
বাঙালি হিন্দুদের নাকের ডগায় সিটিজেনশীপ এমেণ্ডমেন্ট এক্টের টোপ ঝুলিয়ে শরণার্থী
আবেগে সুরসুরি দিয়ে তাদেরকে নিজেদের শিবিরে অনেকটাই টেনে নিয়ে আসতে সক্ষম হচ্ছে
রাজ্য বিজেপি। মানুষ বুঝতেই পারছে না, এনপিআর-এর ভুমিকা কি হতে চলেছে। মানুষ টের পাচ্ছে
না, এনআরসিতে যাদের
যাদের নাম বাদ যাবে, তাদের জীবনের উপর কত বড়ো বিপর্যয় ঘনিয়ে আসবে। সিপিআইএম নেতৃত্ব যে
সেই বিষয়ে একেবারেই অন্ধকারে, না বিযয়টি তাও নয়। কিন্তু তাঁদের মূল গণ্ডগোলটি হলো
এখানেই যে,
তাঁরা
কোন বিপদটি আগে মোকাবিলার আর কোনটি পরের সেই বিষয়ে সচেতন নন।
যদি হতেন, তবে বিজেপি ও
তৃণমূলের দিকে আঙুল তুলতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে, পাড়ায় পাড়ায় গণসচেতনতা গড়ে
তোলার বিষয়ে আদাজল খেয়ে নেমে পড়তেন। মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে আগে এনপিআর’এ ঠিক কি
কাণ্ড হতে চলেছে, সেই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করতেন। মানুষকে বোঝাতে পারতেন
যে, সরকার এনপিআর করে যে
যে তথ্যগুলি লিপিবদ্ধ করবে, ঠিক সেই তথ্যগুলির উপরে ভিত্তি করেই এনআরসি’র প্রাথমিক
খসড়া তৈরী হবে। ও সেই তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের নাম নিয়েই সন্দেহজনক ভোটারের
তালিকা প্রস্তুত হবে। একবার সন্দেহজনক ভোটারের তালিকায় নাম উঠে গেলেই মানুষের
জীবনে যে বিপর্যয় শুরু হবে, আসামের অভিজ্ঞতায় মানুষকে সেই বিষয়ে সচেতন করার দায়িত্ব
নিতে পারতো ক্ষমতা হারানো সিপিআইএম। মানুষও জানতে পারতো, একবার ফরেনার্স ট্রাইব্যুন্যাল
থেকে নোটিশ আসার অর্থ কি হতে পারে। মানুষ বুঝতে পারতো সেই নোটিশ আসার পর এনআরসিতে
নিজের নাম তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষকে কত ঘাটের জল খেতে হতে পারে। কতদিনের
পুরানো কাগজ ঘাঁটতে হবে। আবার শুধু তাই নয়, বিভিন্ন কাগজে নিজের নামের একটি
অক্ষরও এদিক ওদিক হলে, কি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। এনআরসি’র তালিকায় নাম না
উঠলেই যে একজনকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করে দেওয়া হতে পারে, সেবিষয়ে আজও কোন
রাজনৈতিক দল মুখ খোলে নি। নিজের উপরে পড়া অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর তকমা থেকে নিজেকে উদ্ধার
করার যে একটিই উপায়, অর্থাৎ নিজেকে হিন্দু শরণার্থী বলে প্রমাণ করা সেই উপায়টি যে কত কঠিন, সেই বিষয়ে মানুষকে
অবহিত করার দায়িত্ব পালন করতে পারতো সিপিআইএম দলটি। মানুষকে জানাতে পারতো, আফগানিস্তান
পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু হিসাবে অত্যাচারিত হওয়ার সরকারী নথি
না দেখাতে পারলে ভারত সরকার একজনকেও হিন্দু শরণার্থী বলে স্বীকার করবে না।
নাগরিকত্ব দেওয়া তো পরের কথা। তখন সাধারণ মানুষের টনক নড়তো। সত্যিই তো আজকে বিদেশী
সরকারের কাছ থেকে সেই দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম সমাজের হাতে অত্যাচারিত নির্যাতীত
হওয়ার বৈধ সরকারী নথি কি করে সংগ্রহ করবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি? কি করে সম্ভব হবে
বাঙালি হিন্দুর শরণার্থী হিসাবে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়া?
বাঙালি
মুসলিম নিজে থেকেই বুঝতে পেরেছে, যে একবার যদি কোন কারণে এনআরসি থেকে নাম বাদ যায়, তবে চৌদ্দ পুরুষ
পশ্চিমবঙ্গে বাস করেও বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর তকমা নিয়ে বাকি জীবন ডিটেনশন
ক্যাম্পে কাটাতে হবে। তাই তারা আপন গরজেই পথে নেমেছে এনআরসি ও সিটিজেনশীপ
এমেণ্ডমেন্ট এক্ট ২০১৯-এর বিরোধীতায়। রাজ্য সিপিআইএম যদি সত্যই মানুষের আশু বিপদের
দিকে তাকিয়ে মানুষের পাশে থাকতে চায়, তবে তাদের বৃহৎ প্রেক্ষাপটে আটকিয়ে না থেকে, রাজ্যের হিন্দু
মুসলিম সাধারণ মানুষের উপর যে ভয়ানক বিপদ ও বিপর্যয় নেমে আসতে চলেছে, সেই বিষয়টিকেই
অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে, পৌঁছাতে হবে মানুষের ঘরে ঘরে। বিজেপি কিংবা তৃণমূলের বিরুদ্ধে হাজার
তর্ক শানিয়েও মানুষের সমর্থন নিজের দিকে টেনে নিয়ে আসা যাবে না। মানুষকে তাঁর
সামনে ওঁৎ পেতে থাকা আশু বিপদ সম্বন্ধে যদি ওয়াকিবহল করা যায়, যদি আসামের
অভিজ্ঞতাগুলি তুলে ধরে পরপর কি কি বিপদ হতে পারে স্পষ্ট বোঝানো যায়, তাহলে মানুষই বুঝতে
পারবে এগোতে হবে কোন পথে। থাকতে হবে কার সাথে। দুর্ভাগ্যের কথা রাজ্যে মাত্র সাত
শতাংশ মানুষের সমর্থনের উপর নির্ভরতা নিয়ে আইসিইউতে ধুঁকতে থাকা সিপিআইএম দলটির
পক্ষে এই বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করার মতো শক্তি বোধহয় আজ আর নাই। থাকলে তার
প্রতিফলন দেখা যেত পাড়ায় পাড়ায়। গঞ্জে গঞ্জে। মহল্লায় মহল্লায়। গ্রামে গ্রামে।
যেখানে সিপিআইএমের নেতানেত্রীর পদধুলি পাওয়াই ভগবান দর্শনের মতো অলীক হয়ে
দাঁড়িয়েছে আজ।
২৬শে
ডিসেম্বর’ ২০১৯
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

