কবিতাসন্ধ্যার আসরে
ফেসবুক জুড়ে কত কবি!। আজ অমুক গ্রুপে লাইভ
স্ট্রীম। কাল নিজের ওয়ালে কবিতা লাইভ। পরশু দেশ বিদেশের অনলাইন কবিতা-সন্ধ্যায় কবিতা
পাঠ। মাসে দুই একদিন বাংলা আকাডেমিতে আয়োজিত সাহিত্যসভায় আমন্ত্রিত কবি হিসাবে স্বরচিত
কবিতা পাঠের নিমন্ত্রণ। এর বাইরেও কলকাতার বুকে রকমারি কবিতাপাঠের আসর জুড়ে কবিদের
নিত্য আনাগোনা। আমি আপনি কে নেই সেখানে? একবার মঞ্চে উঠে একটি কিংবা দুটি কবিতা পাঠের
সুযোগ হলেই ফেসবুকের ওয়াল জুড়ে আমাদের মার্চপাস্ট! বন্ধুবৃত্তের লেজুড় যার যত লম্বা।
তার পোস্টে তত ভিড়। আর সেই ভিড়ের মাঝে আমি এবং আপনি। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, আমাদের
কবিতার কি খবর? জানি অনেকেই এমন বেয়াড়া প্রশ্নে রেগে যাবেন। যেতেই পারেন। কিন্তু সত্যি
করেই কি, এই এতসব বিস্তৃত আয়োজনে আমাদের কবিতাগুলির কোন খোঁজ পাওয়া যায় আদৌ? আদৌ কি
আমাদের সেই বন্ধুবৃত্তের লেজুড় জুড়ে আমাদের কবিতাগুলির উপস্থিতি টের পাওয়া যায়? আচ্ছা
একবার না হয়, ভেবে বলুন তো! আপনার কোন একটি কবিতাও কি আপনার বন্ধুবৃত্তে কোনরূপ আলোচনার
বিষয় হয়ে উঠেছে? কিংবা কোন লাইন। একটি বা দুটি পঙতি! অন্য কারুর আলোচনায় শুনতে পেয়েছেন
কোনদিন? জানি এমন বেমক্কা প্রশ্নের আশা করেননি কোনদিন। ভাবেনওনি, কেউ কখনো এমন একটা
প্রশ্নের সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে আপনাকে।
হ্যাঁ এটা ঠিক। আপনি কবি। কবিতা সৃষ্টির আয়োজনটুকু আপনার। সেই সৃষ্টির আয়োজনে কতজন বিমোহিত হলো। কতজন সহবাস করলো। কে কোথায় আপনার সৃষ্টির বিষয়ে গবেষণায় ব্রতী হল। না, এসব কোনটিই একজন কবির দেখবার বিষয় নয়। কবির কাজ সৃস্টির আনন্দউৎসবে নিত্য অবগাহন! পাঠকের কাজ কবিকে খুঁজে নেওয়া। কবির সৃষ্টিতে জগৎ ও জীবনকে রসসিক্ত অনুভবে উপলব্ধি করা। এইসবই শাশ্বত সত্য। সাহিত্যের সত্য। ফলে এটা ঠিক। আপনার কবিতার কোন লাইন কার ভিতরে কোন গানের ধুয়ো তুললো, সেটির খোঁজ রাখার দায় কবির নয়।
কিন্তু আমরা এখন নিজের ঢাক নিজে বাজানোর
সময়বৃত্তে বন্দী। সেই ঢাক যে যেমন যতটা দক্ষতায় বাজাতে পারে। এইসময়ে সে’ই কিন্তু তত
বড়ো কবি। এই কথাটা আমরা হয়তো কেউ মুখে স্বীকার করি না। কিন্তু আমি কিংবা আপনি, এই বিষয়টা
হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গিয়েছি। ফলে ফেসবুক জুড়ে আমরা প্রতিদিন সেই ঢাক বাজানোর সংস্কৃতিতেই
অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। না হলে ভাবুন একবার। আপনি বাংলা আকাদেমিতে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে
এসেছেন। অবশ্যই নিজের যোগ্যতায়। আকাদেমির সভাঘরে উপস্থিত শ্রোতারা আপনার কবিতা শুনেছেন।
যাঁদের ভালো লেগেছে, আশা করাই যায়। এই হাতে হাতে মজুত সর্বকর্মের কাণ্ডারী সেই মুঠোফোনে
আপনার কবিতাপাঠের মুহুর্তও কারুর কারুর ক্যামেরায় বন্দী হয়ে গিয়েছে। কারণ আপনার কবিতা
তাঁদের ভালো লেগেছে। সোশ্যাল সাইটে তাঁরাই আপনার সেই কবিতা পাঠের মুহুর্তের ছবি ছড়িয়ে
দিতে পারেন। দেওয়ারই কথা। তথ্য প্রচারের যুগও এইটি। আগেকার দিনে ইনটারনেট ছিল না। মুঠোফোন
ছিল না। তবু মানুষের মুখে মুখে কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তো। ফলে
এটাও আশা করা ভুল নয়। আজকে আকাদেমিতে আপনি যে স্বরচিত কবিতাটি পাঠ করলেন। তার ভিডিও
উপস্থিত দর্শক শ্রোতার মাধ্যমেই প্রচারিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ তেমনটাই হওয়ার সম্ভাবনা
রয়েছে।
কিন্তু তেমনটা হয় কি? এইখানে অনেকেই বলবেন
জানি। হয় নিশ্চয়। অত্যন্ত জনপ্রিয় বিখ্যাত কবিদের ক্ষেত্রে হয় বইকি। কিন্তু আমি কিংবা
আপনি তো আর সেইরকম জনপ্রিয় খ্যাতিমান কবি নই। ফলে আমাদের ঢাক আমাদেরকেই বাজাতে হবে।
তাই আমি কিংবা আপনি, বাড়ি ফিরে নিজের স্বরচিত কবিতাপাঠের ছবি নিজের ওয়ালে নিজেই পোস্ট
করে থাকি। আর খেয়াল করতে থাকি। কয়টা লাইক আর কয়েটা কমেন্ট পেল সেই পোস্ট। সংখ্যাতত্ত্বের
সেই হিসাবেই সোশ্যাল সাইটের ঘেরাটপে আমরা আমাদের একটা বাজারদরের আঁচ করতে পারি। না,
কোন অর্থমূল্যে নয়। জনপ্রিয়তার মূল্যে।
আমাদের কবিতা লেখা ও প্রকাশের সাথে সাথে
এই বিষটিও সমান্তরালে চলতে থাকে। তাই আমি এবং আপনি। স্বরচিত কবিতাপাঠের সান্ধ্য আসরগুলিতে
একটি দুটি কবিতা পাঠের সুযোগ পেলেই ধন্য হই। প্রিয়জনদের নিয়ে তাদের হাতে কামেরা ধরিয়ে
দিয়ে ছুটি। সেই বহুমূল্য মুহুর্তের ছবি বন্দী করে ফেলতে। আসল কাজ তো শুরু হবে বাড়ি
ফিরে। ফলে আকাদেমির সভাঘরে সমবেত কবিদের হাটে আমরাও আমন্ত্রণ পেলে, অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়
থাকি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। আমাদের সাজ এবং পোশাকেও যেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষা
মজুত থাকে। কিন্তু মূল মুশকিল শুরু হয় তারপর থেকেই। একে একে কবিদের ডাক পড়বে। প্রত্যেককেই
অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে। যার যত বেশি পরিচিতি। খ্যাতি কিংবা দর। সেই অনুপাতে তাঁর
ডাক তত আগে। ফলে আমাকে কিংবা আপনাকে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে বইকি। মনের ভিতরে উচাটন।
একটু যাঁরা বেশি খ্যাতিমান। তাঁরা থাকবেন তো? আমি কিংবা আপনি যখন কবিতা পাঠের ডাক পাবো?
এটা তো ঠিক। অধিকাংশ সময়েই নিজের কবিতা পাঠ হয়ে গেলেই। কিংবা সংবর্দ্ধনা পর্ব মিটে
গেলেই। একটু যাঁরা বেশি পরিচিত মুখ। কবি হিসাবে যত্রতত্র ডাক পড়ে কবিতা পাঠের্। তাঁদের
দেখা যায়, নিজের কাজ মিটে গেলেই নানা অজুহাতে সভাকক্ষ ত্যাগ করে যেতে। ফলে আমাদের ভিতরে
একটা অস্থিরতাও যেন দানা বাঁধতে থাকে। স্বীকার করি আর নাই করি। সেটি এড়িয়েও যাওয়া যায়
না সহজে। এর একটা বড়ো সুবিধেও রয়েছে কিন্তু। আমরা যখন নিজেদের কবিতাপাঠের অপেক্ষায়
মশগুল। তখন যাঁরা মঞ্চে তাঁদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করছেন। স্বভাবতঃই আমাদের মনোযোগ তাঁদের
দিকে থাকলেও। তাঁদের কবিতার সাথে আমাদের কোন যোগাযোগ গড়ে ওঠার অবকাশ পায় না। আমরা সেই
সময়ে নিজের কবিতার ভিতরেই বিরাজ করতে থাকি। ঠিক যে কবিতাটি পাঠ করবো বলে হাজির হই কবিতাসন্ধ্যার
আসরে!
ফলে আমি কিংবা আপনি। আমরাও যখন মঞ্চে উঠে
নিজেদের কবিতাপাঠে ব্যস্ত থাকি। আমাদের প্রিয়জনেরা যে মুহুর্তে মুঠোফোনে আমাদের কবিতা
পাঠের সময়কে ধারণ করতে ব্যস্ত থাকে। সেই মুহুর্তে উপস্থিত অধিকাংশ শ্রোতাই, বিশেষ করে
যাঁরা স্বরচিত কবিতা পাঠের অপেক্ষায় বসে। সেই তাঁরাও আমাদের পাঠ করা কবিতার সাথে কোনরূপ
যোগাযোগ ঘটানোর অবসর পান না। আর এইভাবেই এগিয়ে চলতে থাকে বাঙালির কবিতাসন্ধ্যার সাহিত্যিক
আয়োজন। ফলে অধিকাংশ সময়েই কবিকেই নিজের ওয়ালে নিজের কবিতাপাঠের ছবি হাজির করতে হয়।
এই সেই নিজের ঢাক নিজে পেটানো। ঢাক পেটানোর এই মহোৎসবে আমি আপনি এবং আমাদের বন্ধুবৃত্ত।
সবই মজুত। মজুত এন্তার লাইক ও কমেন্ট। কিন্তু হাজার খুঁজলেও সেই মহোৎসবে আমার কিংবা
আপনার কবিতা ও কবিতার পাঠকের দেখা পাওয়া ভার।
স্বীকার করুন আর নাই করুন। আমি এবং আপনি।
আর আমাদের পরিচিত অপরিচিত বন্ধুবৃত্ত। হ্যাঁ তথ্য প্রযুক্তির এই হাইটেক যুগে পরিচিত
বন্ধুবৃত্তের থেকেও অপরিচিত বন্ধুবৃত্তের পরিধি বেশ বড়ো হয়ে থাকে। অন্তত, আমাদের লক্ষ্য
থাকে, অপরিচিত বন্ধুবৃত্তের সেই পরিধিটি যত বেশি বাড়িয়ে তোলা যায়। সেই অনুপাতেই আমাদের
জনপ্রিয়তা ওঠানামা করে। ফলে আমি আপনি এবং আমাদের নিজ নিজ বন্ধুবৃত্ত। এর ভিতরে আমার
কিংবা আপনার কবিতা। কবিতার লাইন। আর সেই কবিতার পাঠক। নাহ! এতটা আশা করার উপায় আমরা
রেখেছি কি? বাংলা সাহিত্যের কবি ও কবিতা সন্ধ্যার সব আয়োজনে আর সব কিছু মজুত থাকলেও।
দুঃখজনক ভাবে বাংলা কবিতা ও বাঙালি পাঠকের উপস্থিতি টের পাওয়া দায়। ফলে আমাদের ওয়াল
জুড়ে আমাদের কবিখ্যাতি নিয়ে ধন্য ধন্য পড়ে গেলেও। আমাদের কবিতার কোন লাইন কোন পাঠকের
হৃদয় খুঁড়ে খুঁজে পাওয়া বিরলতম এক অভিজ্ঞতা। নিজের ঢাক নিজে বাজাতে বাজাতে আমাদের বোধের
ক্ষেত্র এমনই অসাড় হয়ে গিয়েছে। আমরা আজ আর টের পাই না। আমাদের কবিতা আর আমাদের পাঠকের
খোঁজ আমাদের কাছে নেই আর। কবিতাহীন কবিসন্ধ্যার মঞ্চজুড়ে পড়ে থাকি আমি এবং আপনি। আমাদের
সামনে সতীর্থ সহসাথীরা মঞ্চে ওঠার অপেক্ষায়। বঙ্গসংস্কৃতির সাহিত্যসভার সুদূরতম কোণেও
পাঠকের সমাবেশ গড়ে ওঠে না। পাঠকের অভাবে আমাদের কবিতা আমাদের স্বরক্ষেপণের পরিধির ভিতরেই
ঘুরপাক খেতে থাকে নিরন্তর।
১৮ই মে’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

