পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮ এক অশনিসংকেত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮ এক অশনিসংকেত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮ এক অশনিসংকেত



পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮ এক অশনিসংকেত

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৮-তে রাজনৈতিক হিংসা প্রতিহিংসা মার পাল্টা মার, গুলি বোমার ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়গুলি সম্ভববত আগের সব রেকর্ড ম্লান করে দিয়েছে এর মধ্যেই। নির্বাচন হতেও এখন কয়েকদিন দেরি আছে যদিও, কিন্তু মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়া শুরুর প্রথম দিন থেকে এই লেখা লিখবার সময় অব্দি সময়সীমায়, এর মধ্যেই বহু মানুষের প্রাণ চলে গিয়েছে। অনেকেই আহত হয়ে নানান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সহিংসতার এই মারণযজ্ঞ থেকে রেহাই পান নি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরাও। সাংবাদিকদের উপরেও চড়াও হয়েছে দুষ্কৃতিরা। ভাঙ্গা হয়েছে ক্যামেরা। আহত হয়েছেন ক্যামেরাম্যান থেকে সাংবাদিক। আর এর মধ্যেই বিভিন্ন দলের নেতানেত্রীদের রাজনৈতিক তরজা অব্যাহত। কিন্তু মজার কথা হলো এই রাজনৈতিক তরজায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক দুষ্কৃতিদের হাতে প্রাণ যায় উলুখাগড়ার। সাধারণ দলীয় কর্মী থেকে গ্রাম পঞ্চায়েতের সাধারণ প্রার্থীদের। কিন্তু রাজনৈতিক হেভিওয়েট নেতানেত্রীদের গায়ে আঁচড়টি লাগে না। অথচ তাদেরই মুখ থেকে কব্জি কেটে নেওয়ার হুঙ্কার থেকে ব্যোম মারার ফতোয়া, কিংবা বিপক্ষ দলের কর্মীদের শশ্মানে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি কোন কিছুই বাদ যায় না। যত বড়ো রাজনৈতিক সভা, তত বড়ো হুমকি দেওয়ার ঘটা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সহিংস হুমকির তর্জন গর্জন আজকে এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছিয়েছে, যে রাজনীতি আর ভদ্রলোকেদের কর্মক্ষেত্র থাকছে না প্রায়। যে যত বেশি হুঙ্কার ছাড়তে পারবেন, দলের ঊর্দ্ধতন নেতানেত্রীর নেক নজর তত বেশি তার উপরে পড়বে। ফলে দলীয় কর্মীদের ভিতর তাঁর ব্যক্তি ইমেজ তত বড়ো হয়ে উঠবে এবং তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতাও যেন তত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এটাই পরিবর্তনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন একটি প্রবণতা হয়ে দেখা দিয়েছে। আর অসুস্থ এই প্রবণতার জের গিয়ে পৌঁছাচ্ছে প্রান্তিক রাজনীতিতে। সাধারণ কর্মী থেকে দলীয় সমর্থক কিংবা নির্বাচনের নীচুতম স্তরের প্রার্থীদেরকেই এই প্রবণতায় বলি হতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে মারধোর খুনোখুনি কোনটাই বাদ যাচ্ছে না। অথচ পারস্পরিক হানাহানির এই পরিসরেও হেভিওয়েট নেতারা এসি ঘরে বসে থেকে গরম গরম হুমকির বয়ান তৈরী করে চলেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো নেতারা মুখে যাই বলুন, পুলিশ কি করছে? রাজ্যে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করার দায় ও দায়িত্ব তো তাঁদের উপরেই ন্যাস্ত নাকি? মূল গণ্ডগোলটাই এখানে। ভারতবর্ষের সংসদীয় গণতন্ত্রে যদি প্রশ্ন করা হয়, পুলিশ তুমি কার তবে সকলেই জানেন উত্তর একটাই, শাসন ক্ষমতায় যখন যে দল থাকে তার। বাস্তবিক পক্ষেই আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে নিরপেক্ষ ভাবে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করার মতো পরিস্থিতি ও পরিসর অধিকার ও সুযোগ কোনটাই পুলিশের নাই। আর নাই বলেই থানার মধ্যেই পুলিশকে ফাইলে মুখ ঢেকে আত্মরক্ষা করতে হয়। বস্তুত রাজ্যের সকল থানাতেই যে আজকে পুলিশ নিরাপদ, বিষয়টা তেমনও নয়। সেটা পুলিশের থেকে আর ভালো কে জানে। তাই বিরোধী পক্ষের অভিযোগের মতোই পুলিশকে আত্মরক্ষার জন্যে, পেশাগত বাধ্যবাধকতায় আজকে দলদাসে পরিণত হতে হয়েছে। না হলে একদিকে প্রাণ ও অন্যদিকে পেশা দুটি নিয়েই টানাটানি। পুলিশেরও ঘর সংসার আছে। সেও আর পাঁচটা সাধারণ নাগরিকের মতোই অসহায়। তাই আপনি বাঁচলে বাপের নাম স্মরণ করে নীচুতলার পুলিশকে তার উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতোই চলতে হয়। উপর থেকে যখন যেমন নির্দেশ আসে, পুলিশ তখন তেমনই সক্রিয় হয়ে ওঠে কিংবা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গে পুলিশের এই ভুমিকা আবার আদৌ নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই পুলিশকে এই ভুমিকায় চলতে হয়েছে, কম বেশি সব সরকারের আমলেই।

ঠিক এই কারণেই আজকে রাজ্যবাসী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন, আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনে আরও কতো তাজা প্রাণ ঝরে যেতে দেখতে হবে ভেবে। প্রতিদিনের টিভি নিউজেই রক্তে ভেজা লাশের মিছিল। সে যে দলেরই হোক না কেন, এইভাবে গুলি বোমা বন্দুকের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া তো তার মানুষ হিসাবেই হোক আর রাজনৈতিক দলের কর্মী কিংবা সমর্থক হিসাবেই হোক, আদৌ পাওনা ছিল না। কিন্তু এই কথাটিই বুঝতে চাইছেনা কোন পক্ষই। যত বেশি লাশ পড়বে, তত বেশি ঘোলা জলে মাছ ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা। তাই যেখানে একটা মাত্র লাশ, সেখানে সেই লাশ নিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে লাশ নিয়ে টানা টানি। কিন্তু মুশকিলের বিষয় লাশ তো আর সাক্ষ্য দিতে পারে না। তাই লাশের বাড়ীর লোকজনকেই হাইজ্যাক করে নিয়ে সাংবাদিকের ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানোর লড়াই শুরু হয়ে যায় দলগুলির মধ্যেই। লাশ নিয়ে টানাটানির এই রাজনীতি আর যাই হোক গণতন্ত্র নয়। এই রাজনীতি তাই মানুষেরও নয়। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের যুদ্ধে লাশ ফেলাটাও রাজনীতি। লাশ নিয়ে কুম্ভীরাশ্রু ফেলাটাও রাজনীতি। কিন্তু এই রাজনীতির কুশীলব যাঁরাই হোন না কেন, তাতে সাধারণ জনগণের যে কোন ফয়দা নাই, সেটি জনগণকেই বুঝে নিতে হবে।

আর এইখানেই বাঁধ দিতে চাইছে শাসক পক্ষ। জনগণ যদি বুঝে নিতে চায়, তারাও যদি বুঝিয়েই দিতে যায়, কত ধানে কত চাল, তবে সরকারী মধুভাণ্ডের অধিকারও একদিন হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তাই উন্নয়নের প্রহরী দিয়ে উন্নয়নের রঙকেই হাতিয়ার করে, মনোনয়ন পর্ব থেকেই শুরু হয়েম গিয়েছে বিরোধী পক্ষগুলিকে নির্বাচন প্রণালী থেকে দূরে রাখা। প্রার্থীই না থাকলে আর নির্বাচন কোথায়? খেলাই হলো না তো গোলের হিসাব। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ওয়াকওভারের খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে জেলায় জেলায়। এই সেই ওয়াকওভারের খেলা, যে খেলায় প্রবলতর প্রতিপক্ষের খাটানো মশারিতেই নির্বাচনের দিন স্থির হওয়ার আগেই চৌত্রিশ শতাংশ আসন জিতে নেওয়া গিয়েছে। সার্বিক এই সাফল্যের আনন্দে দফায় দফায় আবীর খেলার মধ্যেই চলেছে বাকি আসনগুলিতেও জয় নিশ্চিত করার খেলা। আর সেই খেলায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও নিজ নিজ শক্তি অনুসারে পাল্টা দাওয়াইয়ের বন্দোবস্ত করে রাখতে চাইছে। ফলে প্রতিদিনই লাশ পড়ছে দমাদম করে। তাই প্রাণ যাচ্ছে সব পক্ষেরই সাধারণ নিরীহ কর্মী সমর্থকদের। কারুর কম কারুর বেশি।

আর এইখানেই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব বর্তায় দেশের সংবিধানের উপরেই। কিন্তু মুশকিল হলো সংবিধান তো আর নিজে কথা বলতে পারে না। তাই সংবিধানকে রক্ষা করার শেষ আশ্রয় আদালতকেই ঠিক করতে হবে সংবিধানের কথাগুলি ঠিক মতো শোনা ও শোনানোর। এবং প্রয়োজন পড়লে সেই সংবিধানকেও দরকার মতো ঠিকঠাক মাপসই করে নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে। একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন ব্যাপক মৃত্যুমিছিল কোনভাবেই কোন নির্বাচনকে বৈধতা দিতে পারে কিনা, স্থির করতে হবে সেটিই। স্থির করতে হবে এইটিও যে, নির্বাচনের আগেই এক তৃতীয়াংশের বেশি আসনের ফয়সালা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় হয়ে যাওয়া যে কোন গণতন্ত্রের পক্ষেই কতটা লজ্জার এবং ভয়াবহ। আর সেইটি সময় মতো নির্ধারণ করতে না পারলে, শুধু এই রাজ্যের পক্ষেই নয়, সারা ভারতেই পশ্চিমবঙ্গের এই রোগ গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বড়ো অশনিসংকেত হয়ে দেখা দেবে অচিরেই।

অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, সরকার পাল্টিয়ে গেলেই গণতন্ত্র আবার যথাস্থানে ফিরে আসবে। অনেকেই এই পরিস্থিতি বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের কার্যকারণের ফলাফল বলে মনে করছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু একদমই ভিন্ন। যখন যেই একবার শাসন ক্ষমতার দখল নিতে পারবে, সেইই ঠিক একই রকম করে  তখন গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করে শাসন ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যে সর্বশক্তি দিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়বে। ফলে সকলের আগে গণতন্ত্রের সুরক্ষার বলয়গুলিকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলতে না পারলে, যাই করা হোক না কেন তা আসলেই বালির বাঁধ দেওয়ার মতো বিষয় হবে। তাই যাঁরা মনে করছেন জনগণ একবার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ পেলেই সকল সমস্যার আশু সমাধান হয়ে যাবে, তাঁরা বাস্তব পরিস্থিতি থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থান করছেন।

৬ই মে ২০১৮

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত