জুতো পালিশ তো হলো সমাজটাকে পালিশ করবে কে?
সম্প্রতি একজন প্রথিতযশা কবির
পাদুকা প্রক্ষালনের ভঙ্গিমা নিয়ে সোশ্যাল সাইটে ঝড় উঠেছে তর্ক বিতর্কের। পক্ষে
বিপক্ষে বিভিন্ন পক্ষের যুক্তি ও পাল্টা যুক্তিতে আসর সরগরম। শালীনতা অশালীনতা
নিয়ে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের তুলকালাম কোলাহলে বাংলার সমাজ ও রাজনীতির একটা
স্পষ্ট ছবি ধরা পড়ে যাচ্ছে অনেকেরই চোখে। ঘটনার ঘনঘটায় বিষয়টি দৌড়িয়েছে প্রশাসন
অবধি। চর্চা চলেছে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে বাক স্বাধীনতা ও বাক সংযমের তর্কাতর্কি
নিয়েও। যে কোন সমাজের পক্ষে তর্ক বিতর্ক সুস্বাস্থের। বাকস্বাধীনতাও যেমন জরুরী
ঠিক তেমনই বাক সংযমও সমাজের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। কিন্তু মুশকিলটা হয়, বাকসংযম ও
স্বাধীনতার সীমারেখা নিয়েই। সকল পক্ষই নিজের নিজের স্বার্থে এই সীমারেখা টেনে নিয়ে
মল্লযুদ্ধের অবতারণা করে ফেলে। সমস্যার শুরু সেখান থেকেই। একজন কবি বা নাগরিকের
যেমন অধিকার রয়েছে, তিনি কিভাবে কখন কোথায় জুতো পালিশ করাবেন, ঠিক তেমনই একজন পাঠক বা
নাগরিকেরও অধিকার রয়েছে সেই কাজের সমালোচনা করার বা প্রশংসা করার। এটা মানুষের
ব্যক্তিস্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের বিষয়। কখনোই কেউই সেই বিষয়ে বাইরে থেকে
হস্তক্ষেপ করতে পারে না কোনভাবেই। করলে সেটি অবশ্যই নিন্দনীয়। দুঃখের বিষয় তখনই
ঘটে, যখন মানুষ বুঝে উঠতে
পারে না,
কখন
কোথায় থামতে হবে। ঠিক কতটা ব্যক্তি অধিকারের এখতিয়ার। আর কতটা অনধিকার চর্চা।
আর কে না
জানে, অনধিকার চর্চায়
বাঙালির কোন জুড়ি নাই। জুড়ি নাই ঝগড়াঝাঁঠিতেও। বস্তুত আমাদের মতো এমন ঝগরুটে জাতি
খুব কমই আছে হয়ত। যেকোন বিষয় নিয়ে যেকোন সময়ই আমরা দুরন্ত ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতে পারি।
তার আরও একটা বড়ো কারণ, স্বভাব অলস বাঙালির জীবনে অবসর অনেক। ফলে ঝগড়া করার মতো
অঢেল সময় হাতে থাকায় আমাদের আর পায় কে। যদি সঠিক পরিসংখ্যান নেওয়া যেতে পারতো, দেখা যেত সোশ্যাল
নেটওয়ার্ক সাইটগুলিতে বাঙালির মতো আর কোন জাতি এত বেশিপরিমাণে ঝগড়া করে সময় নষ্ট
করে না। তর্ক বিতর্ক ভালো। কিন্তু আমাদের আলাপ আলোচনা তর্ক বিতর্ক কিছুদূর অগ্রসর
হয়েই পারস্পরিক ঝগড়ায় দাঁড়িয়ে যায়। আর এই কারণেই সারা বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে যে
পরিমানে আনফ্রেণ্ড আর ব্লক অপশান দুটি ব্যবহার করা হয়, সঠিক হিসাবে নিতে পারলে দেখা
যেত, অতি অবশ্যই তার
সিংহভাগই বাঙালির হাতেই ঘটে। এটাই আমাদের প্রকৃতি আমাদের স্বরূপ। আমাদের এই যে এক
সামাজিক চিত্র,
এটিও
হয়তো তেমন ক্ষতিকারক হয়ে উঠতো না, যদি না এর ভিতর কারণে অকারণে রাজনীতি ঢুকে পড়ে রাজনৈতিক
মল্লযুদ্ধ শুরু না হয়ে যেত। এই যে সবকিছুরই রাজনীতিকরণ বা একটা রাজনৈতিক চেহাড়া
ফুটে ওঠা যে কোন জাতির পক্ষেই সেটি একটি সামাজিক অভিশাপ। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়
অধিকাংশ বাঙালিই এই বিষয়ে আদৌ সচেতন নয়।
কবি কি
করছিলেন?
সেটি
বড়ো কথা নয়। তাই নিয়ে আলাপ আলোচনা, কবির কাজের নিন্দা প্রশংসা করা, সেটিও বড় কথা নয়। যে কোন
বিখ্যাত ব্যক্তিরই অধিকাংশ কাজের সমালোচনা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। সেটি
খ্যাতির বিড়ম্বনা হতে পারে। কিন্তু তার থেকে বড়ো কিছু নয়। যে কোন প্রকৃত কবিই তাই
সেই নিয়ে আদৌ মাথা ঘামান না। মাথা ঘামাতে পারেন একমাত্র তিনিই যিনি আদৌ বড়ো কবি
নন। এই কিছুদিন আগেই আমরা দেখেছি, কবি শঙ্খ ঘোষের একটি প্রাসঙ্গিক বক্তব্যকে ঘিরে একটি
রাজনৈতিক দলের দায়িত্বপূর্ণ নেতার অকারণ উষ্মা প্রকাশ নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হলেও সেই
ঘূর্ণী কবিকে উতলা করে নি আদৌ। কারণ যা কিছু অকারণ অযৌক্তিক তাই নিয়ে সময় নষ্ট
করার মতোন সময় থাকে না সত্যিকার প্রতিভাধর মনীষীদের। কবি শঙ্খ ঘোষের মধ্যেও ঠিক
সেই সত্যেরই প্রস্ফূটন দেখা গিয়েছিল ঠিক এই বছরেই। কি্ন্তু বড়ো কথাটা তাহলে কি? বড়ো কথাটা হলো এই যে, সামান্য কোন ঘটনা
যখন আতি সহজেই রাজনৈতিক একটা রঙ পেয়ে যায়, বুঝতে হবে সমাজটা ঠিক অভিমুখে
চলছে না। ঘুরপাক খাচ্ছে নিজেরই চতুর্দিকে।
এই যে
ক্রমাগত নিজেরই চারপাশে ঘুরপাক খেতে থাকা, এটি যে কোন জাতির পক্ষেই একটি
বড়ো অভিশাপ। বাঙালির ক্ষেত্রে এই ঘুরপাকের মূল ভরকেন্দ্রটিই হলো বাঙালির রাজনীতি।
রাজনীতিই আমাদের সমাজের সেই ঘূণপোকা, যা সমগ্র সমাজদেহটাকেই ফোঁপড়া করে দিয়ে রেখেছে
বিশেষ করে বিগত সাড়ে সাত দশকে। রাজনৈতিক রঙ না লাগানো অব্দি আমরা শান্তি পাই না
কিছুতেই। সকল বিষয়কেই রাজনৈতিক রঙের বলয়ে টেনে নিয়ে যাওয়াটাই আমাদের ধর্ম হয়ে
দাঁড়িয়ে গিয়েছে। আর এই কারণেই পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক অক্ষগুলির পক্ষ নিয়েই আমাদের
সকল বিষয়ে ওকালতি চলতে থাকে।
যাকে
নিয়ে বিতর্ক,
তিনি
যদি কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগামী হন, তবে তো কথাই নেই। সেই দলের কর্মী সমর্থকরাই তাঁর
সপক্ষে ওকালতি করতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন দ্রুত। ঠিক যেমন, সেই দলের বিরোধী পক্ষের কর্মী
সমর্থকরাও ঝাঁপিয়ে পড়বেন বিতর্কের কেন্দ্রে থাকার মানুষটির বিপক্ষে। ফলে শেষ
পর্য্যন্ত সামগ্রিক বিষয়টিই দাঁড়িয়ে যায় পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির রাজনৈতিক
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাকবিতণ্ডায়। হারিয়ে যায় মূল বিষয়টিই। হারিয়ে যায়, রাজনীতির বাইরে
সামাজিক আলোচনার স্বাস্থ্যদায়ক পরিসরটিই। আর যেহেতু আমাদের বাংলার রাজনৈতিক
পরিবেশটাই আজ ঘোলাটে হয়ে উঠেছে, হারিয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক শালীনতার মানদণ্ডটাই, ঠিক সেই কারণেই
বাকসংযম ও ভাষাগত শালীনতার সংস্কৃতিরও অপমৃত্যু ঘটে গিয়েছে এই বাংলায়। কাঁটাতারের
উভয় পারেই। যার যেখানে গলার জোর যত বেশি, সেই সেখানে শেষ কথা। তার কথাই আইন। তার ইচ্ছাই
আদালত।
এটাই এই
বাংলার বর্তমান চিত্র। আমরা স্বীকার করি আর নাই করি। অত্যন্ত পরিতাপের কথা এই যে
এমন কি কবি সাহিত্যিক পেশাজীবী বুদ্ধিজীবী থেকে আমজনতা সকলেই এই অপসংস্কৃতির শিকার
হয়ে পড়েছে আজ। কেউই আর বিরুদ্ধু সমালোচনা বরদাস্ত করতে পারি না আমরা। আমার কোন কাজ, ভুল হোক আর ঠিকই হোক, কারুর ভালো না
লাগলেই রে রে করে তেড়ে যেতে দেরি লাগে না আমাদের। বিশেষ করে সাথে পারিষদবর্গের দল
যদি ভারি থাকে আমাদের। আবার ঠিক তেমনই, অন্যের কোন কাজ ঠিকই হোক আর ভুলই হোক আমার
অপছন্দের হলেই হলো, তাকে অপরাধী কিংবা খলনায়ক বানিয়ে তোলার ভিতরেই যেন আমাদের যাবতীয়
আনন্দ। আর এইগুলি তখনই ঘটতে থাকে, যখন আমাদের হাতের কাছে রাজনৈতিক ফয়দা তোলার বিষয়টি মুখ্য
হয়ে ওঠে। এই যে রাজনৈতিক স্বার্থ, যার বাইরে দাঁড়িয়ে স্বাধীন মৌলিক চিন্তার পরিসরগুলিই
ক্রমাগত অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে থাকে, এইটিই সেই রাজনৈতিক ঘূণপোকা, যা আমাদের সমাজটিকে ছাড়খার করে
দিচ্ছে প্রতিদিন।
হ্যাঁ
সমাজের সকল স্তরের মানুষই আজ এই অসুস্থতার শিকার হয়ে পড়েছে। যে কোন রাজনৈতিক দলের
দলীয় স্বার্থের পক্ষে সেটি যতই ভালো হোক সমাজ ও জাতির জীবনে তা এক মারাত্মক ব্যাধি
বিশেষ। তাই কবির জুতো পালিশ নিয়ে বিতর্ক যতই ঘুলিয়ে উঠুক না কেন, মূল প্রশ্ন হলো
সমাজটাকে আজ পালিশ করবে কে?
২৭শে
ডিসেম্বর ২০১৮
কপিরাইট শ্রীশুভ্র
কর্তৃক সংরক্ষিত

