বাংলায় ছাত্ররাজনীতির চারদশক
শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতির প্রবেশ, দলীয় রাজনীতির
নিয়ন্ত্রণে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশে পঠন পাঠনের ঘোর অবনতিই সূচীত করে। জীবনের সমগ্র
পরিসরে শিক্ষার্জনের সময়সীমা খুবই সীমিত। সেই সীমিত কালসীমায় যে বিদ্যার্জন এবং
মেধার বিকাশ সাধন হয়, তার উপরেই সাধারণত বাকি জীবনের সুখ
শান্তি কর্ম ও পরিতৃপ্তি নির্ভর করে। নির্ভর করে একটি জাতি,একটি
দেশের উন্নতিও। রাজনীতির অঙ্গনে,সে নিজের ব্যক্তিগত আখের
গোছানোর দূর্নীতিই হোক কিংবা সুনাগরিকের দেশপ্রেমে অভিষ্ট দেশসেবা ও দেশের উন্নয়ণ
প্রক্রিয়ায় সদর্থক ভূমিকা রাখাই হোক; কর্মমুখর হয়ে ওঠার
জন্যে সারা জীবন পাওয়া যাবে। কিন্তু শিক্ষার্জনের জন্যে নির্দিষ্ট কয়টি দিনই
জীবনে পাওয়া যায়।
জীবনের সেই স্বল্প কয়টি দিন,যা কার্যকরি
শিক্ষার্জনের জন্যেই নির্দিষ্ট তা কখনই রাজনীতিচর্চার ক্ষেত্র হতে পারে না।
শিক্ষার্জনের এই পর্বটি ছাত্রছাত্রীর মৌলিক মেধা বিকাশের প্রস্তুতি পর্ব। তারা এই
কালসীমায় শিক্ষা আহরণ করবে, আত্তীকরণ করবে। সেই অধীত
বিদ্যায় তাদের মেধা পুষ্ট হতে থাকবে। বিকশিত হয়ে ওঠার পথে দ্রুত গতিশীল থাকবে।
এবং পর্বে পর্বে তাদের মৌলিক চিন্তা শক্তির বিকাশ ঘটবে। পারদর্শী হয়ে উঠবে কোনো
না কোনো কার্যকরী বিদ্যায়। যে পারদর্শিতায় তারা তাদের কর্মজীবনে ক্রিয়াশীল
থাকবে জীবনের মূলপর্বে। তাই সমগ্র জীবনের প্রেক্ষিতে শিক্ষাজীবনের এই মূল্যবাণ
পর্বটি জীবন গড়ার জন্যেই নির্দিষ্ট থাকা উচিত।
কিন্তু। দুই বাংলায় শিক্ষাক্ষেত্র আজ
ছাত্ররাজনীতির অভিশাপের করাল গ্রাসে। কেন এমন হলো? সেটা বুঝতে গেলে একটু ফিরতে হবে
ইতিহাসে। বৃটিশ এসে শাসনকার্য পরিচালনা এবং শোষণকার্য চালু রাখার জন্য বশংবদ
রাজভক্ত কর্মচারী তৈরীর কারখানা স্বরূপ পত্তন করল আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা। যে
শিক্ষাব্যবস্থা সমাজদেহের অন্তর থেকে গড়ে উঠল না। বিদেশী শোষক চাপিয়ে দিলো বাইরে
থেকে। ফলে দেশের নাড়ির স্পন্দন থেকে বিচ্যুত, জাতির ঐতিহ্য
ও উত্তরাধিকারের সাথে সম্পর্কহীন, স্বদেশের প্রাণের সাথে
শিকড়হীন এমন এক শিক্ষা পদ্ধতি চালু হল,যা মেরুদণ্ডহীন
অনুকরণ প্রিয় নকলনবীশ মুখস্ত বিদ্যায় পারদর্শী ডিগ্রী সর্বস্ব চাকুরী প্রার্থী
তৈরী করে।
ফলে শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ালো চাকুরী
সন্ধান। মৌলিক মেধা বিকশের জন্যে সমগ্র জীবনের উদ্বোধন নয়। সুচতুর বৃটিশ বুঝেছিল
শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রথমেই যদি জাতির মেরুদণ্ডটি ভেঙ্গে দেওয়া যায়, তবে সেই জাতিকে
শতাব্দীব্যাপি বশংবদ করে রেখে শোষণ প্রক্রিয়াকে সুনিশ্চিত করা যায়। আর
স্বাধীনতার নামে ভারতবর্ষে বৃটিশের তাঁবেদারদের হাতে শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতা
হস্তান্ততরের পর, স্বদেশী শোষককুল সেই একই শোষণ ব্যবস্থা
জারি রাখার উদ্দেশ্য বৃটিশ প্রবর্তীত শিক্ষাব্যবস্থাকেই বজায় রাখল। আগে যেখানে
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারখানায় বৃটিশভক্ত রাজকর্মচারী তৈরী হতো; এখন সেখানেই রাজনৈতিক দলীয় কর্মী তৈরীর ব্যবস্থা শুরু হয়ে গেল।
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল রাখার
উদ্দেশ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ নেতাকর্মীর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের প্রবাহ বজায় রাখার
জন্যে শিক্ষাক্ষেত্রকেও রাজনীতির পরিমণ্ডলে নিয়ে আসা হল ছাত্ররাজনীতির নাম করে।
ছাত্ররাজনীতি শিক্ষাক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করল। আর ছাত্ররাজনীতির
নিয়ন্ত্রণ থাকল রাজনৈতিক দলগুলির হাতে। ছাত্ররা ব্যবহৃত হতে থাকল দলীয় রাজনীতির
স্বার্থে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য গৌন থেকে গৌনতর হতে থাকল। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি
রাজনৈতিক দলেগুলির আখড়ায় পরিণত হল। শিক্ষাক্ষেত্রও হয়ে উঠল রাজনৈতিক দলগুলির
অঞ্চল দখলের লড়াইয়ের ময়দান। নষ্ট হয়ে গেল স্কুলকলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের
পরিবেশ। ছাত্র শিক্ষক সুসম্পর্ক।
শিক্ষাক্ষেত্রে এরফলে নেমে এসেছে এক চরম নৈরাজ্য।
এবং সেটা কাঁটাতারের উভয় পাড়েই সত্য হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে সরকারী
ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে পরস্পরের রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াইয়ের একটা বড়ো
ময়দান হয়ে উঠেছে শিক্ষাক্ষেত্রগুলি। শিক্ষাঙ্গনের ছাত্ররাজনীতিতে তারই স্পষ্ট
প্রভাব পড়ছে। আর পড়েছে বলেই বারবার বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে মুক্ত চিন্তাশক্তি ও মৌলিক
মেধা বিকাশের পথটি। ছাত্ররা হাফপ্যাণ্ট পড়া থেকেই দেশের বা রাজ্যের প্রধান
রাজনৈতিক দলগুলির দলদাসে পরিণত হয়ে পড়ছে। তথাকথিত ছাত্ররাজনীতি ছাত্রছাত্রীদেরেই
স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলিরই স্বার্থ এক
তাই এই অভিশাপ চলবে।
পশ্চিমবঙ্গে সর্বনাশটা শুরু হয়েছিল নকশাল
আন্দোলনের সামূহিক ব্যার্থতার সরাসরি কুফল থেকেই। রাজ্য মেধাশূন্য এক মধ্যমেধার
রামরাজত্বে পরিণত হয়ে গেল। সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি এইটাই যে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের
মানসিকতায় দেশ সমাজ ও জাতির আর কোনো প্রাসঙ্গিকতাই রইল না। কেবলমাত্র নিজের পেশাগত
উন্নতিই জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালো। যার ফলে দেশ থেকে মেধা নিষ্ক্রমণ হয়ে
দাঁড়ালো যুগধর্ম। আর এই বিষয়ে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেসী প্রশাসন চূড়ান্ত সফল
হয়েছিল তাদের প্রশাসনিক তৎপরতায় ও বর্রবতায়। ভীত সন্ত্রস্ত অভিভাবকমণ্ডলী নিজেদের
সন্তানদেরকে রাজনীতির প্রাঙ্গন থেকে সড়িয়ে নিতে ব্যগ্র হয়ে উঠলেন। আর সেই শূন্যতা ভরাট করতেই রামরাজত্ব শুরু হলো মধ্যমেধার।
এরাজ্যে সত্তর দশকের মধ্যভাগ থেকেই এই সংস্কৃতি
গ্রাস করলো গোটা সমাজ জীবনকে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা মনে করল প্রত্যক্ষ রাজনীতি
চর্চার নীট ফল শূন্য;
তাই তারা নিজেদের পেশাগত উন্নতিকেই পাখির চোখ করা শুরু করল। বাবা
মায়েরাও ছেলে মেয়েদের ডাক্তার ইঞ্জীনীয়র করার ইঁদূর দৌড়ে ঠেলে দিতে থাকলেন।
কারণ নকশাল আন্দেলনের চূড়ান্ত ব্যর্থতার
সুযোগে মধ্যমেধার বুদ্ধিমানেরা ততদিনে সব পাদপ্রদীপের আলোতে আলোকিত হতে শুরু করে
দিয়েছে। ছাত্রদের চেতনায় দেশ ও জাতি গঠনের নতুন দিনের স্বপ্ন দেখার যুগের অবসান ঘটল খুব দ্রুত। আর এই সুযোগে- কংগ্রেসী আমলের অবসান ঘটিয়ে সদ্য ক্ষমতায় আসা সিপিএম তাদের তিন দশকের
সাম্রাজ্য বিস্তারে হাতিয়ার করলো এই মধ্যমেধা চর্চার পরিসরটিকেই। সেই পথেই গোটা
শিক্ষা ব্যবস্থাই হয়ে উঠল সিপিএম-এর ভোটব্যাঙ্কের সেফটি ভল্ট।
সেদিন জ্যোতিবসুর নেতৃত্বাধীন সিপিএম বোঝেনি এই
ব্যবস্থা গোটা জতির পক্ষেই একদিন চূড়ান্ত অভিশাপ হয়ে দেখা দেবে। বোঝেনি কারণ, বোঝার জন্যে যে
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেম লাগে, সেটা তাদের ছিল না। তাদের
কাছে পার্টির প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন ও সেই শক্তি ধরে রাখাই মূল বিবেচ্য ছিল। দেশ গঠন
ও জাতি গঠনে সমাজবিপ্লবের যে ভূমিকা, সেই ভুমিকা পালন করার
মতো কোন যোগ্যতাই এই পার্টি ও তার কোনো নেতৃত্বেরই ছিল না। তার ফল স্বরূপ ক্ষমতার
ননী মাখন খেতে পার্টিতে বেনোজল ঢোকার রাস্তাটাও বিশাল রাজপথ হয়ে গেল। আর সেই পথেই
সিপিএম-এর হাত ধরে এরাজ্যে দূর্নীতির বিকেন্দ্রীকরণ ঘটল খুব দ্রূত। যার ফলে
সামাজিক অবক্ষয়ের পরিসরটি বিস্তৃত হল পুরোপুরি।
আর সেই অবক্ষয়ের সর্বপ্রথম আঘাত পড়লো
শিক্ষাব্যবস্থার আঁতুরঘর রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিসরে ও শিক্ষা ব্যবস্থার
সামগ্রিক পরিকাঠামোতেই। প্রতিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে উঠল ক্যাডার তৈরীর
কারখানা। পার্টির তৈরী করে দেওয়া শেখানো বুলির তোতাপাখি হিসেবে গড়ে তোলা হতে থাকল
যুবসম্প্রদায়কে। যাদের হাতে পড়ে রইল একটাই লক্ষ্য; পার্টির ভোটব্যাঙ্ক বাড়ানো আর
সেই সুযোগে সরকারী চকুরীর প্রসাদ পাওয়া।
মৌলিক চেতনার পূর্ণ বিকাশে শিক্ষার আর কোনো ভূমিকাই থাকল না। একদল তাদের
মেধার যোগ্যতায় পাড়ি দিতে থাকল রাজ্যের বাইরে। আর একদল ছাত্ররাজনীতির নামে আখের
গোছানোর কাজে নিবিষ্ট থাকল। রাজনৈতিক নেতানেত্রীর শেখানো বুলির বাইরে তাদের
বুদ্ধিবৃত্তি পুষ্ট হল না আর। যে কোন জাতির পক্ষেই এ এক ভয়ঙ্কর অবস্থার অশনি
সংকেত। দুঃখের বিষয় সিপিএম-এর নেতৃত্বের, এই আশনি সংকেত
অনুধাবন করার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল না সেদিন। উল্টে তাঁদের নির্দ্দিষ্ট
পরিকল্পনায় ছাত্ররাজনীতিকে গড়ে তোলা হল পার্টির ভোটব্যাঙ্ক বৃদ্ধির দুরন্ত হাতিয়ার
হিসেবেই। গোটা রাজ্যের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের পতাকার তলায় নিয়ে আসতে
পারার বিজয়াল্লসেই তারা তখন মত্ত। সেই সাথে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক
অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগে পার্টির প্রতি আনুগত্যই যোগ্যতার প্রথম ও প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ালো
দিনে দিনে। এইরকম নিষ্ছিদ্র বন্দোবস্তের সফল বাস্তবায়নে সিপিএম যখন আনন্দে
আত্মহারা তখন তলায় তলায় রাজ্যে বছরের পর বছর বিকলাঙ্গ মানসিকতার প্রজন্ম গড়ে উঠতে
থাকল। যাদের কাছে পার্টির পতাকা জড়িয়ে ব্যক্তিগত আখের গোছানোই জীবনের মূলমন্ত্র
হয়ে উঠল। উঠল শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণ থেকেই।
তাই গত তিনদশক ধরেই এরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার মান
ক্রমাগত নীচে নামতে নামতে আজকে সিপিএম-এর বংশধর এই তৃণমুলী আমলে এসে তলানীতে
ঠেকেছে। বিশ্ববিদ্যালয় আজ আর জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র নয়। সরকারী চাকুরীর
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্যতম আখরা আর সরকারী দলের ভোটব্যাঙ্কের নাটবল্টু উৎপাদনের
কারখানা মাত্র। এই পরিসরে মধ্যমেধার সুবিধেভোগী বুদ্ধিজীবিদেরই রমরমা। তাই তারাই
নানান ভাবে এই শিক্ষাব্যবস্থার পরিকাঠামোতে যুক্ত হয়ে ক্ষমতার ননী মাখন চাটতে
ব্যস্ত। আর বর্তমান শাসকদল সিপিএমের তিনদশকের আখের গোছানোর পরিকল্পনাকে প্রথম তিন
মাসেই সফল করে ফেলেছে। তাই বর্তমানে প্রকৃত সৎ ও মেধাবী শিক্ষাব্রতী মানুষদের
পক্ষে এই রাজ্যের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই কাজ করা শুধু অসম্ভবই নয়, নিরাপদও নয়।
তাই যঃ পলায়তি সঃ জীবতি।
বস্তুত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেসী আমলের নকশাল আন্দোলনকে দমন করার রাজনৈতিক ফয়দাটি
পরিপূর্ণ সদ্ব্যব্যহার করেই সিপিএম-এর সাড়ে তিনদশকের রাজত্ব। দেশে মধ্যমেধার রমরমা
চললেই ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে একটানা রাজত্ব চালানোর সমূহ সুবিধে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের
এই মূলসূত্রটি জ্যোতিবসুর নেতৃত্বাধীন পার্টি খুব ভালো করেই জানতো। আর সেই কাজেই
রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডটি জ্যোতিবসুর আমল থেকেই ভেঙ্গে ফেলা শুরু হয়েছিল
খুব দক্ষতার সাথেই। কিন্তু তখন তাঁরা বোঝেননি, তাঁদের সেই অপকর্মের ফলশ্রুতি একদিন কি ভয়ানক হতে পারে। যে ধারার
সূত্রপাত তাঁরা করে গেলেন, তা যে কি বিদ্ধংসী সংস্কৃতির জন্ম
দিয়ে গেল,আজকে পরিবর্তনের প্রথম চার বছরেই রাজ্যবাসী তা
মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পারছেন। এ যেন সন্ত্রাসীদের হাতে পরমাণু বোমার চাবিকাঠি
তুলে দেওয়ার মতো ব্যাপার।
তাই আজ যখন ভুতপূর্ব শাসকদলের নেতানেত্রীদেরকে
বর্তমান প্রশাসকের দিকে সমালোচনার তর্জনী তুলতে দেখা যায়, রাজ্যবাসী তখন
আর সেই তর্জনীকে বিশ্বাস ও ভরসা কোনোটাই করতে পারে না। চূড়ান্ত দুঃখের বিষয় এটাই, আজকে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার চূড়ান্ত অবক্ষয় দেখেও ভুতপূর্ব শাসকদলের
নেতানেত্রী থেকে একনিষ্ঠ ভক্তদের কাউকেই তাদের পার্টির এমন ক্ষমাহীন অপকর্মের জন্যেও আত্মসমীক্ষা করতে
দেখা যায় না। দেখা যায় না নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে সামান্যতম হলেও লজ্জিত হতে।
এটাই এ রাজ্যের চরিত্র।
পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের চৌঁত্রিশ বছরের শাসন
আমলে ছাত্ররাজনীতিকে ক্যাডার তৈরীর প্রক্রিয়া হিসেবে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে
যাওয়া হয়ছিল। এবং সাংগঠনিক দৃঢ়তায় ছাত্ররাজনীতিকে কার্যত বিরোধীশূন্য করে, বামফ্রন্টের
একছত্র আধিপত্য রাজ্যে এক বিরোধীশূন্য গণতান্ত্রিক পরিসরের সংস্কৃতির পত্তন
করেছিল। ছাত্র থেকে শিক্ষক, পঠনপাঠন থেকে কর্মসংস্কৃতি
সর্বত্র বামরাজনীতির ছাত্রসংগঠনটি নিঃশ্ছিদ্র আধিপত্ত বিস্তার করেছিল। তাতে
শিক্ষাবিস্তার হোক না হোক, রাজনৈতিক আধিপত্ত বিস্তারের কাজটি
হয়ে ছিল নিখুঁত। পরিবর্ত্তনের কাণ্ডারীরা এইখান থেকেই ক্ষমতা দখলের সূত্রটি গ্রহণ
করে।
পরিবর্ত্তনের কাণ্ডারীরা ক্ষমতায় এসেই রাতারাতি
বাম আমলের চৌঁত্রিশ বছর ধরে গড়ে তোলা আধিপত্ত, দুদিনের মধ্যেই কায়েম করতে সমস্ত
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সরাসরি পেশিশক্তির আস্ফালনের
উপর নির্ভর করতে শুরু করল। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা দিতে থাকল বিভিন্ন কলেজে
ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে। অধ্যাপক অধ্যক্ষ নিগ্রহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই যে
শিক্ষাক্ষেত্রের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এর জন্যে বর্তমান সরকারি দলের প্রত্যক্ষ
মদত নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে না। এবং এই প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এক কলেজ থেকে
আর এক কলেজে। এক অঞ্চল থেকে আর এক অঞ্চলে।
এবং রাজনৈতিক জমি দখলের লড়াইয়ে ব্যবহৃত
পেশিশক্তিই সরাসরি ছাত্ররাজনীতির নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্কুল কলেজ
বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারী দলের তাঁবেতে নিয়ে আসতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছে
স্বাভাবিক পঠনপাঠনের পরিবেশ। সমস্ত রাজ্য জুড়ে এই যে পেশিশক্তির দাপটের আস্ফালন
আছড়ে পড়ছে শিক্ষাঙ্গনের চত্বরে, অবশ্যই এর পেছনে সরকারী দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের
সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। তারা ভাবছেন, বাম আমলের সাড়ে
তিনদশকের রাজত্বের অন্যতম স্তম্ভ এই ছাত্ররাজনীতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে
পারলে তাদেরও দীর্ঘমেয়াদী সময়সীমায় শাসন ক্ষমতা দখলে রাখা সহজ সাধ্য হবে। তাই
গণতন্ত্রের পরিসরে স্বৈরতন্ত্রের অভিলাষ চরিতার্থের এই প্রয়াস চলছে।
এই যে ক্ষমতা দখলের রাজনীতির অভিশপ্ত নাগপাশ
গ্রাস করে ফেলেছে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে, এখানেই কপাল পুড়েছে বাংলা ও বাঙালির।
পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ জুড়ে চিত্রটা মূলত একই রকম। এর পরিণতি ভবিষ্যতে যে
ভয়াবহ সে কথা সহজেই অনুমেয়। যে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড স্বরূপ সেই
শিক্ষাব্যবস্থার আগাগোড়া ঘূণে ধরে গেলে সে জাতির উন্নতি কোনোদিনও সম্ভব নয়। নয়
বলেই উন্নত বিশ্বের জাতিগুলির শিক্ষাব্যবস্থা এই ঘূণ থেকে মুক্ত। সেসব দেশে
শিক্ষাক্ষেত্র রাজনৈতিক কলুষতা মুক্ত। শিক্ষাক্ষেত্র সেখানে জাতির ভবিষ্যত
সুনাগরিক গড়ে তোলার অঙ্গন। মৌলিক মেধা বিকাশের সুবিস্তৃত মুক্ত পরিসর।
জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পীঠস্থান।
সুচতুর বৃটিশের প্রবর্তীত শিক্ষাব্যবস্থা, ও তাদের তৈরী
করে দেওয়া ভোট সর্বস্ব ক্ষমতালোভী গণতন্ত্রের যুগলবন্দীর ফল ফলেছে আজ কাঁটাতারের
উভয় পাড়ের বাংলায়। সেই ফলেরই অভিশপ্ত ফসল এই ছাত্ররাজনীতি। সারা বাংলা জুড়ে আজ
তাণ্ডব চালাচ্ছে। কিন্তু এই অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে গেলে সমাজ বিপ্লব ছাড়া
অন্য কোনো পথ নেই। যে রোগ সমাজদেহের ভিতরে শিকড় ছড়িয়েছে; সমাজদেহের
গভীর থেকে তার মূলোৎপাটন করতে গেলে সমাজ সংস্কার করতে হবে আগাগোড়া। আর সেই
সমাজসংস্কার সম্ভব একমাত্র সমাজ বিপ্লবের পথ ধরেই। এই অভিশপ্ত ছাত্ররাজনীতির কবল
থেকে শিক্ষাঙ্গনকে মুক্ত করতে না পারলে বাংলা ও বাঙালির ভবিষ্যত যে অন্ধকার সে কথা
বিতর্কের উর্দ্ধেই।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

