সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও দাঙ্গার রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও দাঙ্গার রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও দাঙ্গার রাজনীতি



সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও দাঙ্গার রাজনীতি

ভুমিকা:

না দিল্লীর সাম্প্রতিক হিংসায় কতজন আহত নিহত হলো, সেটি খুব একটা বড়ো কথা নয়। যতজনই হোক যে পক্ষেরই হোক। ব্রিটিশের হাতে পত্তন হওয়া ভারতবর্ষের, বিগত একশত বছরের ইতিহাসে  হিংস্র জনতার বীভৎস আক্রমণে মানুষের মৃত্যুমিছিল এই প্রথম নয়। এর আগেও বহুবার সংঘঠিত হয়েছিল। এবং এর পরেও হবে। অনেকেই এই কথায় অবাক হতে পারেন। শত শত মানুষের মৃত্যু কোন বড়ো কথা নয়? এ কেমন কথা? এ কোন যুগে এসে পৌঁছালাম আমরা। বড়ো কথা নয় এই কারণেই যে, বিগত একশত বছরে দাঙ্গা ও গণহত্যায় ভয়াবহতা সময়ের সাথে বেড়েছে বই কমে নি। মানুষের ভিতর সাম্প্রদায়িক ও জাতি বিদ্বেষ বেড়েছে বই কমেনি। রাজনীতির কারবারিদের এক একটি দাঙ্গা কিংবা গণহত্যায় ফুলে ফেঁপে উঠে আরও শক্তিশালী ও প্রভবাশালী হওয়ার ঘটনা বেড়েছে বই কমেনি। ফলে এই উপমহাদেশে দাঙ্গা এবং গণহত্যা সমাজ ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে একটি বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকাই ভালো। দাঙ্গা কিংবা গণহত্যা কিন্তু সমার্থক নয়। দাঙ্গা মূলত দুটি পক্ষের পারস্পরিক হানাহানির ঘটনা। সে যে পক্ষই শুরু করুক না কেন। গণহত্যা কিন্তু স্বতন্ত্র। গণহত্যায় একটি পক্ষ হত্যলীলা সংগঠিত করে। অপর পক্ষেই মানুষ আহত নিহত হয়। ঠিক যেমন আশির দশকে আসামে বাঙালি নিধনে সহস্রাধিক বাঙালির হত্যা সংগঠিত করা হয়েছিল। এই দুটি ঘটনাই আবার রাষ্ট্রীয় মদতে ঘটাও সম্ভব। অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতেই রাষ্ট্রীয় মদত ছাড়া দাঙ্গা বা গণহত্যা সংঘটিত হয়ও না। তাঁদের মতবাদের পক্ষে অবশ্য যুক্তিও রয়েছে। কারণ খুবই স্পষ্ট। দেশের প্রতিরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ একমাত্র রাষ্ট্রের হাতেই ন্যাস্ত থাকে। ফলে সেই নিয়ন্ত্রণকে পাশ কাটিয়ে দাঙ্গা লাগানো তখনই সম্ভব, রাষ্ট্র যদি জেনে বুঝে না দেখার ভান করে। এছাড়া, একমাত্র কোন দুর্বল রাষ্ট্রে দুই বা একাধিক পক্ষে গৃহযুদ্ধ লাগলে স্বতস্ফূর্তঃ ভাবে রাষ্ট্রীয় মদত ছাড়াই দাঙ্গা লাগা সম্ভব।

দিল্লীতে এই সপ্তাহের সংঘটিত হত্যালীলা ও ধ্বংসযজ্ঞ দাঙ্গা না গণহত্যা সেটি অবশ্য ক্ষয়ক্ষতির সামগ্রিক চেহাড়া স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে না। কিন্তু যে সকল ছবি সম্প্রতি প্রকাশ হয়ে পড়েছে, সেগুলি ভালো করে দেখলেই বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, এই হত্যালীলা ও ধ্বংসযজ্ঞ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। পরিকল্পিত ভাবে কোন একটি বিশেষ পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্দেশে ঘটনো। বহু ছবিতে দিল্লী পুলিশের সামগ্রিক ভুমিকা দেখে শিহরিত সাধারণ জনতা। পাথর ছোঁড়ারত পুলিশের ছবি। দাঙ্গাবাজদের সাথে একসাথে অন্যসম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর দিকে ধেয়ে যাওয়া পুলিশের ছবি। রাজপথের সিসিটিভি ধ্বংসরত পুলিশের ছবি। রাজপথে শায়িত নৃশংস ভাবে আহত বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষজনদের দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানোরত পুলিশের ছবি। বিশেষ জনগোষ্ঠীর দোকানে আগুল লাগানোয় ব্যস্ত দাঙ্গাবাজদের নিরাপত্তায় বিশাল পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতির ছবি। এই রকম শত শত ছবির ভিতর দিয়ে দিল্লী পুলিশের ভুমিকা পর্যালোচনা করলে বুঝতে অসুবিধা থাকার কথা নয়, সাম্প্রতিক দিল্লীর সহিংসতায় ঠিক কারা জড়িত। এবং কোন শক্তির মদতে সংগঠিত পুর্বপরিকল্পনায় ঘটানো হয়েছে এই বীভৎস দাঙ্গা বা গণহত্যা।

পদ্ধতি:

প্রকাশিত সংবাদ এবং দৃশ্যমান ছবিগুলি থেকে দেখা যায়, এই দাঙ্গা বা গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল একাধিক স্তরে ও একাধিক পর্বে ভাগ করে। সকলের প্রথমে বিশেষ সম্প্রদায়ের বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সমর্থকরা পথে নেমে পড়ে। সরকারের জনবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে মাসাধিককাল ব্যাপি চলা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করা জনতার বিরুদ্ধে তারা ক্রমাগত হিংসাত্মক স্লোগান দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। এর পরেই পুলিশের বেপরোয়া লাঠি চালানোয় রাজপথে অবস্থানরত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ এর বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী মহিলারা ছত্রভঙ্গ হয়ে প্রাণ হাতে ছুটোছুটি করতে থাকে। এদের ভুমিকা সফল ভাবে সংঘটিত হওয়ার পরেই সামনে নেমে পড়ে পাথরবাজরা। কারণ পাথর না ছুঁড়লে দাঙ্গা লাগানোর মতো উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরী করা কষ্টকর। ঠিক এই কারণেই সরকারে আসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদেরকে বিশেষ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক স্লোগান দিতে দিতে ঘটনা শুরুর আগের দিনেই জায়গায় জায়গায় ট্রাক ভর্তি পাথর ফেলাতে দেখা গিয়েছে। পাওয়া গিয়েছে তেমনই ভিডিও ছবি। এবার সেই পাথর কাজে লাগানোর পালা। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ও পূর্বপরিকল্পিত ছক মাফিক সেই কাজে এবার হাত লাগায় দ্বিতীয় স্তরের কুশীলবরা। এবং তার ফলও মেলে হাতে হাতে। বিগত আড়াই মাস শত প্ররোচনা সত্তেও যাঁদেরকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ফাঁদে ফেলা যায়নি, এবার সরাসরি তাদের মাথা ফাটিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় মারামারিতে টেনে আনা গেল। ফলে শুরু হয়ে গেল দুই পক্ষের পাথরছোঁড়ার যুদ্ধ। একদিকে পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক সংগঠিত আক্রমণ। আর অন্যদিকে হতচকিত বিভ্রান্ত অসংগঠিত প্রতিরোধ। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছিল দিল্লীতে। এর পরের স্তরে আসে লাঠিবাজদের দল। প্রথমে পুলিশ ও দাঙ্গাবাজরা মিলিত হয়ে একাধিক রাস্তার বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ভাঙা্র কাজে হাত লাগায়। উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এরপরেই পাশে সরকারী পুলিশ নিয়ে এলোপাথারি ভাঙচড় চালিয়ে বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষকে তাড়া করে মানুষের যানবাহন ঘরবাড়ি দোকানপাট আক্রমণ করা শুরু হয়ে যায়। রাস্তায় ফেলে বেধড়ক লাঠির বাড়িতে জখম করা হয় বহু মানুষকে। এবং এই কাজে পুলিশের তৎপরতাও ছিল দেখার মতো। এইসময়েই একাধিক দাঙ্গবাজদেরকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের বীরত্বের ছবি লাইভ টেলিকাস্ট করতেও দেখা গিয়েছে। এদের কাজ সফল হওয়ায়, বহু এলাকা ছেড়ে মানুষ দোকান পাট বাড়িঘরে তালা ঝুলিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে শুরু করে। এইপর্বেই আতঙ্কিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে দেখা যায় অন্য সম্প্রদায়ের অনেক মানুষকেই। কেউ কেউ নিজের জীবন বিপন্ন করেও পড়শীর প্রাণরক্ষায় এগিয়ে আসেন। ঠিক যে চিত্রটি ধ্বংস করাই রাষ্ট্রীয় মদতে সংঘটিত যে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুল উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু এতেও শেষরক্ষা হয় না। এরপরেই আসরে নামে পরবর্তী স্তরের কুশীলবরা। একে একে দোকানপাট বাড়িঘরের তালা ভেঙে ঢুকে পড়ে লুঠপাঠ ও অগ্নিসংযোগে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। যাতে দরকারী নথিপত্র ইত্যাদি সব ভস্মীভুত হয়ে যায়। সন্ত্রস্ত ভীত এবং প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসা জনতার উপর দেশি বন্দুকের গুলিচালানো শুরু হয়ে যায় এলোপাথারি ভাবে। ফলে বেশির ভাগ মৃত্যুই ঘটছে দেশি বন্দুকের গুলিতে। বিপুল পরিমাণে দেশি বন্দুক মজুত করা হয়েছিল দিনে দিনে। এমনকি ডালডার ভিতর প্যাকেটে মুড়ে দেশি বন্দুকের সরবরাহের ছবিও দেখা যাচ্ছে। এরপরেই একধিক বহুতলের ছাদ দখল করে চারিদিকে পাথরবৃষ্টি ও পেট্রলবোমা ছোঁড়া হতে থাকে। পেট্রলবোমা ছোঁড়ার কাজে দেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বোমা নিক্ষেপের রেঞ্জ বাড়ানো হয় বিশেষ ভাবে। এই কাজে দীর্ঘ প্রশিক্ষণের ইতিহাস থাকাই স্বাভাবিক। এই পর্বেই একাধিক স্কুল মসজিদ মাদ্রাসায় ভাঙচুড় সংঘটিত করে অগ্নি সংযোগ করা হয়। শত শত গাড়ি পুড়িয়ে ভস্মীভুত করা হয়। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই বীভৎস ধ্বংসলীলা সংগঠিত করা সুদক্ষ ও প্রশিক্ষিত বাহিনী ছাড়া সম্ভব নয়। এরাই অন্তিম স্তরে দাঙ্গার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় পুলিশকে নিজেদের নিরাপত্তায় নিযুক্ত রেখে। এইভাবেই প্রথম তিনদিনের সামগ্রিক ঘটনা ঘটানো হয়েছিল বলেই প্রাথমিক সংবাদ ও প্রামাণ্য চিত্র বিশ্লেষণ করে অনুমান করা যায়। স্বাভাবিক ভাবেই জায়গায় জায়গায় পাল্টা প্রতিরোধের সমানা সামনি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু তাতেও ধ্বংসলীলা ও গণহত্যা প্রতিরোধ করা যায় নি।

হ্যাঁ এরপরেই বিশাল পুলিশ বাহিনী নামিয়ে রুটমার্চ করে জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শদাতার বয়ানে জনগণকে বরাভয় দেওয়া হয়, যা হয়েছে হয়ে গেছে। আর চিন্তার কিছু নাই। জনগনের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। সকলকে সরকারের উপর ভরসা রাখতে আহ্বান করাও হয়েছে।

বিশ্লেষণ:

যেকোন ঘটনা বিশ্লেষণে একাধিক তথ্য উঠে আসে। সেই তথ্যগুলিকে যুক্তিগ্রাহ্য পরম্পরায় সমন্বিত করতে পারলে একটি চিত্র পাওয়া যায়। সেই চিত্রই মূল উদ্দেশের দিকে, দিক নির্দেশ করতে সহায়ক হয়। ভারতবর্ষের বর্তমান শাসককুল দেশবাসীকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে বিভাজিত করে পরস্পর মুখোমুখি দ্বন্দের দিকে ঠেলে দিতে বদ্ধপরিকর। এবং এই বিষয়ে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাও সীমাহীন। এবং এই উদ্দেশ্যকে পাখির চোখ করেই দেশব্যাপি এন আর সি করার পরিকল্পনা। এবং সেই পরিকল্পনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন আদায়ের উদ্দেশেই সংশোধিত নাগরিকপঞ্জী ২০১৯ আইন। যে আইন পাশ হওয়ার পরমূহুর্ত থেকেই দেশব্যাপি লাগাতার গণআন্দোলন সংগঠিত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ভাবে। বিভিন্ন জায়গায়। লক্ষণীয় এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে মূলত সাধারণ জনগণ এবং অন্তঃপুরবাসিনী গৃহকর্তীদের উদ্যোগে। যাতে প্রথমাবধি সামিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ নানা পেশার নানা ধর্মের ও নানা জাতির সাধারণ মানুষও। বস্তুত কোন রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দেশব্যাপি এতবড়ো আন্দোলন একটি অভুতপূর্ব ঘটনা। এখন শাসককুলের কাছে এই আন্দোলন তাদের অভীষ্ট সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির পক্ষে এক বিপুল হুমকির বিষয়। এরই ভিতর, দিল্লীর শাহিনবাগ এখন বিশ্বের গণআন্দোলনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। প্রায় আড়াই মাসব্যাপি সাধারণ ঘরসংসারের গৃহকর্তীরা ২৪ ঘন্টা যে অবস্থান আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটি সমগ্র বিশ্বেই অভিনব এবং অভুতপূর্ব। অতিদ্রুত এই আন্দোলন স্তব্ধ করে না দিতে পারলে, আবিশ্ব ভারত সরকারের মুখ পুড়বে। বর্তমান শাসককুল তাই অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত। তাদের একটি আশা ছিল সাম্প্রতিক দিল্লী নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারলে, আইন প্রয়োগ করে হোক বলপূর্বক হোক যেকোন ভাবেই শাহিনবাগের আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু দিল্লী বিধানসভার সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভারতবর্ষের শাসক দলের ভরাডুবি দলটিকে‌ অত্যন্ত বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত করে তুলেছে ভিতরে ভিতরে। ফলে তাদের কাছে এখন একটি পথই খোলা। একদিকে সরকারী প্রভাব খাটিয়ে সংশোধিত নাগরিক আইন ২০১৯ এর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলাগুলির শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার জন্য স্বচেষ্ট হওয়া। ও অন্যদিকে সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে দেশব্যাপি জনগণের ভিতর তীব্র সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া। যাতে দেশব্যাপি চলতে থাকা গণআন্দোলনকে বিভ্রান্ত করে দিশাহারা ও দুর্বল করে দেওয়া যায় সহজেই। আর সেই কাজে একটি দুইটি দরকারে একাধিক, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নামে গণহত্যার মতো ঘটনা শাসককুলের কাছে শেষ ভরসা। কিন্তু সেটি সফল করতে গেলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও তাকে কার্যকর করার মতো জনসমর্থনও প্রয়োজন। সেই জনসমর্থন তৈরীর দীর্ঘ প্রক্রিয়া চলে আসছে বিগত ছয় বৎসর ব্যাপি। প্রথমে গোরক্ষার নামে গোরক্ষখ বাহিনী তৈরী করার সমাজিক প্রক্রিয়া। এর সাথে আমিষ নিরামীষ খাদ্যাভ্যাসের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি। দেশব্যাপি সমাজের সকল স্তরে সাম্প্রদায়িক স্লোগান ছড়িয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক হিংসার বাতাবরণ তৈরী করা। বিগত ছয় বছরে এই বিষয়ে বর্তমান শাসককুলের সাফল্য প্রশ্নাতীত। স্বাধীনতাউত্তর ভারতবর্ষে এই পরিমাণ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চার ঘটনা আগে আর ঘটে নি। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না বলেই আতঙ্কিত শাসককুল। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের এই ভয়াল পরিবেশের ভিতরেও রাজনৈতিক দলগুলির নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই যে গণআন্দোলন শুরু হয়েছে, তাকে প্রতিরোধ করার শেষ রাস্তাই হলো ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই সপ্তাহের দিল্লীর ঘটনা তারই প্রকৃষ্ট নিদর্শন। দেশের এক তৃতীয়াংশ জনগণের চেতনায় এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। বাকি দুই তৃতীয়াংশকে সামলিয়ে নেওয়া বহু দলীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অত্যন্ত সহজেই সম্ভব। বর্তমান শাসককুলের সেকথা অজানা নয়। এই বিষয়ে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত।

গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামোয় এক একটি রাজনৈতিক দলের এক এক রকম উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা জনবিরোধী হলে গণতন্ত্রে মূলত তিনটি স্তম্ভ বা সুরক্ষা বলয় থাকা দরকার। প্রথমটি হলো আইন ও বিচার ব্যবস্থা। দ্বিতীয়টি হলো নিরপেক্ষ স্বাধীন পুলিশ প্রশাসন এবং তৃতীয়টি হলো শক্তিশালী বিরোধী শক্তি। এই তিনটি স্তম্ভ বা সুরক্ষাবলয় না থাকলে বা কোনভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে, গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর সিঁড়ি ভেঙ্গেই স্বৈরতন্ত্র ক্ষমতার মগডালে উঠে পড়তে পারে। যেকোন গণতান্ত্রিক দেশের পক্ষেই সেটি বিপদজনক। আর ঠিক সেই কারণেই যেকোন দেশের পক্ষে সুদৃঢ় আইন ও বিচার ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ ও সুদক্ষ পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরী। কারণ তৃতীয় সুরক্ষা বলয়টি অর্থাৎ শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের নিশ্চয়তা সব সময় নাও থাকতে পারে। বর্তমান ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এই তৃতীয় স্তম্ভটি প্রায় ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। ফলে অত্যন্ত শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা না থাকলে সঠিক আইনও সঠিক সময় সঠিক ভাবে কার্যকর করা সম্ভব নয়। এবং সেই আইনের পথে পৌঁছাতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী পুলিশ প্রশাসন। দুর্ভাগ্য ভারতীয় গণতন্ত্রের। স্বাধীনতার পূর্বে যেমন পুলিশ প্রশাসনের মূল কাজই ছিল শাসক ব্রিটিশের স্বার্থরক্ষা করা, স্বাধীনতার পরেও পুলিশের কাজ ঠিক সেই একই রকম রয়ে গিয়েছে। নির্বাচিত সরকারের স্বার্থ রক্ষা করা। ব্রিটিশ আমলেও যেমন, শাসকের স্বার্থ রক্ষায় যাবতীয় বেআইনি কাজে পিছপা ছিল না পুলিশ প্রশাসন, স্বাধীনতার পরবর্তীতেও ঠিক তেমনি শাসকের মর্জি মাফিক তার স্বার্থ রক্ষার্থে হুকুম পালন করাই পুলিশের মূল কাজ। সেই কাজে ব্যর্থ হলেই শাসকের রক্তচক্ষুর মুখে পড়ে পুলিশের কর্মজীবন দফারফা। পুলিশ প্রশাসনের সাধ্য নাই, সেই অবস্থা থেকে নিজেকে রক্ষা করার। ভারতীয় সংবিধান আজ অবধি পুলিশ প্রশাসনকে সেই স্বাধীনতা দেয় নি। নানান সময়ে পুলিশের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য নানান আইনি সুপারিশ উঠে এসেছে। কিন্তু ক্ষমতায় নির্বাচিত কোন সরকারই সেইসব সুপারিশ কার্যকর আইনে পরিণত করেনি। করেনি দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থেই। আর এই বিষয়ে ডান বাম মধ্যপন্থী সব পন্থীদেরই রাজনৈতিক স্বার্থ এক ও অভিন্ন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠ গোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষিত করা ও তার নেতা মন্ত্রীদের বিত্তবৈভব রক্ষার জন্যেই পুলিশকে ব্যবহৃত হতে হচ্ছে একটানা। এর থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের পুলিশ প্রশাসনই মুক্ত নয় আজও। করণটা সেই ব্রিটিশ প্রবর্তীত শাসন পরিকাঠামোর উত্তরাধিকার বহন।

দিল্লীর সাম্প্রতিক গণহত্যা ও ধ্বংস যজ্ঞে, দৃশ্যত পুলিশের ভুমিকা সেই সত্যই প্রতিষ্ঠিত করলো আরও একবার। নিষ্ঠুর নির্মম ভাবে। এরপর হাতে থাকে বিচার ব্যবস্থা ও তার আইনি পরিকাঠামো। এখন সঠিক তদন্তের কাজ ধামাচাপা দেওয়া হলে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার পথই বা খুলবে কি করে। তারপর রয়েছে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রীতা। একাধিক দশক ব্যাপি বিচারপর্বকে টেনে নিয়ে যেতে পারলেই কেল্লাফতে। তার জন্য প্রশাসন ও রাজনৈতিক শক্তি এবং অপরিমিত অর্থসামর্থ্যই যথেষ্ঠ। এইখানেই ভারতীয় আইনি ব্যবস্থার মূল দুর্বলতা। আইন থাকলেও তার দ্রুত ও যথাযথ প্রয়োগের কোন নিশ্চয়তা নাই। সংবিধান ও আইনের এই দুর্বলতার ফাঁক দিয়েই এদেশে বিচারের বাণী অধিকাংশ সময়ে নিরবে নিভৃতে কাঁদে। আর তার জন্য বলি হতে হয় উৎপিড়িত নির্যাতীত সাধারণ দেশবাসীকেই।

সবশেষে আজকে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবা দরকার এদেশের আইন প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা থাকতেও সংবিধান দাঙ্গা ও গণহত্যার মতো নৃশংস অপরাধ থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে অপারগ কেন? তাই দশকে দশকে এই অপরাধ বারবার সংগঠিত করা হচ্ছে, ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থতায়। তাই দেশবাসীর হাতে বাকি থাকে একটিই পথ। সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পথে শান্তিপূর্ণ অহিংস গণআন্দোলন সংগঠিত করে ব্যালট বক্সে নিরব বিপ্লব ঘটানো। কিন্তু গোড়ায় গণ্ডগোল। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই সেই বিষয়ে সম্যক সচেতন। তাই নানান ছলে নানান উপায়ে জনগণকে বিভাজিত করে ক্ষমতায় টিকে থাকার নামই ভারতীয় গণতন্ত্র। ও তার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই নানাবিধ প্রক্রিয়ার ভিতর সবচেয়ে বীভৎস হল এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে জনগণকে বিভাজিত করে ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার পদ্ধতি। এই প্রক্রিয়ার সাফল্য যত বিস্তৃত হবে, ভারতবর্ষের গণতন্ত্র ততই বিপন্ন হবে। ভারতীয় গণতন্ত্র যত বিপন্ন হবে সাধারণ জনগণের জীবন জীবিকা ততই বিপদের সম্মুখীন হবে। এই অবস্থা কিছু দশক চলতে পারে। কিন্তু তার অনিবার্য পরিণতি হয় গণবিপ্লব নয় গৃহযুদ্ধ। প্রথমটিতে জনগণের সামনে সুদিনের হাতছানি। দ্বিতীয়টিতে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলির ক্ষমতা লাভের হাতছানি। প্রথমটিতে দেশের ও জনগণের স্বাধীনতা সুরক্ষিত। দ্বিতীয়টিতে দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনাই সমধিক।

২৯শে ফেব্রুয়ারী’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত