দিব্য জীবনের দিশারী শ্রীঅরবিন্দ
শ্রীঅরবিন্দের দর্শন তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে বিদগ্ধ
জ্ঞানীগুণী পণ্ডিত মানুষরা অনেক আলোচনা গবেষণা এমনকি সাধনাও করেছেন!তবু আমরা
শ্রীঅরবিন্দের আজীবন যোগসাধনাকে কেন্দ্র করে তাঁর দর্শন ও কর্মকাণ্ডের মূল সূত্রটি
সম্বন্ধে বিশেষ চর্চা করি না, আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রেক্ষিতে! কিন্তু তাঁর
বিপুল কর্মকাণ্ডের বিস্তারে মানুষটিকে সম্যক চিন্তে পারলে হয়ত তাঁর সেই যোগসাধনার
পথে আমরাও কিছুটা পা মেলাতে প্রয়াসী হতাম! তিনি বুঝেছিলেন মানুষের চেতনা স্তরের
উন্নয়ণ না ঘটালে সমাজ সভ্যতা দেশ সুন্দর করে গড়ে তোলা যায় না! তাই তিনি সাধনায়
বসলেন কি করে চেতনার সেই উন্নতি ঘটানো যায়! এই বিষয়ে তিনি মেলে ধরলেন এক
বৈপ্লবিক দর্শন!
শ্রীঅরবিন্দের প্রথমেই মনে হল ডারুইন থিওরীর কথা!
ক্রমাগত জৈবিক অভিযোজনের মাধ্যমে নিম্নস্তরের প্রাণী থেকে বহু যুগ অতিক্রম করে
অপেক্ষাকৃত উচ্চস্তরের প্রাণীর সৃষ্টি হয়! এটি প্রকৃতির ধর্ম! ডারুইন থিওরী
অনুসারে এই ভাবেই বানর প্রজাতি থেকে মানব প্রজাতির উদ্ভব! শ্রীঅরবিন্দ ভাবলেন তবে
বানরের নিম্নস্তরের চেতনা থেকে পর্যায়ক্রমে আজকের মানব চেতনা স্তরে যদি পৌঁছানো
যায়, তবে আমাদের এই বর্তমান চেতনা স্তর থেকে আমরা নিশ্চই অদূর ভবিষ্যতে আরও
অনেক উচ্চস্তরের মানব চেতনালোকে প্রবেশ করব! কারণ ডারুইন থিওরী অনুযায়ী প্রকৃতির
এই জৈবিক অভিযোজন তো আর থেমে নেই! সে তো নিরন্তর ক্রিয়াশীল! এইখান থেকেই যাত্রা
শুরু তাঁর দর্শনের!
ডারুইন থিওরী পর্যালোচনা করে শ্রীঅরবিন্দ দেখলেন, এই প্রকৃতিতে
একই সাথে বিভিন্ন চেতনাস্তর বিদ্যমান! উদ্ভিদের চেতনা থেকে প্রাণীজগতের চেতনাস্তর
উন্নত! আবার প্রাণীজগতের মধ্যে মানবের চেতনাস্তর আরও উন্নত! এই একই সাথে বিভিন্ন
চেতনাস্তরের সহাবস্থান তাঁকে উদ্বুদ্ধ করল বিশেষভাবে! ধ্যানযোগে তিনি দেখতে পেলেন,
মানব চেতনাস্তরের উপরে উর্দ্ধমুখী আরও চার পাঁচটি উন্নততর চেতনাস্তর
রয়েছে বিশ্ব প্রকৃতিতে! যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অধিমানস ও অতিমানস
চেতনাস্তর! যদিও এই স্তরগুলির বাস্তব দৃষ্টান্ত বর্তমান জৈবিক পরিবেশে পরিস্ফূট
নয়! অর্থাৎ জৈবিক অভিযোজনে সুদূর ভবিষ্যতে মানব প্রজাতি ক্রমান্নয়ে এইসব স্তরে
পৌঁছাবে!
তিনি অনুধাবন করলেন বর্তমানে মানব সভ্যতা যে
চেতনাস্তরে অবস্থান করছে,
সেই স্তরের দূর্বলতা নিহিত তার অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের চেতনা
প্রবাহের কারণেই! যে কারণে সমাজ সভ্যতায় এত অনাচার এত অবিচার! এত কান্না জমে আছে
ইতিহাসে! রাষ্ট্রতন্ত্রের এমন আগ্রাসী রূপ! অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চালিকা শক্তি
অধিকাংশকে বঞ্চিত শোষিত করে নির্দিষ্ট কজনের মধ্যে ধন ও ঐশ্বর্য্য কুক্ষিগত করে
রাখার ওপরেই নির্ভরশীল! এবং মানুষের এত দুঃখ দূর্দশার মূল কারণও এটাই! ফলে
মহামানবদের প্রদর্শিত পথে এগোনোর মতো উপযুক্ত চেতনা প্রবাহের অভাবে মানব সভ্যতা এই
নিম্নস্তরীয় মানবচেতনায় আজও নিমজ্জিত! তিনি বুঝলেন কয়েক লক্ষ বছর লাগবে এর থেকে
মুক্তি পেতে!
অর্থাৎ ঠিক পরবর্তী উচ্চতর চেতনা প্রবাহের স্তরে
পৌঁছাতে বহু যুগ অতিক্রম করতে হবে! অপেক্ষা করতে হবে বহু দিন! আর এদিকে আমাদের
বর্তমান চেতনা প্রবাহের স্তরে লোভ লালসা হিংসা দ্বেষ ঈর্ষা প্রভৃতি তমগুণ গুলি এমন
প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল থেকে আমাদেরকে সংকীর্ণ স্বার্থবোধ দ্বারা পরিচালিত করে যে
ইচ্ছে থাকলেও এই শৃঙ্খল কেটে আমরা আলোর পথে আরও এগোতে পারি না কিছুতেই!!
শ্রীঅরবিন্দের চেতনায় এইখানেই এক অভিনব বৈপ্লবিক চিন্তাধারা খেলে গেল! তিনি
দেখলেন পরবর্তী উচ্চতর চেতনাস্তরে পৌঁছাতে জৈবিক অভিযোজনের অনেক দেরী! কিন্তু
যোগবলে এই সময়কে সংক্ষিপ্ত করে এই জীবনেই সম্ভব সেই উচ্চতর চেতনাস্তরে পৌঁছানো!
শুরু হল গভীর যোগ সাধনা!
আমাদের বর্তমান মানব চেতনা প্রবাহের উচ্চস্তরে
পরপর যে চেতনাস্তরগুলি বিদ্যমান, পরপর সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতন সেই স্তরগুলি পেড়িয়ে
পৌঁছানো সম্ভব অতিমানস চেতনায়! শ্রীঅরবিন্দ যোগ সাধনায় ঠিক তাই করলেন! যোগী
পুরুষ সম্ভব করলেন অসাধ্যকে! একজীবনেই তিনি বহু যুগের সাধনার সিদ্ধিলাভ করলেন!
কিন্তু সে তো তাঁর নিজের সিদ্ধিলাভ! কিন্তু তিনি তো শুধু আপন চেতনার উন্মেষের
জন্যেই সাধনায় বসেন নি! কি হবে বাকি মানব জাতির? কি ভাবে
সমগ্র মানব সভ্যতা পৌঁছাবে এই অতিমানস চেতনায়! সবাইকেই কি তাঁর মত সাধনায় বসতে
হবে! কিন্তু বসলেই তো হলো না! সবার মানস গঠন চেতনা শক্তি তো আর যোগীপুরুষের সমকক্ষ
নয়! তবে কি অপেক্ষা করতে হবে আরও লক্ষ বছর?
না! অত দিন অপেক্ষা করতে হবে না, বললেন
শ্রীঅরবিন্দ! তিনি এক অভিনব উপায় কল্পনা করে গেলেন! তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী এই
অতি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন অতিমানস চেতনা শক্তিকে একবার যদি আমাদের মানসলোকে নামিয়ে
আনা যায়, তবে সেই শক্তিতেই বলীয়ান হয়ে আমরা পরপর উচ্চতর
মানসলোকের সিঁড়ি ভেঙ্গে অতিমানস চেতনায় গিয়ে পৌঁছাতে পারব! কিন্তু কিভাবে সম্ভব
সেই শক্তিকে নামিয়ে এনে সবার মধ্যে সঞ্চালিত করা? সম্ভব!
বললেন যোগীপুরুষ! তিনি বললেন তিনিই সেই শক্তিকে নামিয়ে আনবেন! তিনিই সঞ্চালিত
করবেন সেই শক্তি সবার মধ্যে! এ যেন অনেকটা মাইকেল ফ্যারাডের মত ঘুড়ি উড়িয়ে
মেঘের বুক থেকে বিদ্যুৎ শক্তি নামিয়ে আনার মত ব্যাপার! ধ্যানে বসলেন তিনি!
তাঁর আশা ছিল সেই অতিমানস চেতনাকে তিনি নামিয়ে
এনে মানব প্রজাতির মধ্যে একবার সঞ্চালিত করে দিতে পারলেই, ঘটে যাবে এক
বৈপ্লবিক পরিবর্তন! আমাদের মানসলোক অতিমানস চেতনায় বলীয়ান হয়ে সেই বিপুল
শক্তিকে অন্তরে ধারণ করে পরপর উচ্চতর চেতনা প্রবাহের সিঁড়ি ভেঙ্গে পর্যায়ক্রমে
একদিন প্রবিষ্ট হতে পারবে অতিমানব
সত্ত্বায়! এই মানব জীবনের ক্ষুদ্রতার শেকল ভেঙ্গে সকল আত্মিক দূর্বলতার অক্ষমতা
কাটিয়ে মানব প্রজাতি একদিন লাভ করবে দিব্যজীবনের অধিকার! সেই অধিকারের চাবিটি
আমাদের হাতে তুলে দিতেই যোগসাধনায় বসেছিলেন শ্রীঅরবিন্দ!
প্রশ্ন হল তিনি যদি সফলই হবেন তবে আজও আমাদের
কোনো উত্তরণ হল না কেন?
সে উত্তর হয়ত দেবে ভাবীকাল! শ্রীঅরবিন্দের তিরোধানের পর বিগত ৭০
বছরে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়ত হয় নি; কিন্তু তাই
বলে তাঁর যোগসাধনা বিফল একথা বলার অধিকারী যেমন নই তেমনই সে কথা বলার সময়ও এখনও
আসেনি! তবে তাঁর প্রদর্শিত পথে কিন্তু অনেকেই স্ব স্ব ক্ষমতায় কিছুটা অগ্রসর হয়ে
সুফল লাভ করেছেন! যাঁদের মধ্য অগ্রগণ্য শ্রী দিলীপ কুমার রায়!
১৯৩৩ সালের একটি পত্রে শ্রীঅরবিন্দ তাঁকে
বলেছিলেন; "I want to invoke
here on earth the light of a higher world; to manifest a new power which will
continue to exists as a new influence in the physical world and will be a
direct manifestation of the Divine in our entire being and daily life!"
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

