সাহিত্যে নোবেল ও যৌন কেলেঙ্কারী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাহিত্যে নোবেল ও যৌন কেলেঙ্কারী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সাহিত্যে নোবেল ও যৌন কেলেঙ্কারী

 

সাহিত্যে নোবেল ও যৌন কেলেঙ্কারী


না, এবছর আর সাহিত্যে কেউই নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন না। তা না পান, ক্ষতি নাই। সে রবীন্দ্রনাথও নাই, নেই সেই বাংলার নবজাগরণ। তাই সাহিত্যে কে নোবেল পেলেন আর না পেলেন তাতে আমাদের বাঙালিদের কিই বা এসে যায়? যাও বা একজন পেয়েছিলেন, তাও সেই নোবেল পদকও চুরি হয়ে গিয়েছে বেশ কয় বছর হলো। সেও যাক পদক দিয়েই বা আমাদের আর কি হবে। কবি থাকলে নির্ঘাৎ এই কথাই বলতেন যে, ও পদকে যার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার কাছেই তো গিয়েছে। ভালোই হয়েছে। তাই নোবেল নিয়ে আমাদের বিশেষ মাথা ব্যথাও নাই। বঙ্গসংস্কৃতির বর্তমান হাল যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে কেউই আর নোবেল টোবেলের আশা ভরসাও করেন না। বরং কেউ একজন বরাৎ জোরে নোবেল টোবেল পেয়ে গেলে তাই নিয়েই বিতর্ক দানা বেঁধে উঠবে বেশি। নিশ্চয় কাউকে না কাউকে ধরেই নোবেল বাগিয়ে নিয়েছে। এলেম আছে বলতে হবে। সংস্কৃতির হাট দুভাগে ভাগ হয়ে যাবে, কেউ প্রাপকের পক্ষে কেউ বা বিপক্ষে চলে যাবেন। তাই নোবেল পুরস্কার থাকল কি উঠে গেল তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথা থাকার কথা নয়। বিশ্বকবির নোবেল পাওয়া নিয়েও বিতর্ক কম হয়নি সেকালে। অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা, বৃটিশের বদান্যতাতেই কবির নোবেল লাভ। ফলে যেখানে বাঙালি বিতর্ক সেখানেই। কিন্তু নোবেল তো শুধু বাঙালির নয়। নোবেল নিয়ে মাতামাতি আবিশ্ব। এই একটি পুরস্কার, যে পুরস্কারকে আবিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ স্বরূপ মনে করা হয়। যে পুরস্কারে থেকে বড়ো পুরস্কার আর হয় না। এমনটাই প্রচলিত বিশ্বাস বিশ্ববাসীর।


তাই এবছর সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হচ্ছে না শুনে অনেকেই নড়েচড়ে উঠবেন। আরও নড়েচড়ে উঠবেন না দেওয়ার পেছনের ঘটানাগুলি জানতে পারলে। না এবছর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য়িক হিসাবে কাউকে পাওয়া যায় নি বলে যে সাহিত্যে কাউকেই এবছর নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে না, বিষয়টি আদৌ তেমন নয়। আসলে এইবছরে কাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে, সেটি ঠিক করেই উঠতে পারেন নি সুডিশ একাডেমি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কেন? সে বড়ো আশ্চর্য্যের ঘটনা। বিশেষ করে আমরা বাঙালিরা তো বটেই, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই কোন কিছুর মধ্যে স্ক্যাণ্ডেল খুঁজে পেলে আর কিছু চায় না। তারপরে সেও যদি হয় যৌনতাঘটিত। হ্যাঁ প্রায় চমকে দেওয়ার মতোই ঘটনার ঘনঘটা সুইডিশ একাডেমির অন্দরমহলে। যেখানে যৌনতা আর অর্থ, ক্ষমতা আর স্বজনপোষনের দীর্ঘ কাহিনী। না আমরা সাধারণ জনগণ এই খবরের সারংশটুকুই মাত্র জানতে পেরেছি। ঠিক যতটুকু উঠে এসেছে সংবাদ মধ্যমের বদান্যতায়। ততটুকুই মাত্র। সেও বড়ো বিচিত্র গল্প। কিন্তু যতটুকু খবর বাইরে প্রচারিত হচ্ছে, মন বলছে তার বাইরেও অনেকটাই গল্প রয়ে গিয়েছে। এ বড়ো বিচিত্র পৃথিবী।


ভদ্রমহিলার নাম ক্যটারিনা ফ্রোস্টেনসন। কবি এবং সুইডিশ একাডেমির আজীবন জুরি সদস্য়। সুইডিশ একাডেমির নিয়ম অনুযায়ী সকল মনোনীত জুরি সদস্য়রাই আজীবন সদস্য়পদ পেয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, একবার সদস্য় হয়ে গেলে তিনি আর পদত্যাগও করতে পারেন না। পদত্যাগ করলেও সেই পদটি শূন্যই পড়ে থাকবে তাঁর মৃত্যু পর্য্যন্ত। একমাত্র মৃত্যু হলেই সেই পদে আবার নতুন করে অন্য কোন সদস্য নির্বাচিত হন। এই নিয়মটি প্রবর্তন করেন সুইডেনের তৎকালীন রাজা গুস্তাভ সেই ১৭৮৬ খৃষ্টাব্দে। সমস্যার সূত্রপাত যে আঠারো জন জুরি সদস্য প্রতিবছরের জন্যই সাহিত্যে নোবেল প্রাপকের নাম নির্ধারণ করে থাকেন, তার অন্যতম এই কবি ক্যাটারিনা ফ্রোস্টেনসনকে জুরি সদস্য থেকে বরখাস্ত করার প্রস্তাব নাকচ হয়ে যাওয়ায় একাধিক জুরি সদস্যের সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেওয়াতেই। এখন ১৭৮৬ খৃষ্টাব্দে সুইডিশ সম্রাট গুস্তাভের করা নিয়ম অনুসারে যেহেতু পদত্য়াগ করলেও আমৃত্যু সদস্যপদ বাতিল হয় না, ফলে পদত্যাগী সদস্য়দের শূন্যস্থান রাতারাতি পুরণ করাও সম্ভব নয়। আবার ন্যূনতম বারো জন সদস্য়ের সম্মতি না হলে পুরস্কারের জন্য়ে কোন সাহিত্যিককেই মনোনীতও করা সম্ভব নয়। এদিকে বর্তমান কমিটিতে মাত্র দশ জন সক্রিয় জুরি সদস্য পড়ে রয়েছেন। ফলে আজ সকালেই সুইডিশ একাডেমি কর্তৃপক্ষকে এবছর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার স্থগিত রাখার ঘোষণা দিতে হয়েছে। এছাড়া তাদের আর কোন উপায়ও ছিল না। সামনের বছর পরপর দুই বছরের জন্যে দুইজন সাহিত্যিককে বেছে নেওয়া হবে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য। এমনটাই ঘোষণা করা হয়েছে সুইডিশ একাডেমি থেকে আজ সুইডেনের স্থানীয় সময় সকাল নয়টায়। সুইডেনে বর্তমান রাজা এরই প্রেক্ষিতে সুইডিশ একাডেমির আজীবন সদস্যপদ সংক্রান্ত নিয়মাবলী সংশোধন ও পরিবর্তনের কথাও ঘোষণা করেছেন। ফলে আশা করা যায়, বর্তমান অচলাবস্থা নিতান্তই সাময়িক। এবং সামনের বছরের মধ্যেই একাডেমি আবার ঠিকমত কাজ শুরু করতে দিতে পারবে।


কিন্তু কে এই কবি ক্যাটারিনা ফ্রোস্টেনসন? বাকি জুরিদের একাংশ কেনই বা তাঁকে জুরি সদস্য়মণ্ডলী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে এককাট্টা হয়েছিলেন? ক্যাটারিনার অপরাধটাই বা কি আসলে। না ক্যাটারিনার উপর সরাসরি কোন দোষারোপ করেন নি কেউই। কবি লিখেছিলেন ‘পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য নইলে খরচ বাড়ে’, আর সুইডিশ একাডেমির অন্দরমহলে ‘পতির পাপে সতীর পাপ নাইতো তাই কোন মাপ’। হ্যাঁ কবি ক্যাটারিনা ফ্রোস্টেনসনের স্বামী ফরাসী আলোকচিত্রশিল্পী জঁ ক্লদে আর্নলের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। এখন পর্য্যন্ত পাওয়া খবরে আঠারো জন মহিলা তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণ সহ একাধিক যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন। আর এরই প্রেক্ষিতে সুইডিশ একাডেমির আঠারো জন সদস্যের মধ্যে থেকে একাধিক সদস্য পদত্যাগ করেছেন। যাঁদের দাবি ছিল অন্যতন জুরি সদস্য ক্যাটারিনাকে জুরি সদস্যমণ্ডলী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তাঁদের সেই দাবি না মানা হলে তাঁরা নিজেরাই কমিটি থেকে সরে যান। এইখান থেকেই শুরু হয় অচলাবস্থা। যে কারণে শেষমেশ এইবছর নোবেল সাহিত্যপুরস্কার দেওয়া হচ্ছে না কোন সাহিত্যককেই।


ক্যাটারিনার স্বামী জঁ ক্লদে আর্নলের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছিলেন, আন্না কারিন বিলুণ্ড নামের এক তরুণী। সেটি ১৯৯৬ সালের ঘটনা। যদিও তার অভিযোগে কর্ণপাত করেনি একাডেমি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গত নভেম্বরে আঠারো জন মহিলা যখন এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে যৌনহেনস্থা ও ধর্ষণের অভিযোগ আনে, তোলপাড় শুরু হয় তারপর থেকেই। প্রসঙ্গত ক্য়াটারিনা ও তাঁর স্বামী একটি অভিজাত ক্লাবের মালিক। ফোরাম নামের যে শিল্প ক্লাবটি চালান তাঁর স্বামী নিজে। আবার এই ফোরামই সুইডিশ একাডেমি থেকে প্রাপ্ত সাবসিডি থেকে পরিচালিত হয়। ফলে গোটা বিষয়টির সাথে সুডিশ একাডেমিও জড়িয়ে পড়ে। একাডেমির জুরি সদস্যের একাংশ যার বিরুদ্ধে তোপ দাগতেই আজকের এই পরিস্থিতি। এছাড়াও এই জঁ ক্লদে আর্নলের বিরুদ্ধে আরও একটি বড়ো অভিযোগ যে তিনি নাকি এর আগে সাত বার সাহিত্যে নোবেল প্রাপকের নাম আগাম ফাঁস করে দিয়েছিলেন। অভিযোগগুলি গুরুতর সন্দেহ নাই। কিন্তু এখন দেখার বিষয় সুইডেনের আইন ও সুইডিশ একাডেমি কিভাবে সব দিক সামলিয়ে আবার একাডেমির সুনাম ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।


কিন্তু গোটা বিষয়টি পর্যবেক্ষেণ করে সুইডিশ একাডেমির অন্দরমহলের যে চিত্রটা উঠে আসে, সেটি যে খুব সুস্থতার খবর দেয় তাও নয়। একধিক জুরি সদস্যদের দাবি মতো ক্য়াটারিনাকে প্রথমেই সরিয়ে দিলে হয়তো পরিস্থিতি এতটা ঘোলাটে হয়ে উঠতো না। কিন্তু ক্যাটারিনা ও তাঁর স্বামী জঁ ক্লদের সাথে একাডেমি কর্তৃপক্ষের যে একটি আর্থিক আঁতাত রয়েছে, যার বাধ্যবাধকতায় জুরি সদস্য়দের প্রাথমিক দাবি মানা সম্ভব হয় নি কর্তৃপক্ষের, সেই কথাই মনে হয়। আর যেখানেই আর্থিক আঁতাতের সম্পর্ক, সেখানে ক্ষমতা ও অর্থের জোরে নানান রকমের অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলার সম্ভাবনাই কিন্তু বেশি থাকে। ফলে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে সুইডিশ আকাডেমি কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতার  ও দক্ষতার বিষয়টিও আজ কিন্তু প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়িয়েও যেতে পারে।


রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরি যাওয়ায় আমাদের আর বিশেষ চিন্তার কিছু নাই। কে বলতে পারে ভবিষ্যতে নোবেল পুরস্কারটাই হয়তো এইসব নানান কারণে উঠেই গেল। কবির পদক চোরও সম্ভবত গোটা বিষয়টার উপরেই নজর রেখে চলেছে।

৪ই মে ২০১৮

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত