ঢাক ও ঢাকি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ঢাক ও ঢাকি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ঢাক ও ঢাকি

 

ঢাক ও ঢাকি

ঢাক বাজালেই বাজে। না বাজালে কিন্তু বাজে না। যত বড়ো ঢাকই হোক আর যত দামী ঢাকই হোক। বাজালে তবেই বাজে। বিশেষ করে নিজের ঢাক। নিজেই বাজাতে হয়। না বাজালে অন্য কেউ এসে বাজিয়ে দিয়ে যাবে না। এই সত্যটুকু শিক্ষাদীক্ষার সাথে সাথেই আমরা শিখে যাই ভালো করে। তাই আমরা যে যার সাধ্য মতো আপন ঢাক বাজিয়ে যাই। কিন্তু সেখানেও একটি শর্ত রয়েছে। নিজের ঘরে চারদেওয়ালের ভিতরে বসে ঢাক বাজিয়েও কোন লাভ নাই। বাজাতে হবে একেবারে হাটের মাঝে। হাটে হাড়ি ভাঙা নয়। কিন্তু হাটই ঢাক বাজানোর প্রশস্ত জায়গা। যত বড়ো হাট। তত বেশি সাফল্য। আমাদের আটপৌরে জীবনে এতদিন সেই হাটের পরিসর ছিল খুবই সংকীর্ণ। ফলে যত জোরেই বাজাই না কেন। সেই আওয়াজ বেশি জনের কানে তুলে দেওয়ার উপায় ছিল না বিশেষ। যে যার সীমিত পরিসরে লাজলজ্জা বন্ধক রেখে নিজের ঢাক নিজে বাজিয়ে সমাজে একটা পরিচিতি গড়ে তোলার চেষ্টা করতাম আমরা। যার ঢাকের বোল যত মিষ্টি তার পাশে মানুষ ঘুরঘুর করতো তত বেশি। তাই ঢাক শুধু বাজালেই হতো না। বাজানোর বিশেষ বিশেষ তাল আয়ত্ত করতেও হতো। মানুষের মনের উপরে প্রভাব বিস্তারের তাল। সেখানেই ঢাক বাজানোর কৃতিত্ব। সেটি অভিজ্ঞতার বহরে তৈরী হয়। পাকাপোক্ত হয়। তবুও আমাদের মনের ভিতরে একটা অতৃপ্তি রয়েই যেত। যত মধুর স্বরেই ঢাক বাজাই না কেন। সেই আওয়াজ আপামর জনতার হাটে পৌঁছিয়ে দেওয়ার উপায় ছিল না বিশেষ। বিশেষ বিশেষ প্রতিভাধর ব্যক্তি ছাড়া। কিন্তু আমরা সৌভাগ্যবান। জীবনের শেষ পর্বের দিকে এসে পৌঁছালেও হঠাৎই আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপের মতো আমাদের হাতে এসে পৌঁছালো ইনটারনেটর তার। রাতারাতি বদলিয়ে গেল অনেক কিছু। হঠাৎই আবিষ্কার করা গেল এক বিশাল হাটের মাঝখানে পৌঁছিয়ে গিয়েছি আমরা। শুধু মানুষের মাথা আর মাথা। গুনে শেষ করার উপায় নাই। আমরা বুঝতে পারলাম এই হাটে ঢাক বাজানো শুরু করতে পারলে আর দেখতে হবে না। আমরা সবাই সেলিব্রেটি হয়ে উঠতে পারবো। না, আমরা কেউই আর প্রায় দেরি করি নি। ঢাকের কাঠি হাতে তুলে নিয়েছি যে যার মতো।

এই যে নিজের ঢাক নিজে পেটানোর মহাযজ্ঞ। যে যজ্ঞের আয়োজন ফেসবুক থেকে টুইটার। লিঙ্কডইন থেকে ইনস্টাগ্রাম। পিনটারেস্ট থেক হোয়াটসআপে। সেই যজ্ঞে সকলেই চলেছে সকলের আগে। এই একটি মুশকিল। এখানে সকলেই ঢাকি। তাই দর্শক শ্রোতার পরিসরটুকু আসলেই কম। সকলে সকলকে নিজের ঢাক শোনাতে ব্যস্ত। কিন্তু শুনবে কে? আর দেখবে কে? যার শোনার বা দেখার কথা। তারও কি ঢাক নাই আর? তারও কি নিজের ঢাক নিজেই পিটাতে মন চায় না? নিশ্চয় চায়। ফলে বেশির ভাগ সময়টা সেই আপন ঢাক বাজাতেই ব্যয় হয়ে যায়। বাকি সকলের মতোই। তাই বলে আমাদের ঢাক পেটানো বন্ধ হয় না। বরং অন্তঃসলিল একটি প্রতিযোগিতাও চলতে থাকে। কে কাকে ছাপিয়ে যাবে ঢাকের বোলে। এই যে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। এই প্রয়াসেই নিজেকে একটা সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছিয়ে দেওয়া সম্ভব। সম্ভব নিজের ঢাক নিজে পেটানোর কৌশলের উপরেই। সেই কৌশল ঠিকঠাক কর্যকর করতে পারলে দেখা যায়, এক একজনের ঢাকের আওয়াজে অনেক বেশি লাইক কমেন্টের হুড়োহুড়ি। যত লাইক যত কমেন্ট বুঝতে হবে তিনি তত বড়ো ঢাকি। তার তত বেশি জনপ্রিয়তা। বস্তুত ফেসবুক সহ এই সকল সোশ্যাল মিডিয়া সামজের প্রায় সকলকেই ঢাকি বানিয়ে ছেড়েছে। যিনি জীবনেও নিজের ঢাক নিজে বাজাতে বিশ্বাসী ছিলেন না। এই গড্ডালিকায় তিনিও আপন ঢাকে মনের সুখে বেশ কয়কটা চাঁটি মেরে নিয়ে জল মাপতে শুরু করে দিচ্ছেন। কয়টা লাইক কয়টা কমেন্ট জোটানো যায়।

না, গত শতকে ঘরে ঘরে ঢাকি ছিল না। বিশেষ কিছু চতুর বুদ্ধিমান মানুষ সময় সুযোগের সদব্যবহার করে ঢাকি হয়ে উঠতে পারতেন। বাকিদের দিন যেত ঢাকের শব্দের বাইরে অনেক বেশি শান্তিতে। কিন্তু যুগ বদলিয়ে গিয়েছে। বদলিয়েছে শতক। নতুন শতকের নতুন নিয়ম। নিয়ম বেশিদিন এক জায়গায় স্থিতু হয়ে বসে থাকে না। সতত পরিবর্তনশীল নিয়মের ভিতর দিয়ে যেতে যেতেই আমরা আজকে এই ঢাকি সংস্কৃতিতে এসে পৌঁছিয়েছি। এতদিন সমাজের কেষ্টবিষ্টু ছাড়া বিশেষ কেউ আপন ঢাক বাজিয়ে সুবিধা করতে পারতো না। কিন্তু এখন সকলেই কেষ্টবিষ্টু হয়ে উঠেছেন। সকলেই ঢাকি। সকলেই প্রভুত উদ্যোমে ক্লান্তিহীন ভাবে নিজের ঢাকে চাঁটি মেরে চলেছেন দুইবেলা।

নিজের ঢাকে এই যে নিরন্তর চাঁটি মারার ঘটনা। এর মূল কথা কি? মূল কথা, ‘আমাকে দেখুন’। সত্যই তো বিশেষ ভাবে উল্লেখ না করলে কে আর কাকে দেখতে যাচ্ছে মূল্যবান সময় নষ্ট করে? তাই ঢাকের বোলে মাতোয়ারা করে বাকি সকলের মনোযোগকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে পারাই কেরামতি। সেইখানেই এক একজনের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি। এইভাবে আজকে বহু মানুষই নেটসেলিব্রেটি হয়ে উঠছেন। আপন বন্ধুবৃত্তের পরিসরে। ইনটারনেট মানুষের হাতে এই একটা মহা সুযোগ তুলে দিয়েছে। সেলিব্রেটি হয়ে ওঠার। একেবারেই সেল্ফমেড কার্যক্রম। কথায় বলে আপন হাত জগন্নাথ। ঠিক তাই। কে আর কার উপরে নির্ভর করতে যাচ্ছে? শুধু একটা নেট কানেকশন। একটা দুটো ডিভাইস। আর একটু অবসর। তাহলেই হলো। বাকিটা ইতিহাস।

মানুষের ইতিহাসে যত সেলিব্রেটি এসেছেন। সকলেই যে থেকে গিয়েছেন তাও নয়। এসেছেন অনেক। থেকে যেতে পেরেছেন অনেক কম। কিন্তু তাই বলে, থেকে না গেলেই যে সেলিব্রেটি হওয়া যাবে না তাও নয়। কেউ ক্ষণিকের অতিথি। কারুর স্থায়ী আসন পাতা। এযুগের নেট সেলিব্রেটিদের অবশ্য সেই দায় নাই। কে আর মরণের পরে থাকা না থাকার কথা ভেবে সময় নষ্ট করছে। আজকের এই দিনে আপনার বাজানো ঢাকে কয়টি লাইক কমেন্ট পড়েছে। সেটিই শুধু বিচার্য্য বিষয়। আজকের লাইক কমেন্ট ধুয়ে আগামীকালের জল খাওয়া সম্ভব হবে না। কালকের কথা কাল হবে। কালকের বাজনা কালকেই বাজাতে হবে। আজ বাজিয়ে রাখলাম বলে নিশ্চিন্তে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার উপায়ও নাই। ফলে সকলেই ব্যস্ত। নিজের ঢাক নিয়ে নিজেই বাজানোর প্রতিদিনের নিত্যকর্মে।

না, কারুর সমালোচনা করার কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে, কি ঘটছে আমাদের চারপাশে। এই যে এত ঢাকের বাদ্যি। যদি প্রশ্ন করি, বাদ্যি তো শুনছি। আওয়াজ খানা দিচ্ছে হানা দিল্লী থেকে বার্মা। কিন্তু কি বলছে আসলে? আগেই দেখেছি আমরা। বলছে তো ঘুরেফিরে সেই একটি কথাই, ‘আমাকে দেখুন’। বেশ তো দেখলাম না হয়। কিন্তু হলো কি তাতে? আপনাকে তো দেখলাম। তাতে আমার কি লবডংকা লাভ হলো মশাই? আমি তো সেই, যে তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে রইলাম। জানি আপনি বলবেন, নিজের ঢাক নিজেই বাজিয়ে নিতে। বেশ। তাও না হয় বাজালাম। আপনিও না হয় একবার ফিরে তাকিয়ে মাপজোক দেখে নিলেন আমার। তাতেই বা কতটুকু আলো পড়লো আমার উপরে? কিংবা আরও খোলসা করে বললে, কতটুকু আলোতে পা রাখতে পারলাম? এই আপনার ওনার মতো নিজের ঢাক নিজে বাজিয়ে? জানি আপনরা বলতেই পারেন। আলোতে পৌঁছানোর কথা তো হচ্ছে না। কথা তো নিজের মুখের দিকে স্পটলাইটের ফোকাসটুকু টেনে নিয়ে আসা। সেটি হলেই তো কেল্লাফতে। কেল্লাফতে? লাইমলাইটের সদা চঞ্চল আলোতে ক্ষণিকের উপস্থিতিতেই জীবনের সাধ ও সাধ্যের মেলবন্ধন? আহা এতই কি সহজ? কিংবা সামান্য এই একটুকরো লাইমলাইটের আলোতে নিজের মুখশ্রী ঝালিয়ে নিতে পারার ভিতরেই জীবনের সাফল্য? সত্যই কি জীবন এতটাই শস্তা?

জানি না। এই প্রশ্নের সদুত্তর কারুর কাছে রয়েছে কিনা। জানি না নিজের ঢাক নিজে পেটানোর ভিতরে গৌরব বা গরীমা কতটুকু। আর লজ্জা বা ব্যর্থতাই বা কতখানি? নিজের ঢাক নিজে পেটানোর এই মহাযজ্ঞে মানুষের সমাজ ও সভ্যতাই বা কতটুকু অগ্রসর হবে? কিংবা কতটুকুই বা ফুটে উঠবে মানুষের মুখ। ঢাকি’র মুখ নয়। মানুষের মুখ। যার মান আছে। যার হুঁশ রয়েছে। যে নিজের দিকে আলো টানতে নয়। আলোতে পৌঁছিয়ে আলো ছড়িয়ে দিতে চায়।

২৯শে অক্টোবর ‘২০২০


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত