কর্ণাটক বিধানসভার ফলাফল ও ভারতীয় গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কর্ণাটক বিধানসভার ফলাফল ও ভারতীয় গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

কর্ণাটক বিধানসভার ফলাফল ও ভারতীয় গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা



কর্ণাটক বিধানসভার ফলাফল ও ভারতীয় গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা

কর্ণাটকে সরকার গড়তে না পেরে বেজায় চটে গিয়েছে মোদী অমিত শাহর ব্রিগেড। বিশেষত একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়েও কোটি কোটি টাকা হাতে নিয়ে বসে থেকেও সুপ্রিমকোর্টের রায়ে ঘোড়া কেনাবেচা করার মতো সময় না পাওয়াতেই সরকার গড়তে না পেরে সত্যি করেই কিছুটা ব্যাকফুটে বিজেপির অশ্বমেধ ঘোড়া। একাধিক রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে টপকিয়ে কাঁচাটাকার দৌলতে একের পর এক রাজ্য দখলের পর শেষে কিনা, একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়েও শুকনো হাত চাটতে হচ্ছে? এটাই যেন বেশি করে লেগেছে অমিত শাহ মোদী ব্রিগেডের। যে মোদী ঝড়ের ফানুস উড়িয়ে এই ব্রিগেডের হম্বিতম্বি, সুপ্রিমকোর্টের একটা রায়ে তা চুপসে যেতেই বেশ অস্বস্তিতে বিজেপি। বিষয়টা আত্মসম্মানের। ভোটে ভরাডুবি হলেও সেটা এতটা বিড়ম্বনার বিষয় হতো না। যতটা হলো, রাজ্যপাল আস্থাভোটের জন্যে পনেরোদিন সময় দেওয়ার পরেও সুপ্রিমকোর্টের একটা রায়ে সমগ্র পরিস্থিতিটা বদলিয়ে যাওয়াতেই। আর এইখানেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উন্নয়নের ফর্মুলার কার্যকারিতা প্রশ্নাতীত। উন্নয়নের যে ফর্মুলায় পশ্চিমবঙ্গে একই সময়ে পঞ্চায়েত নির্বাচন সংঘটিত হলো, তাতে বিরোধী পক্ষের মনোনয়ন আটকানো থেকে ছাপ্পা ভোট আর বুথদখলের কেরামতি যে কোন রাজনৈতিক দলেরই শিক্ষণীয়। কর্ণাটকেও এই ফর্মুলায় ভোট করতে পারলে বিজেপিকে এখন হাত কামড়াতে হয় না। ফলে কোটি টাকা ছড়িয়ে ভোট করা বা ভোটের পর কোটি কোটি টাকা ঢেলে দল ভাঙানোরও প্রয়োজন পড়ে না। ঠিক মতো উন্নয়নের হুমকি নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রাখতে পারলেই হলো। নো রিক্স নো চিন্তা। এখানেই উন্নয়নের দাওয়াইয়ের সার্থকতা। কথায় বলে বাংলা আজ যা ভাবে ভারতবর্ষ তা ভাবে কাল। সত্যইই বাঙালি সকলের থেকে কতটাই না এগিয়ে। ভাবতেও ভালো লাগে।

সত্যই কি বিচিত্র এই গণতন্ত্র! জনগণ কাকে ভোট দিল কেন ভোট দিল, বা আদৌ দিতে পারলো কিনা ঠিকমত, সেসবই গৌণ। আসল বিষয় কোন রাজনৈতিক দল কখন কিভাবে কিস্তিমাত করলো সেইটাই। মাঝখানে শুধু একটাই চৌকাঠ সুপ্রিমকোর্ট। সেই চৌকাঠে শুধু যেভাবেই হোক ঠেকে না গেলেই হলো। তাহলেই কেল্লাফতে। হাতের মুঠোয় গণতন্ত্র! কর্ণাটকের কথাই যদি ধরা যায়, জনগণের রায় স্পষ্টতঃই তিনভাগ। পরস্পর বিরোধী প্রধান তিনটি দলের মধ্যে কোন দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় নি। ভোটের প্রচারে যারা পরস্পরের বিরুদ্ধে গালাগালি করেছে, ভোটের পরেই ক্ষমতা দখলের সংখ্যাতত্বে তারাই গলাগলি করে ভাইভাই খেলায় মেতেছে। যাতে প্রবল গোঁসা অন্যজনের। যে আর ভাই খুঁজে পাওয়ার মতো যথেষ্ঠ সময় পেল না ফলাফল ঘোষণার পরে। ফলে তাকে এখন ক্রমাগত সুযোগ খুঁজতে হবে দল ভাঙানোর খেলা শুরু করার জন্যে। রাজনীতির ক্ষমতা দখলের এই খেলায়, কোথায় জনগণ আর কোথায় গণতন্ত্র? সবটাই তো রাজনৈতিক দলতন্ত্রের খেলা। সে খেলায় হারজিৎ আছে। ক্ষমতা দখল আছে, জনসম্পদের লুন্ঠন আছে, আর আছে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বরাভয়। ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতায় থেকে জনসম্পদের উপর ভোগদখল করার জন্যেই এই গণতন্ত্র। হ্যাঁ অধিকাংশ চতুর ও অসাধু মানুষেরই সুযোগ আছে, এই গণতন্ত্রের ননীমাখন খাওয়ার। সেই অধিকার ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত। কেউ কেড়ে নিতে পারে না। ব্যাস এইটুকুই। এর বাইরে জনগণের জন্যে কেবলই ভোটের লাইনে দাঁড়ানোর প্রহসন আর ক্ষমতার হাতে মৌলিক অধিকার ছিনতাইয়ের ধারাবাহিক কার্যক্রম। খুব সংক্ষেপে এই হলো ভারতীয় গণতন্ত্রের সারাৎসার।

এরও রয়েছে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ভারতবর্ষে গণতন্ত্র সামাজিক বা রাষ্ট্রিক বিকাশের হাত ধরে ঘটে নি। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে ইউরোপে। ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে উঠে আসা বুর্জোয়া শক্তির বিকাশই গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটায়। ক্ষমতার কেন্দ্রে ধনতান্ত্রিক শক্তির কর্তৃত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনে। কিন্তু সমগ্র প্রক্রিয়াটিই বিকশিত হয়ে উঠেছিল একেবারে সমাজদেহের অভ্যন্তর থেকেই। অথচ, ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ঘটনাটি ঘটলো একেবারে উল্টোদিক থেকে। রাজা রাজরার দেশ ভারতবর্ষ যেখানে শাসকের সাথে জনগণের সম্পর্ক রাজা প্রজার। ব্রিটিশের পদানত হয়ে, তাদের তৈরী করা নকশায় উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া মেকি গণতন্ত্রে বন্দী হলো স্বাধীন ভারত। অনেকেই প্রতিবাদ করে উঠবেন, তা কেন, এই গণতন্ত্রের কাঠামো স্বাধীন ভারতের সংবিধান অনুসারেই গড়ে তোলা হয়েছে। সংবিধান তো আর ব্রিটিশ আমলের তৈরী নয়। ঠিক কথা, কিন্তু সেটাই সম্পূর্ণ সত্য নয়। ব্রিটিশের সর্বগ্রাসী প্রভাবেই তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরেও তাদেরই চাপিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসাবেই তৈরী ভারতীয় সংবিধান। যার সাথে দেশীয় সমাজ ব্যবস্থার কোন সংযোগ ছিল না আদৌ। ভারতীয় সমাজের প্রেক্ষাপটে, এই গণতন্ত্র শুধুমাত্র ব্রিটিশের ছেড়ে চলে যাওয়া জায়গায় ব্রটিশ শাসনের বদলে আর একটি শাসন ব্যবস্থা মাত্র, যে শাসন ব্যবস্থা ইউরোপীয় দেশগুলির মতো সমাজ বিকাশের ধারায় শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে উঠে আসা বুর্জোয়া শক্তির বিকাশের প্রয়োজনে ঘটেনি। এখানে বুর্জোয়া শক্তির জায়গায় ক্ষমতার দখল গিয়ে পড়লো ব্রিটিশ রাজত্বে পুষ্ট দালাল শ্রেনীর হাতেই। ব্যবসা বাণিজ্য রাজনীতি শাসন ক্ষমতা সবই এই শ্রেণীর হাতে। তাই তাদের স্বার্থেই রচিত হলো সংবিধান। তাদের সুবিধার জন্যেই ভারতীয় গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো। দেশীয় সমাজ ও জনগণ এখানে গৌন। জনগণের পরিচয় শুধুমাত্রই ভোটার হিসাবে। তার বাইরে জনগণের অস্তিত্ব ভারতীয় গণতন্ত্রে আজও ঠিক মতো প্রতিষ্ঠিত নয়। এইখানেই ইউরোপীয় গণতন্ত্রের সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলির গণতন্ত্রের প্রধান পার্থক্য। ইউরোপে জনগণই বুর্জোয়া শক্তির উৎসমূল। তাই সেখানে গণতন্ত্রে জনগণের ভুমিকাই মুখ্য। এখানে জনগণের ভুমিকা গৌন।  ভোটের লাইনে দাঁড়ানো ভোটার মাত্র। ফলে এখনে রাজনৈতিক দলগুলির বাইরে গণতন্ত্রের আর কোনরকম পরিসরই নাই জনগণের জন্য। গণতন্ত্র তাই এখানে দলতন্ত্রের নামান্তর মাত্র। উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এই গণতন্ত্রই স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতীয় সমাজ বিকাশের প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিক এই কারণেই। ইউরোপের সমাজ বিকাশের ধারাতে গণতন্ত্রের জন্ম। এখানে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া দলতান্ত্রিক গণতন্ত্রের ধারাতেই স্বাধীন ভারতের সমাজবিকাশ ঘটে চলেছে।

বিগত সাড়ে সাতদশক ব্যাপি স্বাধীন ভারতের গণতন্ত্রে এই কারণেই রাজনৈতিক দলগুলির স্বার্থকেই গণতন্ত্রের অধিকার ও পরিসর বলে চালিয়ে আসা এত সহজ হয়েছে। জনগণকে নিয়ে ভোটের ময়দানে হাডুডু খেলা হয়ে চলেছে শুধু। ফলে, ক্ষমতার ভাগ পেতে, রাজনৈতিক শত্রুর সাথেও আপোষরফা করে গলাগলি করা এতটাই সহজ এই ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয়। হতভম্ব জনতা সেটিকেই গণতন্ত্রের জয় বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে প্রচারের ঢক্কানিনাদে। সংবিধান তাই চুপ করে দেখে, এক দলের প্রতীকে জেতা প্রার্থী ভোটে জিতে কত সহজে অর্থের প্রলোভনে বিপক্ষ দলে যোগ দিয়েও নিজের জেতা আসনটি রক্ষা করতে পারে। যে কাজটি সরাসরি জনতার সাথে বিশ্বাসঘতকতারই নামান্তর মাত্র। কর্ণাটক বিধানসভার ক্ষমতা দখল করতে অমিত শাহর ব্রিগেড ঠিক যে কাজটি করাতে পারেনি বলেই তাদের আজ আফশোসের শেষ। নাই। তীরে এসেও এইভাবে তরী ডোবা ঠেকানো গেল না বলে।

ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের পরিসরে রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতায়নের বাইরে জনগণের জন্যে দলনিরপেক্ষ সামাজিক কোন পরিসর আজও গড়ে ওঠে নি। ফলে জনগণের মধ্যে যাদের বুদ্ধিবল ও বাহুবল বেশি তারাও গণতন্ত্রের সুযোগ ও সুবিধা নিতে রাজনৈতিক দলগুলির চারপাশে ভিড় বাড়িয়ে চলবেই। রাজনৈতিক দলগুলিও সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েই বৃহত্তর জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। একদিকে প্রতিশ্রুতি আর অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি সম্বন্ধে লাগাতার সমালোচনা ও নিন্দার মধ্যে দিয়ে। আর তাই, জনতার রায় বলে যা প্রচারিত হয় তার মধ্যে সত্যি করে সারবস্তু কিছুই নাই। কারণ জনগণের হাতে কার্যতই অন্য কোন বিকল্প নাই, একটি দলের বদলে অন্য দলকে ভোট দেওয়া ছাড়া। যেখানে প্রতিটি দলের রাজনৈতিক স্বার্থ ও লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। গণতন্ত্র তাই জনগণের একটি ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ও অবরুদ্ধ হয়ে আটকে পড়েছে। যে ভোটটিকে অধিকার করতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সকল রকমের ও ধরণের কর্মসূচী।

ফলে আমরা যদি আলোচনার সূচনার প্রসঙ্গেই আবার ফিরে যাই, দেখা যাবে কর্ণাটক বিধানসভায় কারা মসনদ দখল করলো আর করলো না, জনতার তাতে সত্যই লাভ ক্ষতির কোন ফারাক নাই। জনতা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই রয়ে যাবে। জনতা এখনে রাজনৈতিক দলগুলির শাসন ক্ষমতার দখল নেওয়ার লক্ষ্য ও কর্মসূচীর একক মাত্র। ক্ষমতায় যারাই যাবে, জনতার সাথে তাদের সম্পর্কের ইতর বিশেষ কোন ফারাক চোখে পড়বে না। পড়ার কথাও নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের এটাই সীমাবদ্ধতা ও মূল চরিত্র।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত