বাংলাসাহিত্যের সঙ্কট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বাংলাসাহিত্যের সঙ্কট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বাংলাসাহিত্যের সঙ্কট



 

বাংলাসাহিত্যের সঙ্কট

মূল ধারার জনপ্রিয় বাংলাসাহিত্য এই সময়ের সঙ্কট ও সম্ভাবনাকে কতটুকু ধারণ করতে পারছে? ঠিক এই প্রশ্নটিই যদি করা হয়, নানা মুনির নানা মত শুনতে পাওয়াই স্বাভাবিক। অনেক প্রাজ্ঞ সাহিত্যপ্রেমী অবশ্য বলবেন, সেই উত্তর আজ পাওয়া সম্ভব নয়। উত্তর দেবে ভাবীকাল। এটাই সাহিত্যের নিয়ম। সমসাময়িক চিন্তা চেতনায় একই সময়ের সাহিত্যের গতিপথ প্রকৃতি ও প্রকরণ সম্যক উপলব্ধি করা মুশকিল। প্রায় অসম্ভব কাজ। কথাটি’র ভিতরে নিশ্চয় সত্য রয়েছে। সন্দেহ নাই। আবার একথাও ঠিক সাহিত্য নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা যদি তাঁদের সাহিত্য সাধনায় তাঁর সময়ের সঙ্কট ও সম্ভাবনাকে ঠিকমতো ধারণ করতে না পারেন, তবে তাঁদের সাহিত্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ততটা গ্রহণযোগ্য থাকে না। যেকোন দেশের যে কোন কালের সাহিত্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা সেই ছবিই দেখতে পাই। পাবো। অর্থাৎ আজকের এই সময়ে সাহিত্যচর্চার সাথে যুক্ত থাকতে হলে আমাদেরকে সংযুক্ত থাকতে হবে এই সময়ের জনজীবনের সাথে। সম্পৃক্ত থাকতে হবে এই সময়ের জনমানসের আশা আকাঙ্খার সাথে। এবং একই সাথে শাশ্বত মানবতার বেদীতে এই সময়ের জলছবিকে ধারণ করতে হবে। সোজা কথায় চিরকালীন ও সমকালীন হয়ে উঠতে হবে আমাদের আজকের সাহিত্যচর্চা। ফলে আমাদের অতীত ও বর্তমানের ভিতরের সংযোগসূত্র থেকে আমাদের সাহিত্যচর্চার দিগন্তকে বিচ্ছিন্ন হতে দেওয়া যাবে না কোন ভাবেই। এখন আমাদের অতীত ও বর্তমানের ভিতরে যোগসূত্রটুকু কি? সেই যোগসূত্রই হলো আমাদের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। কোন দেশের কোন কালের সাহিত্যই সেই দেশের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করতে পারে না। যদি করে, তবে সেই নিরালম্ব শিকড়হীন সাহিত্যের সহিত্যমূল্য থাকে না।

না, কেউ যদি মনে করেন। ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার নিয়ে পড়ে থাকলে সাহিত্য সামনের দিকে এগোতে সক্ষম নয়। তবে নিঃসন্দেহে সেই ধারণা সম্পূর্ণতই ভ্রান্ত ধারণা একটি। কেউ যদি তারুণ্যের ঝোঁকে নিজ সংস্কৃতির শিকড় কেটে দিয়ে বিশ্বসাহিত্য রচনায় আত্মসমর্পণ করার প্রয়াস করেন। তবে সেটি সাহিত্যিকের আত্মহত্যার নামান্তর হবে। সাহিত্যের জন্মও হবে না। আবার এ কথাও সত্য। শুধুমাত্র ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে পড়ে থেকে সাহিত্যচর্চায় পুনারাবৃত্তি ছাড়া নতুন কোন মৌলিক সৃষ্টিও সম্ভব নয়। পাঠক হয়তো ভাবছেন তাহলে উপায়? উপায় নিশ্চয় আছে। আছে প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক কালের সাহিত্যের ইতিহাসের ভিতরেই। সেই ইতিহাসের অভিমুখে দৃষ্টিপাত করতে হবে আমাদের। তাহলেই দেখতে পাবো কিভাবে ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সাথে বর্তমান সময়ের সঙ্কট ও সম্ভাবনার যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন যুগের নতুন ভাষ্যের সাহিত্য সৃষ্টি হয়ে চলেছে। বস্তুত সকল দেশের সকল ভাষার সাহিত্যের সেইটিই প্রধান ইতিহাস। একজন সাহিত্যিক কিভাবে তার সাহিত্য সংস্কৃতির ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের সাথে তাঁর সময় ও সঙ্কট, সম্ভাবনা ও সত্যকে মেলাবেন, সেটিই সাহিত্যিকের শৈলী। শক্তি। এবং পারদর্শীতা। সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায় কে টিকবেন আর কে টিকবেন না। কার সাহিত্য নির্দিষ্ট ভাষার সাহিত্যকে বা আরও অন্যান্য ভাষার সাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করে তুলে পরবর্তী যুগের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর কোন সাহিত্যিকের সাহিত্য তার জীবদ্দশার গণ্ডীতেই আটকিয়ে পড়ে থাকবে।

আমাদের আধুনিক বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসের অভিমুখে দৃষ্টিপাত করলে একটি আশ্চর্য বিষয় উঠে আসে বারবার। সেই বিষয়ের অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে আধুনিক বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে আমাদের বাংলা ও বাঙালির যে জলছবি উঠে আসে সেই বিষয়ে সামান্য একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। নানা জনের নানা মত থাকতেই পারে। তবে আমরা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস সাহিত্যের ভিতর দিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সূত্রপাত ধরে নিতে প্রত্যাশী। তার প্রধান কারণ আমাদের বর্তমান আলোচনার সূত্রপাত মূল ধারার জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্য নিয়েই। বঙ্কিমের জীবদ্দশাতেই তিনি যেরকম জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী অন্যান্য সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে তেমটি ঘটে নি কিন্তু। এবং প্রধানত পরাধীন দেশে ইংরেজি ভাষার সূত্রেই নবশিক্ষিত নাগরিক চেতনার হাত ধরেই যে বাংলাসাহিত্যের আধুনিক যুগের সূচনা, সেই বিষয়টি আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। আর বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেই সেই আধুনিক বাংলাসাহিত্যের জয়পতকা প্রথম উড়তে শুরু করে। ফলে আধুনিক বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্রের ভুমিকা ও অবদান অস্বীকার করার উপায় নাই কোন। এবং মূল ধারার আধুনিক বাংলাসাহিত্যের প্রথম জনপ্রিয় কথাকার ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর তুমুল জনপ্রিয়তা এবং অবিসংবাদী প্রভাব পড়েছিল পরবর্তী প্রায় সকল সাহিত্যিকের উপরেই। আরও একটি বিষয় আমাদের স্মরণে রাখা দরকার। বাঙালি পাঠককে তিনি প্রায় একার হাতেই প্রাক ব্রিটিশ যুগ থেকে টেনে নিয়ে আসেন আধুনিক ইউরোপীয় চেতনার নাগরিক মননশীলতার ভুবনে। শুধু যে বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার পথ কাটলেন তাই নয়। বাঙালি পাঠককেও তিনি আধুনিক করে গড়ে তুললেন। যে পথে বাঙালি পাঠক গ্রাম বাংলার আটপৌর গণ্ডী থেকে বেড়িয়ে আন্তর্জাতিক সাহিত্যঅঙ্গনে পা রাখার শক্তি অর্জন করলো দিনে দিনে। আজকের পাঠক বঙ্কিম সাহিত্যের দিগন্তে সেই প্রাক ব্রিটিশ যুগ থেকে আধুনিক যুগে পৌঁছানোর যে যাত্রা তার একটা ছবি প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। পারবেন তার কারণ, বঙ্কিম একদিক দিয়ে যেমন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন, অন্য দিকে তাঁর সময়ের সঙ্কট ও সম্ভাবনাকেও ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁর সাহিত্যিক প্রজ্ঞায়। এবং সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের সাথে তাঁর সময়ের সংযোগসুত্র স্থাপনে কতটা সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেটি সাহিত্য বিশেষজ্ঞদের আলোচনা গবেষণার বিষয়। আমরা শুধু বলতে পারি। সক্ষম হয়েছিলেন নিশ্চয়। না হলে তাঁর এই বিপুল জনপ্রিয়তা সম্ভবই হতো না কোন প্রকারে। সেই বঙ্কিম সাহিত্যে আমরা যে সময়কে প্রত্যক্ষ করি। তার ভিতর দিয়ে প্রাক ব্রিটিশ যুগ থেকে ব্রিটিশ যুগে বাঙালির যে অভিযাত্রা। সেই বিষয়ের ছবিটা আমরা কি প্রত্যক্ষ করি না? করি নিশ্চয়। করি বলেই এত যুগ পড়েও বঙ্কিম সাহিত্যের গুরুত্ব বাংলার সাহিত্যের ইতিহাস থেকে মুছে যায় নি আজও।

বঙ্কিমের পরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে টপকিয়ে বয়সে নবীন আরও এক চট্টোপাধ্যায়, শরতচন্দ্র বাংলাসাহিত্যকে প্রায় একার হাতে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে দিলেন। খেয়াল রাখতে হবে শরতচন্দ্রের জীবৎকালে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা শরতচন্দ্রের মতো সর্বাত্মক ও ব্যাপক ছিল না। বিশ্বকবির জনপ্রিয়তা সীমাবদ্ধ ছিল উচ্চশিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মহলেই। কিন্তু শরতসাহিত্য গ্রাম বাংলায় সামান্য লিখতে পড়তে জানা বাঙালির কাছেই তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। মূল ধারার জনপ্রিয় সাহিত্য নিয়েই আমাদের আলোচনা বলে, এই দিকটির দিকে আমাদের খেয়াল রাখা দরকার বিশেষ করে। প্রসঙ্গত স্বয়ং শরতচন্দ্র কিছুটা মজা করেই নাকি বলেতেন, তিনি লেখেন সাধারণ পাঠকের জন্য। আর কবিগুরু লেখেন তাঁদের মতো সাহিত্যিকদের জন্য। যাই হোক সেই শরতসাহিত্যের দিকে তাকলে আজ আমরা দেখতে পাই ব্রিটিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সামন্ততান্ত্রিক বাংলার জনজীবন ও সংস্কৃতির ছবিই। বস্তুত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম দিয়েছিল। সেই শ্রেণীর হাত ধরেই বাংলা সংস্কৃতির আধুনিকীকরণের সূত্রপাত। এই সংস্কৃতির মাধ্যমে যে মধ্যবিত্ত মানসিকতার জন্ম। সেই মানসিকতারই সার্থক রূপকার শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীতে তারাশঙ্কর বিভুতি মানিক এই ধারাটিকেই এগিয়ে নিয়ে চলেছিলেন। এবং এই যে মূল ধারার জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যের দিগন্ত, সেই দিগন্তেই খুঁজে পাওয়া যায় ব্রিটিশের প্রভাবে গড়ে ওঠা আধুনিক বঙ্গসংস্কৃতির ইতিহাস। সেই সময় ও তার সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করতে গেলে আমাদের পৌঁছাতে হবে সেই সময়ের মূল ধারার জনপ্রিয় সাহিত্যের কাছেই। এইখানেই যে কোন কালের যে কোন দেশের মূল ধারার জনপ্রিয় সাহিত্যের গুরুত্ব ও ভুমিকা। ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের সাথে আধুনিকতার সমন্বয় করতে সক্ষম হওয়াই এই মূল ধারার সাহিত্যের জনপ্রিয়তার চাবিকাঠি। ফলে এক কালের মূল ধারার জনপ্রিয় সাহিত্যই পরবর্তীতে কালাধার হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ আমরা দেখলাম বঙ্কিমচন্দ্র ও শরতচন্দ্র, দুই জনের জনপ্রিয়তার পিছনেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের সাথে আধুনিকতার সমন্বয় সাধনই মূল রসায়ণ। এবং পরবর্তী সকল সফল সাহিত্যিকরাই এই পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। এবারে আরও একটু গভীরে যাওয়ার প্রত্যাশায় আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই বঙ্কিম যুগেই। মনে রাখতে হবে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যচর্চার শুরুই হয় এক শতাব্দীর পরাধীন বাংলায়। অর্থাৎ বঙ্কিমের সাহিত্যে একটি পরাধীন জাতির আত্মসঙ্কটের ভাষ্য উঠে আসার কথা। হাজার বছরের বাংলা সাগরপারের একটি বিজাতীয় বৈদেশিক শক্তির কাছে যেভাবে নপুংসকের মত মাথা নত করে পরাধীনতা বরণ করে নিয়েছিল, তা বিশ্বের ইতিহাসে প্রায় অভুতপূর্ব। পলাশীর যুদ্ধে মীর মদন ও মোহনলালের দেশপ্রেম দিয়ে সেই কলঙ্কমোচন সম্ভব নয়। একটি পরাধীন জাতির আত্মগ্লানি, তার অস্তিত্বের সঙ্কট। তার ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে বৈদেশিক শক্তির ভাষা ও সংস্কৃতির দ্বৈরথ। এসবের কোন চিত্রই পাওয়া যায় না বঙ্কিমের উপন্যাসে। বা সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে। এবং পরাধীনতার গ্লানিও উঠে আসে না বঙ্কিমসাহিত্যের ক্যানভাসে। বিদেশী শক্তির কাছে পরাভুত হওয়ার এক শতাব্দী কেটে গেলেও জাতির জীবনে স্বাধীনতার আকাঙ্থার কোন চিত্র আমরা দেখতে পাইনা বঙ্কিম ও সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় মূল ধারায়। হ্যাঁ ব্যাতিক্রম হিসাবে আনন্দমঠের কথা কিছুটা হলেও স্মরণ করা যেতে পারে। কিন্তু আমরা দেখতে চাইছি বঙ্কিমের সাহিত্যে যে সময় ও সমাজ উঠে আসছে। তার চিত্র। বস্তুত ঊনবিংশ শতকের বাংলার সমাজ ও জীবন পরাধীনতার গোলামীতেই সন্তুষ্ট ছিল। ছিল বলেই এক স্থবির সমাজের চিত্রই দেখা যায় বঙ্কিম সহ সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে। ব্রিটিশের কাছে পরাধীনতার মতো যুগান্তকারী ঘটনাও একটি জাতির স্বাধীন চেতনাকে জাগ্রত করতে সক্ষম হয় নি সেই সময়ে। জাতি স্বদেশী রাজার জায়গায় সাগর পারের হানাদার বাহিনীর রাজারাণীকেই প্রভু হিসাবে স্বীকার করে নিয়ে নিশ্চন্ত তখন। সেই যে সমাজ জীবন। সেই সমাজ জীবনেরই আরও কয়েক যুগের প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে শরতচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ও সমসামায়িক মুলধারার জনপ্রিয় সাহিত্যে। এবং সেখানেও শরৎচন্দ্রের পথের দাবী ব্যতিক্রমের দৃষ্টান্ত হয়েই পড়ে থাকে মাত্র। কবিগুরুর ঘরেবাইরে অন্য গোত্রের বলে তাকে ব্যাতিক্রমের কোঠায় ফেলা গেল না।

অর্থাৎ এই যে মূল ধারার জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্য। যা পাঠককে আবিষ্ট করে রাখতো। তার ভিতর দিয়ে আমরা একটি পরাধীন জাতির পরাধীন মানসিকতার ছবিই প্রতক্ষ্য করি মাত্র। সোজা কথায় গোলামী মানসিকতার জাতির ভিতরে বিদেশী প্রভুর পদানত থেকে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার যে সংস্কৃতি। এবং সেই আখের গুছিয়ে নিতে প্রয়োজনে স্বাজাতির উপরেই শোষণ বঞ্চনার কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে শোষণবাদী এবং আত্মঘাতী সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতির ছবিই ধরে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই সময়ের মূল ধারার জনপ্রিয় সাহিত্যিকরা। তাই তাঁদের সাহিত্যকীর্তিতে পরাধীন জাতির আত্মগ্লানীর বেদনা অনুপস্থিত উল্লেখযোগ্য ভাবে। আবার ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ দুই হাজার বছরের একটি জাতির শিরদাঁড়ায় কোপ বসিয়ে দুই টুকরো করে দিয়ে গেল। সেই দ্বিখণ্ডিত জাতির আপন অস্তিত্বের উপরে এত বড়ো আঘাতও কোন জাতীয় শোকের জন্ম দিতে পারলো না। দুই ভাগের বাঙালি দুটি পৃথক পথ ধরে পরস্পর বিদেশী সেজে এগোতে শুরু করলো। ৪৭ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যেও তাই বাংলাভাগের কোন অভিঘাত পড়ল না। পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যে ছিন্নমূল মানুষের ভিটে হারানোর দুঃখ ও এপারে এসে কঠিন জীবন সংগ্রামের কাহিনী নিশ্চয় রয়েছে। কিন্তু নাই একটি জাতির দেশটি দুটুকরো হয়ে যাওয়ার বেদনা। ওপারের সাহিত্যেও সেই একই বেদনা থাকার কথা ছিল। কিন্তু একই ভাবে সেই বেদনাও অনুপস্থিত ওপার বাংলার সাহিত্যে। বরং সাম্প্রদায়িক ভাগ বাঁটোয়ারায় মাথার উপর থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বোঝা নেমে যাওয়ায় তারা একখণ্ড ছেঁড়া রুটির মতো পড়ে থাকা বাংলাদেশ নিয়েই আজও খুশি। ওপার বাংলার জনমানসে সমগ্র বাংলার কোন সমবেদনা নাই। নাই এপার বাংলার জন মানসেও। একটি জাতির এইরকম অধঃপতন বিশ্বের ইতিহাসে অভুতপূর্ব। সেই অধঃপতনের কারণেই দুই পারের বাংলা সাহিত্যেই বাংলা ভাগের মতো জাতীয় বিপর্যয় বাংলা সাহিত্যে অনুপস্থিত। একদিন ব্রিটিশের কাছে পদানত হওয়ার মতো জাতীয় বিপর্যয়ও যেমন সেদিনের সাহিত্যে অনুপস্থিত ছিল। ঠিক তেমনই।

একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে মন খারাপ হয়ে যাওয়ারই কথা। কিন্তু আরও লজ্জার বিষয়। আমাদের সেই মন খারাপও হয় না। তাই পরাধীনতার বেদনা ও দেশভাগের যাতনা বাংলা সাহিত্যে বিশেষ জায়গা করে নিতে পারে নি। এখানে আমাদের দেখার বিষয় এটাই যে, জাতির সঙ্কট জাতির মানসপটে ধরা না পড়লে সাহিত্যিকদেরও কিছু করার থাকে না। কারণ তাঁদের কাজ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের সাথে অধুনিক সময় ও বাস্তবতার সমন্বয় সাধন। মূল ধারার জনপ্রিয় সাহিত্যিকরা সকলেই কম বেশি সেটাই করেছিলন। এবং সাফল্যের সাথেই। তাঁদের কারুর সময়েই পরাধীনতার গ্লানি ও দেশভাগের যাতনা জাতির অভন্তরে তার জনমানসে প্রতিফলিত হয় নি। সেটি জাতির কলঙ্ক স্বরূপ। কিন্তু জাতির জীবনে প্রতিফলিত না হওয়া সঙ্কটকে লেখক কি করে সময়ের বাস্তবতায় ধারণ করবেন? এটাই হয়তো মূল ধারার জনপ্রিয় সাহিত্যের প্রতিবন্ধকতা। যে মানুষের অনুভবে চেতনায় তার রোগের যন্ত্রণার কোন লক্ষ্মণ দেখা যায় না। তাকে বোঝানো অসম্ভব রোগের স্বরূপটি ঠিক কিরকম। বাঙালির জাতীয় জীবনে কি হিন্দু কি মুসলিম সব সম্প্রদায়ের বাঙালির সমাজেই সেই ঘটনা ঘটেছিল বলেই বাংলা সাহিত্যে এত বড়ো দুটি জাতীয় বিপর্যয় সেভাবে প্রতিফলিত হয় নি। হ্যাঁ এর পিছনে পরাধীন মানসিকতা এবং সাম্প্রদায়িক সংস্করই আসল কারণ।

বরং ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্য অন্যখাতে বয়েছিল। প্রথমত ভাষা আন্দোলন এবং তার হাত ধরে স্বাধীন বাঙালিত্বের জনচেতনার উন্মেষ জাতির ভিতকে এমন ভাবেই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে, শতাব্দী প্রাচীন রোগের ঘোর কেটে জেগে উঠেছিল বাংলাদেশের জনজীবন। যার প্রতিফলন ঘটেছে স্বাধীন বাংলাদেশের মূলধারার জনপ্রিয় সাহিত্যে। যে প্রতিফলন আজও অধরা রয়ে গেল পশ্চিমবাংলার সাহিত্যে। উল্টে আজকের পশ্চিমবঙ্গের জনচেতনা এতটাই অবরুদ্ধ হয়ে বসে রয়েছে যে, বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্বই যে দিনে দিনে বিপন্ন হয়ে উঠছে। সেকথা এপারের বাঙালিকে বোঝানো অসাধ্য। আজকে হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের জলন্ত আঁচ এসে পড়েছে এপারের বাংলায়। যেখানে এক তৃতীয়াংশ রাজ্যবাসীই অবাঙলি। যারা ভাষা ও সংস্কৃতিতে সম্পূ্র্ণ বিদেশী। এবং বাঙালির থেকে সব দিক দিয়ে স্বতন্ত্র। কিন্তু আজকের পশ্চিমবঙ্গ ও বাঙালির জনজীবনের নিয়ন্ত্রকের ভুমিকায় তারাই অগ্রণী। বাঙালি জেগে ঘুমাচ্ছে। ফলে বাঙালির এই দিবানিদ্রাই প্রতিফলিত হচ্ছে হবে আজকের এপারের বাংলা সাহিত্যে। ঠিক যেমন হয়েছিল পলাশীর যুদ্ধের পর এবং ১৯৪৭-এর পর।

তাই আজ যদি বলা হয় এপার বাংলার মূলধারার জনপ্রিয় সাহিত্য এই সময়ের সঙ্কট ও সম্ভাবনাকে ঠিক মতো ধারণ করতে পারছে না। তবে সেটি অর্ধসত্য। পারছে না তো বটেই। কিন্তু না পারার কারণ সাহিত্যিকের অক্ষমতায় ততটা নয়। যতটা জনমানসের গতিপ্রকৃতির কারণে। সমগ্র সমাজ যেখানে জেগে ঘুমাতে বদ্ধপরিকর। সেখানে মূল ধারার জনপ্রিয় সাহিত্যকে সেই ছবিরই প্রতিফলন ঘটাতে হবে। প্রশ্ন হল সেই ছবিটুকুও কি ঠিকমত প্রতিফলিত হচ্ছে এই সময়ের সাহিত্যে? বাঙালির এই দিবানিদ্রার আত্মঘাতী চিত্র? না সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখনও আসে নি। আসবে পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে। আপাতত আমরা বাঙালা সাহিত্যের ইতিহাসের অভিমুখের দিকে তাকিয়ে আমাদের অক্ষমতার দিকগুলি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠার চেষ্টা করতে পারি শুধু।

শুধু সহিত্যকেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের সাথে আধুনিকতার সম্বন্বয় সাধনা করলেই চলবে না। জনমানসকেও জেগে উঠতে হবে। তার সময়ের সঙ্কট ও সম্ভাবনার বিষয়ে সচেতন হয়ে। জনমানসের চেতনা যদি অবরুদ্ধ হয়ে অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। তবে কোন মহৎ সাহিত্যেরও ক্ষমতা নাই সেই অসাড় চেতানাকে জাগিয়ে তোলা। এইখানেই সমাজ সংস্কারকদের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারাই মৃতবৎ জাতিকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। পারলে তখনই মহৎ সাহিত্যের জন্ম সার্থক হয়। কারণ সাহিত্যিকের পক্ষে তখন তাঁর সময়ের সঙ্কট ও সম্ভাবনার বাস্তব সত্যকে ঠিকমত ধরা ও ধারণ করা সম্ভব হয়। এবং ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের সাথে আধুনিকতার সমন্বয় সাধন তখনই সম্পূর্ণ পূর্ণতা পায়।

৬ই অক্টোবর’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত