জাগ্রত জনতা
কর্মসংস্থানের নব নব
উপায় খুলে গিয়েছে। বালিখাদানের বালি থেকে তোলা। পাথরখাদানের পাথর থেকে তোলা। গরুপাচারের
গরু থেকে তোলা। কয়লাচুরির কয়লা থেকে তোলা। জমি বাড়ি ফ্ল্যাট কেনাবেচার উপরে তোলা। ইট
বালি পাথর সিমেন্ট কেনা বেচার সিণ্ডিকেট। শুধু একটাই শর্ত। শাসকদলের সদস্য হতে হবে।
নাহলে কপাল খুলবে না। আর কপাল যখন খুলবে। একেবারে রাজমিস্ত্রী থেকে ব্লক সভাপতি। মাটির
বাড়ি থেকে তিনতলা প্রাসাদ। পঞ্চায়েত সদস্য থেকে এমএলএ। পুরসভার কাউন্সিলর থেকে এমপি।
পাড়ার পেটো মস্তান থেকে হেভিওয়েট নেতা। না, সবাই যে এই সব পদ পাবে। তেমনটাও নয়। কারণ
পদের সংখ্যা সীমিত। কিন্তু সেই পদাধিকারীদের ডান হাত থেকে বাম হাত হতে পারলেও কেল্লাফতে।
না হতে পারলেও ক্ষতি নেই। দলের পতাকা হাতে থাকলেই হলো। মানুষ ভয় পাবে। ভয়ে ভক্তি না
করুক। সমঝে চলবে। সমঝে থাকতে শিখে যাবে। আর পতাকার তলায় যত বেশি মানুষকে কলুর বলদের
মতো বেঁধে রেখে ঘোরানো যাবে। দলের ভিতরে পদোন্নতির দরজাগুলো তত তাড়াতাড়ি খুলতে থাকবে।
এই অব্দি সিস্টেমে কোন গলদ ছিল না। পঞ্চায়েতের ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার কোন ভয় নেই। উন্নয়নকে
রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখতে পারলেই হলো। নো মনোনয়ন। নো ভোট। পুরসভায় নির্বাচন হলেও ভয়
নেই। ইভিএমের পিছনে দলীয় সিপাই দাঁড় করিয়ে রাখলেই কেল্লাফতে। সময় সুযোগ বুঝে ভোটারের
আঙুলে কালি লাগিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়াও এখন জলভাত। জনগণ তাতে কিছুই মনে করবে না। বরং
কষ্ট করে ইভিএম অব্দি যাওয়া। আবার তর্জনী তোলা। নিজের ইচ্ছে মতো বোতামে চাপ দেওয়া।
এত হ্যাপা থেকে মুক্তি। পঞ্চায়েত হাতে থাকুক। পুরসভা হাতে থাকুক। জেলা পরিষদ হাতে থাকুক।
বিধানসভা হাতে আছে বলেই না সিস্টেমটাকে দাঁড় করানো গিয়েছে। বাকিগুলি হাতে থাকলে বহুজনের
কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত। না হলে শুধুমাত্র বিধায়কদের কর্মসংস্থান হলেই তো আর দল ধরে
রাখা যাবে না। ফলে দুর্নীতিই হোক আর কর্মসংস্থানের সিস্টেমই হোক। উপর থেকে গ্রাসরুট
স্তর অব্দি শাখা প্রশাখা বিস্তার করতেই হবে। তাহলেই সকলে মিলে খেয়ে পড়ে ফুলে ফেঁপে
ঢোল হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া সচল থাকবে সক্রিয় ভাবে। এবং সাফল্যের সাথে। এইকারণেই বলা। শুধু
নিজে খেলেই হবে? সবাইকে দিয়ে খেতে হবে তো। গোটা সিস্টেমটাকে ধরে রাখতে হলে।
ফলে নিহত উপ ব্লক প্রধানের
স্ত্রী যখন স্বামী হারানোর শোকে বিলাপ করতে থাকেন। তাঁর গুণধর স্বামী শুধুই নিজে খেতেন
না। সবাইকেই দিয়ে খেতেন। তখন শ্রোতা মাত্রেই সহানুভুতির শিকার হতে বাধ্য। আহা, কথাটাতো
ঠিকই। দিয়ে খেয়েও প্রাণরক্ষা হলো না! নিহত নেতার পিতার কথাতে আবার জানা যায় তাঁর পুত্রকে
হত্যার পিছনে বখরা নিয়ে গণ্ডগোলই দায়ী। ফলে দিয়ে খেয়েও নিস্তার নেই। দেওয়া না দেওয়ার
হিসাব নিকাশেই গণ্ডগোল। অর্থাৎ দলের ভিতরেই নিজেদের ভিতরে গণ্ডগোলের উৎস রাজনৈতিক নয়।
অর্থনৈতিক। রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভেদজনিত হাতাহাতি নয়। অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া, ভাগের
পরিমাণ নিয়ে মতান্তর জনিত খুনোখুনি। দিয়ে খাওয়ার মতো সিস্টেম গড়ে তুলেও নিস্তার নেই।
বখরা নিয়ে গণ্ডগোল থামানোর জন্য এখন নতুন কোন সেফটি ভালভের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে
দলের ভিতরেই পারস্পরিক খুনোখুনি। হত্যা ও প্রতিশোধের লীলাখেলা চলতেই থাকবে। শুধু যে
চলতেই থাকবে। তাও নয়। সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কর্মসংস্থানের এহেন সিস্টেম নিরাপদে
সচল ও সক্রিয় রাখতে সুরক্ষার বন্দোবস্ত করা শাসকদলের মাথাব্যাথার বিষয়।
বিরোধী দলও ওঁৎ পেতে
বসে রয়েছে। এমন সুন্দর সিস্টেমের মালিকানা দখল করার জন্য। সাংবিধানিক গণতন্ত্রে সেটি
অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়ও বটে। আর সেই জন্যেই তো পাঁচ বছর পরপর ভোট। কর্মসংস্থানের
এই সিস্টেমের মালিকানা যাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি ভোগ দখল করতে
পারে। জনগণের কাছেও বিষয়টা জলের মতো পরিস্কার। শাসকদলের পতাকার তলায় থাকতে হবে। তাহলেই
যে কেল্লাফতে হবে তাও নয়। তবে সময় ও সুযোগ বুঝে অনেক কিছুই হাসিল করে নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে দেশের আইনকে যদি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। তাহলে তো কথাই নেই। শাসকদলের
পতাকা বহন তো করতেই হবে। সব সময়েই যে কর্মসংস্থানই শেষ কথা তাও নয়। সবাইকেই যে তোলাবাজি
করতে হচ্ছে। তাও নয়। সবাই যে কাটমানির উপরে নির্ভর করে জীবনধারণ করছে তাও নয়। সিণ্ডিকেটের
সদস্য না হলেই যে কারুর ভাত জুটছে না। তাও নয়। সরকারী তহবিল তছরুপের অধিকারও হাতে গোনা
কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণেই থাকে। সেটাই গণতন্ত্রের নিয়ম। কিন্তু, শাসকদলের পতাকার তলায় থাকা
মানেই প্রয়োজনে আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারা। তাতে সম্পদবৃদ্ধি থেকে চরিত্র
রক্ষা, সবই সম্ভব। ফলে জনতাও শাসকদল ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকতেই পছন্দ করবে। গণতন্ত্র যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার
তত্ত্বের উপরে নির্ভর করে সচল থাকে। এটাই তার গোড়ার কথা।
তাই দুর্নীতি কোন বিষয়
নয়। বিষয় কর্মসংস্থান। বিষয় আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করানোর প্রক্রিয়া। সংখ্যাগরিষ্ঠ
জনতা সেই কারণেই শাসকদলের পক্ষে থাকে। গণতন্ত্রের এটাই নিয়ম। নির্বাচনে যে দলই জয়ী
হোক না কেন। তার ভিত্তি কিন্তু একটাই। জনতাকে এই সুযোগ ও সুবিধেগুলি পাইয়ে দিতে হবে।
অন্তত পাওয়ার লোভ দেখাতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা সেই দলকেই নির্বাচনে জয়ী করবে। যে
দল যত বেশি দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরী করতে সক্ষম হবে। স্বল্পমূল্যে মানুষের
ডায়লোসিস করার ভিতরে সেই দুর্নীতির প্রশ্রয়ের কোন সম্ভাবনা নেই। ফলে যিনি সেই কাজকে
নিজের জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা তাঁকে নির্বাচিত করতে পারে
না। তাঁকে নির্বাচিত করলে দুর্নীতির ফসল ঘরে তোলার সুবিধে হবে না। ফলে ভোটের অংকে তিনি
যে পরাজিত হবেন। এ আর আশ্চর্য্যের কি? কিন্তু যিনি তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে মানুষের
হাসপাতালে কুকুরের ডায়লোসিস করানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার কাছে তিনিই
বেশি গ্রহণযোগ্য। জনতা জানে, তাঁকে নির্বাচিত করার অর্থ দুর্নীতির ভাগ ও বখরা প্রাপ্তির
সুযোগ খুলে যাওয়া।
এই কারণেই টিভিতে চোখ
রেখে একের পর এক নেতাকে অন ক্যামেরা লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতে দেখেই জনতাও নিশ্চিত হতে
পারে। কোন দলকে শাসন ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার কাছে সারদা
কেলেংকারীও কোন অন্যায়ের বিষয় নয়। সেই কেলেংকারীর সাথে জড়িত রথী এবং মহারথীরাই জনতার
গুডবুকে উজ্জ্বল থাকেন। এটাই গণতন্ত্রের মস্ত বড়ো সুবিধে। কারণ, এটা তো ঠিকই। জনতাই
গণতন্ত্রের শেষ কথা। অন্তত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব সেকথাই বলে। ফলে যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ
জনতাই দুর্নীতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সেই দেশের রাজনীতি দুর্নীতি মুক্ত হবে। এমনটা আশা
করার কোন অর্থ হয় না। জনতা সেই রাজনৈতিক দলের কাছেই ভিড় করবে। যে দলে দুর্নীতিগ্রস্ত
নেতা ও নেত্রীর সংখ্যা সব থেকে বেশি। ঠিক এই কারণেই দল বদলের হিড়িকে নেতা দল ছাড়লে।
জনতাও নেতার সাথেই দলত্যাগ করে। এই কারণেই আমরা দাদার অনুগামী, আমরা দিদির সাথে থাকবো।
এই সব স্লোগানের উৎপত্তি। আবার দাদারা বা দিদিরা পুরানো দলে ফিরে এলে, দাদা ও দিদিদের
অনুগামীদের ভোটও পুরানো দলে ফিরে আসে। আসতে থাকে। এই সবই গণতন্ত্রের ণত্ব এবং ষত্ব।
সেই নীতির উপরে ভিত্তি
করেই বাংলা প্রবাদের নতুন সংযোজন। ‘শুধু নিজে খেলেই হবে? সবাইকে দিয়ে খেতে হবে’। খাওয়া
ও খাওয়ানোর এই রীতি এবং পদ্ধতির উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের গণতন্ত্র। কিন্তু মুশকিল
হচ্ছে সেই পরিমাণ নিয়ে। কতটা দিয়ে খেলে, খুন হতে হবে না। কতটা খাওয়ালে নিজের জীবনের
বীমা সুনিশ্চিত থাকে। সবসময় এই পরিমাণ নিয়ে সকলেই সন্তুস্ট থাকবে। তেমনটা না হওয়ারই
কথা। হচ্ছেও না। ফলে দিনে দুপুরেই হোক। আর মাঝ রাতেই হোক। হত্যা আর প্রতিশোধের পালা
দেখতেই হচ্ছে রাজ্যবাসীকে। অবশ্য অনেকেই মনে করতে পারেন। এতে একটা চেকস এণ্ড ব্যালেন্সের
কাজও চলতে থাকে। সেটা মন্দের ভালো। না হলে শোষিতের সংখ্যা বঞ্চিতের সংখ্যা এমন নিদারুন
ভাবে বৃদ্ধি পাবে। যে গোটা সিস্টেমটাই ভেঙ্গে পড়বে একদিন। শোষক আর শোষিতের ভিতরে বিভেদের
দূরত্ব যত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ততই সমাজবিপ্লবের পথ খুলতে থাকবে। এটা ইতিহাসের নিয়ম।
তাই সমাজবিপ্লবকে যাঁরা যমের মতো ভয় পান। তাঁরা এই সব খুনোখুনি, হত্যা আর তাৎক্ষণিক
প্রতিশোধের সংস্কৃতিতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। এটাই সেই চেকস এণ্ড ব্যালেন্স। যা
আগা থেকে গোড়া দুর্নীতির সিস্টেমকেই মজুবত করে ধরে রাখতে পারে। শোষক এবং শোষিতের ভিতরে
দূরত্বটা ততটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে না। আজ যে শোষণের শিকার হচ্ছে। কালকে সেই শোষণের
অধিকার অর্জন করতে পারে। গণতন্ত্র মানুষকে সেই রক্ষাকবচটা দিতে পারে। পারে বলেই সংখ্যাগিরষ্ঠ
জনতা এই গণতন্ত্রের সুবিধে পাওয়ার লোভে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েও লাখ টাকার স্বপ্ন দেখতে
পারে। পারে রাজমিস্ত্রি থেকে রাজপ্রাসাদের মালিক হয়ে উঠতে। রাজনীতির অলিগলি থেকে তোলাবাজি
কাটমানি পুকুরচুরি ইত্যাদির বখরা দেওয়া ও নেওয়ার সিস্টেমের দৌলতে গণতন্ত্রের রাজপথে
মন্ত্রীর কনভয় অব্দি ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিতে পারে। গণতন্ত্র মানুষকে সেই সুবিধেটুকু
দেওয়ার আশ্বাস দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতাও সেটা জানে।
১লা এপ্রিল’ ২০২২
কপিরাইট সংরক্ষিত

