আবার বাইশে শ্রাবণ!
আজ কি বাইশে শ্রাবণ? তবে তো আজ একটু
স্মরণ করতেই হয় মানুষটিকে। মৃত্যুদিন বলে কথা। ধুপধূনো রজনীগন্ধার মালা মৃতের ফটোতে।
আবৃত্তি গান। লাইভ নৃত্য। আর রবীন্দ্ররচনা। সেই স্কুল জীবনের পরীক্ষার খাতার মতো। রবীন্দ্রনাথ
কে ছিলেন। আর কি করেছিলেন। সেই রচনার ধারাই চর্বিতচর্বন সারা বছর বিশেষ দুটি দিন। ক্যালেণ্ডারের
তারিখ মিলিয়ে। পঁচিশে বৈশাখ হলে জন্মদিনের সুরে। আর বাইশে শ্রাবণ হলে শ্রাদ্ধবাসরের
সুরে। হ্যাঁ সুরটা ঠিক মতো ধরে রাখা চাই। নাহলে তাল কেটে যাবে। ভদ্রলোক দুটি খুব দামী
কথা বলে গিয়েছিলেন। আরাধ্য দেবতার পুজোর ছলেই তাকে ভুলে থাকার কথা। আর গঙ্গাজলেই গঙ্গাপূজা
করার কথা। জানি না, তিনি কোনদিন আঁচ করতে পেরেছিলেন কিনা, তাঁর এই আপ্তবাক্য বাঙালি
তাঁকেই একদিন ফিরিয়ে দেবে। কি আশ্চর্য্য না? একটি মানুষ, জীবন ও ইতিহাসের গভীর অনুধ্যান
থেকে তাঁর স্বজাতির দুইটি মুদ্রাদোষের দিকে বিশেষভাবে আলোকপাত করলেন। অথচ সেই স্বজাতি,
আপন চরিত্রবলে সেই মুদ্রাদোষকেই আজ রবীন্দ্রসংস্কৃতিতে পরিণত করে ছেড়েছে।
সত্যই আমাদের
জবাব নাই কোন। আমাদের রবিপুজোর আড়ালে আমরা কেমন সর্বাত্মক ভাবে মানুষটিকেই সরিয়ে দিয়েছি।
আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের দিনযাপনের অভিমুখ থেকে। না। সরিয়েই বা আর দিলাম কই। কারণ গ্রহণ
করলে তো তবে সরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ। আমরা কি ভদ্রলোককে আমাদের জীবন সংস্কৃতিতে গ্রহণ
করেছিলাম কোনদিন? আমাদের বছরের এই দুইটি দিনে রবিপুজোর আড়ালে আমরা কেমন সুন্দর করে
আমাদের কৃতকর্মসহ সমগ্র মানুষটিকেই আড়াল করে রেখে দিয়েছি। আরও সত্য করে বলি বরং? সম্পূর্ণ
অগ্রাহ্য করেছি আমরা রবীন্দ্রনাথকে। আর সেই সাথে বছর ভর রবীন্দ্রসঙ্গীতে রবীন্দ্রকবিতায়
রবীন্দ্রনৃত্যে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোয় আমাদের দায়িত্ব সেরেছি। এ যেন অনেকটা গয়ায় গিয়ে
পিণ্ডদানের মতো।
আমাদের ব্যক্তি
জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, ও রাষ্ট্রিক জীবন। সর্বত্র আমরা এই মানুষটিকে
বিশেষ ভাবে অগ্রাহ্য করতে করতে এতটাই অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি যে, সেই সত্য বাস্তবতাটুকুও
আর অনুভব করতে পারি না। মনে আছে ভদ্রলোক একদিন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বাঙালিকে বাঁধতে
পথে নেমে ছিলেন, রাখী হাতে? সেই বাঙালিই একদিন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ব্রিটিশের কাছে
বাংলা ভাগের দাবি জানিয়েছিল? এবং সেই দাবি পুরণের জন্য ১৯৪৬শে নিজেদের মাথা নিজেরাই
কাটতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পরস্পরের উপরে। রবিঠাকুর নামক সেই মানুষটি মৃত্যুর মাত্র পাঁচ
বছরের ভিতরেই বাঙালি রাখী ফেলে রক্তাক্ত করেছিল নিজের হাত। কবি যে হাতে রাখী ধরিয়ে
দিয়েছিলেন ১৯০৫ সালে। মাত্র চার দশক পরেই সেই হাত রক্তের পিপাসায় সাম্প্রদায়িক হিংসায়
মেতে উঠেছিল। কত শিশু অনাথ হয়েছিল? কত নারী পথের ভিক্ষারী হয়ে গিয়েছিল। কত মা তার সন্তান
হারিয়েছিল? মনে পড়ে আজ কোন বাঙালির? আজ এই যে বাইশে শ্রাবণে যার ফটোয় মালা দিচ্ছি।
সেই মানুষটিকে ১৯৪৬-এ মনে পড়ে নি তো আমাদের।
আজ ২০২০ তে
এসেও লকডাউনেও তেলেনিপাড়ায় দাঙ্গা লাগে! এইসময়ের রাজনৈতিক প্রোপাগাণ্ডার হাঁড়িকাঠে
মাথা গলিয়েই তো আজ আমরা আরও বেশি করে হিন্দু হচ্ছি। মুসলিম হচ্ছি। এবং ভোটের লাইনে
দাঁড়িয়ে সেই সাম্প্রদায়িক বিষ ঝেড়ে দিয়ে আসছি ভোটের বোতামেই। আমরাই, যাদের একজন রবীন্দ্রনাথ
রয়েছেন। ভারতের অন্যান্য জাতিসমূহের কিন্তু এমন একজন রবীন্দ্রনাথ নাই। আমাদের ছিল।
আমরা রাখি নি তাকে। তাঁর সোনার বাংলাকে কেমন মাখনের ভিতরে দিয়ে ছুরি চালানোর মতোন কেটে
দুই ভাগ করে দিয়েই না তবে আমাদের রবিপুজো? আমাদের পঁচিশে বৈশাখ। আমাদের বাইশে শ্রাবণ।
এই সেই ভদ্রলোক।
যিনি বুঝতে পেরেছিলেন ব্রিটিশের পাঠশালায় পড়লে স্বদেশী হয়ে ওঠা যাবে না। যাবে না সমগ্র
জাতিকে শিক্ষার আলোর বৃত্তে টেনে নিয়ে আসা। তাই এই মানুষটিই মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের
সাথে তুলনা করে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রচলন করতেই গড়ে তুলেছিলেন শান্তিনিকেতন। আর আজ
আমরা? পেটে বাচ্চা আসতেই ইংরেজি স্কুলের ফর্ম তুলতে লাইনের দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করে
ফেলছি। না তাতে আমাদের কারুরই মাথা কাটা যায় না। আমরা তো আর পঁচিশে বৈশাখের মানুষটির
শিক্ষায় শিক্ষিত নই। আমরা সেই ব্রিটিশের পত্তন করা মুখস্তবিদ তৈরীর কারখানায় গড়ে ওঠা
এক একটি মহামূর্খ। তাই আমরাই আজ তাঁর মাতৃদুগ্ধের ফরমুলা নিয়ে ব্যঙ্গ করে থাকি। যে
মানুষটি জাতির সার্বিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে বিশেষ করে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, আমারা সেই
মানুষটির সেই পথকেই অবরুদ্ধ করতে শিক্ষাকে দিনে দিনে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে
নিয়ে এসেছি। কারণ আমরা জানি, সকলেই সমান শিক্ষিত হয়ে গেলে, তাদের আর শোষণ করা যাবে
না প্রয়োজন মতো। প্রয়োজন মতো আর তাদেরকে সমাজের নীচুতলায় বেঁধে রেখে দাবিয়ে রাখা যাবে
না। যাবে না, সমাজে আমাদের উচ্চাসনের বেদীকে টিকিয়ে রাখা। তাই শিক্ষাকে দিনে দিনে এমন
ভাবেই মহার্ঘ্য করে দাও, যাতে সমাজটা অন্তত দুইটি শ্রেণীতে বিভাজিত থাকে। শিক্ষিত আর
অশিক্ষিততে।
হ্যাঁ এটাই
আমাদের শিক্ষা। রবীন্দ্রনাথ নামক সেই বিরল প্রজাতির মানুষটির থেকে হাজার যোজন দূরবর্তী
থাকার শিক্ষা। তিনি বাঙালিকে অসাম্প্রদায়িক করে একজাতি এক প্রাণ করতে চেয়েছিলেন। কার্জনের
বঙ্গবিভাগ প্রতিরোধ করতে পথে নেমে ছিলেন ১৯০৫ সালে। লিখেছিলেন, বাঙালির ঘরে যত ভাই
বোন এক হউক এক হউক, এক হউক হে ভগবান। না ভগবান নিশ্চয় সেদিন কবির অপরিণামদর্শীতায় মুচকি
হেসে ছিলেন। তাই আমরাই আজ খণ্ড বিখণ্ড থেকে গর্ববোধ করি। কেউ এক হওয়ার কথা বললেই তাকে
দেশদ্রোহী বলে দেগে দিই। পঁচিশে বৈশাখই হোক আর বাইশে শ্রাবণ। মানুষটি চোখের দিকে তাকিয়ে
আমাদের মাথা কাটা যায় না। সমগ্র জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার যে কর্মযজ্ঞে তিনি আমাদের
আহ্বান করেছিলেন। সেই কর্মযজ্ঞকে দক্ষযজ্ঞের মতো পণ্ড করতেই আমাদের যাবতীয় সাধনা।
তারপরেও আমরা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে পুজোর আয়োজন করি। মাতৃভাষাকে সর্বতো ভাবে কোনঠাসা করে
দিয়ে নিজেদের জীবন থেকে প্রায় ছেঁটে ফেলে দিয়েও আমরা রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারণ করি।
না তাতেও আমাদের জীহ্বা খসে পড়ে না।
এই মানুষটিই
না আমাদের মূল অসুখটিকে চিহ্নিত করে বলে ছিলেন, আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের
মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া। আর কি করলাম আমরা? এক একটি শিবিরে মাথা মুড়িয়ে সম্পূর্ণ
ব্যক্তিস্বার্থের লাভ লোকসানের হিসাব কষতে কষতেই বৃদ্ধ হয়ে গেলেম। শুধু তাই নয়। নিজের
অসুখটিকে পরবর্তী প্রজন্মের ভিতরে আরও সর্বাত্মক করে ইনজেক্ট করে দিয়ে গেলাম। কচি সন্তানকে
অভিভাবকই শিখিয়ে দেয় সহপাঠীকে ঈর্ষা করার মন্ত্র। সেই সন্তান কখনো বুকের ভিতর বিশ্বলোকের
সাড়া পাবে?
না আমরা তাঁর
পথে হাঁটার বান্দাই নই। আর হাঁটবোই বা কেন? আমাদের রক্তে না দুর্নীতির ভাইরাস। আমরা
ঘুষ নিয়ে ঘরণীর ঘাড়ে সোনার হার পড়িয়ে দেবো। তাতে আপন স্ত্রীর চোখেও আমাদের ঘাড় হেঁট
হয়ে যাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নাই। আমাদের শিক্ষার বনেদ এতটাই দৃঢ়। আমরা দুধে জল দিয়ে বিক্রী
করবো। সেই দুধেই আমাদের জাতি অপুষ্টিতে বেড়ে উঠবে। তাতে আমাদের কি? আমাদের ব্যক্তিস্বার্থে,
এমন কোন দুর্নীতি নাই আমরা যার সাহায্য নেবো না। সেই আমরাই দুই বিঘা জমি আবৃত্তি করে
আসর মাতিয়ে দেবো। কিংবা দেবতার গ্রাস আবৃত্তি করেই রাজনৈতিক মঞ্চ থেকেই কুসংস্কার ছড়াতে
থাকবো বেশি করে। অভিভাবক হয়ে পণের দাবিতে অটল থাকব। ছেলে বৌ পোড়ালে। ছেলেকে আড়াল করতে
সমস্ত সোর্স কাজে লাগাবো। সেই আমরাই আবার রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে সমাজচেতনা নিয়ে থিসিস
লিখবো। কি মঞ্চ কাঁপিয়ে বক্তৃতা দেবো। পরীক্ষা পাশের সিলেবাসে গোরা থাকলে, মুখস্ত করা
নোট লিখে গোরার ভারতবর্ষ আবিষ্কারের তত্ব লিখে নম্বরের তত্বতালাশ করবো। আবার সেই আমরাই
পরিবর্তীত পরিস্থিতির সুযোগ নিতে ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অপশক্তিকে ভোট দিতে
ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবো।
হ্যাঁ তাই
বলে আমাদের রবীন্দ্র অনুরাগে কোন খাদ নাই। ক্যালেণ্ডারের তারিখ মিলিয়ে আমরা রবীন্দ্রনাথ
নিয়ে যতরকম ভাবে নাচা যায়, সব রকম ভাবেই নাচবো। এবং নাচাবো। পঁচিশে বৈশাখ থেকে বাইশে
শ্রাবণ। বছর ভর। বছরের পর বছর। আমরা যারা বাঙালি। কাঁটাতারের দুই পারে। মাঝখানের নোম্যন্স
ল্যাণ্ডে বাংলার নিয়তি হয়তো রবীন্দ্রনাথকেই বুকে নিয়ে অপেক্ষা করে আবারো এক রবীন্দ্রনাথের
জন্য। একজন রবীন্দ্রনাথ দিয়ে তো আর বাঙালির রক্ত শোধন করা যায় নি।
২২শে শ্রাবণ’
১৪২৭
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

