সাহিত্যসভা ও আত্মপ্রচারের আলোকবৃত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাহিত্যসভা ও আত্মপ্রচারের আলোকবৃত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সাহিত্যসভা ও আত্মপ্রচারের আলোকবৃত্ত



সাহিত্যসভা ও আত্মপ্রচারের আলোকবৃত্ত

ফেসবুকের ওয়াল দেখে যদি বাংলা সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে ধারণা করতে যাই, তবে প্রাথমিক ভাবে মনে পুলক জাগে বইকি! আজ এখানে সাহিত্যসভা তো কাল ওখানে সাহিত্যসভা। আজ এই মঞ্চে নতুন বইয়ের প্রকাশ তো কাল অমুক মঞ্চে। নিত্য নতুন কাব্যগ্রন্থ আর পত্রিকার ঝাঁঝকঝকে প্রকাশ অনুষ্ঠানে লেখক কবিদের ভিড় দেখে আশ্বস্ত হতে হয়, বাংলা সাহিত্য এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। ফেসবুকের ওয়াল জুড়ে কবিসাহিত্যিকদের সেল্ফি থেকে শুরু করে বই প্রকাশের ছবির রমরমা দেখে যে কেউ আশ্বস্ত হবেন বাংলাসাহিত্যের বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে। এর সাথে যোগ করুন দিকে দিকে লিটল ম্যাগাজিন মেলা নিয়ে কবি সাহিত্যিক সংগঠকদের বিপুল উৎসাহের বিষয়টি। কত ধরণের ছোট পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছে নিয়মিত। কত রকমের নতুন পত্রিকার প্রকাশ হচ্ছে নিরন্তর। এবং সব সংবাদই ফেসবুকের ওয়াল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিগন্তে। বিদেশে প্রবাসী বাঙালিদের অনেকেই ঢাকা কলকাতায় না থাকার জন্য মনে মনে হাহুতাশ করতেও পারেন হয়তো। এইসব সাহিত্যসভা সাহিত্যমেলা সাহিত্য অনুষ্ঠানে সরাসরি যোগ দিতে না পারার জন্য। ফেসবুক ওয়ালের ছবি দেখে আর লাইক ও কমেন্ট করেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর প্রয়াস।

ওয়াল জুড়ে কবি সাহিত্যিকদের হাসিমাখা মুখ। কেউ কবিতা পাঠ করছেন। কাউকে পুষ্পস্তবক দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। কারুর নতুন কাব্যসংকলন প্রকাশ হচ্ছে প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের হাতে। মেলা জুড়ে টেবিল আলোকিত করে ছোট পত্রিকার সম্ভার ঘিরে কবি সাহিত্যিকদের স্বহাস্য মুখশ্রী। বন্ধুস্বজনদের সাথে আনন্দের সেল্ফির ব্যস্ততা। সব মিলিয়ে আগাগোড়া উৎসবের আবহ!

আপনিও খুশি। আপনার কবিতাপাঠ আছে অমুক সভায়। কাল ছিল গল্পবৈঠকের সভা। আগামীকাল যাবেন বন্ধুর তৃতীয় কাব্যসংকলনের প্রকাশ অনুষ্ঠানে। পরশু হয়তো ডাক আসবে লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় আবৃত্তি অনুষ্ঠানে কোন। এইভাবেই বাংলাসাহিত্যচক্র চক্রাকারে ঘুরে চলেছে। কিন্তু চলেছে কোথায়্? কোন অভিমুখে?

আপনি কি বলতে পারবেন? কিংবা আমি? এই যে ওয়াল জুড়ে ছবির পর ছবি। এইযে শহর জুড়ে এত কোলাহল, এত অনুষ্ঠান, এত কবিসাহিত্যিকদের ভিড়; এর ভিতর বাংলাসাহিত্যের সঠিক অবস্থানটা ঠিক কোথায়্ কেমন তার স্বরূপ? কোনদিকে তার ভবিষ্যৎ?

একটি তো চিরকালের সত্য দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কবিতা লিখে কারুর পেটের ভাত জোটে না। জোটে না কেন, না কবিতার বই বাজারে বিক্রী হয় না তেমন। কবিতার বই যদি লিপস্টিকের মতোও বাজারে বিক্রী হতো, তবে তো কবিদের ভাগ্য খুলে যেত। প্রকাশক কবিদের দরজায় দরজায় হত্যে দিয়ে বসে থাকতো একটি সংকলনের প্রকাশের জন্য। না কবিতার বইয়ের কোন বাজারদর নাই। তাই কবিকেই নিজের অর্থে নিজের বই প্রকাশ করতে হয়। আর আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের ভালোবেসে উপহার দিতে হয়। তারপরেও সেই উপহার পাওয়া কবিতার সংকলনের কয়টি পাতা উল্টিয়ে দেখেন কবিরই প্রিয়জন, সেবিষয়ে স্বয়ং কবিও নিঃসন্দেহ থাকতে পারেন না। এই তো গেল সবচেয়ে বেশি যে মাধ্যমটিতে লেখকদের ভিড় সেই কবিতার সংকলনের কথা। গল্পসংকলন এমনিতেই প্রকাশ হয় কম। তার ঢক্কানিনাদও তাই আরও কম। আর প্রবন্ধসংকলন হলে তো কথাই নাই। প্রবন্ধের পাঠক পেতে গেলে হয়তো প্রবন্ধপাঠের জন রীতিমত পারিশ্রমিক দিতে হবে পাঠককে। তবে যদি কিছু সংখ্যক পাঠক জোগার করা যায়।

এই যেখানে বাস্তবচিত্র, সেখানে এই যে আপনি সেদিন মঞ্চ আলো করে নিজের সদ্যজাত কবিতাটি পড়ে শোনালেন সমবেত ভদ্রমণ্ডলীকে, যার জন্য বেশ কিছুটা হলেও হাততালিও পেলেন; সত্যিই কি আপনি বলতে পারবেন নিশ্চিত হয়ে- কজন আপনার কবিতাটি শুনলেন মনোযোগ দিয়ে? কিংবা কজনের মনে রয়ে গেল আপনার কবিতাটি? একটু খেয়াল করে দেখলে দেখতে পাবেন, কবিতা শোনার মতো ধৈর্য্যশীল কান ও মননশীল হৃদয় আজ আর বিশেষ দেখা যায় না। যায় না কেন? কারণ, সকলেই বসে আছেন, কখন তাঁর নিজের কবিতাটি পাঠ করবেন বলে। এবং বেশ অধৈর্য্য হয়েই। এবং হয়তো আপনিও নিজের অজান্তেই নাম লিখিয়ে বসে আছেন সেই একই দলে। না হলে, বাড়ি ফিরে দেখুন বিশেষ কোন কবিতার কথা মনে নাই আর আপনার। সকলেই এই বিষয়টা অবগত আছেন। তবু কেন যান সকলে? যান এইকারণেই যে, গেলে অন্তত মঞ্চ আলোকিত করা তাঁর কবিতাপাঠের ছবিটি উঠবে। এবং চোখে পড়বে অনেকের। একজন কবিরও তো দরকার নিদেন পক্ষে এই প্রচারটুকুর।

হ্যাঁ, তাই এই যুগে কেন, সকল যুগেই প্রচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রচারের আলোর বৃত্তে না থাকলে, আপনিই রয়ে যাবেন অন্ধকারে। কবিসাহিত্যিক মাত্রেই আজ সেইটিকে ভয় করেন বেশি। সকলেই তো আর জীবনানন্দ দাশ হয়ে জন্মান না! তাই সেই প্রচারের আলোরবৃত্তের অমোঘ টানে আজকের কবিসাহিত্যিকদের ভিড় লেগে থাকে সাহিত্যসভা থেকে বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে। সাহিত্য মেলা থেকে ফেসবুকের ওয়ালে।

কিন্তু এই যে আলোর বৃত্ত, তাতে সাহিত্যের আলো কতটুকু? আর কতখানি আত্মপ্রচারের আলো শুধু? সেটি হয়তো গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে একথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়, প্রচার তো সাহিত্যের নয়, প্রচার সাহিত্যিকের। তাই কবিতাপাঠ, গ্রন্থপ্রকাশ, বই ও পত্রপত্রিকার মেলা যত হয়, তার সিকিভাগও হয় না সাহিত্য নিয়ে তথ্যনিষ্ঠ বস্তুনিষ্ঠ কোন আলোচনা সভা। সব সভাই, দেখুন, হয় সহিত্যিকের সংবর্ধনায় তাঁকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্তুতি, না হলে কবিতাপাঠ সংগীত পরিবেশনা নয়তো গল্পপাঠেই আসরের সমাপ্তি। এই যেখানে বাংলায় সাহিত্য সভাগুলির বৈশিষ্ট, সেখানে সাহিত্য নিয়ে প্রকৃত আলাপ আলোচনার পরিসর কতটা অপরিসর সেকথা বলাই বাহুল্য।

বেশ ধরেই নেওয়া যাক বাংলাসাহিত্যের বর্তমান অভিমুখ ও বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষিতে বাংলাসাহিত্যের তুলনামূলক অবস্থান নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে একটি সাহিত্যসভা। কিংবা ধরুন, আলোচনার বিষয়বস্তু, এসময়ের সাহিত্যে সমসাময়িক আর্থ-সামাজিক-রাজনীতির প্রভাব। এমন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা সভায় ডাক পড়লো আপনার। বক্তা কিংবা শ্রোতা হিসাবেই। যাবেন কি আপনি্? হয়তো যাবেন প্রথম প্রথম। কদিন গিয়ে দেখলেন, শুধু নিরব শ্রোতা হয়েই সময় গেল কেটে, বক্তা হিসাবে ডাক পাচ্ছেন না। প্রচারের আলোরবৃত্তের বাইরেই পরে থাকতে হচ্ছে। সংসার সামলিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পূরণ করে অন্যের বক্তব্য শোনার ধৈর্য্য কদিন থাকবে আমার আপনার? কিংবা ধরা যাক আমি আপনিই ডাক পেয়ে গেলাম। বাংলাসাহিত্যে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা সভায় বক্তা হিসাবেই অংশগ্রহণের। কি বলবো বলুন তো মাইক্রোফনের সামনে? সে বসেই হোক কিংবা দাঁড়িয়ে? কজন আমরা আজকের বাংলাসাহিত্যের দশা নিয়ে ভাবি, বা খোঁজখবর রাখি ঠিকমতো? সারা বছরে কয়টা বই পড়ি এইসময়ের? কতটুকু জানি বাংলাসাহিত্যের? কতটুকু ধারণ করতে পারি চারপাশের বহমান সময়ের ছোটবড়ো প্রতিধ্বনিগুলিকে সঠিক ভাবে?

না বাংলা কেন কোন সাহিত্য নিয়েই আমরা বিশেষ মাথা ঘামাই না। জানিও না গভীর ভাবে। সে সময়ও নাই। নাই সে অধ্যাবসায়ও। আর নাই বলেই তার সুস্পষ্ট ছাপ রয়ে যায় আমাদেরই ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রকাশ করা সাহিত্যসংকলন থেকে পত্রপত্রিকার পাতায় পাতায়। আসলে সাহিত্য কেন সমসাময়িক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই সময়কে কতটা এবং কিভাবে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে দিচ্ছে, বা আবহমান মানবসভ্যতায় তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আসল স্বরূপই বা কিরকম, জানি কি আমরা সেসব ঠিকঠাক? বাংলায় কবিতা লিখছি গণ্ডায় গণ্ডায়, গল্প লিখছি দুচারটা। গ্রন্থপ্রকাশ করছি হয় নিজের অর্থে, নয়তো কারুর বদান্যতায়। সেসব ঠিক আছে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সাথে আমাদের নাড়ীর যোগ কোথায়? কিংবা থাকলেও কতটুকু? আদৌ কি আমরা বিচলিত সেসব নিয়ে? আদৌ নই। তাই প্রকৃত সাহিত্য আলোচনা হয় না বিশেষ। যা হয় সে কাব্যপাঠ। সঙ্গীত পরিবেশন। শ্রুতিনাটক। নয়তো গল্পপাঠ। এর বাইরে সাহিত্যসভার দেখা পাওয়া ভার। আর পেলেও সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরের বাইরে বিশেষ নয়। হলেও সেখানে গিয়ে পৌঁছাবার ক্ষমতা কুলাবে না আমার আপনার।

তাই নিয়ে না, কোন আক্ষেপ নাই আমাদের। তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে, আত্মপ্রচারের আলোর বৃত্তে রয়ে যাওয়া। নিরন্তর। পারলে প্রতিদিন। আর তাই আমরা দৌড়াচ্ছিও এই সভা থেকে অমুক মঞ্চে। আর শুধুই ফ্ল্যশ লাইটের ঝলকানি। ধরে রাখছি আত্মপ্রচারের সেরা মুহূর্তগুলিকে। আর বাড়ি ফিরে ওয়াল আলো করে আলোকিত করছি নিজেদের। যে আলোর পিছনেই লুকিয়ে রয়েছে আমার আপনার, আমাদের সাহিত্যচর্চার অসাড়তার বিষাদজনক অন্ধকার।

৭ই অগ্রহায়ণ

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত