শূল দিয়ে যায় চেনা
ব্যক্তিগত স্ক্যাণ্ডল। তারপর সে
যদি হয় নারী ঘটিত। তবে তো কথাই নাই। এরপর যদি জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি কেন্দ্র বা
রাজ্য প্রশাসনের ক্ষমতায় অধিষ্টিত রাজনৈতিক দলগুলির কোন হেভিওয়েট নেতা মন্ত্রী সাংসদ
বিধায়ক নন। তবে তো আর আমাদের পায় কে। বঙ্গসমাজের উৎসাহ উদ্দীপনা উদ্বেগ চতুর্গুন বর্দ্ধিত
হয়ে সেই স্ক্যাণ্ডেলকে দুই হাতে লুফে নেবে। এবং তারপরে যদি ঘটনা পরপম্পরায় মোটামুটি
স্পষ্ট হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধ। তবে তো কথাই নাই। সমাজিক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে
তাঁর বিচার হয়ে যাবে। না আত্মপক্ষ সমর্থনে হোক কিংবা নিজের কৃতকর্মের স্বীকারক্তিই
হোক অভিযুক্তের কোন কথাই শুনতে রাজি নয় আমাদের সমাজ। একপাক্ষিক সেই বিচারের রায়ও দিয়ে
দেবে সমাজ। সে দিতেই পারে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের অধীনস্থ এক রাজ্যের অধিবাসী
আমরা। গণতান্ত্রিক অধিকার বোধ আমাদের হাড়ে মজ্জায়। আমরা সেই অধিকার বোধ ছাড়বো কেন?
ফলে আমরা ঝটপট অভিযুক্তের বিচার করে ফেলবো। এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্ক্যাণ্ডেল
নিয়ে সমাজ জুড়ে এমন শোরগোল তুলে ফেলবো, যেন মনে হবে আমরা এযাবৎ সত্যযুগে বাস করছিলাম।
হঠাৎ তার মধ্যে এই একজন আমাদের সমাজকে কালিমালিপ্ত করতে উদ্যোত। ফলে, আর দেরি নয়। ধর
আর বিচার কর। এবং সমাজ তার বিচার করে রায়ও দিয়ে দেবে। কিন্তু। না, স্ক্যাণ্ডেল নিয়ে
প্রাত্যহিক চর্চা চলতেই থাকবে। যত বড়ো স্ক্যাণ্ডেল। তত বেশি শোরগোল। যত বেশি শোরগোল
তত বেশি মজা। সমাজের এই মজাটা উপভোগ বড়ো জরুরী।
কিন্তু যদি
অভিযুক্ত ব্যক্তির পিছনে সরাসরি কোন রাজনৈতিক দল থাকে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি কোন রাজনৈতিক
দলের ছোটখাটো পাণ্ডা থেকে সেজো নেতা মেজো নেতা কি বড়ো নেতা হন। তার হাতে যদি নির্বাচনে
দাঁড়ানোর টিকিট থাকে। তিনি যদি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হন। কিংবা লালবাতি জ্বালানো আগে
পিছনে পুলিশ পেট্রোল নিয়ে চলা রাজনৈতিক হেভিওয়েট নেতা বা মন্ত্রী হন! না, তখন আমাদের
সমাজের মুখে রা কাটে না। ওসব রাজনৈতিক বিষয়ে আমরা থাকি না। সম্প্রতি রুদ্রনীলের সেই
বিখ্যাত লাইনের মতোই, দাদা আমি সাতে পাঁচে থাকি না। আমরাও তখন আমাদের স্বনির্মিত ব্যক্তিস্বার্থের
ব্যালকোনিতেই ঝুলতে থাকি। মাটিতে আমরা নামি না।
অনেকেরই হয়তো
স্মরণে থাকতে পারে। বাম আমলের কথা। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক যোগ্য প্রার্থীকে
টপকিয়ে এক মহিলার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার পদে বসে পড়ার কথা। হ্যাঁ তাই নিয়ে কিছুটা
শোরগোল কানাকানি যে হয়েছিলো না, তা নয়। কিন্তু তা সেই খবরের কাগজের পরিসরেই। তারপর
সেই মহিলার মা যখন আইন ও প্রশাসনের দরজায় দরজায় দ্যুম করে নিখোজ হয়ে যাওয়া নিজের মেয়ের
প্রাণ ভিক্ষায় ঘুরে মরেছেন। শাসন ক্ষমতার প্রতিটি দেওয়ালে মাথা ঠুকেছেন দিনের পর দিন।
মেয়ের হদিশ পাওয়ার জন্য। না, আমাদের সমাজ নড়ে চড়ে বসে নি। ওটা ওদের দলীয় বিষয়। রাজনীতির
মারপ্যাঁচে আমরা নাই। আমরা থাকিও নিই। সেই মা তাঁর মেয়ের হদিশও আর খুঁজে পাননি। অসহায়
সেই মায়ের চোখের জল আমাদের এই সত্যযুগীয় সমাজকে স্পর্শও করে নি। শাসক আসে শাসক যায়।
নতুন দল। নতুন রং। কিন্তু সমাজের রং বদলায় না। বদলায় না রাজনীতির রঙও। আমরা খবরে আরও
একটি মেয়ের সন্দেহজনক আত্মহত্যার খবর জানলাম। সদ্য ওকালতি পাশ করে রাতারাতি বিশাল বড়ো
চাকুরী প্রাপ্তি। ক্ষমতার অলিন্দে অবাধ যাতায়াত। কোন আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপের কারসাজিতে
এমন চমকপ্রদ উত্থান! অনুমান করতে সমাজের দেরি লাগে নি। না। যেখানেই রাজনৈতিক ক্ষমতার
আশীর্বাদ। সেখানেই সমাজ স্পিকটিনট। তাই সেই সদ্য তরুনীর মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনা,
বা আত্মহত্যা বলে চালানো সংবাদেও সমাজ নড়ে চড়ে বসে নি। ঝুল বারান্দা থেকে নামে নি।
সাতে পাঁচে থাকে নি। কারণ সমাজের জানা ছিল পর্দার পিছনে আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপের
কাহিনীটুকু।
এবং এই সেই
সমাজ। যে সমাজ সান্ধ টিভির পর্দায় দিনের পর দিন সচক্ষে সাংসদ বিধায়ক মন্ত্রী আমলাদের
লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিতে দেখেও ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে সেই দলকেই বিপুল ভোটে জিতিয়ে নিয়ে
এসেছিল ঐতিহাসিক ম্যানডেটে। সেই সমাজই আজ বিচার করে ফেলেছে এক অধ্যাপকের। সমাজের সেই
বিচার করার অধিকার আছে কি নাই, সে আলোচনার অধিকারও নাই আমাদের। আমরা সেই আলোচনার প্রয়াসীও
নই আদৌ। অধ্যাপক দোষী না নির্দোষ। সে বিচারের জন্য দেশে আইন আদালত আছে। ব্যক্তিগত ভাবে
কার চোখে অধ্যপক দোষী আর কার চোখে তিনি নির্দোষ। সেটিও প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার
প্রসঙ্গ। সেখানেও নাক গলানোর অধিকারী নই আমরা কেউই।
আমরা বরং
একটু গভীরে প্রবেশের প্রয়াস করি। অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ফিরিস্তির ভিতর প্রধান
অভিযোগটি কি? তিনি তাঁর পাদধিকার বলে, বেশি নম্বর পাইয়ে দিয়ে সহজে পাশ করিয়ে দেওয়ার
বিনিময়ে ছাত্রী’র সাথে যৌনসম্ভোগ উপভোগ করেছেন দিনের পর দিন। এবং পূর্বেও আরও কয়েক
জন ছাত্রীকে নানান রকম সরকারী সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাদের সাথেও যৌন সম্ভোগ উপভোগ
করেছেন। এখানে আমারা এই কথা নিয়ে আলোচনা করবো না, যে যৌনসম্ভোগ উপভোগ নরনারীর যৌথ সম্মতি
ও পুলক ছাড়া সম্ভব নয়। তাই কোন এক পক্ষকে দায়ি করা নেহাতই পক্ষপাতিত্ব। না। সেটি বর্তমান
আলোচনার বিষয়ই নয়। আমরা দেখতে চাইছি, এ কেমন শিক্ষা পদ্ধতি, যেখানে বেশি নম্বর তোলাটাই
শিক্ষিত হওয়ার মাপকাঠি। শিক্ষার মাপকাঠি তো নম্বর হতে পারে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের
পঠন পাঠন, শিক্ষা পদ্ধতি হওয়া দরকার আন্তর্জাতিক মানের। বিশ্বের নানান দেশের নানান
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিক্ষক শিক্ষার্থী আদান প্রদান, এবং অনেক বিষয়ে যৌথ গবেষণা কর্মের
ভিতর দিয়েই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চলার কথা। সেই স্তরে উত্তীর্ণ হতে গেলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের
পরিকাঠামোকেও হতে হয় আন্তর্জাতিক মানের। সেখানে যাঁরা শিক্ষা দিতে আসবেন। তাঁরা মূলত
নিজ নিজ বিষয়ে শুধু যে দিকপাল হবেন, তাই নয়। নিত্য নতুন গবেষণার কাজেও নিবেদিত থাকবেন।
তবেই শিক্ষার্থীরা সরাসরি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। অর্থাৎ একটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শিক্ষার দিগন্তে নিত্য নতুন গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারকে
নিরন্তর পুষ্টি জুগিয়ে চলা। সমৃদ্ধ করে তোলা। এবং সেই কাজ করতে গেলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ
কাজ নিশ্চিত করতে হয় প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়কে। সেটি হলো মানবসম্পদ তৈরী। বিশ্বজুড়ে
এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এই মানবসম্পদ তৈরীর প্রধান কারিগর। আর অধ্যাপকরাই হলেন সেই মানবসম্পদ
তৈরী’র যজ্ঞের পুরোহিত।
এটাই কি আমাদের
রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আসল রূপ? বিশেষ করে কলকাতার বাইরের মফঃস্বল অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির?
জানি মড়া মানুষও হেসে উঠবে, এসব প্রশ্নে। কিন্তু কেন হেসে উঠবে? হেসে উঠবে এই কারণেই
যে, আমাদের রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি মানবসম্পদ তৈরীর অঙ্গন নয়। ব্রিটিশের হাতে গড়া
যে ভুয়ো গণতন্ত্রের মালিক আজ আমরা, সেই গণতন্ত্রকে ঠিকঠাক চালিয়ে নিয়ে যেতে কিছু সুবিধাবাদী,
স্বার্থপর, সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতার দলদাস, চতুর, এবং শোষণকামী লেখাপড়া জানা ছেলে মেয়ে
তৈরী করার নিরন্তর একটা সিস্টেমের প্রয়োজন। আমাদের দেশের অধিকাংশ সরকারী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি
সেই সিস্টেমেরই এক একটি অংশ। এবং এই সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সম্মিলিত ভাবে এই ভুয়ো গণতন্ত্রকে
চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার নিঃশ্ছিদ্র একটি সিস্টেম। রাজনীতির মাঠে মেঠো পালওয়ান দিয়ে ফুটো
মাস্তান দিয়ে ভোটে জেতা নিশ্চিত করা যায়। মন্ত্রী হয়ে বসা যায়, সম্পূর্ণ নিরক্ষর হয়েও।
কিন্তু একশ তিরিশ কোটির দেশের সম্পদ লুঠ করতে গেলে পেটে কিছু লেখাপড়া জানা বিদ্যবুদ্ধির
দরকার পড়ে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি সেই লেখাপড়া জানা পাইক বরকন্দাজ নায়েব গোমস্তার
জন্ম দেওয়া নিশ্চিত করে। কারণ নিরক্ষর মেঠো পালোয়ান কি ফুটো মাস্তান দিয়ে নিজের দেশকের
লোককে দাবিয়ে রাখা গেলেও শোষণ করা যায় না। শোষণ করতে গেলে বিভিন্ন বিষয়ে ন্যূনতম বিদ্যাবুদ্ধি
ও কারিগরি স্কিলের প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতার ভাষণে ঝাণ্ডা হাতে হাজির হওয়া মাথামোটা
দলীয় কর্মী দিয়ে সেকাজ সম্ভব নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই সেই কাজের জন্য উপযুক্ত আমলা
বুদ্ধিজীবী পেশাজীবী থেকে শুরু করে কেরানীকুলের জন্ম সুনিশ্চিত করে। নিরন্তর জোগানও
সুনিশ্চিত করে। এখানেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আসল ভুমিকা।
আমরা কি একথা
কেউ জানি না? নিশ্চয় নয়। আমরা কি এই কথা এই প্রথম শুনলাম। তাও নয়। তাহলে আমরা এই সিস্টেমের
বিরুদ্ধে কোনদিন আঙুল তুলি না কেন? সোচ্চার হই না কেন? কারণ আমরা এই সিস্টেমেরই সফল
প্রডাকশান। এবং এই সিস্টেম থেকে বেড়িয়েই আমরা যে যার সাধ সাধ্য সামর্থ্যের মতো নিজের
নিজের আখের গুছিয়ে নিয়ে বসে আছি। ফলে এই সিস্টেমের প্রতি আমাদের অপরিসীম শ্রদ্ধা ও
ভালোবাসা। এবং কৃতজ্ঞতা। একেবারেই মনুষ্যত্বের কোনরূপ দীক্ষা না নিয়েই আমরা শিক্ষিতের
সনদ লাভ করে ফেলেছি। সেই পরম পাওয়াকে কোন বলদে পায়ে ঠেলে? আমরাও ঠেলি না। তাই আমদের
লক্ষ্য থাকে, কোনভাবেই এই সিস্টেম যেন ভেঙ্গে না পড়ে। কোনভাবেই নতুন প্রজন্মের চোখে
যেন এই সিস্টেমের খোলনোলচে ধরা না পড়ে যায়। যতক্ষণ না এই সিস্টেম নতুন প্রজন্মকে আমাদের
উপযুক্ত উত্তরসূরী করে তৈরী করে তুলতে পারছে। ততক্ষণই ভয়। আর সেই ভয়েই আমরা যখনই দেখি,
এমন কোন ঘটনা। যে ঘটনা এই সিস্টেমকেই বেআব্রু করে ফেলতে পারে। তখনই আমরা সচেতন ভাবে
একটা শোরগোল তুলে ফেলি। মস্তবড় হইচই লাগিয়ে দিই। এবং কোন একজনকে হাতের কাছে পেয়ে গেলেই
তাকে স্কেপগোট করে সমাজিক ভাবে তার বিচার করে দিই। যাতে মানুষের নজর আমাদের সাধের এবং
অতি প্রয়োজনের এই সিস্টেমের দিকে না পড়ে।
ভুয়ো গণতন্ত্রকে
ঠিক মতো টিকিয়ে না রাখতে পারলে, একশ তিরিশ কোটির দেশের সম্পদ ঠিক ঠাক পরিমাণ মতন লুঠ
করা সম্ভব নয়। আর সেই কাজটা সফল ভাবে করতে গেলেই এদেশে ব্রিটিশের পত্তন করে দিয়ে যাওয়া
শিক্ষাব্যবস্থার ভিতটাকে ধরে রাখতে হবে মজবুত করে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই
সেই কাজটি করে চলেছে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বেশি
নম্বর পাইয়ে দেওয়া, নানান ধরণের সুযোগ সুবিধে পাইয়ে দেওয়া। ব্যক্তিগত যোগাযোগের সূত্রে
সরকারী বেসরকারী ভালো চাকরী পাইয়ে দেওয়া। ইত্যাদি নানান প্রলোভন দেখিয়ে তার ছাত্রীকে
যৌন সম্ভোগে বাধ্য করার সুযোগ পেয়ে যান সহজেই। এবং এটা এই সিস্টেমের ফলেই সম্ভব হয়।
এই মূল সত্যটাকে আমরা অধিকাংশই এড়িয়ে যেতে চাই। তাই যে যত বেশি এড়িয়ে যেতে চাই, সে’ই
ততবেশি শোরগোল তুলি ব্যক্তিগত কেচ্ছা কাহিনী নিয়ে। সমাজে ব্যক্তিগত কেচ্ছা কাহিনী খুবই
জনপ্রিয় হয়। ফলে গোটা বিষয়টা ঘুলিয়ে দেওয়াও সহজ হয়ে যায়। সেই ধোঁয়াশায় আমরা আমাদের
এই নোংরা কিন্তু দক্ষ ও সফল সিস্টেমকে আড়াল করে সুরক্ষিত করতে প্রয়াসী হই।
এরই সমান্তরালে
আরও একটি সমানধর্মী চিত্র দেখে নেওয়া যাক। এদেশে রাজনীতি আর দূর্নীতির সহাবস্থান এমনই
মজবুত ও সুদৃঢ় যে, রাজনীতিবিদদের ডানহাত বাঁহাত আণ্ডারওয়ার্লড ডনদের বাহুবল অস্ত্রবলের
শক্তিতে বলীয়ান। এটা ওপেন সিক্রেট। সময়ে সময়ে সেই আণ্ডারওয়ার্ল্ড ডনেদের প্রতিপত্তি
এমন লাগাম ছাড়া বেড়ে যায় যে, রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন দেশের আইন
নিজের পথে এগোতে শুরু করলেই কান টানলে মাথা এসে যাওয়ার অবস্থা হতে পারে। আর তখনই ডাক
পড়ে ফেক এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদের। সরকারী বেতন পুস্ট শার্প সুটাররাই তখন কান কে মাথার
থেকে এমন ভাবেই ছেঁটে ফেলে যে, এদেশের কোন আইনের নাগাল আর মাথা অব্দি পৌঁছাতে পারে
না। ফলে সিস্টেমটা সুরক্ষিত থাকে। এইভাবে সিস্টেমকে সুরক্ষিত রাখতে গেলেই সময় অসময়ে
কাউকে না কাউকে স্কেপগোট করতেই হয়। না যাকে তাকে তো আর স্কেপগোট করা যায় না। তাই যার
হাতে গোটা সিস্টেম বেআব্রু হয়ে পড়তে পারে। স্কেপগোট করতে হয় তাকেই।
অর্থাৎ সব
কিছুর উপরে এক একটি সিস্টেম। এদেশের ভুয়ো গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার যে সকল সিস্টেম
চালু রয়েছে, সেই সিস্টেমগুলিই নিঃশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে রাখা হয়। যখন যেসময়ে
সেই বলয়ে কোন ছিদ্র দেখা দেবে। তখনই যেভাবেই হোক সেই ছিদ্র মেরামতের আবশ্যক। জনগণের
নজর যেন কোনমতে সেই ছিদ্রের ভিতরে গিয়ে না পড়তে পারে। এই যে ব্যক্তিগত কেচ্ছা কাহিনী
নিয়ে এত ছি ছি ক্কার পড়ে গিয়েছে। সমাজ নড়ে চড়ে বসেছে। এ সবই সেই ছিদ্র মেরামতি পর্ব।
অভিযুক্ত
কবি তথা অধ্যাপক যে অপকর্মটি সুকৌশলে চালিয়ে
আসছিলেন এতদিন। সেটি কেউ জানতেন না? সহকর্মী। সহযোগী সম্পাদকমণ্ডলী। কবিবন্ধু বান্ধবী।
ছাত্রছাত্রী। শিক্ষাকর্মী। না এমনটা ভাবার বা কল্পনা করার কোন অর্থ হয় না। সেটি কষ্টকল্পনা
মাত্র। আসলে এই গোটা সিস্টেমে এধরণের অধ্যাপক অধ্যাপিকারাই সংখ্যায় বেশি। বেশি বলেই
গোটা সিস্টেম এমন সাফল্যের সাথে চলছে। দশকের পর দশক ধরে। কিন্তু ঐ, সার কথা কবেই কে
একজন বলে গিয়েছিলেন। চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা। যদি না পড়ে ধরা। আসলে যে কোন অপকর্ম বেআব্রু
হয় তখনই। যখন স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ সূত্রটি ছিন্ন হয়ে যায়। কর্ম অপকর্ম, সব কিছুরই একটা
পরিমিতি বোধের প্রয়োজন। যতক্ষণ সেই পরিমিতি বোধ অটুট থাকে। সুশোভন পর্দার আড়ালে নাটক
ততক্ষণই জমে ওঠে। পরিমিতির ভারসাম্য একটু এদিক ওদিক হলেই, গোটা সিস্টেমটাই বেআব্রু
হয়ে পড়তে পারে। তাই সেই ভারসাম্যে সামান্য টাল খেলেই সমাজে বেশি করে শোরগোল ফেলে দেয়
তারাই, যারা এই সিস্টেমের সুফল ভোগী।
কিন্তু সাধারণ
জনমানস। তাদের স্বাধীন কোন মুখ নাই। ভুয়ো গণতন্ত্রে সেই উপায় থাকে না। সমাজ পরিচালনার
চাবিকাঠি যাদের হাতে থাকে। তাদের মুখোশ নিসৃত কথামৃতকেই বেদবাক্য জ্ঞানে প্রতিধ্বনিত
করতে হয় জনমানসকে। আর চলতি বাংলায় তাকেই বলি গড্ডালিকা প্রবাহ। সেই গড্ডালিকার স্রোতের
অভিমুখেই চলতে থাকে জনমানসের জনচেতনা। সেই জনচেতনাই আবার এই সিস্টেমের কাণ্ডারীদের
হাতে তুরুপের তাস। ফলে এ এমন এক চক্রব্যূহ, যার থেকে নিস্ক্রমণের উপায় নাই কারুর।
ধৈর্য্য ধরে
এতখানি অব্দি যদি কোন পাঠক পড়েও আসেন। তবে তাঁর প্রথম প্রশ্ন হবে। তবে উপায় কি? কোন
একটা পথের হদিশ তো দিতে হবে। না। পথের হদিশ দেওয়ার অধিকার লেখকের থাকে না। সেই অধিকার
অর্জন করে নেন সমাজসংস্কারক থেকে শুরু করে প্রকৃত দেশনেতা কিংবা জাতির রূপকার এবং ক্ষেত্র
বিশেষে যুগান্তকারী বৈপ্লবিক সংগ্রামী মুক্তিকামী জনচেতনা। পথের কোন হদিশও থাকে না।
পথের হদিশ করে নেওয়ার জন্য একদম নতুন করে পথ কাটতে হয়। সেই পথ কাটার কোন শর্টকাট উপায়ও
থাকে না। থাকা উচিতও নয়। জীবন দিয়ে সেই পথ কাটতে হয়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সঠিক গন্তব্যে
পৌঁছানোর। যে দেশ। যে জাতি। সেই পথ কাটতে পেরেছে। তারা তার সুফল নিশ্চয় পাচ্ছে। পাবে।
আমরা পারি নি। তাই আমরা সেই সুফল পাওয়ারও অধিকারী নই। আমরা আমাদের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্য
করেই চলেছি। চলতেই হবে।
তাই আজকে
যারা ভাবছেন, ক্ষমতার দর্পে যৌন কেলেঙ্কারীতে অভিযুক্ত অধ্যাপককে শূলে চড়িয়েই সমস্যার
সমাধান হয়ে যাবে। সেটাই সঠিক এবং উপযুক্ত পথ। তারা এই সিস্টেমের রক্ষকদের পাতা ফাঁদেই
পা দিচ্ছেন। এবং এটাও ঠিক সেই ফেক এনকাউন্টারে অভিযুক্ত ধর্ষকদের গুলি করে হত্যা করায়
দেশ জুড়ে উল্লাসে ফেটে পড়ার মতো নির্বোধ আনন্দের বেশি কিছু নয়। সেদিনও আসল অপরাধী বেঁচে
গিয়েছিল। আজও আসল অপরাধী এই সিস্টেম বেঁচে যাবে। একজন অধ্যাপক কেন একশজন অধ্যাপককেও
শূলে চড়িয়ে এই চরমতম ঘৃণ্য শিক্ষা ব্যবস্থার সিস্টেমের গায়ে আঁচর কাটাও যাবে না। না।
থাক। এসব কথা আমাদের বুঝে কাজ নাই। বেশি বুঝতে গেলে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যেতে বেশি সময়
নাও লাগতে পারে। কথায় বলে। য পলায়তিঃ স জীবতিঃ। তাই আমরা পালিয়েই বাঁচার হদিশ খুঁজে
নিই। সেখানেই আমাদের সুরক্ষা।
এই সিস্টেমের
কাণ্ডারীরাও সেটা জানে। জানে বলেই তারা এক এক নামে এক একটি শূল খাড়া করে রেখে দেয়।
আর সময় সময় দরকারে সেই শূলে স্কেপগোটদের চড়িয়ে দিয়ে হাসি হাসি মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে
হাত নাড়ে। বলে আইন আইনের পথেই চলবে। আর আমরাও আমাদের নিজস্ব সুরক্ষার বলয়কে আরও সুরক্ষিত
করতে দুহাত তুলে তালি বাজাই, থালা বাজাই। পটকা ফাটাই। স্ট্যাটাস দিই। না ধর্মের কল
বাতাসে নড়ছে ঠিক।
২৯শে জুলাই’
২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

