চরিত্রের দোষ
যুদ্ধ লাগলেই এক বিশেষ ধরণের মানুষের চরিত্র
বেআব্রু হয়ে যায়। এঁরা ক্ষমতায় থাকেন না। ক্ষমতা। অর্থাৎ শাসন ক্ষমতায় থাকলে তবু একটা
অর্থ থাকে। সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া, মিথ্যের প্রচারে জনতাকে বিভ্রান্ত করার একটা দায়
থাকে শাসকের। অন্তত অধিকাংশ সময়ে। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থেকেও। শাসক কিংবা প্রশাসক
না হয়েও সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া, ঘটনাকে বিকৃত করে তোলা। মিথ্যার প্রচারে সামিল হওয়া
এবং ইতিহাসকে মুছে দেওয়ার একটা তাগিদ অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষের ভিতরে কাজ করতে থাকে।
এঁরা সমাজের ভিতরে থেকে ঘুণপোকার মতো সমাজকে ফোঁপড়া করে দিতে থাকেন। কারণ এঁরা অধিকাংশ
সময়েই কোন না কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ নিয়ে ক্ষমতার দাসত্ব করতে থাকেন। এঁদেরকে আমরা
ক্ষমতার দলদাস বলতে পারি। যদিও দেখা যাবে। অধিকাংশ সময়েই এঁরা ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব
না করেই ক্ষমতার দলদাস হয়ে ওঠেন। সরাসরি শাসক শ্রেণীর সাথে এঁদের কোনরূপ সংযোগ থাকে
না। শাসকের হয়ে ওকালতি করে এঁদের যে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। তেমনটাও
নয়। শাসকশ্রেণী যে এঁদেরকে তাদের স্বার্থে কাজে লাগিয়ে পুরস্কৃত করে। তেমনটাও নয়। সম্পূ্র্ণ
স্বতঃপ্রোণদিত হয়েই এঁরা শাসকশ্রেণীর হয়ে ওকালতি করতে থাকেন। প্রতিষ্ঠানের কথা। শাসকের
নির্দেশ। ক্ষমতার প্রচার। এঁদের কাছে বেদবাক্য। চোখ বন্ধ করে এঁরা দলদাসত্ব করতে থাকেন।
এবং বাকি মানুষদের বিভ্রান্ত করে চলেন অধ্যাবসয় সহকারে। এই বিষয়ে এঁদের কোন ক্লান্তি
নেই। বিরাগ নেই। সাধারণ অবস্থায় এঁদের চেনা একটু কষ্টকর হলেও। যুদ্ধ আসলেই এঁরা নিজেদের
বেআব্রু করে ফেলেন। তখন এঁদের আসল চরিত্রের উদ্ঘাটন হয়ে যায়।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জনপদই এঁদের মতো
মানুষের দ্বারা সংক্রমিত। সমাজে এঁদের সরাসরি কোন প্রভাব না থাকলেও। ক্ষমতার পক্ষে
জনসমর্থন তৈরী করে তুলতে এঁদের অভিঘাত যথেষ্ঠ। কারণ এঁরা সংক্রমক। এঁরা, যে যত বেশি
শিক্ষিত। সে তত বেশি সংক্রমক। ফলে এঁরা দলে ভারি। সমাজে, এঁদের মোমবাতি মিছিলের অভিঘাত
পড়ে। ভালোরকম ভাবেই। সবসময়ে সেই প্রভাব যে ক্ষতিকারক হবেই। তেমনটাও বলা যায় না। স্থান
কাল পাত্রের বিচারেই সেটি ঠিক হয়। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই এঁদের প্রভাব বাকিদের বিভ্রান্ত
করার জন্য, যথেষ্ঠ কার্যকারি। এবং অধিকাংশ সময়েই এঁদের প্রভাব ক্ষমতায় থাকা শাসক শ্রেণীর
স্বার্থ রক্ষা করে থাকে। এর একটা বড়ো কারণ। এঁরা অধিকাংশ সময়েই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ নিয়ে।
ক্ষমতার পক্ষ নিয়ে। শাসকের পক্ষ নিয়ে ওকালতি চালিয়ে যান। আর যুদ্ধ লাগলে তো কথাই নেই।
এবারে সেই যুদ্ধই লেগেছে। ইউক্রেনে। না,
এঁরা কেউই ইউক্রেনের নাগরিক নন। কিন্তু যুদ্ধের বিরুদ্ধে এঁরা সরব হয়েছেন অবশেষে। অবশেষে
কেন বলছি। তার একটা বড়ো কারণ রয়েছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে বিশ্বের
যেখানেই যুদ্ধ বাধুক না কেন। এঁদেরকে সেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে কখনো টুঁ শব্দটি করতে শোনা
যায়নি। রাজপথে নামতে দেখা যায়নি। যুদ্ধ নয় শান্তি চাই প্ল্যাকার্ড হাতে। এঁদেরকে যুদ্ধ
বিদ্ধস্ত কোন দেশের পতাকার ছবি নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়ার প্রোফাইল ছবিতে লাগাতে দেখা
যায়নি। মার্কিন হানাদার বাহিনী যখন প্রথম বারের জন্য ইরাকে হানা দিয়েছিল। ইরাকের বিরুদ্ধে
বাকি বিশ্বকে একত্রিত করে ইরাকের উপরে অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিয়েছিল। যার সরাসরি
প্রভাবে লক্ষ লক্ষ ইরাকি শিশু’র মৃত্যু হয়েছিল। তখন ইরাকের পতাকা হাতে কাউকেই আমরা
রাস্তায় নামতে দেখিনি। ইরাকের নবজাতকদের জন্য কাউকেই দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে দেখা যায়নি।
শুরুটা প্রায় তখন থেকেই। তারপর একে একে যুগস্লাভিয়া, আফগানিস্তান, আবার ইরাক, লিবিয়া,
সিরিয়া, সোমালিয়া, সুদান, ইয়েমেন। আর লেবানন আর প্যালেস্টাইনের কথা তো বলাই বাহুল্য।
সেখানে মুসলিম নিধন যজ্ঞ তো বারো মাসের বিষয়। না, এই সব যুদ্ধের সময়। আমরা এঁদের কাউকেই
যুদ্ধ নয় শান্তি চাই প্ল্যাকার্ড হাতে পথে নামতে দেখিনি। পরেও দেখবো না। ইয়েমেনে এই
মুহুর্তেও যুদ্ধ চলছে। আজ প্রায় সাত আট বছর ধরে। একটানা। সাড়ে তিন লক্ষের বেশি মানুষকে
হত্যা করা হয়েছে। আজকেও হবে। ইয়েমেনের পতাকা হাতে কয়জন পথে নেমেছেন? ইয়েমেনের হানাদার
বাহিনী ও তাদের মদতদাতা শক্তির বিরুদ্ধে কয়জন সরব হয়েছেন? না, সেটা হবে কি করে? ইয়েমেনে
মানুষ মারা গেলে ক্ষতি নেই। কারণ আগে দেখে নিতে হবে কে বা কোন শক্তি মানুষের হত্যাযজ্ঞে
সামিল হয়েছে বা মদত দিচ্ছে।
ফলে ১৯৯১ সালের পর থেকে একটার পর একটা
যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষের হত্যা যজ্ঞে যাঁরা নিরব ছিলেন। সেই সেই হত্যা যজ্ঞের সমর্থনে।
সেই তাঁরাই আজ কেঁদে কুল পাচ্ছেন না। ইউক্রেনবাসীর জন্য। ২২শে মার্চ অব্দি সময়ে ইউক্রেন
যুদ্ধের প্রথম ২৮ দিনে কতজন ইউক্রেনবাসীর মৃত্যু হয়েছে? অফিস অফ দ্য ইউনাইটেড নেশন
হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস দপ্তরের পরিসংখ্যান কি? একবার দেখে নেওয়া যাক বরং। যুদ্ধের প্রথম আঠাশ
দিনে ৯৭৭ জন ইউক্রেনবাসীর প্রাণ গিয়েছে। যার ভিতরে ৮১টি শিশু। কিন্তু এই ৯৭৭ জনের ভিতরে
কতজন ডনবস অঞ্চলের স্বাধীনতাকামী রুশভাষী রয়েছেন। যাঁদের প্রাণ গিয়েছে ইউক্রেন সমারিক
বাহিনীর আক্রমণে। তার হিসেব দেওয়া নাই। এই সময় পর্বে আহত ইউক্রেনবাসীর সংখ্যা ১৫৯৪।
যার ভিতরে শিশুর সংখ্যা ১০৮। না এই হিসেবের ভিতরে কতজন রুশভাষী ডনবস বাসিন্দা ইউক্রেনের
সামরিক বাহিনীর আক্রমণে আহত। সেই হিসেবও নেই। এই হিসেব রাষ্ট্রপুঞ্জের দেওয়া। এবারে
রাশিয়ার সমারিক দপ্তরের দেওয়া একটি পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া যাক। এই একই সময়ে ইউক্রেনে
যুদ্ধরত রুশ সামরিক বাহিনীর প্রায় ১৩০০ সৈনিকের মৃত্যু হয়েছে। আহতের সংখ্যা প্রায় ৪০০০
হাজার। ২০০৩ সালের মার্চ মাস থেকে ২০০৯ সালের জুন মাসের ভিতরে ইরাকে ৬ লক্ষ ৫৪ হাজার
৯৬৫ জন ইরাকবাসীর মৃত্যু হয়েছিল। ইরাক আক্রমণের প্রথম তিন সপ্তাহেই, ২০০৩ সালের এপ্রিলের
৯ তারিখের ভিতরেই ৩০,০০০ এর বেশি ইরাকবাসীর মৃত্যু হয়েছিল মার্কিন হানাদার বাহিনীর
আক্রমণে। ফলে আজকে যাঁরা ইউক্রেনবাসীরদের জন্য কেঁদে আকুল হয়ে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের
তীব্র নিন্দায় সরব। সেই তাঁরাই কিন্তু ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনীর ইরাক আক্রমণের সমর্থনে
সাদ্দামের মুণ্ডু চাই বলে রণহুঙ্কার দিতেন। সেদিন তাঁদেরকে সাধারণ ইরাকবাসীর মৃত্যুতে
কেঁদে আকুল হতে দেখা যায়নি। পরিসংখ্যানের হিসাব অনুযায়ী ২০০৩ সালের ১৯শে মার্চ ইরাক
আক্রমণের প্রথম দিন থেকে ২০২০ সাল অব্দি ইরাক অভিযানে ৪ হাজার ৫৮৬ জনে মার্কিন সৈন্যের
মৃত্যু হয়েছে। যার ভিতরে প্রথম বছরে মাত্র ৪৮৬ জন মার্কিন সৈন্যের মৃত্যু হয়েছিল। এই
সব পরিসংখ্যান তুলে ধরার উদ্দেশ্য একটাই। আজকে যাঁরা ইউক্রেনবাসীর জন্যে চোখের জল ফেলছেন।
তাঁদের সেই চোখের জলের স্বরূপটা সম্যক অনুধাবন করার প্রয়োজন রয়েছে।
আমরা আফগানিস্তান লিবিয়া সিরিয়া ইয়েমেন
প্যালেস্টাইন ইত্যাদি যুদ্ধ বিদ্ধস্ত অঞ্চলগুলির হিসেবকে সরিয়ে রেখে ইরাক ও ইউক্রেনের
তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরছি, কারণ। মার্কিনদের ইরাক আক্রমণ আর রাশিয়ার ইউক্রেন
আক্রমণের ভিতরে একটা সমান্তরাল হিসেব নিকেশ রয়েছে। পুরোপুরি একশো শতাংশ না হলেও অনেকটা
পরিমাণেই। এবার দেখা যাক, এই সমান্তরাল চিত্রটা ঠিক কি রকম। মার্কিনরা ইরাক আক্রমণ
করেছিল সাদ্দাম হোসেন গণ বিদ্ধংসী অস্ত্রসম্ভার তৈরীর প্রকল্প চালাচ্ছে, এই অজুহাতে।
তাদের লক্ষ ছিল। সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। না, একজন ইরাকবাসীও
মার্কিনদের কাছে সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আর্জি জানায়নি। কিন্তু মার্কিনদের স্বার্থ
ছিল ইরাক দখল করার। আজও ইরাক মার্কিনদেরই দখলে রয়েছে। সেদিন যাঁরা মার্কিনদের স্বার্থ
রক্ষায় ইরাক আক্রমণের সমর্থনে প্রতিদিন টিভি খুলে ইরাকের আকাশে মার্কিন মিসাইল বর্ষণের
লাইভ ছবি দেখে দুই হাত তুলে নৃত্য করতেন। আজকে কিন্তু তাঁরাই যুদ্ধ নয় শান্তি চাই বলে
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের নিন্দায় সরব। সেদিন তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন। সাদ্দাম হোসেন
গণ বিদ্ধংসী অস্ত্রসম্ভার তৈরী করছে। তাই সেইগুলি ধ্বংস না করলে বিশ্ব নিরাপদ নয়। সেই
তাঁরাই আজ বেমালুম চোখ বুঁজে রয়েছেন। এটা জেনেও যে, ইউক্রেনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর
মদতে ৩০টি ল্যাবরেটরী তৈরী করা হয়েছে। যেগুলিতে সরাসরি মার্কিন বিজ্ঞানীরা গণ বিদ্ধংসী
বায়োলজিক্যাল অস্ত্র তৈরীর প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত। না, ইরাকে সাদ্দাম কোনভাবেই গণ
বিদ্ধংসী অস্ত্রসম্ভার তৈরীর প্রকল্পের সাথে জড়িত ছিলেন না। ইরাকী বিজ্ঞানীদের সেই
ক্ষমতাও ছিল না। সেকথা আমরা সকলেই জানতাম। ইরাক দখল করে দুই দশক কাটিয়ে দিয়েও মার্কিন
হানাদাররা আজও একটিও গণ বিদ্ধংসী অস্ত্রসম্ভার খুঁজে পায়নি ইরাকে। কিন্তু কোটি কোটি
ইরাকবাসীর প্রাণ চলে গিয়েছে এই যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশটিতে। আমেরিকা ও তার দোসর দেশগুলির
সৈন্যদের গোলায়। কিন্তু ইউক্রেনে দীর্ঘদিন ধরেই বায়োলজিক্যাল অস্ত্র তৈরীর বিষয়ে গবেষণা
চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য এই ল্যাবরেটরীগুলি
পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্বকে বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের আতঙ্ক থেকে রক্ষা করা।
ইউক্রেনবাসীদের দুঃখে কেঁদে আকুল হওয়া
প্রজাতির মানুষরা এই সকল তথ্যই জানেন। ইরাক আক্রমণের সময়ে তাঁরা যে যুক্তিতে মার্কিনদের
ইরাক আক্রমণে সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেই একই যুক্তিকে তাঁরা রাশিয়ার ইউক্রেন অভিয়ানের
সময় সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলেছেন। চরিত্রের দোষ। ঢেকে রাখা দায়। আমরা আগেই বলেছি। যুদ্ধ লাগলেই
এই প্রজাতির মানুষের চরিত্র সম্পূর্ণ বেআব্রু হয়ে পড়ে। মার্কিনদের আফগানিস্তান আক্রমণের
মূল অজুহাত ছিল। মৌলবাদী সন্ত্রাসবাদের আতুঁরঘর আফগানিস্তানের তালিবানদের নিকেশ করা।
রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ইউক্রেনকে নব নাৎসী সম্প্রদায়ের হাত
থেকে উদ্ধার করা। যে নব নাৎসীদেরকে অস্ত্র অর্থ এবং যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে শক্তিশালী
করে তুলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো। না, ইউক্রেনবাসীদের জন্য কেঁদে আকুল হওয়া
প্রজাতির মানুষেরা আফগানিস্তানে তালিবান নিকেশের সমর্থন করলেও ইউক্রেনকে নব নাৎসী শক্তির
কব্জা থেকে উদ্ধার করার বিষয়টিকে সমর্থন করতে পারছেন না কিছুতেই। তাঁরা খুব ভালো করেই
জানেন। মার্কিন শক্তি কতদিন ধরে কত ভাবে এই নব নাৎসীদের ইউক্রেনে শক্তিশালী করে তুলেছে।
কেনই বা তুলেছে। কিভাবে এদের মাধ্যমে মার্কিন শক্তি গোট ইউক্রেনকে নিজের কব্জায় রেখে
শাসন ও শোষণ করে চলেছে। এঁরা তাই কোনভাবেই মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে
পারছেন না। মার্কিন শক্তির স্বার্থরক্ষাই এঁদের আজীবনের ধ্যানজ্ঞান। ঠিক এই কারণেই।
যে মুহুর্তে তাঁরা বুঝতে পেরেছেন। রাশিয়া ইউক্রেনে ঢুকে পড়লে। ইউক্রেনকে নব নাৎসীদের
কব্জা থেকে মুক্ত করে ফেলবে। ইউক্রেনে মার্কিন শক্তির বায়োলজিক্যাল মারণাস্ত্র তৈরীর
বিপুল কর্মযজ্ঞ বন্ধ হয়ে যাবে। সেই মুহুর্ত থেকেই তাঁরা রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের বিরুদ্ধো
গলা ফাটাচ্ছেন। মার্কিনদের স্বার্থ ব্যাহত হওয়া মানে তাদের কাছে সেটি ব্যক্তিশোকের
মতো ভয়াবহ। ফলে দুর্বৃত্তের যেমন ছলের অভাব হয় না। তাঁদেরও ঠিক সেইরকম ভাবেই ইউক্রেনবাসীদের
জন্য আজ চোখের জলের অভাব হচ্ছে না। যে চোখের জলের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি তাঁদের চোখে।
ন্যাটো যখন একটানা আশি দিনের বেশি যুগস্লাভিয়ায় বোমা বর্ষণ করে ধ্বংস করে দিয়েছিল একটা
দেশ। নব্বইয়ের দশকে। সেই চোখের জলের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি ন্যাটো যখন মার্কিন মদতে
সমৃদ্ধশালী লিবিয়াকে শশ্মানে পরিণত করে দিয়েছিল আকাশ থেকে নিরাপদে বোমা ফেলে ফেলে।
সিরিয়া আফগানিস্তান ইরাক ইয়েমেন প্যালেস্টাইন। না না না। এঁদের চোখের জলের ছিটেফোঁটাও
দেখা যায় না তখন। আজকে তাঁরাই চোখের জল সমালাতে পারছেন না। এঁরাই আবার সাদ্দামের বিরুদ্ধে
আঙুল তুলতেন। ইরাকী কুর্দদের স্বাধীনতা হরণ ও তাদের উপরে সমারিক অত্যাচার চালানোর অভিযোগ
তুলে। সেই তাঁরাই আজ, ইউক্রেনের নব নাৎসীদের কব্জায় থাকা রাষ্ট্রশক্তি’র এক টানা আট
মাস রুশভাষী ডনবস অঞলের বাসিন্দারের উপরে সমারিক আক্রমণের বিষয়ে অনবদ্য নীরবতা পালন
করছেন। কি আশ্চর্য্য এঁদের সহ্যশক্তি। আর কি আশ্চর্য্য এঁদের নীতিবোধ!
এবং কি আশ্চর্য্য এঁদের মনোবৃত্তি! রাশিয়ার
মিসাইল এঁদের কাছে মানবতা বিরোধী বর্বতার বহিঃপ্রকাশ। অথচ মার্কিন মিসাইল বর্ষণ এঁদের
কাছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও মার্কিনশক্তির শৌর্যের প্রকাশ। রাশিয়ার ইউক্রেন
অভিযান এঁদের কাছে ওয়ার ক্রাইম। অথচ মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর একের পর এক দেশে কোটি
কোটি মানুষকে মিসাইল আর বোমায় উড়িয়ে দেওয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত! ভাবলে শিউরে
উঠতে হয়। এই সব শিক্ষিত অথচ নৃশংস মনোবৃত্তির প্রজাতির মনুষদের কথায়। ইউক্রেনবাসী শরণার্থী
যাঁরা পোল্যাণ্ড রোমানিয়া হাঙ্গেরিতে আশ্রয়ের জন্য ছুটে গিয়েছে। তাদের কথা চিন্তা করে
এঁদের রাতের ঘুম নষ্ট। সেই একই সময়ে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর আক্রমণে বিদ্ধস্ত হয়ে
অগ্নিদগ্ধ ঘরবাড়ি থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী রাশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের
স্মরণে এঁদের মনে কোন মর্মবেদনা নাই। একই মানুষ। অথচ স্থান কাল পাত্র বিচারে দুই বিপরীত
নীতির ধারক ও বাহক।
সত্যি করেই আজ এঁদের চিনে নেওয়ার সময় চলে
এসেছে। সুকান্তের কথাই যদি স্মরণ করি। তবে বলতেই হয়। এই বিশ্বকে এই প্রজাতির মানুষ
থেকে মুক্ত করে যেতে না পারলে। এই পৃথিবী কোনদিনই নবজাতকের বাসযোগ্য হয়ে উঠবে না। অনেকেই
ভাবতে পারেন। সকলেই কি সেইরকম? সকলের কাছেই কি সবসময় সঠিক তথ্য গিয়ে পৌঁছায়? যে ভাবে
মিথ্যাচারের প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে আসছে মার্কিন শক্তি। অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই তো সত্যের
নাগাল পাওয়া কষ্টসাধ্য। কিংবা অসম্ভব। ঠিক কথা। কিন্তু সেটি সাধারণ জনতার সম্বন্ধে
সত্য। আমরা আলোচনা করছি শিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত প্রজাতির মানুষদের নিয়ে। তথ্যের ভাণ্ডার
যাঁদের নাগালের ভিতরেই থাকে। তাঁরা যে অজ্ঞতার কারণে অন্যায়ের সাথে আপোস করে চলেন।
তা নয়। তাঁরা ব্যাক্তিস্বার্থের কারণেই অন্যায়ের সাথে স্বেচ্ছায় আপোস করে চলেন। বলা
ভালো, অন্যায়ের মদত দিয়ে চলেন। তাতে তাঁদের ব্যক্তিস্বার্থে যতটা না সুরক্ষিত থাকে।
তাঁদের মনের আনন্দ হয় তার থেকে শতগুন বেশি। এঁদের স্বার্থ ইউক্রেনবাসীদের সাথে জড়িত
নয়। এঁদের স্বার্থ মার্কিন শক্তির সাথে জড়িত। এঁদের আত্মীয় স্বজন বন্ধু পরিজনদের একটা
অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ ন্যাটো গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির নাগরিক। ফলে যেখানেই মার্কিন
স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার এতটুকু সম্ভাবনা দেখা যাবে। সেখানেই তাঁদেরকে মাঠে নেমে পড়তে
দেখা যাবে। এটাই এঁদের ধর্ম। আজকে যে এঁরা ইউক্রেনবাসীর দুঃখে কাতর। বিষয়টা তেমন একরৈখিকও
নয়। অন্ধ মার্কিন ভক্তির উৎসাহের বহিঃপ্রকাশে এই কুম্ভীরাশ্রু! ফলে যেখানেই মার্কিন
স্বার্থহানী। সেখানেই এঁদের নয়ন অশ্রসজল হয়ে উঠবে। এ আর বিচিত্র কি?
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই প্রজাতির ঘুণপোকারা সমাজের ভিতরটাই ফাঁপা করে দিতে থাকে। কারণ তাঁরাই উচ্চ শিক্ষিত। তথ্যের ভাণ্ডার তাঁদের হাতের নাগালে থাকে। এমনকি তথ্য ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সুযোগ ও শক্তি তাঁদের হাতেই থাকে। ফলে ক্ষমতার অক্ষগুলি এঁদের সহায়তাকেই কাজে লাগিয়ে জনমানসকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের দিন তিনেকের ভিতরেই বিশ্বজুড়ে রাশিয়া বিরোধী গনচেতনা গড়ে তোলার পিছনে এঁদের একটা বিশেষ অবদান রয়েছে বইকি। এঁদের ভিতরেই অনেকের মধ্যেই আবার চুড়ান্ত কমিউনিস্ট বিরোধী জিঘাংসা কাজ করতে থাকে। তাঁদের আবার স্মরণেই থাকে না। আজকের রাশিয়া পুরোপুরি ক্যাপিটালিস্ট হয়ে গিয়েছে। যেখানে কমিউনিজম পুরোপুরি পরাজিত। বিদ্ধস্ত। এবং অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এঁদের মতো উচ্চ শিক্ষিত মার্কিনভক্তদের সেই কথা স্মরণ করানোও অর্থহীন। তাঁদের কাছে আজও রাশিয়া মানেই কমিউনিজম। যেটিকে এঁরা যমের থেকেও বেশি ভয় করে। ফলে যে মুহুর্তে মার্কিন শক্তি সরাসরি রাশিয়া বিরোধী অবস্থান নিয়ে নিল। সেই মুহুর্তেই এঁদের কাছে রাশিয়াই প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠলো। ফলে ইউক্রেন দখল সম্পূর্ণ হলেই রাশিয়া একে একে পোল্যাণ্ড রোমানিয়া হাঙ্গেরি বুলগেরিয়া জর্জিয়া বাল্টিক দেশসমূহের দখল নিতে শুরু করে দেবে বলে অপপ্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়তে এঁদের দুইদিনও ভাবতে হলো না। রাশিয়া আর কমিউনিজম ভীতি এঁদের কাছে আজ প্রায় সমার্থক। এবং যুদ্ধ বাঁধলেই এঁরা বেআব্রু হয়ে পড়েন। চরিত্রের দোষ যাবে কোথায়।
২৬শে মার্চ’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

