মৃত্যুশোক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মৃত্যুশোক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মৃত্যুশোক




মৃত্যুশোক

এক

যেকোন মৃত্যুই দুঃখজনক। নিকট বা পর। এমনকি শত্রু কিংবা মিত্র। এমনকি রাজনৈতিক বা সামরিক। কিন্তু আমাদের কাছে সব মৃত্যুই সমান দুঃখজনক নয়। অনেক সময় অনেক মৃত্যুই উৎসবের, বিশেষ করে শত্রুর মৃত্যু। একদম নিকট জনের মৃত্যু আমাদেরকে যতটা শোকগ্রস্ত করে, সকলের মৃত্যুই ততটা শোকগ্রস্ত করে না। এই যে বিভিন্ন জনের মৃত্যু আমাদের ভিতরে ভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়া ঘটায়, এর আর একটি নাম দেওয়া যেতে পারে সম্পর্ক। যার সাথে আমাদের যেমন সম্পর্ক, যে ধরণের সম্পর্ক, তার মৃত্যু আমাদের ভিতরে তার ভিত্তিতেই শোকের জন্ম দেয়, বা দেয় না। প্রতি মুহুর্তে মানুষ মারা যাচ্ছে, সব মৃত্যুই যদি সমান ভাবে আমাদের শোকাতুর করে তুলতো, তবে শুধু আমাদের জীবনই নয়, গোটা মানব সভ্যতা থেমে যেত। আবার কোন মৃত্যুই যদি আমাদের ভিতরে কোনরকম রেখাপাত না করতো, তবে মানুষের এই পৃথিবী সম্পূর্ণ অমানবিক হয়ে যেত।

মৃত্যুর এই যে ভিন্ন ভিন্ন রেখাপাত, এ আমাদের জীবনের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট। যার ভরকেন্দ্র, মৃতজনের সাথে আমাদের সম্পর্কের সূত্রের উপরেই। সম্পর্কের এই সূত্রই আমাদের ভিতরে শোকের জন্ম দেওয়া ও না দেওয়ার আসল করিগর। তাই সব মৃত্যুই সকলের কাছে সমান শোকের নয়। কোনদিনই তা সম্ভব নয়। নয় বলেই সমাজ সংসার আজও সচল রয়েছে।

মৃত্যুর সাথে সম্পর্কের এই সূত্র আবার শ্রেণী বৈচিত্রের উপরেও অনেক পরিমানে নির্ভরশীল। আমরা যে যেধরণে অর্থনৈতিক শ্রেণীতে বাস করি, তার থেকে দুর্বল বা নিম্নমানের অর্থনৈতিক শ্রেণীর ভিতরে ঘটা মৃত্যু আমাদের ভিতরে বিশেষ কোন অনুভুতির জন্ম দেয় না। আবার আমাদের থেকে উচ্চতর সমৃদ্ধতর অর্থনেতিক শ্রেণীর ভিতরে ঘটা মৃত্যুতে আমরা যতটা না শোকগ্রস্ত হই, তার থেকে বেশি শোকের ভান করি সময় অসময়ে। এই যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া, একই মৃত্যুকে ঘিরে, এটা ন্যায় নীতির প্রশ্ন নয়। এটা মানুষের জীবধর্ম। বিশেষ করে বর্ণভেদ মূলক সমাজে। বিশেষ করে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়।

ফলত দেখা যাচ্ছে, আমাদের জীবনে মৃত্যজনিত শোক দুঃখ, শুধুমাত্র আত্মীয় বিয়োগের মতো প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণার বাইরে নানান সম্পর্ক ও শ্রেণীগত অবস্থানের উপরে নির্ভরশীল। অর্থাৎ মৃত্যুশোক যতটা না, মৃত্যুর উপরে নির্ভশীল, তার থেকে অনেক বেশি পরিমাণে নির্ভরশীল মৃতজনের সাথে আমাদের সম্পর্ক ও আমাদের পারস্পরিক শ্রেণীগত অবস্থানের উপর। এটা ঠিক, মৃত্যু ও মৃত্যুজনিত শোক এমন হিসাব নিকেশ করে দেখা দেয় না। মৃত্যু ঘটলে, তা যে কারণেই হোক, আমাদের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সহজাত ও সতঃস্ফূর্ত ভাবেই দেখায় দেয়। কারণ, মৃত্যু আচমকা এলেও, আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সূত্র ও অবস্থানগত তারতম্য দিনে দিনে গড়ে ওঠে। আমাদের জীবনযাপনের অভ্যস্থতার মধ্যে দিয়েই মৃত্যু ও মৃত্যুশোক আমাদেরকে এক এক সময়ে এক এক রকমের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় নিজেদেরকে নিজেদের মুখোমুখি করিয়ে দেয়।

তখন আমরা যদি সত্যি সত্যিই নিজেদের মুখোমুখি হওয়ার শক্তি রাখি, দেখতে পাবো, একই আমির ভিতরে বাস করে কত ভিন্ন ভিন্ন আমির মুখ। এক এক সময়ে এক এক ধরণের সম্পর্কের সূত্রে এক এক রকমের ভিন্ন আমি অবগুন্ঠন খুলে আত্মপ্রকাশ করে ফেলে। আমরা শত প্রয়াস করলেও সেই আত্মপ্রকাশকে ধামাচাপা দিতে পারিনা বেশিরভাগ সময়েই। ধরা পড়ে যায় আমাদের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের গ্রন্থিগুলি।

কিন্তু এই যে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের গ্রন্থির ভিত্তিতে, এক একটি নানা রঙের আমির আত্মপ্রকাশ, একে আমাদের মনুষ্যত্বের ব্যর্থতা ভাবলে ভুল হয়ে যাবে। এটি যে আমাদের জীবধর্ম। একে অস্বীকার করে অতিক্রম করতে গেলে আমাদের স্বাভাবিক জীবন ছন্দের তাল, বেতাল হয়ে পড়তে বাধ্য। তাহলে সমাজ সংসারের স্বাভাবিক চলন বাধাপ্রাপ্ত হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। তাই যে কোন মৃত্যুর সময় এই নানান আমির ভিন্ন ভিন্ন আত্মপ্রকাশ, ন্যায় বা অন্যায়ের অর্থাৎ নীতিগত কোন বিষয় নয়। জীবনে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামের সূত্রেই এই ভিন্ন ভিন্ন আমিত্বের সংযোগ। এর যোগ জীবনের সাথে। সেখানেই হয়তো মৃত্যুর দূরবর্তী জীবনের ঘ্রাণ।

দুই

যে কোন আত্মহত্যাই পাপ। যদি আত্মহত্যাকে পাপ বলেই ধরা হয়ে থাকে। একথা তো ঠিক আত্মহত্যাকে আজও কোন সমাজ মানুষের মৌলিক অধিকার বলে আইনত স্বীকৃতি দেয় নি। একজন সেলিব্রেটির আত্মহত্যা ও একজন কৃষকের আত্মহত্যা দুই পাপ। দুই কাম্য নয়। দুই দুঃখজনক। কিন্তু এক আধজন সেলিব্রেটির ব্যক্তিগত জীবনের নানান ওঠাপড়ার কারণে আত্মহত্যা, আর হাজার হাজার কৃষকের বছরের পর বছরের ধরে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত ও রূপায়িত ভুল নীতিমালার  প্রয়োগের ফলে আত্মহত্যা এক নয়। প্রথমটি আত্মহত্যা হলেও দ্বিতীয়টি হত্যা। প্রথমটি দুঃখজনক। কিন্তু দ্বিতীয়টি মর্মান্তিক। প্রথমটি ব্যক্তিগত বিষয়। দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রীয় বিষয়। প্রথমটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন পরিচিত বন্ধুবান্ধবসহ ফ্যান ফলোয়ারদের শোকের বিষয়। দ্বিতীয়টি গোটা দেশের জনসাধারণের শোকের বিষয়। প্রথমটির ক্ষেত্রে ব্যক্তির আত্মহত্যা একেবারে নিকটজনদের দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আত্মহত্যকারীর পরিবারই পথে বসে না, পথে বসে গোটা দেশের অর্থনীতিই।

না, আমরা সাধারণত এতশত ভাবতে চাই না। অভ্যস্তও নই। আমাদের আবেগে আমরা চলি। যেসময় যে আবেগ আমাদের যেভাবে পরিচালিত করে আমরা সেই ভাবেই হাসি কাঁদি। কারণটি নিয়ে পূর্বেই বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার সাথে আমাদের ব্যক্তিগত আবেগ অনুভুতির সম্পর্কের বাইরে আমরা পা রাখতে পারি না। আমাদের দেশপ্রেম, আমদের স্বদেশচেতনা, আমাদের মানবপ্রেমের শিক্ষা দীক্ষা, আমাদের ব্যক্তিগত লোভ লালসা আকাঙ্খা, চাহিদা ভালোবাসা ইত্যাদি বহুকিছু জড়িয়ে রয়েছে, আমাদের ব্যক্তিগত আবেগ অনুভুতির ভিতরে। সেগুলির ভিতর দিয়েই আমাদের বুঝে নিতে হবে, কেন আমরা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করি।

যদিও আমরা সকলেই জানি, আত্মহত্যাই হোক আর হত্যাই হোক, দুইই আসলে মৃত্যু। দুই মূলত এবং প্রধানত শোকের বিষয়। সেই মৃত্যু করোনাতেই হোক আর হাজার মাইল পথ হাঁটতে বাধ্য হয়েই হোক। কিন্তু সেই মৃত্যুশোক যার কাছে যেমন ভাবেই বাজুক না কেন, কিংবা যদি নাও বাজে, তাতেও জীবনের কিছু এসে যায় না। জীবনের অভিমুখ কেবলই সামনে। পিছনে কে মরে পড়ে থাকলো, জীবনের ধর্ম নয় সেই দিকে তাকিয়ে বিলাপ করা। জীবন অনন্তকাল ধরে অনন্তের অভিমুখে চলেছে। সেই চলায় কোন ছেদ নাই। যতি নাই। থামা নাই। মৃত্যু ক্ষণিকের একটা ঝটকা দেওয়ার চেষ্টা করে মাত্র। কিন্তু তার বেশি আর কোন ক্ষমতা নাই তার। জীবনের শক্তি এমনই অনন্ত। এমনই দূর্বার যে, আমোঘ মৃত্যুও কোন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না বিশ্বময় এই অনন্ত জীবনের পথে।

আমরাও চলেছি সেই পথে। কার জন্য কে আত্মহত্যা করলো। কার কোন ভুল নীতির ফলে কতশত মানুষের প্রাণ গেল, যাচ্ছে ও যাবে সেসব ভাবার অবসর কোথায়। কালকের ভোরে আমাকেও ঘুম থেকে উঠতে হবে। সেই প্রয়াসই শেষ সত্য। উঠি আর নাই উঠি। যতক্ষণ না মৃত্যুর অন্ধকারে নিজে ঢলে পড়ছি, ততক্ষণ জীবনের দাবি এমনই অমোঘ যে, কারুর মৃত্যুশোকই চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারে না। থামিয়ে দিতে পারে না আমাদের কোন আনন্দসুখের অনুভুতিই।

১৬ই জুন’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত