অন্ধবিশ্বাসের
অন্ধকার
“এক”
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। কি অব্যর্থ মন্ত্র! মানুষের চিন্তা চেতনা
অনুসন্ধিৎসাকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে রেখে, তার ব্যক্তিত্বের স্বাধীন ও মৌলিক
বিকাশকে অবরুদ্ধ করে রাখার এমন কার্যকরি অস্ত্র আর দুটি নাই। মানুষের ইতিহাস ঘুরে
দেখলেই দেখা যাবে এই বিশ্বাসের যাঁতাকলেই অধিকাংশ মানুষকে আটকিয়ে রাখার নামই ধর্ম।
পরে সেটাই হয়ে উঠলো রাজনীতি। আর গ্লোবালাইজেশনের শতকে সেটাই কর্পোরেট কালচার।
বিশ্বাসের সাথে আরও যে বিষয়টি ওতোপ্রতো ভাবে জড়িত, সেটি হলো প্রচার। যোগাযোগ
ব্যবস্থা যত উন্নত হয়ে উঠেছে, এই প্রচারযন্ত্রও হয়ে উঠেছে ততই শক্তিশালী। আধুনিক
বিশ্বকে এই প্রচারযন্ত্রে বেঁধে ফেলেই ধর্ম ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতির কারিগররা ও
কর্পোরেট দুনিয়া মানু্ষের মনে বিশ্বাসের ফাঁদ পেতে চলেছে প্রতিনিয়ত। সাধারণ
মানুষের হাতে দিনের শেষে পড়ে থাকে শুধুমাত্র অন্ধবিশ্বাসের মৌতাতটুকু। এই মৌতাত
পিরামিডের যুগেও ছিল আজও আছে। সমান ভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে।
মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতির পরিবেশ থেকে অন্ধবিশ্বাসের ভিত গড়ে
উঠতে থাকে একেবারে প্রথম থেকেই। আর সেখান থেকে গড়ে ওঠে তার ধর্মবোধ। বা আরও
নির্দিষ্ট করে বললে, রিলিজিয়াস আইডেনটিটি ও চেতনা। বস্তুত ধর্ম আর রিলিজিয়ন এক
বিষয় নয়। সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি বিষয়। ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝে থাকি, সেটা আসলে
রিলিজিয়ন। গোষ্ঠীবদ্ধ সাম্প্রদায়িকতা। কিন্তু ধর্ম হলো মূলত জৈবিক প্রকৃতি, মানবিক
আদর্শ, সাংস্কৃতিক শুভবোধ। যেগুলির সাথে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সংস্কৃতির বিশেষ কোন
মিল থাকে না অধিকাংশ সময়েই। তাই এই আলোচনায় ধর্ম বলতে আমরা রিলিজিয়নই বুঝবো। কারণ
রিলিজিয়নের সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ তৈরী হয় নি আজও। সেই রিলিজিনের হাত ধরেই মানুষের
মনের ভিতর, চেতনার ভিতর গড়ে উঠতে থাকে অন্ধবিশ্বাসের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য। আধিপত্য।
যে বিশ্বাসে শিক্ষিত মানুষও মনে করতে বাধ্য হয় তাঁর আপন রিলিজিয়নের ধর্মগ্রন্থ কোন
মানুষের লেখা নয়, স্বয়ং ঈশ্বরের লেখা। ঈশ্বরেরই বাণী। অর্থাৎ যে ভাষায় সেই ধর্মগ্রন্থ
লেখা হয়েছে, সেটিই ঈশ্বরের মুখের ভাষা। ঈশ্বর কখনোই অন্য ভাষায় কথা বলেন না। আর এই
বোধ থেকেই মানুষ বিশ্বাস করে প্রচার করে যে, অন্য সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থগুলি আদৌ
ঈশ্বরের বাণী নয়। ঈশ্বরের লেখা নয়। কারণ ঈশ্বরের তো একটই ভাষা। যে ভাষায় বিশেষ
সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর ধর্মগ্রন্থ লিখিত। এই বিষয়ে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ অভিন্ন।
প্রত্যেকেরই ঠিক এই একই রকম বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের অন্ধত্ব নিয়েই পথ চলা শুরু
হয় সাধারণ মানুষের। তার পারিবারিক সংস্কৃতির ভিতর থেকেই। তার সামাজিক সংস্কৃতির
পরিসরে।
প্রতিটি ধর্মগ্রন্থই যে যে যুগে যে যে অঞ্চলে লেখা হয়েছে, সেই সেই যুগের সেই
সেই অঞ্চলের মানুষের সর্বত্তোম জ্ঞানের আধার। অর্থাৎ একটি বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষ
একটা বিশেষ সময়কাল অব্দি যে জ্ঞান আহরোণ ও অর্জন করেছিল সেই অঞ্চলের ও সেই কালের
লিখিত ধর্মগ্রন্থগুলি সেই জ্ঞানেরই কালাধার। এইখানেই প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের
ঐতিহাসিক গুরুত্ব। মানুষ তার পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণী শক্তিতে জগৎ ও জীবনকে যে কালে
যতখানি যেভাবে বুঝতে পেরেছে তার ধর্মগ্রন্থও সেই ভাবে লেখা হয়েছে। এটা মানুষেরই
ইতিহাস। তাই ধর্মগ্রন্থ মানুষের লেখা নয় বলে যারা আস্ফালন করে, তারা প্রকৃত অর্থে
মানুষকেই অপমান করে সকলের আগে। অস্বীকার করে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ঐতিহ্যকে।
মানুষের জায়গায় ঈশ্বরকে বসিয়ে দিতে পারলেই অধিকাংশ মানুষকে গোষ্ঠীস্বার্থে শাসন
করা সহজ হয় বলেই কিন্তু তারা এমন করে থাকে। এবং থাকবেই। এটাই ধর্ম ব্যবসার প্রথম
শর্ত। আর এই শর্ত পুরণ করতেই অধিকাংশ মানুষকে জ্ঞানবিজ্ঞান চেতনার থেকে দূরবর্তী
করে রাখার দরকার পরে। সেটি সম্ভব হয় তখনই যখন মানুষকে প্রকৃত শিক্ষার সুযোগ সুবিধা
থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা যায়। তাই ধর্ম ব্যবসার অন্যতম শর্ত হলো শিক্ষার বিস্তার ও
প্রসারকে সবকালেই সঙ্কুচিত করে রাখা। মানুষকে যদি প্রতিদিন ধর্মগ্রন্থ হাতে বসিয়ে
রাখা যায়, তবে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের শিক্ষা থেকে দূরে রাখা সহজ হয়। মানুষকে যদি
প্রতিদিন ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ আচার বিচার দিয়ে বেঁধে রাখা যায়, তাহলেও মানুষকে
শিক্ষা ও চেতনার বিকাশের পথ থেকে দূরে রাখা অধিকতর সহজ হয়। কারণ এমনিতেই অধিকাংশ
মানুষের অক্ষরজ্ঞান ধর্মগ্রন্থ পড়া ও উপলব্ধি করার মতো সবল নয়। ফলে তাদেরকে
অশিক্ষিত করে রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক আচার বিচার ধর্মীয় ক্রিয়াকলপই আসল অস্ত্র।
এখন এই যে ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ ও আচার বিচার দিয়ে মানুষকে বেঁধে ফেলে তাকে অন্ধ ও
অচেতন করে রাখার প্রক্রিয়া, সেটি সবচেয়ে সহজে ও সফল ভাবে সম্ভব হয় অন্ধবিশ্বাসের
ভক্তির ভিতর দিয়েই। আর সেই কারণেই অন্ধ বিশ্বাসের ভিত মজবুত করার কার্যক্রমগুলি
প্রতিটি রিলিজিয়নেরই গোড়ার কথা। যার শুরুই হয় ধর্মগ্রন্থ ঈশ্বরের সৃষ্টি এই
মিথ্যাকে প্রচার করার ভিতর দিয়েই।
এইভাবে অধিকাংশ মানুষকে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীস্বার্থে অন্ধ অচেতন করে রাখতে
পারলেই তাদেরকে অর্থনৈতিক ভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শোষণ করার কাজটি সুচারু
ভাবে সম্পন্ন করা যায়। ডারুইনের ত্বত্ব অনুযায়ী পৃথিবীর সম্পদ সীমিত। কিন্তু
মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদা অনন্ত। তাই সেই সীমিত সম্পদের উপর প্রভুত্ব করতে গেলে
অধিকাংশকেই অন্ধ ও অচেতন করে রাখার দরকার পরে। তাদেরকে ভয় ভগবান ও ভুতের ভয় দেখিয়ে
হাতের মুঠোয় রাখার জন্যেই ধর্মব্যবসার উৎপত্তি। সেই ধর্মব্যবসাই সকলের আগে তাই
হাতিয়ার করে ধর্মগ্রন্থগুলিকেই। সেকারণেই সেগুলি ঈশ্বর প্রণীত প্রচার করে মানুষকে
সম্পূর্ণ ভুল পথে পরিচালিত করার কার্যক্রম শুরু হয়। এরই সাথে সাম্প্রদায়িক আচার
বিচার দিয়ে ব্যক্তি মানুষকে সামাজিক ভাবে বেঁধে ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। সে আর কোন
প্রশ্ন করবে না। তর্ক করবে না। ভাবতে শুরু করবে না। সামাজিক পরিসরে ব্যক্তি জীবনের
বঞ্চনা ও শোষণের বিষয়গুলি ভাগ্যের মার বলেই মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। তাকে
আগেভাগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার ভাগ্য ঈশ্বর কর্তৃক নির্দিষ্ট। আজকের দুঃখ
দুর্দশার কারণ তার পূর্বজন্মের কর্মফল। এই জন্মের কষ্টের ভিতর দিয়েই ঈশ্বর তার
পরীক্ষা নিচ্ছেন। অর্থাৎ এই জন্মের সমস্ত শোষন বঞ্চনাকে ঈশ্বরের পরীক্ষা নেওয়া বলে
চালিয়ে দিতে পারলেই, মানুষের প্রতিবাদ প্রতিরোধের সামনে পড়তে হবে না ধর্মব্যবসায়ী
ও শোষকশ্রেণীকে। কি চমৎকার পরিকল্পনা ও কার্যক্রম। হাজার হাজার বছর ধরে ঠিক
এইভাবেই এগিয়ে চলেছে মানুষের সমাজ ও সভ্যতা। মুষ্টিমেয় চতুর ও ধুর্তদের সুখে থাকার
ও বিত্তশালী হয়ে ওঠার জন্যেই রমরমিয়ে চলে এসেছে ধর্মব্যবসার সকল প্রকার কার্যক্রম।
ঠিক এই কারণেই রিলিজিয়ন ও রাজনীতি পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে থাকে। একে অন্যের
পরিপূরক। আর বর্তমান কর্পোরেট নিয়ন্ত্রীত বিশ্বে ধনতান্ত্রিক পুঁজিই এই রাজনীতি ও
রিলিজিয়নকে নিয়ন্ত্রীত করে চলেছে। ফলে মানুষের প্রাথমিক অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়
নি আদৌ। রিলিজিয়ন রাজনীতি ও কর্পোরেট পুঁজি, তিনটিরই প্রাণভমরা ঐ অন্ধবিশ্বাস। তাই
তিনটিই প্রচার করে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘগুলি,
রাজনৈতিক দলগুলি এবং কর্পোরেট হাউসগুলি চব্বিশ ঘন্টা মানুষের মনে ও চেতনার ভিতর
অন্ধবিশ্বাসের ভিতকে শক্ত করে চলেছে। সেটাই তাদের প্রাথমিক ও অন্যতম প্রধান কাজ।
সকল ধরণের প্রচার যন্ত্রগুলিই তাদের হাতিয়ার এই কাজে। এবং একটু খেয়াল করলেই দেখা
যাবে যে ধর্মব্যবসার ক্ষেত্রে ধর্মীয় গ্রন্থগুলিও এই প্রচার যন্ত্র হয়ে উঠেচে দিনে
দিনে। আবার প্রচার সর্বস্ব এই যুগে অন্য সম্প্রদায়, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও
প্রতিযোগী কর্পোরেট সংস্থার বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিদ্বেষ ছড়ানোও এই প্রচারের আরও একটি
প্রধানতম মুখ কিন্তু। তাই অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ মাত্রেই বিধর্মী, তাদের ঈশ্বর
মাত্রেই কাল্পনিক। তাদের ধর্মগ্রন্থ মাত্রেই অপাঠ্য। বিরোধী রাজনৈতিক দল মাত্রেই
অসৎ ও ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রকারী। বিরোধী রাজনৈতিক নেতানেত্রী মানেই প্রকারন্তরে
দেশদ্রোহী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত। প্রতিযোগী কর্পোরেট সংস্থা মানেই অনুন্নত,
অসাধু। এইভাবে প্রচার করে করে মানুষের স্বাধীন বিচারবুদ্ধিকে ভোঁতা করে রেখে তার
মৌলিক চেতনার বিকাশকে অবরুদ্ধ করে রাখার ক্রমাগত প্রয়াস চলতে থাকে।
“দুই”
সকল কথাই বেদে লেখা আছে। অর্থাৎ বেদের পরে মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞান বুদ্ধি
বিবেচনা অভিজ্ঞতা আর বৃদ্ধি পায় নি। মানুষের চেতনা আর বিকশিত হয়ে ওঠে নি। কি
আশ্চর্য্য বিশ্বাসের ভিত। ঠিক এই একই কথা বিশ্বাস করতে দেখা যায় অন্য সম্প্রদায়ের
মানুষের মনে নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ সম্বন্ধে। এবং এই বিশ্বাস যার ভিতর যত অনড় অটল
তিনিই তত বড়ো ধার্মিক। কি অদ্ভুত সমাপতন! বিগত পাঁচ ছয় শতাব্দী ব্যাপী সময় সীমায়
মানুষের সভ্যতায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার বিকাশের হাত ধরে যে সকল যুগান্তকারী
পরিবর্তনগুলি হয়ে গেল তার সবই কি না বেদে বা কোরাণে আগেভাগেই বলা ছিল। বিশ্বাসের
কি প্রবল জোর! অর্থাৎ মনীষী থেকে বিজ্ঞানী, কর্মী থেকে উদ্ভাবক কারুরই কোন কৃতিত্ব
নাই। সব কৃতিত্ব ঐ বেদের, কোরাণের। তাও আবার সেগুলি নাকি মানুষের লেখাও নয়! এবং এরপরেও আবার
বেদ পন্থী আর কোরাণপন্থীদের ভিতর পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিবাদ ও বিদ্বেষ।
প্রত্যেকের কাছেই একমাত্র অভ্রান্ত সত্য তার সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ। অন্য
সম্প্রদায়ের গ্রন্থের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে কেউই রাজী নয়। কারণ অন্য
সম্প্রদায়ের গ্রন্থ তো আর ঈশ্বর প্রণীত নয়!
সম্প্রতি ভারতে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের হাত ধরে হিন্দুত্বের রনংদেহী স্বরূপ
নতুন করে এই অন্ধবিশ্বাসে তা দিতে শুরু করেছে। তাদের নেতানেত্রীদেরকে প্রকাশ্যে
সভায় নানা রকম বিশ্বাসের চকলেট উপহার দিতে দেখা যাচ্ছে জনগনকে। বলতে শোনা যাচ্ছে,
রামায়ণ মহাভারতের যুগেই নাকি ইনটারনেট আবিস্কার হয়েছিল সর্বপ্রথম। সে যুগেই মিসাইল
টেকনোলজির আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ব্যবহৃত হতো হেলিকপ্টার ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও
রামায়ন মহাভারত লেখা হয়েছিল সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন যুগপর্বে। তবে এখনো পর্য্যন্ত
কাউকে বলতে শোনা যায় নি যে ফেসবুকও সেই সময়েরই অবদান। সীতা লঙ্কায় বন্দী থেকে
প্রতিদিন ফেসবুক স্ট্যাটাস দিতেন বা দ্রৌপদী দুইবেলা সাজ বদল করে করে সেল্ফি পোস্ট
করতেন। কিংবা স্কাইপীতেই শকুনির সাথে দুইবেলা পরামর্শ হতো কৌরব পক্ষের। পাণ্ডবরা
কৃষ্ণকে ইমেল করেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছিল। বলা যায় না,
সেসবও শুনতে হতে পারে আগামীতে। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। মহাভারতের শেষে
দেখা যায় ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির স্বশরীরে স্বর্গে পৌঁছিয়ে গেলেন। এবং মানুষকে এটাই
বিশ্বাস করিয়ে দেওয়া হলো যে এই মানুষটি জীবনে কোন পাপাচার করেননি বলেই এটা সম্ভব
হলো। এই যে মানুষের অন্ধবিশ্বাসে সুড়সুড়ি দিয়ে তাদেরকে ছলনার ফাঁদে আটকিয়ে ফেলা,
এটা কিন্তু কেবল মাত্র ধর্মব্যবসায়ীদেরই একচেটিয়া নয়।
ঠিক এইরকমই মানুষকে একদিন বিশ্বাস করানো হলো নীল আর্মস্ট্রং প্রথম মানুষ
হিসাবে চাঁদে পা রাখলেন। মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। এতটাই অভিভূত হয়ে গেল যে
ভাবতেও ভুলে গেল সত্যই যদি পঞ্চাশ বছর আগে মানুষ চাঁদে পৌঁছিয়ে গিয়েছিল, তবে গত
পাঁচ দশকে আর কোনদিন গেল না কেন? এই কেনর কোন উত্তর আর মানুষ করলো না। করলো না
কারণ, তাদের বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় হয়ে উঠলো, বা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করানো হলো যে
প্রশ্নের আর কোন অবকাশই রইল না। অথচ বিগত সহস্র বছরের সভ্যতার ইতিহাসও যদি ধরা
যায়, প্রতিটি কাজ মানুষ প্রথম করার পর থেকে বারবার পুনরাবৃত্তি করে গিয়েছে। কোন
একটি কাজ মাত্র একবার করে থেমে যাওয়ার কোন ইতিহাস নাই মানুষের সমাজ সভ্যতায়। এই
একটিবার চাঁদে যাওয়া ছাড়া। এবং বারবার
পুনারাবৃত্তির মধ্যে দিয়েই মানুষ দক্ষ থেকে আরও দক্ষ হয়ে উঠেছে সেই বিষয়ে। তার
জ্ঞানের ও ক্ষমতার পরিধি বিস্তৃত থেকে বিস্তৃতর হয়ে উঠেছে। এটাই মানুষের ধর্ম। না
রিলিজিয়ন নয়। তার অন্তঃপ্রকৃতি। আর এরই বিপ্রতীপে হলো বিশ্বাসের প্রকৃতি। প্রশ্ন
বা জিজ্ঞাসার কোন পরিসরই থাকে না বিশ্বাসের অন্ধত্বের ভিতর। তাই ঠিকমতো বিশ্বাস
করাতে পারলে যত আজগুবিই হোক না কেন, মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাসের পাতা ফাঁদে
আটিকিয়ে পড়তেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে বেশি।
২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্ষমতার যে দুটি অক্ষ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল অর্থাৎ ইঙ্গমার্কীণ
পক্ষ আর কম্যুনিস্ট শাসিত সোভিয়েত পক্ষ, এই দুই পক্ষের ভিতর ক্ষমতার ভারসাম্যকে
অতিক্রম করে যাওয়ার একটি সুতীব্র লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল সামরিক ক্ষমতার বৃদ্ধি ও
সম্প্রসারণ এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ভিতর দিয়ে। এটোম ব্যোম আবিষ্কারের
ভিতর দিয়ে ইঙ্গমার্কীণ পক্ষ যে সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল, সোভিয়েত পক্ষ একের পর এক
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ভিতর দিয়ে সেই অবস্থানকে টেক্কা দিয়ে চলছিল। সেই
ইতিহাস সকলেরই জানা। বিশেষ করে মহাকাশ বিজ্ঞান ও গবেষণায় সোভিয়েত ইউনিয়নের তাক
লাগিয়ে দেওয়া সব কার্যকলাপ আবিশ্ব সকলের উপরেই সোভিয়েত পক্ষের ক্ষমতা সম্বন্ধে
একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছিল। যে বিষয়টি ইঙ্গমার্কীণ পক্ষের কাছে দিনে দিনেই
অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছিল ঠিক মত মোকাবিলা করার ব্যাপারে। কারণ তাঁরা বুঝতে
পেরেছিল, এইভাবে চলতে থাকলে বিশ্ববাসীর মনে সোভিয়েতের ক্ষমতা সম্বন্ধে এমন একটি
ধারণার সৃষ্টি হয়ে যাবে যে, তার প্রভাবে বিশ্বের নানান প্রান্তে কম্যুনিজমের
প্রভাব পড়তেও শুরু করবে দ্রুত। যেটি ধনতন্ত্রের পক্ষে অতীব বিপজ্জনক। এই বিষয়টিই
হয়ে উঠেছিল ইঙ্গমার্কীণ পক্ষের মাথাব্যথার প্রধান কারণ। এরপর কিউবার মিসাইল সঙ্কট
রাশিয়ার ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিকে আরও প্রকট করে তুলল। মেহনতী মানুষের চেতনায়
কম্যুনিজমের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাও পাখা মেলতে থাকলো দ্রুত। সামগ্রিক ভাবে এই
পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্যে মার্কীণ যুক্তরাষ্ট্রের চন্দ্রাভিযানের রূপকথার
সৃষ্টি করতে হলো। এবং এমনই সুচারুরূপে সেই কাজ সম্পন্ন হলো যে গোটা বিশ্বের অভিমুখ ঘুরে গেল
ইঙ্গমার্কীণ পক্ষের দিকে। মানুষের বিশ্বাসের ভিতে মার্কীণ শক্তির প্রতিপত্তির
নমুনা একেবারে দৃঢ় ভাবে গেঁথে দেওয়া সফল হলো
এরপর সময়ের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, পূর্ব ইউরোপ থেকে কম্যুনিজমের ভ্যানিশ
হয়ে যাওয়া। আর তারপরেই আবিশ্ব সম্পদের উপর একচেটিয়া ক্ষমতা দখল ও মানুষের জীবন ও
জীবিকার উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে মুষ্টিমেয় বহুজাতিক সংস্থার স্বার্থে
শুরু হলো গ্লোবালাইজেশনের গগন বিদারী প্রচার। প্রচারের মহিমাই এমন। যার গলার জোর
যত বেশি, তার কথাই তত বেশি ধ্রুবসত্য। সেই প্রচারের ঢক্কানিনাদে মানুষের চেতনায়
বিশ্বায়নের খুড়োর কল ধরিয়ে দিয়ে শুরু হলো এক নতুন যুগের। গুটিকয়েক বহুজাতিক
সংস্থার নিয়ন্ত্রণে এসে গেল গোটা বিশ্ব। তাদেরই ব্যবসায়িক স্বার্থে দেশে দেশে
পরিবর্তীত হতে থাকলো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও পরিকাঠামোর পরিসর। বদলিয়ে যেতে থাকলো দেশীয়
অর্থনীতির অভিমুখ এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, জাতীয় স্বার্থের থেকে বড়ো হয়ে উঠলো বহুজাতিক
সংস্থার ব্যবসায়িক স্বার্থগুলিই। প্রতিটি দেশের রাজনীতি দুইবেলা সেই স্বার্থ
রক্ষার কাজেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আর জনগণ বিশ্বায়ণের চাকচিক্যে হতবুদ্ধি হতবাক হয়ে
ছুটতে শুরু করলো খুড়োর কলের পিছনে। তলায় তলায় দেশীয় সম্পদের উপর দখল নিয়ে নিতে
থাকলো বহুজাতিক গুলি। দেশে দেশে অর্থনীতির ভিতেই ঘূণ ধরিয়ে দেওয়া সহজ হলো।
বিশ্বায়নের অন্ধবিশ্বাসে কেউ খেয়ালও করলাম না, আসল গল্পটা কি। পিটার
ইংল্যাণ্ডের শার্ট পড়ে পেপসী কোকে গলা ভিজিয়ে কেএফসির কিউয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বায়নের
মৌতাত উপভোগ করতে ছুটলাম উর্দ্ধশ্বাসে। আমাদের অন্ধবিশ্বাসের জোর এতই যে আমরা
নিশ্চিন্তে থাকলাম এই ভেবে, এইভাবে এইপথেই আমাদের উন্নতি অবধারিত। আমাদের এই
অন্ধবিশ্বাসের ভিতকে টিকিয়ে রাখার জন্যেই এরপর আমদানী করা হলো সন্ত্রাসবাদের জুজু।
কোন অবস্থাতেই যাতে বিশ্বায়নের পাতা ফাঁদটা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না যায়, ঠিক তার
জন্যেই শুরু হলো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মকফাইট। সন্ত্রাসবাদের জনকই সন্ত্রাসবাদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধযুদ্ধ খেলা শুর করে দিল। আমরাও অন্ধের চোখ বিস্ফোরিত করে হতবাক হয়ে
মাথা নাড়তে থাকলাম। ঠিক ঠিক, এই সন্ত্রাসবাদীগুলির জন্যেই আমাদের জীবন বিপন্ন।
উদ্ধারকর্তার প্রতিটি বাণীতেই আমাদের মনের বল বৃদ্ধি পেতে থাকলো। আমরাও নিশ্চিন্ত।
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর! সেই বিশ্বাসেই নিজের চোখে আবিশ্ব মানুষ দেখলো
কিভাবে দুটি প্লেন সরাসরি টুইন টাওয়ারের পেটের মধ্যে ঢুকে গেল মাখনের ভিতর ছুরি
চালানোর মতো। নিজের চোখে দেখা ছবিকে কে আর অবিশ্বাস করে? এতো আর পরের মুখে ঝাল
খাওয়া নয়। স্বচোক্ষে দর্শন। সন্ত্রাসবাদের ছবিটা বিশ্বময় এমন সুচারু ভাবেই চাড়িয়ে
দেওয়া গেল যে আমদের বিশ্বাস করতে আর একসেকেন্ডও দেরি লাগলো না কে সন্ত্রাসবাদী আর
কে সন্ত্রাসবাদের থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে পারে।
চন্দ্রাভিযানের গল্পের পর আবারও একটি সফল রূপকথার জন্ম দেওয়া হলো। পদার্থ
বিজ্ঞানকে রীতিমত ঘোল খাইয়ে অপদার্থ প্রমাণ করে দেখানো হলো কিভাবে সন্ত্রাসবাদী
হানায় বিপর্যস্ত হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশের নাগরিকরাও। অর্থাৎ এই যদি
অবস্থা হয়, তাহলে আবিশ্ব অন্যান্য দেশের নাগরিকরা কতটা সুরক্ষিত সে আর ব্যাখ্যার
কি প্রয়োজন? অতএবে অন্যান্য দেশকে কোন দেশের পক্ষে থাকতে হবে সেটি বুঝতে আর বাকি
থাকলো না কারুরই। কেবলমাত্র চোখের দেখার উপর নির্ভর করেই আমরাও বিশ্বাস করতে শুরু
করে দিলাম মিডিয়ার প্রচার। ভেবে দেখলাম না, যা দেখলাম তার সাম্ভব্যতা ঠিক কতখানি।
না অতটা বিদ্যা সত্যই আমাদের পেটে ছিল না। এখনো নাই। তাই চোখে দেখা ছবিই আমাদের
কাছে ধ্রুবসত্য। আমরা জানলাম না যে, টুইন টাওয়ার যেভাবে ধ্বসে পড়েছিল সেটি কোন
অবস্থাতেই বিমান হানায় সম্ভব হতে পারে না। পারে না পদার্থবিদ্যার স্বাভাবিক
নিয়মেই। এইভাবে ধ্বসে পড়া একমাত্র তখনই সম্ভব হতে পারে, যদি টুইন টাওয়ারের বিভিন্ন
তলায় বিশেষ বিশেষ কলমে বিশেষ ধরণের উন্নত মানের বিস্ফোরোক আগে থেকেই মজুত করে রেখে
রিমোর্ট কন্ট্রোলে ফাটানো হয় তবেই। এই যে স্বাভাবিক জ্ঞান সেটি স্বভাবতঃই সাধারণ
মানুষের থাকার কথাও নয়। আমাদেরও নাই। ফলে অন্ধকে যেমন ঢপ দেওয়া সহজ হয়, আমাদেরকেও
ভিডিওর ছবি দেখিয়ে লাইভ ছবি দেখানোর গল্প বিশ্বাস করিয়ে দেওয়া হলো। আমাদের মগজে
ঢুকিয়ে দেওয়া হলো এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই সামরিক অভিযানের অধিকার পেয়ে গেল
বিশেষ একটি দেশ। তার কোন কাজেই আর কোন প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকবে না। কারণ সেই দেশ
নিজেই সন্ত্রাসবাদের শিকার। ফলে বিশ্বের যে কোন দেশকেই যেকোন সময় যে কোন অজুহাতেই
আক্রমণের অধিকার তার অধিগত।
শুরু হয়ে গেল সন্ত্রাসবাদ নিয়ে রাজনীতির যুগপর্বের নতুন এক শতক। বুঝলাম
ইঙ্গমার্কীণ অক্ষই এই বিশ্বের একমাত্র রক্ষক। আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের
জন্যেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাদ্য ও সামাজিক সুরক্ষার থেকে বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে
সামরিক খাতে সেই বরাদ্দ বৃদ্ধি আশু জরুরী। সেই বরাদ্দের ভাগ কোন দেশের কোন সংস্থার
কোন মালিকের নাম ফোর্বস পত্রিকার ধনীদের তালিকায় উপরে তুললো অতশত হিসাবে আমাদের
মতো আদার ব্যাপারিদের কি দরকার! আমরা জানি কি ভয়ঙ্কর এই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে
আবিশ্ব লড়াই শুরু হয়েছে। আমরা জেনে গিয়েছি কে আমাদের একমাত্র রক্ষক। তাই ভক্ষকের পাতা ফাঁদে আটকিয়ে পড়েও আমরা বিশ্বাসের
জোরেই নিশ্চিন্তে থাকি, সুদিন এলো বলে।
ঠিক যেমন একদিন ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল আজকের কষ্ট স্বর্গের
সুখে পৌঁছিয়ে দেবে আমাদেরকে আগামী জন্মে। এও ঠিক তেমনি আমরা প্রত্যেকেই আজকের
দুর্ভোগগুলি থেকে মুক্তির পথ হিসাবে বিশ্বায়নের ঢক্কানিনাদের উপরেই আস্থা রেখে বসে
আছি। সেই আস্থাতেই সদ্যজাতের জন্যে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ভর্তির ফর্ম তুলতে ভোর
রাতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি। বিশ্বায়নের ভাষা ইংলিশে পারদর্শী করে তুলতে পারলেই
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কেল্লাফতে। আর দেখতে হবে না। বহুজাতিকে চাকরী আটকায় কে? কি দৃঢ়
বিশ্বাস! কি অপরিসীম অন্ধত্বের নমুনা। সেই অন্ধত্ব আর বিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটানোই
ধর্মব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ ও কর্পোরেট মালিকদের প্রাথমিক দায়িত্ব।
১৪ই ডিসেম্বর’ ২০১৮
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

