স্বল্পশিক্ষিত মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত
এমনকি আধাশিক্ষিত দরিদ্র পরিবারেও অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, সন্তান হলেই অভিভাবকদের
মাথায় সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার উত্তুঙ্গ আগ্রহ এবং অদম্য একটা জেদ চেপে যায়। যে অভিভাবক
নিজের শিক্ষাপর্বে পড়াশুনায় যত বেশি ফাঁকি দিয়ে থাকে। অধিকাংশ সময়েই সেই অভিভাবকই আপন
সন্তানের শিক্ষাপর্বে কঠোর অনুশাসন চালিয়ে থাকে। লক্ষ্য একটাই। যেভাবেই হোক সন্তানকে
উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত করে তুলতে হবে। সে কাজ, গাধা পিটিয় ঘোড়া করা প্রয়াসের মতো মুর্খামি
হলেও। এটি একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। এবং এই প্রবণতা সাধারণত স্বল্প শিক্ষিত ও আধাশিক্ষিত
অভিভাবকদের ভিতরেই বেশি চোখে পড়ে। এবং বিশেষ করে যে সকল অভিভাবক নিজেদের শিক্ষাপর্বে
পড়াশুনায় অতিরিক্ত পরিমাণে ফাঁকি দিয়ে থাকে, তারাই আপন সন্তানের শিক্ষাপর্বে অতিরিক্ত
নজরদারী চালিয়ে থাকে কড়া ভাবে।
এর ফলে, শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষা একটি
ভয়াবহ অবতার রূপে আবির্ভুত হয়। আমাদের বাংলায়, ব্রিটিশ প্রবর্তিত করণিক উৎপাদনের শিক্ষা
ব্যবস্থায় পরীক্ষার খাতায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তিকেই শিক্ষার মানদণ্ড বলে গণ্য করা
হয়। প্রকৃতপক্ষে এর থেকে বড়ো অশিক্ষা আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু সেই ব্যবস্থাই চলে
আসছে শতকের পর শতক ধরে। অন্তত পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর
থেকে। ফলে অধিকাংশ অভিভাবকদের লক্ষ্যই থাকে আপন সন্তান কোন বিষয়ে পরীক্ষার খাতায় কত
বেশি নম্বর পেল, সেইদিকে। আর নম্বর তোলার এই প্রতিযোগিতাকেই শিক্ষা বলে ভুল করে বসে
অধিকাংশ স্বল্পশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত অভিভাবক।
একেবারে শৈশব থেকেই এই সকল স্বল্প শিক্ষিত
এবং অর্ধশিক্ষিত অভিভাবকদের সন্তানরা পড়াশুনা বলতেই পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতাকেই
জেনে থাকে। প্রায় ঘরে ঘরে, কোন শিক্ষার্থী কত বেশি নম্বর পেল। সেটাই যখন ভালো ছাত্র
কিংবা ছাত্রী হওয়ার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তখন গোটা সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতটাই
নড়বড়ে হয়ে যায়। পরিতাপের বিষয়, সেই নড়বড়ে ভিতের উপরেই বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামো
দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দী ধরে। অনেকেই ভাবতে পারেন। দাঁড়িয়েই যখন আছে। একেবারে ধ্বসে
পড়ে যখন যায়নি। তখন আর এই নিয়ে চিন্তা করারই বা কি আছে? সত্যই তো পরীক্ষার খাতায় কে
কত বেশি নম্বর তুলতে পারলো, সেটি না জানা গেলে, কে মেধাবী শিক্ষার্থী বোঝা যাবে কি
করে? ঠিক কথা। একমাত্র মধ্যমেধার কিংবা নিম্নমেধার সমাজই ঠিক এই ভাবে ভেবে থাকে। আর
বিশেষ করে সেই ধারণা একবার যদি সাগরপারের উন্নত কোন জাতি মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে যায়। তবে
তো আর কথাই নেই।
এখানে একটা বিস্ময়ও রয়েছে। আমাদের বাংলায়
প্রচলিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তক সেই ব্রিটিশ এই দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে সাতদশকের
বেশি সময় হয়ে গেল। আমাদের দেশের বহু রথী এবং মহারথীরা দেশ বিদেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার
খোলনলচের সাথে খুব ভালো করেই পরিচিত। কিন্তু তারপরেও আমাদের বাংলায় শিক্ষা পরিকাঠামোর
কোন বদল ঘটে না। বিস্ময়টুকু এইখানেই। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির কলা এবং কৌশলকেই
আমাদের সমাজে শিক্ষা বলে ধরে নেওয়া হয়। এবং মান্যতা দেওয়া হয় সেই তাঁদেরকেই, যাঁরা
সেই কলা এবং কৌশলে যত বেশি পরিমাণে দক্ষ। তাঁদেরকেই আমরা মহা শিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত
বলে গণ্য করে থাকি। এই যে একটা সার্বিক অশিক্ষা। এবং আগাগোড়া একটা ফাঁকিবাজি। শিক্ষার
মতোন একটা প্রাথমিক এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। এই ফাঁকিবাজিই একটি জাতিকে,
একটি সমাজকে বিশ্বসভায় সার্বিক ভাবে পিছনের সারিতে কোণঠাসা করে রাখার জন্য যথেষ্ঠ।
তাই জাতিসমূহের দরবারে, জাতি হিসাবে বাঙালি
আজও পিছিয়ে থাকা একটি অনুন্নত জাতির ছবিই তুলে ধরে। এবং সেই পরিচয়েই প্রথমসারির দেশগুলি
বাঙালিকে বিচার করে থাকে। অনেকেই সমস্বরে প্রতিবাদ করে উঠবেন। সেকি কথা। আমাদের রবীন্দ্রনাথ।
আমাদের সত্যজিত রায়। বিবেকানন্দ, নেতাজী। আমাদের ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারী। আমাদের
মুক্তিযুদ্ধ। এবং মুজিবর রহমান! না, এঁদের কাউকে দিয়েই, কোন ঘটনা দিয়েই একটি জাতির
পরিচয় সার্থক হয় না। জাতির পরিচয় সার্থক হয়, বিশ্বসভায় তার দান দিয়ে। অন্যান্য জাতিগুলি
আমাদেরকে কতটা অনুসরণ করলো। আমাদের কাছে কতটা এবং ঠিক কিভাবে ঋণী থাকলো। সেই বিচারেই
বিশ্বসভায় জাতিসমূহের দরবারে বাঙালির আসল পরিচয়। এখন অব্দি বিশ্বসভায় একটা আন্তর্জাতিক
ভাষা দিবস ছাড়া, বাঙালির আর কোন অবদান নেই।
এবং এই না থাকার পিছনের গল্পটাই আমাদের
শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক পরিকাঠামো, সার্বিক চিত্র। এবং বিশেষ করে জনমানসে শিক্ষা এবং
শিক্ষার্জনের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণার এক নিদারুণ ছবিই তুলে ধরে। প্রায় ঘরে ঘরে
অর্ধশিক্ষিত স্বল্পশিক্ষিত অভিভাবকদের সন্তানরা দেশের ভ্রান্ত শিক্ষানীতির খপ্পরে পড়ে
এবং অভিভাবকদের শিক্ষার অভাবের শিকার হয়ে প্রকৃত শিক্ষার সম্পূর্ণ উল্টো দিকে এগিয়ে
চলতে থাকে। দশকের পর দশক ধরে। আর আশ্চর্য্যের কথা, দেশ বিদেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাগুলির
সাথে যাঁরা পরিচিত। তাঁরাও নিজের দেশের শিক্ষা পরিকাঠামোকে ভ্রান্ত দিশা থেকে উদ্ধারের
কোন চেষ্টাও করেন না। আর এখানেই আসল রাজনীতি। সমাজের উচ্চশিক্ষিত অংশ কখনোই চায় না,
দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত শিক্ষার আলোয় শক্তিশালী হয়ে উঠুক। সেটি হলে আর সমাজের বৃহত্তর
জনগণের উপরে পুঁজিবাদী শোষণ চালানো সম্ভব হবে না। ফলে পুঁজিবাদী স্বার্থকেই রক্ষা করতে,
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিতরা নিজ দেশের শিক্ষার পরিকাঠামোর অন্ধকার দিকগুলিতে কোনরকম
আলো ফেলতে আগ্রহী নন।
না ধান ভানতে শিবের গীত নয়। মূল প্রেক্ষাপট
পরিস্কার না হলে বোঝা যাবে না, সমাজদেহে প্রায় ঘরে ঘরে কেন এবং কিভাবে, কোন পথে এই
বিপুল পরিমাণ অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিত অভিভাবকদের আবির্ভাব ঘটলো। এটি কোন একটি
নির্দিষ্ট যুগের অভিশাপ নয়। এইটি শত শত বছরের আবহমান সমাজ রাজনীতি। যার পশ্চাতে রয়েছে
অর্থনীতির গল্প। ব্রিটিশ আগমনের পূর্বে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজেও এই রাজনীতিরই অন্য একটি
মুখ প্রকট ছিল। সমাজে ব্রাহ্মণ ছাড়া, উচ্চ শ্রেণী ছাড়া কারুর শিক্ষার অধিকার ছিল না।
পাছে গোটা সমাজ শিক্ষিত হয়ে গেলে ব্রাহ্মণ সহ সমাজের উচ্চশ্রেণী অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ
করার অধিকার হারিয়ে ফেলে। সেই ভয়েই সমাজের বৃহত্তর অংশের জন্য শিক্ষার্জনের দরজা পুরোপুরি
বন্ধ ছিল। ব্রিটিশ আসাতে কালে কালে সেই দরজা খুলে গেলেও সুরাহা হলো না কোন। সুরাহা
যাতে না হয়, সেইভাবেই ব্রিটিশ শাসকেরা এদেশে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন করেছিল। আর সেই
কাজে তাদের প্রধান সহায় ছিল, সেই ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চশ্রেণীর সুবিধেভোগী সমাজই। ফলে
কালের নিয়মে ব্রিটিশকে চলে যেতে হলেও তাদের এদেশীয় দালাল সমাজ শিক্ষাব্যবস্থাটিকেই
সামগ্রিক ভাবে পঙ্গু করে রেখে দেওয়ার পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে ফেলে। পরীক্ষার পড়া মুখস্থ
করে পরীক্ষার পর পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তিকেই দেশ জুড়ে মানুষ শিক্ষার্জন বলে
ধরে নিল। যাতে কেবল মাত্র বেতনভুক একটা সমাজ পুঁজিবাদের সকল স্বার্থকে কায়েম রাখতে
পুঁজির দালালি করে যেতে পারে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
এই যে একটি সার্বিক যাঁতাকল। সেই যাঁতাকলেরই
সার্থক সৃষ্টি অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্প শিক্ষিত প্রায় নিরেট অভিভাবকশ্রেণী। যাঁরা পুঁজির
স্বার্থেই আপন সন্তানদেরকেই প্রকৃতপক্ষে অশিক্ষিত করে রাখার সার্বিক চক্রান্তের শিকার
হয়ে হাত মেলাবেন পুঁজিবাদী শক্তির সাথেই। এবং ঘরে ঘরে বলি হতে থাকবে শিক্ষার্থীদের
ভবিষ্যত। ঘরে ঘরে পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক শিক্ষার্থী তৈরী করার
কার্যক্রমে চলতে থাকবে। যে কার্যক্রমে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিত
হয়ে পরবর্তীতে অভিভাবক অবতারে ধ্বংস করতে পারেন আপন সন্তানের শিক্ষার ভবিষ্যৎ। এবং
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। অপর দিকে সেই যাঁতাকলের ভিতর দিয়েই যাঁরা যত বেশি উচ্চশিক্ষিত
হয়ে উঠবেন। তাঁরাই সেই যাঁতাকলটিকে আরও সুদৃঢ় করে তোলার জন্য ঝাঁপাবেন এবং তত বেশি
করে শতাব্দীব্যাপি কায়েম করে রাখার রাজনীতি করে যাবেন।
১০ই আগস্ট ২০২৩
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
