টিভির স্ক্রিনে কোটি
কোটি টাকার স্তুপ দেখতে দেখতে। টাকার পরিমাণ গুনতে গুনতে বেশ ভালোই কেটে গেল আমাদের
কয়টি দিন। মাঝে মধ্যেই এমন চমৎকার দৃশ্যাবলী ব্রেকিং নিউজ হয়ে টিভির স্ক্রিনে আছড়িয়ে
পড়লে। আমাদের সান্ধ্য অবসরটুকু বেশ সুরম্য হয়ে ওঠে। সন্দেহ নাই। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের
প্রায় সকলেরই। মন্ত্রীর টাকা না তাঁর বান্ধবীর টাকা। সেই নিয়ে চাপান উতোর তর্ক বিতর্ক
যাই থাক। টাকার পরিমাণ কিন্তু গড়পরতা বাঙালির কাছে চোখ কপালে তুলে দেওয়া মতো। আবার
শুধু টাকাই তো নয়। সাথে রাশি রাশি গহনা। গহনার স্তুপের দিকে চোখ রেখে অনেক বাড়ির গৃহিণীদেরই
চক্ষু চড়কগাছ নিঃসন্দেহে! টাকা গহনা আর ফ্ল্যাটের সংখ্যা এবেলা ওবেলা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে জমি, বাগানবাড়ি রিসর্টের সংখ্যাও। আমাদের বিস্ফোরিত চোখের সামনে
টিভি এঙ্কারদের উত্তেজিত কণ্ঠস্বরও ক্রমেই চড়চড় করে বেড়ে চলেছে। সব মিলিয়ে জমজমাট জুলাই।
জমজমাট জুলাইয়ের এই স্মৃতি
আমাদের মনে কদিন টাটকা থাকবে। সেটা বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হলো এই। আমরা কিন্তু জমজমাট
জুলাইয়ের এই কয়টি দিন টিভির সামনে খবরের কাগজের পাতায় আর নেটের অলিতে এবং গলিতে। চরম
উপভোগ করলাম। হয়তো আরও কয়টি দিন উপভোগের এই রেশ বজায় থাকবে। আবার ইতিমধ্যে ইডির জালে
যদি আরও এক আধটা রাঘব বোয়াল ধরা পড়ে যায়। তবে তো আমাদের পোয়বারোর সময় এখন। তবে শোনা
কথায় বিশ্বাস করলে বলতে হয়। রাজ্যের প্রধান দেশ প্রধানের কাছে নাকি ছুটে যাচ্ছেন। এবং
সেটি যদি ঘটনাই হয়। তবে জমজমাট জুলাইয়ের পর আটঘাট আগস্ট আসার সম্ভাবনাই বেশি। এখন ড্যামেজ
কন্ট্রোলের সময়। ড্যামেজ কন্ট্রোলের পর্ব অবশ্য ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে তাতে
রাজনীতির ঘোলা জল যতটা মিশেছে। তার ভিত্তিতে বলা যায়। চাকুরী প্রার্থীদের একটা বড়ো
অংশকেই কিন্তু আর সহজে বোকাবুঝ দেওয়া যাবে না। গত এগারো বছর ধরে যে বোকাবুঝ দেওয়ার
সংস্কৃতি চলে আসছে। সেই সংস্কৃতিকেই আঁকড়িয়ে ধরে থাকা কিন্তু এত সহজ হবে না। কারণ বঞ্চিত
সেই যোগ্য চাকুরী প্রার্থীরা কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ গহনা ফ্ল্যাট জমি বাড়ির হিসাবটুকু
নিজেদের মতো করে হিসাব করে নেবে এবারে। ফলে বোকাবুঝ দিয়ে কালক্ষেপের দিন আপাতত কিছুদিন
মুলতুবী দিয়ে রাখতে হবে শাসক পক্ষকে। এবং বিশেষ করে মনে রাখতে হবে। একদিকে বিকাশরঞ্জন
ভট্টাচার্য এবং একদিকে আদালত কিন্তু ছেড়ে কথা বলবে না। ইডির ভুমিকা পরবর্তীতে কোথায়
গিয়ে দাঁড়াবে। সেটি রাজনৈতিক হিসাব নিকাশের বিষয় হতে পারে। কিন্তু বঞ্চিত চাকুরীপ্রার্থীদের
হাহাকার আর আইন এবং আদালত। আপাতত শাসক পক্ষকে অস্বস্তিতে রাখার কাজটুকু চালিয়ে যেতে
থাকবে।
থাক, বরং এসব কথা। এসব
নিয়ে আমজনতার বিশেষ মাথা ব্যাথা নেই। থাকার কথাও নয়। যদি না কোটি কোটি টাকার স্তুপে
নিজের কষ্টার্জিত টাকা কারুর থেকে থাকে। তাদের কপালে যথেষ্ঠ চিন্তার ভাঁজ পড়তে থাকবে
দিনে দিনে। লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে পিছনের দরজা দিয়ে পাওয়া চাকরি ধরে রাখা না গেলে।
তাদের কিন্তু আমও যাবে বস্তাও থাকবে না। চিন্তায় রয়েছে তাঁরা। চিন্তায় থাকবে তাঁরা।
আর চিন্তায় থাকছে তাঁরাই। যাঁদের ছেলেমেয়ে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে প্রাপ্য চাকরি থেকে
বঞ্চিত হয়ে ধর্ণায় বসে রয়েছে। একটা সুবিচারের আশায়। আমরা যাঁরা এই দুই পক্ষের ভিতরে
পড়ছি না। আমাদের কিন্তু বেশ খাসা ঘুম হচ্ছে। সকালের কাগজ থেকে শুরু করে পথেঘাটে, টিভির
চ্যানেল থেকে চ্যানেলে ঘুরে ঘুরে। আর আমাদের নেট দুনিয়ার অলিতে গলিতে। আমাদের রসালাপ
আর শেষ হতে চায় না। কোন নেতার কয়জন বান্ধবী। কোন মন্ত্রীর কয়টি উপপত্নী। কোন বান্ধবীর
কয়টি ফ্ল্যাট। কোন উপপত্নীর কয়টি গাড়ী। কোন অনুষ্ঠানে কাকে কোন মন্ত্রীর বক্ষলগ্না
হয়ে দাঁড়াতে দেখা গিয়েছে। সেইসব নতুন পুরানো তথ্য ও ছবি ইতিহাস খুঁড়ে বার করে নিয়ে
আসার বিষয়ে আমাদের অফুরন্ত উদ্যোম। আর যাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত। তাঁদের
তো একটাই বারোমাস্যা। পরস্পর দোষারোপ আর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করা।
ফলে আমাদের দিনগুলি মন্দ
কাটছে না। বরং আরও কয়টি রাঘোব বোয়ালের হদিশ পেয়ে গেলে। টিভি ছেড়ে নেট ছেড়ে ওঠে কে?
না, রাঘোব বোয়ালদের হদিশ যে আমজনতার কাছে থাকে না। বিষয়টি তেমনও নয়। বরং আমজনতা এই
রাঘোব বোয়ালদেরকে বেশি বেশি ভোটে জেতানোর জন্য আদাজল খেয়ে বুথে বুথে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে
থাকে। এবং নির্বিকার চিত্তে। টিভির পর্দায় রাঘোব বোয়ালদেরকে তোয়ালে জড়িয়েই হোক আর বিনা
তোয়ালেতেই হোক, নোটের তাড়া বুঝে নিতে দেখেও ভোটের বাক্সে তার কোন ছাপ পড়তে দেয়নি আমজনতাই।
একবার নয়। ন্যাড়া কিন্তু বারবারই বেলতলায় যায় এই যুগে। তা যাক। যে যেভাবে খুশি থাকতে
চায়। নেতা মন্ত্রী যত বেশি দুর্নীতিপরাণ হবে। আমজনতার তত বেশি সুবিধে। নিয়মের বালাই
নেই। আইনের শাসন নেই। আদর্শের তোয়ক্কা নেই। বিবেকের তাড়না নেই। শুধু একটু দুকান কাটা
বেহায়া হতে হবে। তাহলেই দুর্নীতির সুফল কোন না কোনভাবে লাভ করার একটা পথ খুলে যাবে।
শাসন ক্ষমতায় যদি দুর্নীতিপরায়ণ শাসকদলগুলি থাকে। কিন্তু শাসকদল যদি নীতিপরায়ণ হয়।
নেতামন্ত্রীরা যদি এক একজন রামকৃষ্ণ পরমহংস হয়ে গিয়ে টাকা মাটি মাটি টাকা জ্ঞানে দেশসেবায়
লেগে যান। তবে তো সমূহ সর্বনাশ! আইনরক্ষকরা যদি সংবিধান মেনে আইনের শাসন রক্ষায় নিবেদিত
প্রাণ হয়ে যায়। আদালত যদি সক্রিয় থাকে চব্বিশ ঘন্টা। আমজনতার কিন্তু সাড়ে সর্বনাশ!
না, জনতা তাই সেই সরকারই
চায়। যে সরকার থাকলে। পিছনের দরজা দিয়েই যাবতীয় অনৈতিক অসাংবিধানিক অপকর্মগুলি সহজে
হয়ে যেতে থাকবে। এবং সেটাই সমাজবাস্তবতার নামে স্বাভাবিক বলে প্রতিপন্ন হয়ে উঠবে। যে
স্বাভাবিক অবস্থার সুফল যে যার বুদ্ধিবল অর্থবল এবং লোকবল দিয়ে হাসিল করে নিতে পারবে।
সেই দুকান কাটা বেহায়াদের মতো। একমাত্র বরাৎ খারাপ না হলে যাঁদের দরজায় ইডিও কড়া নাড়ার
সাহস পায় না। পাবে না। ফলে এই আমজনতাই জমজমাট জুলাই চুটিয়ে উপভোগ করে নিতে পারছে। অন্যকে
ধপাস করে পড়ে যেতে দেখলে যেমন আমোদ অনুভুত হয় মনের গহনে। এও ঠিক সেই রকম। যদিও কথায়
বলে ঘুঁটে পোড়ে। গোবর হাসে। না, প্রবাদ ধুয়ে তো আর সমাজ চলে না। রাজনীতিই যেখানে নীতিহীন।
সেখানে প্রবাদের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে একেবারেই কদাচিৎ। তাই, আজকে আমদের যাবতীয় নজর মন্ত্রী’র
আরও কয়জন বান্ধবীর খোঁজ পাওয়া গেল। সেইদিকে। কোন বান্ধবীর নামে কয়টি ফ্ল্যাট। কোথায়
কোথায়। সেইখানে। কোন বান্ধবীর কাছ থেকে কত টাকা উদ্ধার হলো। সেই পরিমাণে। আর মন্ত্রীর
সাথে কোন বান্ধবী কতটা ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিল। সেই হিসাবে। আমাদের যাবতীয় নজর সেইদিকে।
গত এগারো বছর ধরে গোটা রাজ্য জুড়ে এই যে একটা দুর্নীতির রেকেট চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আমজনতার প্রত্যক্ষ মদতে। এর বিরুদ্ধে আমাদের কারুর মুখে কোন কথা নেই। কেন লক্ষ লক্ষ
শূন্যপদ পড়ে রয়েছে। কেন সেই পদগুলি বছরের পর বছর ধরে খালি করে রেখে দেওয়া হয়েছে। না,
আমরা সেই বিষয়ে স্পিকটিনট। যদি বা কিছু শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ করা হলো। তাও চাকরির
পরীক্ষায় শাদা পাতা জমা দেওয়া কিংবা মেধা তালিকায় পিছিয়ে থাকা প্রার্থীরাই লক্ষ লক্ষ
টাকার বিনিময়ে সরকারী চাকরি কিনে নিল। এই বিষয়গুলি কি আমরা জানতাম না? জমজমাট জুলাই
না এলে জানা হতো না? তাতো নয়। তারপরেও তো আমরা বুথে বুথে গিয়ে ভিড় করেছি। লাইন দিয়ে
দাঁড়িয়ে থেকেছি। পবিত্র সেই সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করে দুর্নীতিপরায়ণ নেতানত্রীদের
বিপুল ভোটে জয়ী করে শাসন ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। আর সেই কারণেই আমরা বলতে যাই না,
রাজ্যজুড়ে কেন এতো তোলাবাজি। কাটমানির রাজত্ব গড়ে উঠেছে। কেন সোজাপথে কর্মসংস্থানের
সব কয়টি পথ বন্ধ করে রেখে দেওয়া হয়েছে। এই কারণেই আমাদের মধ্যে আর কোন হেলদোল নেই।
আমরা কিন্তু এই পরিবর্তনেই খুশি রয়েছি। রাঘোব বোয়ালদের রাজত্ব অটুট থাকুক। তবেই আমাদের
ক্ষুদ্র স্বার্থ সংরক্ষিত থাকবে। বাহুবল বুদ্ধিবল অর্থবল আর লোকবলই যতদিন শেষ কথা বলতে
থাকবে। ততদিনই আমজনতারও সুদিন। দুই একটা রাঘোব বোয়াল আইনের জালে ধরা পড়লেও। দুদিন আমোদ
করে নেওয়া বই তো নয়। সেই জাল কেটে মুক্ত হওয়ারও হাজারটা আইনী পথ এইদেশ রয়েছে। পকেটে
যদি কাঁচা টাকা মজুত থাকে। হাতে যদি রাজনৈতিক ক্ষমতার ধ্বজা উড্ডীন থাকে। বেহায়াদের
মতোন দুই কানই যদি কাটা থাকে। আর আমাদের মতোন আমজনতার যদি ভোট দেওয়ার অধিকার থাকে।
শাসন ক্ষমতায় শাসকদলের মুখ ও পতকার রঙ যাই হোক না কেন। আমরাই দুর্নীতিপরায়ণ রাঘোব বোয়ালদের
সুরক্ষার কবচ। কারণ সেখানেই আমাদের স্বার্থের নোঙর বাঁধা।
৩০শে জুলাই’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

