কৃষক ‌আন্দোলন সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কৃষক ‌আন্দোলন সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

কৃষক ‌আন্দোলন সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত

 

 

কৃষক ‌আন্দোলন সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত


উত্তাল কৃষক আন্দোলন। এখনো যুথবদ্ধ সংগ্রামে প্রত্যয়ী লাখো লাখো কৃষক। এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ কৃষক একতা মঞ্চের নেতৃবৃন্দ। অন্যদিকে অনড় সরকার ও তার প্রশাসন। নির্বিকার দেশ প্রধান। এবং কৃষক আন্দোলন বিরোধী প্রচারে ক্লান্তিহীন মিডিয়া ও সরকারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। মাইলের পর মাইল রাজপথ জুড়ে মাটি কামড়িয়ে পড়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ কৃষক। দিনের পর দিন। রাতের পর রাত। এক মাস অতিক্রান্ত। কোন সমাধান সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি আজও। পাঁচ দফা আলোচনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পরেও কৃষক একতা মঞ্চ চার দফা দাবি নিয়ে পরবর্তী আলোচনায় আহ্বান জানিয়েছে সরকারকে। দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যম কৃষক আন্দোলনকে যথাযথ ভাবে তুলে ধরছে না। এই আন্দোলনের গুরুত্বকে লঘু করে দেখানোয় প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের তৎপরতা বরং বেশি। কিন্তু তা সত্তেও আন্দোলনের আঁচ আছড়িয়ে পড়েছে অন্তর্জাল জুড়ে। দেশে এবং বিদেশে। বহু সংগঠন এবং ব্যক্তি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আন্দোলনের খবর তুলে ধরছে রাতদিন। অক্লান্ত নিষ্ঠার সাথে। তারা সরাসরি আন্দোলনরত কৃষকদের দাবিকে, তাদের বিচার বিবেচনা ও চিন্তাধারকে অন্তর্জাল জুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে দেশ বিদেশের মানুষ প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। যে সুযোগ করে দেওয়ার দায়িত্ব প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের ছিল। প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে তাদের এই প্রয়াস কৃষক আন্দোলনের সাথে একনিশ্বাসে উচ্চারিত হবে। আন্দোলনরত কৃষকদের সাথে বৃহত্তর জনগণের যোগসূত্র তৈরী করে দিচ্ছেন এঁরা। ফলে এ এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণ। সরকার যেভাবেই হোক কৃষক আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দিতে মরিয়া। অন্যদিকে আন্দোলনরত কৃষকরা জীবনপণ করে আন্দোলনকে সফল করে তুলতে পথে নেমেছে। কৃষকদের বাড়ির শিশু কিশোর কিশোরী ও গৃহবধুরাও যে যার সামর্থ্য মত কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্দোলনরত কৃষকদের সব রকমের সুবিধার জন্য, দেখাশোনার জন্য পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। যার যেমন ক্ষমতা, সে তেমন ভাবেই এই ঐতিহাসিক আন্দোলনে সামিল কৃষকদের সেবা দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন ঘটনা এ দেশের ইতিহাসে সম্পূর্ণ অভুতপূর্ব।


দিল্লী পুলিশ চারদিকে ব্যারিকেড করে কৃষকদের দিল্লীতে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তাতে লাভের লাভ কিছুই হয়নি। কৃষকরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে অবরুদ্ধ রাজপথেই বসে পড়ে তাদের আন্দোলন জারি রেখেছে এক মাসের বেশি সময় ধরে। এবং দিল্লীর কঠিন ঠান্ডায়। আর কৃষকদের খাদ্য বস্ত্র আচ্ছাদন ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় সব ধরণের সাহায্য দিয়ে নিরন্তর চব্বিশ ঘন্টা সেবা দিয়ে চলেছে বিভিন্ন সংগঠন। ফলে কৃষকরা এই আন্দোলনে নিঃসঙ্গ নয় আদৌ। এবং প্রতিদিন নতুন করে কৃষকদের দল ভারী হয়ে উঠছে। সংখ্যায় ও সংগ্রামে। প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞায়। আর তাদের সেবায় নিয়োজিত সংগঠন ও ব্যক্তির সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিদিন। ঠিক এই কারণেই ভারতবর্ষের এই কৃষক আন্দোলন প্রতিদিন আগের দিনের তুলনায় আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে রাষ্ট্রের নানা প্রান্তেই। ফলে ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় সরকার যে খুব একটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে, বিষয়টা আদৌ তেমন নয়। কিন্তু সরকার তার মুখভঙ্গিমায় সরকারের প্রকৃত অবস্থাকে ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। আর তলায় তলায় কৃষক ঐক্যকে ভাঙার চেষ্টায় নানান রকমের ফন্দিফিকির তৈরী করার কাজে ব্যস্ত রয়েছে।


সরকারের তরফ থেকে, এবং সরকারী দলের কব্জায় থাকা সব কয়টি প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনকে লঘু করে, বিকৃত করে দেখানোর চেষ্টা সেই ফন্দিফিকিরের একটি দিক। সরকারে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে নিরন্তর প্রচার চলছে আন্দোলনরত কৃষকদের বিরুদ্ধে। প্রচারের প্রধান দিকটি হলো, বলা হচ্ছে আসল কৃষকরা কেউ আন্দোলনে নাই। তারা সরকারের বলবৎ করা নতুন কৃষি আইনকে সাদরে বরণ করে নিয়েছে। যারা আন্দোলন করছে তারা কেউ নাকি আদপেই কৃষক নয়। তার নকল কৃষক সেজে সরকার বিরোধী দেশদ্রোহী শক্তিগুলির মদতে সরকারকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করছে। আন্দোলনরত কৃষকদের কখনো টেররিস্ট। কখনো খালিস্তানী। কখনো পাকিস্তানের মদতপুষ্ট। কখনো চীনের মদতপুষ্ট বলা হচ্ছে। কৃষকদের জীবনযাপন, আদবকায়দা, পোশাক পরিচ্ছদ এমনকি খাদ্যাভাস নিয়েও কটাক্ষ করে বলা হচ্ছে, এরা কখনোই দেশের কৃষক সম্প্রদায়ের কেউ হতে পারে না। এদের পরিধানে দামী পোশাক। মুখে ইংরেজি ভাষা। চলাফেরায় শহুরে ভঙ্গিই নাকি প্রমাণ করে দিচ্ছে এরা সব নকল কৃষক। সরকারী দলের মদতপুষ্ট গণমাধ্যমগুলিও এই সব প্রচারগুলিকে প্রধান্য দিয়ে দেশময় ছড়িয়ে দিচ্ছে যত্ন করেই।


এর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কৃষকরা গর্জে উঠেছে। তাদের সোজা কথা। কৃষক বলেই কি তাদের অন্যের অনুগ্রহে ভিখারীর মতোন বেঁচে থাকতে হবে নাকি? তাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে না? এই যুগেও কৃষকরা লেখাপড়া না জেনে মূর্খ হয়ে থাকবেই বা কেন? তাদের কথা। আজকের কৃষক সম্প্রদায় যথেষ্ট শিক্ষিত। তাদেরকে আর বোকা বানিয়ে রাখার উপায় নাই। সেই দিন চলে গিয়েছে। না, আন্দোলনরত কৃষকদের বিরুদ্ধে আরও অনেক ধরণের প্রচার চলছে সমান তালেও। বলা হচ্ছে এই আন্দোলন করছে শুধুমাত্র কংগ্রেস শাসিত পাঞ্জাবের কৃষকরাই। অন্য কোন অঞ্চলের কৃষকরা এই আন্দোলনে সামিল নয়। কৃষকরা সেই মিথ্যা প্রচার খণ্ডন করে দেখিয়ে দিচ্ছে, রাজস্থান হরিয়ানা মধ্যপ্রদেশ গুজরাট উত্তরপ্রদেশের কৃষকরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কিভাবে একতাবদ্ধ হয়েছে পাঞ্জাবের কৃষকদের সাথে। যে হরিয়ানা আর পাঞ্জাবের অধিবাসীদের ভিতর চিরকালের রেষারেষি, সেই তারাও আজ দুই ভাইয়ের মতো পরস্পরের হাত ধরে রাজপথ জুড়ে জড়ো হয়েছে। কৃষকস্বার্থ বিরোধী এই অন্যায় কৃষি আইন রদ করার আন্দোলনে। ফলে প্রচার ও পাল্টা উত্তরে জমে উঠেছে কৃষক আন্দোলন। নিরস্ত্র নিরীহ শান্তিপূর্ণ গণ অবস্থানে আন্দোলনরত কৃষকদেরকে খালিস্তানী কি টেররিস্ট বলে মিথ্যা প্রচারে দেগে দেওয়ার অপচেষ্টা রুখে দিতে বদ্ধপরিকর সমবেত কৃষকসমাজ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই কৃষকরা এসে একজোট হচ্ছে এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে। যাতে সরকার বাধ্য হয় এই অন্যায্য কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে।


২০২০’র এই কৃষক আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো তাৎপর্য, এই আন্দোলন বৃহত্তর জনসমাজের সক্রিয় সমর্থন লাভ করেছে। ফলে কৃষকরা আদৌ অসহায় নয়। তারা নিশ্চিন্ত, তাদের পাশে সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা রয়েছে। ফলে এই আন্দোলন যদি মাস গড়িয়ে বছর পার করে দেয়, তাতেও আন্দোলনরত কৃষকরা নিরুৎসাহিত নয়। আর সরকারের ভয় ঠিক এইখানেই। সরকার প্রথম থেকেই আশা করে বসে রয়েছে। এই আন্দোলন যত দিন যাবে তত বেশি জনসমর্থন হারাবে। এবং ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে। আর তখনই সরকার অবশিষ্ট মুষ্টিমেয় আন্দোলনকারীকে হটিয়ে দিতে সমর্থ হবে। কিন্তু গত একমাসের আন্দোলনের গতি প্রকৃতি সরকারের সেই আশায় একেবারেই জল ঢেলে দিয়েছে বলা যায়। যত দিন গড়াচ্ছে আন্দোলন তত বেশি করে সংহত হয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। প্রতিটি কৃষকের চোখেমুখে যে আত্মপ্রত্যয় এবং দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে। তা এক কথায় অভুতপূর্ব।


এই কৃষক আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট হল এই যে, কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থন, মদত ও পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ ছাড়াই শুধুমাত্র কৃষকরাই জোট বেঁধে এই আন্দোলনকে এই অব্দি এগিয়ে নিয়ে এসেছে। সুযোগ্য নেতৃত্বের মধ্যে দিয়েই। এটাই ভারতীয় রাজনীতিতে এক অভুতপূর্ব বিষয়। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দলের মদত ছাড়া, উদ্যোগ ছাড়া গণ আন্দোলন গড়ে ওঠে না। ফলে যখন যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তারা নিশ্চিন্তে থাকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের গড়ে তোলা আন্দোলনে ক্ষমতাসীন কোন রাজনৈতিক দলই ভয় পায় না। বিপক্ষীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা করা অনেক সহজ বলেই। কিন্তু ক্ষমতাসীন সব দলই রাজনীতি নিরপেক্ষ প্রকৃত গণ আন্দোলনকে সর্বদা ভয় পায়। তাই সবসময় তাদের লক্ষ্য থাকে যেকোন গণ আন্দোলনকেই রাজনৈতিক ভাবে হাইজ্যাক করে নেওয়া। সে যেভাবে যে কৌশলেই হোক না কেন। বর্তমান ভারতসরকারও সেই পথেই যে তলায় তলায় চেষ্টা করে চলেছে। সেটি অনুমান করা কষ্টকর নয় আদৌ। তাই তারা ক্রমাগত এই কৃষক আন্দোলনকে বিপক্ষীয় রাজনৈতিক শক্তির ষড়যন্ত্র বলেই দেশময় প্রচারে ব্যস্ত। যেভাবেই হোক আর যেমন করেই হোক একবার এই গণ আন্দোলনের গায়ে রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। অনেক সহজেই আন্দোলনকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব হবে। সরকারে ক্ষমতাসীন দল যে সেই লক্ষ্যকেই পাখির চোখ করে অগ্রসর হতে উদ্যোগী, সেই বিষয়ে আন্দোলনরত কৃষকরা যথেষ্ঠই ওয়াকিবহাল। এইখানেই বর্তমান কৃষক আন্দোলনের অন্যতম শক্তি। তারা রাজনীতির মারপ্যাঁচটা ভালো ভাবে বোঝে বলেই প্রথম থেকেই এই আন্দোলনকে অরাজনৈতিক রাখার বিষয়ে যত্নশীল ও সদা সতর্ক। অন্য কোন রাজনৈতিক দলকেই তারা তাদের আন্দোলনে সমিল হতে দিতে নারাজ। তারা জানে, একবার কোন রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনে ঢুকে গেলেই, গোটা আন্দোলনের দিশা বদলিয়ে যাবে। এবং আন্দোলন হাইজ্যাক করে নেবে ঢুকে পড়া রাজনৈতিক শিবির। এবং ব্যর্থ হবে কৃষকদের আন্দোলন।


সরকার ক্রমাগত বলে চলেছে, এই আন্দোলন আসলে কংগ্রেস শাসিত পাঞ্জাবীদের ষড়যন্ত্র। এই আন্দোলনে অন্য কোন প্রদেশের কৃষক সামিল নয়। এদিকে, এই যে এই আন্দোলন মূলত পাঞ্জাবী কৃষকদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে যাতে সামিল হয়েছে হরিয়ানা থেকে উত্তরপ্রদেশ। রাজস্থান থেকে গুজরাট। মহারাষ্ট্র থেকে মধ্যপ্রদেশের কৃষকরাও। এবং সেই আন্দোলনের মুখ্য মুখ যে পাঞ্জাবের কৃষকরাই। সেটাই আসলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে সবচাইতে বেশি। যদি এই কৃষক আন্দোলনে পাঞ্জাবের কৃষকরা সামিল না হতো, তাহলে বর্তমান সরকার অনেক সহজেই এই আন্দোলনকে দমন করতে সক্ষম হতো। কিন্তু এই কৃষক আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি পাঞ্জাবের কৃষকরাই সমবেত হয়ে সরকারকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। ভারতবর্ষে পাঞ্জাবীরা অনেক বেশি কষ্টসহিষ্ণু জাতি। তাদের দৈহিক বল ও মানসিক শক্তি অন্যান্য অনেক ভারতীয় জাতিগোষ্ঠীর থেকে বেশি। ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পুলিশবিভাগে পাঞ্জাবীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এবং পাঞ্জাব মূলত কৃষি প্রধান প্রদেশ বলে, সেনাবাহিনীতে ও পুলিশে কর্মরত পাঞ্জাবীদের আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কেউ না কেউ সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত। ফলে আন্দোলনরত কৃষকদের যাদের ভিতর সংখ্যার বিচারে পাঞ্জাবী কৃষকরাই বেশি, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সেনা নামিয়ে দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। আর জাতি হিসাবে পাঞ্জাবীরা সুদৃঢ় জাতীয়তাবোধে দীক্ষিত। ফলে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সকল পাঞ্জাবীই এই কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে ও সহযোগিতায় পাশে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতে সরকারও কিছুটা ব্যকফুটে। যে কারণে আন্দোলনের প্রথমে পুলিশ দিয়ে জল কামান দিয়ে কাঁদানে গ্যাস দিয়েও কৃষকদের এক ইঞ্চী পিছু হটিয়ে দিতে পারেনি এই সরকার। এই সময় সেনা নামানোরও তাই উপায় নাই সরকারের। ফলে সরকারের হাতে একটাই অস্ত্র। শুধু সময় গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া। আর রাজনৈতিক ভাবে যেকরেই হোক আন্দোলনকে দুর্বল করে দেওয়া। সরকার ঠিক সেই পথেই এগোচ্ছে।


এবং সরকারের এখন প্রধান কাজ হলো ভারতবর্ষের বাকি প্রদেশগুলিতে এই কৃষক আন্দোলন যাতে ছড়িয়ে না পড়ে। সেটি নিশ্চিত করা। সেটি করতেই সরকারে ক্ষমতাসীন দল বিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরগুলির নেতানেত্রীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছে। প্রয়োজনে ঘোড়া কেনাবেচা করে হলেও বিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরগুলির সাহায্য নিয়েই দেশব্যাপী কৃষক আন্দোলন যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করতে চাইবে তারা। আর রাজনীতিতে যুক্ত পেশাদার রাজনীতিবিদরা দেশসেবার থেকেও অর্থের বিষয়টা বেশি ভালো বোঝে। কেননা রাজনীতির লক্ষ্যই হলো আখের গোছানো। আন্দোলনরত কৃষকরা এই বিষয়গুলি সম্বন্ধে যথেষ্ঠই ওয়াকিবহাল। হ্যাঁ এই পরিকল্পনা অসফল হলে অবশ্য সরকার প্রতিবেশি দেশের সাথে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করতে পারে। কিংবা করোনার অজুহাতে কৃষকদের জীবনরক্ষার স্বার্থকে সামনে টেনে এনে আন্দোলনকে নিষিদ্ধ ঘোষণাও করতে পারে। কৃষকরা এমনিতেই করোনা প্রোটকল মানা বন্ধ করে দিয়েই বিনা মাস্কে পরস্পর গাদাগাদি করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে একবার করোনা সংক্রমণ ধরে গেলে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ হবে না সরকারের পক্ষে। এই দিকটিই সেই বেহুলার বাসরঘরের ছিদ্রের মতোন রয়ে গিয়েছে বর্তমান কৃষক আন্দোলনে। এখন দেখার বিষয় হলো সরকার সেই ছিদ্রপথ দিয়ে ঢোকার কোন পরিকল্পনা করে কিনা?


যে কোন আন্দোলনের অভিমুখ নির্ভর করে আন্দোলনরত মানুষের ঐক্যের উপরেই। কৃষক একতা মঞ্চ সেই ঐক্যকে কতটা সুদৃঢ় করে তুলতে পারে এবং কত বেশিদিন ধরে রাখতে পারে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার তার সব ধরণের ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই ঐক্যে কত তাড়াতাড়ি ফাটল ধরাতে পারে। কৃষক আন্দোলনের সাফল্য তাই অনেকগুলি বিষয়ের উপরে নির্ভর করছে। এই আন্দোলন সফল হোক আর নাই হোক। পরবর্তী গণ আন্দোলনের পক্ষে এই আন্দোলন একটি প্রশস্ত রাজপথ তৈরী করে দিয়ে যাবে। সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। সরকারও সেই বিষয়ে ওয়াকিবহাল। আর তাই কব্জায় থাকা গণমাধ্যমগুলির সাহায্য নিয়েই এই আন্দোলনকে প্রাত্যহিক খবরের শিরোনাম থেকে যত দূরে সম্ভব রাখতেই সরকার স্বচেষ্ট। তার জন্যে যা যা করতে হয়, সরকার যে করবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া কৃষকরা যে এই সরকারের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে, সেই বিষয়ে সরকারেরও কোন সন্দেহ নাই। ফলে পাঞ্জাব হাতছাড়া হলেও হরিয়ানা রাজস্থান গুজরাট উত্তরপ্রদেশ ধরে রাখতে যা যা করনীয় সরকার তা করবে। বৃহত্তর জনসমর্থন থেকে আন্দোলনরত কৃষকদের দূরে আটকিয়ে রাখাই সরকারের পাখির চোখ এখন।


ফলে কৃষক আন্দোলন যেমন গণ জাগরণের বিষয়ে একটা আশার পথ একটা আলোর রেখা দেখাচ্ছে। ঠিক তেমনই জনগণকে বিভ্রান্ত করার লক্ষে আরও বড়ো ধরণের পরিকল্পনার অশনিসংকেত রয়েই যাচ্ছে। এমন কিছু ঘটিয়ে তোলা। যাতে মানুষের চোখের ঘুম ছুটে যায়। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা বলে মানুষের মন থেকে কৃষক আন্দোলনকে সড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও ষোলআনা রয়েছে। এবং সেটি বেশ ভয়াবহ একটি আশংকা। অবশ্য এখনো সবকিছুই নিছক অনুমানের স্তরে। যত দিন এগোতে থাকবে। ছবি তত স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আপাতত অনেকেই আশা করছে, কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব ও সরকারের ভিতর একটি মধ্যস্থতাই সবচেয়ে কাম্য পথ। কিন্তু আন্দোলনের অভিমুখ মধ্যস্থতার বদলে অন্যায্য কৃষি আইন বাতিলের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই কৃষকরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এখনো। সুখের কথা আন্দোলনরত কৃষকদের সাথে একটা বড়ো অংশের জনসমর্থন রয়েছে। আন্দোলনের পক্ষে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


২৮শে ডিসেম্বর’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত