রাজনীতির আবর্তে ছাত্রসমাজ ও ছাত্রজাগরণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রাজনীতির আবর্তে ছাত্রসমাজ ও ছাত্রজাগরণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রাজনীতির আবর্তে ছাত্রসমাজ ও ছাত্রজাগরণ




রাজনীতির আবর্তে ছাত্রসমাজ ও ছাত্রজাগরণ

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকে ছাত্রছাত্রী পেটানো ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ধ্বংস করা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গিয়েছে। কখনো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে কখনো ক্ষমতাসীন সরকারী দলের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে। উদ্দেশ্য উভয় ক্ষেত্রেই এক ও অভিন্ন। বিরোধী কন্ঠস্বরকে অঙ্কুরেই স্তব্ধ ও রুদ্ধ করে দেওয়া। এবং এই উদ্দেশের স্বপক্ষেই ক্ষমতাসীন নেতানেত্রীরা শিক্ষাক্ষেত্রকে রাজনীতিমুক্ত করার কথা বলে থাকেন। মুখে এই কথা বললেও, নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন না। বরং সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলিকে প্রতিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ শক্তির অধিকারী করে তোলার সর্ব প্রকার প্রচেষ্টা করে থাকেন। এটাই ভারতীয় রাজনীতির চিরকালের বৈশিষ্ট। বস্তুত এটি কোন নতুন ঘটনা নয়। নতুন যেটুকু সেটি হলো এমন উদগ্র ভাবে এমন হিংসাত্মক ভাবে এমন দ্রুততায় এই প্রয়াস সংঘটিত করার প্রয়াসটুকুই। সংশোধিত নাগরিক আইন ২০১৯ এবং প্রস্তাবিত এনআরসি-এর বিরোধীতায় সোচ্চার হওয়া জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশি তাণ্ডবের বিরুদ্ধে দেশব্যাপি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা গর্জে উঠে ঠিক এই প্রবণতার বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাদের সেই স্বঃতস্ফূর্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ধারাকে স্তব্ধ করে দেওয়ারও চেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছে। নানান ভাবে। নানা ছলে। প্রথমেই যেটি করা হচ্চে, সেটি হলে দেশব্যাপি এই ছাত্র জাগরণকে দেশবিরোধী বলে প্রচার করা। এবং সেই প্রচারের সপক্ষে জনমত সংগঠিত করা। আর এই কাজে বিশেষ ভাবে টার্গেট করা হচ্ছে, মূলত সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেই, যেসব বিশ্বাবিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশই সরকারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বশংবদ নয়। এবং লাগাতার প্রচারে এদেরকে রাষ্ট্রবিরোধী তকমায় বিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। এবং সেই সাথে শুরু হয়েছে সময় সুযোগ বুঝে সরকারী কলকব্জাকে নিস্ক্রিয় করে রেখে টার্গেটেড ছাত্রছাত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর সন্ত্রাসী হামলা।

সম্প্রতি দিল্লীর জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির নিরস্ত্র ছাত্রছাত্রী এমনকি অধ্যাপক অধ্যাপিকাদের উপর, সন্ধ্যার অন্ধকারে মুখে কাপড় বেঁধে ঘটানো সন্ত্রাসী হামলা, এই প্রয়াসেরই সাম্প্রতিকতম নিদর্শন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নিস্ক্রিয় পুলিশের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুরক্ষাবাহিনীকে নিস্ক্রিয় করে রেখে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকিয়ে এই নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা টিভি ক্যামেরার লাইভ সম্প্রচারে সারা দেশের মানুষের চোখের সামনেই সমস্ত ঘটনা ঘটে। বিশ্বাবিদ্যালয়ের ভিতর যখন শখানেক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, একের পর এক আহত শিক্ষার্থী এমনকি অধ্যাপিকাও যখন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, তখন দেশের পুলিশ নিরব দর্শকের ভুমিকায়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিনা অনুমতিতে পুলিশ ভিতরে ঢুকতে পারে না। অথচ এই দিল্লী পুলিশই এই ঘটনার কিছু দিন পূর্বেই জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের বেধরক পিটিয়ে তাদের আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চেষ্টা করেছিল।

বিষয়টা ছাত্ররাজনীতির নয়। বিষয়টা কে কার উপর হামলা চালালো সেইটুকুও নয়। বিষয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল নিয়েও ঠিক নয়। বিষয়টা রাষ্ট্রের একাধিপত্য বিস্তারের। বিষয়টা বিরোধীশূন্য গণতন্ত্র কায়েম করার প্রয়াসের। বিষয়টা দেশব্যাপি অন্ধভক্ত তৈরী করার কার্যক্রমের। বিষয়টা দেশর মানুষকে তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের। এবং দেশবাসীকে নিরন্তর ভুল দিশায় ব্যাতিব্যস্ত রাখার কর্মকাণ্ডের। আর দেশের ছাত্রসমাজ যুবশক্তিকে সর্বদা খেলা বিনোদন আর দলীয় রাজনীতির যাঁতাকলে বেঁধে রাখতে পারলে বাকি কাজগুলি অনেক সহজ হয়ে যায়। সেই ছাত্রসমাজ যদি দিবানিদ্রা থেকে জেগে উঠতে চায়, তবে প্রথমেই তাদের ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। এটাই যখন রাষ্ট্রশক্তির প্রথম প্রায়োরিটি হয়ে দাঁড়ায়, তখন কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজই আর সুরক্ষিত নিরাপদ থাকে না।

ঠিক এইকারণেই ভারতবর্ষের কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ই আজ আর ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে নিরাপদ নয়। সুরক্ষিতও নয়। সুখের কথা বর্তমান ছাত্রসমাজের একটি বড়ো অংশই এই সত্য অনুভব করতে পারছে। আর পারছে বলেই, তারা অকুন্ঠচিত্তে এর প্রতিরোধে এমন লাগাতার ভাবে সরব হয়ে উঠছে। বিভিন্ন জনবিরোধী ইস্যুকে কেন্দ্র করে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ ও দেশব্যাপি এনআরসি তেমনই এক ইস্যু। যে ইস্যুতে দেশব্যাপি ছাত্রসমাজ এই জনবিরোধী আইন ও পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সজোরে আওয়াজ তুলেছে। তাদের কন্ঠস্বরে ভীত সন্ত্রস্ত রাষ্ট্রশক্তি এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করার সাহস করতে পারছে। একেবারে প্রথমেই যদি এই ছাত্রজাগরণকে দমিয়ে দেওয়া না যায়, তবে ছাত্রজাগরনের হাত ধরে দেশের যুবশক্তির দিবানিদ্রা কেটে গেলেই রাষ্টশক্তির পায়ের তলার মাটি টলমল করে উঠতে পারে। অন্তত বিশ্ব ইতিহাসের শিক্ষা আমাদেরকে সেই কথাই বলে।

যেহেতু প্রতিটি রাজনৈতিক দলই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলিকে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাখতে স্বচেষ্ট, তাই ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে তারা প্রায় কেউই কথা বলে না। তাদের মূল লক্ষই থাকে ছাত্ররাজনীতির আঁচে হাওয়া দিয়ে নিজেদের ভোটব্যাংক বাড়িয়ে তোলা ও তা মজবুত রাখা। কিন্তু ক্ষমতায় নিরঙ্কুশ ভাবে অধিষ্ঠিত হয়ে গেলেই একমাত্র ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মুখেই সময়ে অসময়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার যৌক্তিকতার বিষয়ে নানান কথা শোনা যায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নিবিষ্ট লক্ষ্য রাখলে দেখা যাবে, ক্ষমতাসীন রাজনেতিক দলগুলি একমাত্র তখনই শিক্ষাঙ্গনকে ছাত্ররাজনীতি থেকে মুক্ত রাখার পক্ষে ওকালতি করে, যখন বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী রাষ্ট্রশক্তির অনাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। বুঝতে হবে, মূলত যে যে কলেজ বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্ররাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সরকারে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হাতে থাকে না, সেই সেই ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন নেতানেত্রীদের চৈতন্য হয়, শিক্ষাঙ্গন রাজনীতি করার জায়গা নয়। বস্তুত, ক্ষমতাসীন নেতানেত্রীদের এই যে রাজনীতি, এটি তখনই শুরু হয়, যখন শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থীরা সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির নাগপাশ থেকে বেড়িয়ে এসে দেশ ও জাতির স্বার্থে বৃহত্তর আন্দোলনে সমিলা হতে স্বচেষ্ট হয়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ ও দেশব্যাপি এনআরসি ঠিক সেইরকমই একটি বৃহত্তর বিষয়। যে বিষয়ে দেশব্যাপি এক স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্রজাগরণ গড়ে উঠছে। যেকোন রাজনৈতিক দলই স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র জাগরণের ঘটনায় বিচলিত হয়ে পড়বে। সেটাই স্বাভাবিক। তার একটিই কারণ, যে কথা পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে; প্রতিটি রাজনৈতিক দলই তাদের ভোটব্যাংকের স্বার্থে ছাত্ররাজনীতির রাশ নিজেদের পক্ষে রাখতে স্বচেষ্ট থাকে। আর সেই রাশ হাতছাড়া হওয়া মানেই ভোটব্যাংকে বড়ো রকমের ধ্বস।  ফলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্রজাগরণ অস্তিত্ব সংকটের অশনি সংকেত হয়ে দেখা দিতে পারে। বিশেষত অধিকাংশ সময়ই এই স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্রজাগরণ রাষ্ট্রশক্তির অন্যায়ের বিরুদ্ধেই সংঘটিত হয়ে থাকে। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলি আবার তাদের নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলনকে হাইজ্যাক করার জন্য মাঠে নেমে পড়ে। এটাই গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট।

ফলত রাজনীতির আবর্তে পড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছাত্রসামাজই। আবার এই রাজনৈতিক আবর্তে ছাত্রসমাজকে আবদ্ধ করে রেখেই নিজেদের রাজনেতিক শক্তি বৃদ্ধি করে সবরকম রাজনৈতিক পক্ষই। রাষ্ট্রশক্তিও সবসময় ছাত্রসমাজকে নিজের নিয়ন্ত্রণে ধরে রেখে দেশ শাসন করতে চায়। সেই কারণেই এই রাজনীতির আবর্তের বাইরে বেড়িয়ে এসে ছাত্রজাগরণ যেকোন দেশের রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে খুবই বিপদজনক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সর্বশক্তি দিয়ে সেই ছাত্র জাগরণকে দমন করতেই উঠে পড়ে লাগে রাষ্ট্রশক্তি। বিভিন্ন সময় নানান দেশের ইতিহাসেই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গিয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে জাগ্রত ছাত্রসমাজের হাত থেকে রাষ্ট্রশক্তি তাই নিজেকে রক্ষা করার জন্যই শিক্ষাক্ষেত্রে দলীয় রাজনীতির শাখা সংগঠনগুলিকে সক্রিয় করে রাখে সব সময়। এর প্রধান সুবিধে হল, বিভিন্ন শিবিরে বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলির জালে ছাত্রসমাজকে আটকিয়ে রাখা যায়। তারা একজোট হয়ে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করতে পারে না। বরং রাজনৈতিক দলগুলির ক্রীড়নক হয়ে বিভিন্ন শিবিরের রাজনৈতিক শক্তিবৃদ্ধির পক্ষে কাজ করতে থাকে। সংসদীয় গণতন্ত্রে ছাত্রসমাজের এটাই মূল ভুমিকা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মুশকিল বাঁধে তখনই যখন ছাত্রসমাজ এই চক্রব্যূহ থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে। যখন নিজেদের স্বাধীন কন্ঠস্বরকে সমাজের চারদিকে ছড়িয়ে দিতে চায়। যখন রাষ্ট্রশক্তির জনবিরোধী নীতিমালার প্রতিবাদে গর্জে উঠতে চেষ্টা করে। প্রথমে রাজনৈতিক শিবিরগুলিকে সক্রিয় করে ছাত্রসমাজকে নানান ভাবে বিভ্রান্ত করে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। বেশির ভাগ সময়েই এতেই কাজ হয়ে যায়। কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে তাতেও কাজ না হলে রাষ্ট্রশক্তি সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রান্দোলনের উপর।

৬ই জানুয়ারী ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত