বাঙালির বোধদয়
বাংলায় এখন দলবদলের হাওয়া। দলবদলের
পালে আপাতত জোয়ার চলছে। দল বদলের এই জনজোয়ারে সামিল রাজনৈতিক নেতা মন্ত্রী থেকে শুরু
করে অধ্যাপক বুদ্ধিজীবী সেলিব্রিটি, লেখক সাংবাদিক অভিনেতা শিল্পী এবং রাজনৈতিক দলের
কর্মীবৃন্দরা। কে আছে কে নাই! এইরকমই অবস্থা। কেউ হয়তো চলেছেন গরুর দুধে সোনা আছে শুনে।
কেউ হয়তো চলেছেন বাংলাকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিতে। যারা ভারতবর্ষ জুড়ে
সরকারী অর্থাৎ জনসম্পত্তি বেচে দিচ্ছেন একের পর এক। তারাই নাকি এই বাংলাকে সোনার বাংলা
হিসাবে গড়ে দেবেন। এমনটাই বিশ্বাস আজ এই রাজ্যের অধিবাসীদের একটা বড়ো অংশের। যারা বছরের
পর বছর, নির্বাচনের পর নির্বাচনে নিজের ভোটার কার্ডের দৌলতে ভোট দিয়ে পঞ্চায়েত থেকে
শুরু করে পুরসভা, বিধানসভা থেকে শুরু করে লোকসভায় জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করে আসছেন।
তাদের ভিতর থেকেই একদল বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছেন, তারা ভারতবর্ষের নাগরিক নন।
যে দল তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার টোপ দিচ্ছে, দলবদলের পালায় তারাও ভিড়েছেন।
যিনি ভোটার কার্ডের মালিক।
তিনি নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছেন, তিনি এখনো ভারতবর্ষের নাগরিক নন। যেহেতু
তিনি শুনেছেন তাকে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ পাশ করা হয়েছে।
তাই তিনিও ঠিক করে নিয়েছেন দলবদলের পালায় তিনি সেই দলকেই বিজয়ী দেখতে চান, যে দল ক্ষমতায়
এলে আগে তাকেই ডি-ভোটার অর্থাৎ সন্দেহযুক্ত ভোটারের তালিকাভুক্ত করে দিয়ে তারই কাছে
প্রমাণপত্র দেখতে চাইবে, যে ১৯৪৮ সালের জুলাই মাসের আগে থেকেই তিনি বর্তমান ভারতীয়
ভুখণ্ডে বসবাস করছেন কিনা। সেরকম কোন সরকারী প্রমাণপত্র যদি দেখাতে না পারেন তবে তাকে
নতুন করে প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। তিনি কোন একটি মুসলিম রাষ্ট্র থেকে বিতারিত হয়ে
বিনা অনুমতিতে বেআইনী ভাবে ভারতীয় ভুখণ্ডে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে ঢুকে পড়েছেন বলে। সেই
প্রমাণপত্র দাখিল করলে তবেই তাকে শর্ত সাপেক্ষে ছয় বছর ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে
বেনাগরিক অনুপ্রবেশকারী হিসাবে। এবং সেই ছয় বছর কেটে যাওয়ার পরেই তিনি নাগরিকত্ব সংশোধনী
আইন ২০১৯ অনুযায়ী একজন শরণার্থী হিসাবে ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব পাওয়ার আবেদন জানাতে পারবেন।
এবং মধ্যবর্তী এই ছয় বছর এবং যতদিন না ভারত সরকার তাঁকে নাগরিকত্ব দিচ্ছে, ততদিন তিনি
কোন সরকারী সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। পারবেন না স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা
সত্ব অর্জন করতে। একমাত্র যেদিন ভারতসরকার তাকে নাগরিকত্বের সনদপত্র প্রদান করবে, সেই
দিনই তিনি ভারতীয় নাগরিকের অধিকার প্রাপ্ত হবেন।
হ্যাঁ সেই আশাতেই বুক
বেঁধেছেন কোটি কোটি বাঙালি। রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সাংবিধানিক নাগরিকত্বের প্রধান
সত্ব ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তারা সেই দলকেই রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় নিয়ে আসবেন, যে দলটি
ক্ষমতায় এলে তাদের এমন সোনায় সোহাগা অবস্থার সৃষ্টি হবে। প্রথমে তারা এন-পি-আর’এ নাম
তুলবেন। তারপর ডি-ভোটার লিস্টে নিজেদের নামটি দেখতে পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে মাথা পিছু
প্রায় হাজার কুড়ি টাকা খসিয়ে এন-আর-সি’র তালিকায় নিজের নাম তুলতে গোছা গোছা কাগজপত্র
নিয়ে এই দফতর থেকে ঐ দফতরে ছোটাছুটি করবেন। এতকিছু করেও যখন এন-আর-সি’র তালিকায় নাম
উঠবে না, তখন তারা পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাষ্ট্রে দৌড়াবেন, ১৯৪৮ সালের পর মুসলিম রাষ্ট্র
থেকে বিতারিত হওয়ার পুরানো নথিপত্র সংগ্রহ করতে। কারণ একমাত্র সেই নথির ভিত্তিতেই নাগরিকত্ব
সংশোধনী আইন ২০১৯’র দৌলতে তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার কথা। অন্য কোন নথিই আইনত গ্রাহ্য
নয়।
এক বড়ো অংশের বাঙালিই
এই পথে নিজের ভোটারকার্ড বিসর্জন দিয়ে নতুন করে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার আশায় টগবগ
করে দলবদলের পালায় ভিড় বাড়িয়ে চলেছেন। যেখানেই দলবদলের কাণ্ডারীরা গলায় গাঁদাফুলের
মালা ঝুলিয়ে রোড শো করছেন। সেখানেই নাগরিকত্বের লোভে সেই বাঙালির ভিড় বাড়ছে। যে মঞ্চ
থেকেই সি-এ-এ’ নিয়ে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, সেই মঞ্চের চারপাশেই জনসমুদ্রের ঢেউ উঠছে।
আর সামনেই রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন। তাই এই সুযোগটাকে আর হারাতে রাজি নন অনেকেই। যাদের
হাতে ১৯৪৮ সালের জুলাই মাসের আগের সরকারী দলিলপত্র আছে, তাদের অবশ্য নাগরিকত্ব পাওয়ার
লোভ নাই। কারণ সেই কাগজই এন-আর-সি’তে নাম তোলার জন্য যথেষ্ঠ। হ্যাঁ তার জন্য অবশ্য
হাজার কুড়ি টাকা খরচ ও সরকারী দফতরে দৌড়াদৌড়ি ঠিকই করতে হবে। তাই মন্দ কি। ২০১৪ সাল
থেকেই তো এই দৌড়ানো শুরু হয়ে গিয়েছে। গ্যাসের ভর্তুকির টাকা ব্যাংক একাউন্টে পাওয়ার
লাইনে দাঁড়ানো দিয়ে যার শুরু। নোট বাতিলের লাইনে দাঁড়িয়ে যার অগ্রগতি। এন-আর-সি’তে
নাম তোলানোর লাইনে দাঁড়িয়ে যার পরবর্তী পর্বের শুভ সূচনা। দেশ এগিয়ে চলেছে।
দেশ এগিয়ে চলেছে। বিধায়ক
সাংসদ রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও সেই পথে পা মেলাতে বাংলাকে এবারে তুলে দিতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রীর
হাতে। তিনিই তো সোনার বাংলা গড়ে দেবেন। যে বাংলায় গরুর দুধে সোনাও পাওয়া যাবে। বিগত
দশ বছর কাটমানি, চিটমানি, তোলামানি সহ অন্যান্য সরকারী সুযোগ সুবিধার ভোগ দখল করে এতদিনে
অনেকের বোধদয় হয়েছে, মানুষের জন্য কাজ করতে হলে দলবদলের পালে হওয়া লাগাতে হবে। তাই
একে একে উইকেট পড়াও শুরু হয়েছে। মানুষের জন্য কাজ করার এহেন উৎসাহ ও উদ্দীপনা সত্যই
অভিনব। নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে হওয়া এই বোধদয় ও উৎসাহ উদ্দীপনা বাংলার রাজনীতিতে
এক নতুন পার্বণের শুরু করে দিয়েছে। সেই পার্বণের আনন্দের হাটে আপামর বাঙালির এক বড়ো
অংশই আজ গা ভাসিয়ে আহ্লাদিত।
এবং এতটাই আহ্লাদিত যে,
দিল্লীর প্রান্তে মাসাধিককাল ব্যাপী রাজপথে অবস্থানরত ভারতীয় কৃষকদের আন্দোলনও তাদের
কাছে মূল্যহীন। তারা প্রতিদিন সান্ধ্য টিভির সংবাদ জলসায় বিতারিত জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে
প্রতিদিনই নিশ্চিন্ত হচ্ছেন। না, নতুন কৃষি আইনও কৃষকদরদী। এবং এই আইন ভারতীয় কৃষকদের
এবার ধরে ধরে ধনী করে ছাড়বে। কৃষকরা তাদের ফসলের উপরে এতটাই বেশি দাম পাবে যে, কৃষকদের
ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে, তারা বিশ্বাস করেন। তারা এও বিশ্বাস করেন, নতুন এই কৃষি আইনে
সাধারণ মানুষও লাভবান হবেন। দেশ বিদেশের বহুজাতিক কোম্পানির নতুন নতুন শস্যমলে লোভানীয়
অফারে রোজকার সবজীবাজার করা যাবে। রাস্তার ধারের কাঁচা সবজীর বাজারে আর ছুটতে হবে না।
ঝাঁচকচকে সবজী মলে বেড়াতে বেড়াতে আলু পটল শাকসবজী কিনে বাড়ি ফেরা যাবে। ফলে কৃষি আইন
নিয়ে বিরোধীতা করা যে দেশদ্রোহীতারই সামিল। সে বিষয়ে তারাও নিঃসন্দেহ। তাই এই বাংলায়
কৃষি আইন নিয়ে কোন আন্দোলনও নাই। সমস্যাও নাই। সকলেই দেশপ্রেমী। অধিকাংশই সোনার বাংলা
গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী। ঠিক যেমন ২০১৪ সালের, সেই প্রত্যেক ভারতীয়র ব্যাংক
একাউন্টে পনেরো লাখ টাকা দেওয়ার দেশব্যাপী প্রতিশ্রুতি ছিল। ঠিক সেই রকমই বিশ্বাসে
এই বাংলার বাঙালি এখন নিশ্চিন্ত। এবার সোনার বাংলা পাওয়া যাবে হাতে হাতে। শুধু নির্দিষ্ট
বোতামে আঙুল টেপাটাই বাকি।
বাঙালি তাই সি-এ-এ’তেও
আছে নতুন কৃষি আইনেও আছে। দলবদলেও আছে। ভোটের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করাতেও আছে। ক্ষমতাসীন
রাজনৈতিক শিবিরের প্রতি অন্ধভক্তিতেও আছে। প্রতিদিনের সান্ধ্য টিভির সংবাদ জলসাতেও
আছে। আর বাঙালি সেলিব্রিটি ও বুদ্ধিজীবীরাই তো সেই বাঙালিকে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে বরাবর।
দশ বছর আগেও দিয়েছিল। এবারেও দিচ্ছে। কখন কোন বোতামে আঙুল ছোঁয়াতে হবে। শুধু নিজ নিজ
সাম্প্রদায়িক বিশ্বাসে অটল থাকলেই হবে। সঠিক বোতাম খুঁজে পেতে দেরি হবে না একদম।
১৩ই ফেব্রুয়ারী’ ১৪২৭
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

