নির্বাসিত রবীন্দ্রনাথ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নির্বাসিত রবীন্দ্রনাথ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

নির্বাসিত রবীন্দ্রনাথ



নির্বাসিত রবীন্দ্রনাথ

সত্যই বাঙালির জীবনে আর কিছু থাকুক আর নাই থাকুক একজন রবীন্দ্রনাথ আছেন। যাকে দোহন করে করেও শেষ করা যায় না। যে যেমন দোহন করে নিতে পারে, সমাজ সংসারে তার তেমন কদর বাড়ে। আমার জানা নাই, পৃথিবীতে এমন আর দ্বিতীয় কেউ আছেন কিনা? বা থাকলেও তাঁকেও তাঁর দেশের মানুষ এমন ভাবেই সিঁড়ি বানিয়ে সমাজিক অবস্থানের মগডালগুলিতে উঠে বসতে পারে কিনা। অনেকের মনে এই প্রসঙ্গে শেকস্পীয়রের কথা মনে হতেই পারে। কিন্তু শেকস্পীয়র চর্চা এক বিষয়। আর তাঁকে ভাঙিয়ে আখের গুছিয়ে নেওয়া আর এক বিষয়। বাংলায় রবীন্দ্রনাথকে ভাঙিয়ে আখের গুছিয়ে নেওয়ার মানুষের কিন্তু অভাব নাই। এমন কি যিনি সেই মহার্ঘ্য নোবেল পদকটি চুরি করে হজম করে ফেলেছেন, তিনিও কবিকে ছেড়ে দেন নি। এমনই মহার্ঘ্য আমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ। অনেকেই ভাবতে পারেন বিশ্বনিন্দুকে কিনা বলে। কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি একটু বঙ্গসংস্কৃতির আনাচে কানাচে ঠিক মতো খৌঁজ নিয়ে দেখা যায়, তবে সামাজিক অবস্থানের মগডালে উঠে বসার মতো এমন সুন্দর ফিক্সডডিপোজিট আর নাই আমাদের বাংলায়। হ্যাঁ আপনি এটা বলতে পারেন, সেটা ভাঙিয়ে খেতেও এলেম লাগে বই কি। সত্যিই লাগে।

এবং এমন এলেমদার মানুষের ভিড়েই আমাদের রবীন্দ্রনাথ যেন রবীন্দ্রনাথ থেকেই ক্রমে ক্রমে বিলীন হয়ে যেতে বসেছেন। রবীন্দ্রনাথের জায়গা নিয়ে নিয়েছে রবীন্দ্রনাথের জগদ্দল মূর্তি। আর সেই মূর্তিরই আড়ালে পড়ে গিয়েছেন মানুষ রবীন্দ্রনাথ। দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। সাধক রবীন্দ্রনাথ এবং কর্মী রবীন্দ্রনাথ। এদিকে ২৫শে বৈশাখ যাকে জাগিয়ে তুলি আমরা ঘটা করে, আর সারা বছর যাকে ভাঙিয়ে দিন আনা দিন খাওয়া, সেই রবীন্দ্রনাথই পথরোধ করে দাঁড়িয়ে থাকেন ঠাকুর বাড়ির রবিঠাকুরকে। সত্যই এ এক অদ্ভুত অবস্থা। কবি জীবনানন্দের ভাষায় এও সেই অদ্ভুত আঁধার এক। একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন এই রবীন্দ্রনাথ হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের জীবনদর্শন ও জীবনসাধনার বাইরে বস্তুত অনাদরে অবহেলাতেই পড়ে থাকেন সমগ্র বাংলা ও বঙ্গসংস্কৃতির আঙিনা হতে নির্বাসিত হয়ে। না না এই নিয়ে সত্যই কি বিতর্কের অবকাশ আছে বলে মনে হয় আপানার? আসলে সত্য চিরকালই কঠিন এবং অধিকাংশ সময়েই নির্মম। তাই হঠাৎ দুম করে সত্যের সামনা সামনি পড়ে গেলে দিশাহারা তো লাগবেই। মনে হতেই পারে, এসব নেহাতই কষ্ট কল্পনা। নিন্দুকের প্রচার। মনে হতেই পারে, আমাদের এতদিনকার রবীন্দ্রনাথ কি করে চিরনির্বাসিত থাকতে পারেন বঙ্গসংস্কৃতির দিগন্তে? যাঁর হাত ধরেই কিনা পুষ্ট হয়ে উঠেছে বঙ্গসংস্কৃতির আধুনিক পর্ব? এ যেন মেঘলা দিনে সূর্যের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ করার মতোই মুর্খামির এক আস্ত দৃষ্টান্ত।

বেশ সে কথাই যদি মেনে নিতে হয়, ভালো। তবে তো ধরে নিতেই হয় রবিঠাকুরের আজীবন সাধনা ও কর্মের সুফল বাংলা ও বাঙালিকে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্তেই নিয়ে গিয়েছে এযাবৎ। জানি, রবীন্দ্র পরবর্তী বিভিন্ন যুগের বাঙালির মেধা ও মনীষার ইতিহাস তুলে ধরবেন অনেকেই। দেখিয়ে দেবেন কি ভাবে রবীন্দ্রনাথের অনপনেয় প্রভাবে আন্তর্জাতিক স্তরেও বাঙালির মধা ও মনীষা আবিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে। না, সেটাই শেষ কথা নয়। প্রধান বিষয়ও নয় মোটেও। কয়জন বিখ্যাত মানুষ রবীন্দ্রনাথ থেকে পুষ্টি নিয়ে নতুনতর কি কি সমৃদ্ধির ডালি সাজিয়ে গিয়েছেন সমাজ ও সভ্যতার জন্যে সেখানেই রবীন্দ্রনাথের মূল পরিচয়ের নোঙর নয় কিন্তু। রবীন্দ্রনাথের মূল পরিচয়ের নোঙর সেইখানেই, যেখানে সমাজ ও সভ্যতা সামগ্রিক ভাবে আলো ও সমৃদ্ধির পুষ্টি পেতে পারে। এবং সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি, সেটি হলো কবির আপন স্বাজতির সমাজ ও সংসার সামগ্রিক ভাবে কতটা বেশি সেই পুষ্টি ও সমৃদ্ধিতে পূর্ণ হয়ে উঠলো। রবীন্দ্রনাথের প্রধান প্রাসঙ্গিকতা ঠিক সেখানেই বন্ধু। সেই পরিসরে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা যতটাই বলিষ্ঠ হয়ে উঠবে, ততটাই আবিশ্ব সমাজ ও সভ্যতা আলো পেতে পারবে রবীন্দ্র বলয় থেকে।

অত্যন্ত দুঃখের ও পরিতাপের বিষয়, আমাদের দুই বাংলার সমাজ ও সংসার এই মানুষটির থেকে বিশেষ কোন পুষ্টি লাভ করতে পারেনি আজকের সময় অব্দি। যদি পারতো, আজ দুই বাংলার পরিস্থিতি, দুই বাংলার সংস্কৃতি ভিন্নতর হতো। এই সত্যটি বুঝতে হবে আমাদেরকে। না কোন মোহের বশে, আবেগের বশে এই সত্যকে স্বীকার করতে পিছপা হলে পিছিয়ে যাবো আমরাই। যেমন পিছিয়েই যাচ্ছি ক্রমাগত। অস্বীকার করার সংস্কৃতিকেই সত্বঃসিদ্ধ করে নিয়েছি বলেই। কারণ সেটাই যে আমাদের জাত ধর্ম। আমাদের বাঙালিদের। সে আমরা কাঁটাতারের যে পারেই থাকি নয় কেন।

মানুষটির সব কাজের মধ্যে প্রধানতম কাজটি ছিল কিন্তু শিক্ষাবিস্তার, প্রকৃত শিক্ষার সঠিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা। শিক্ষার সকল মাধ্যমগুলিকে সবল করে তোলা। কারগরি শিক্ষার বিষয়টিকে সমাজের সকল প্রান্তেই সমান ভাবে কার্যকর করে তোলা। এবং সার্বিক শিক্ষার প্রসারকে বাস্তব করে তোলার জন্যে শিক্ষাকে পুঁথিগত চৌহদ্দীর বাইরে নিয়ে আসা। ফলে এইযে মানুষ গড়ার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করার সাধানা শুরু করেছিলেন কবি বোলপুরের শান্তিনিকেতনে, সেটিই ছিল নানা রবীন্দ্রনাথের মূল অভিমুখ। কিন্তু কবির তোতা কাহিনী মুখস্থ করা বাঙালি, আজও ব্রিটিশের চাপিয়ে দিয়ে যাওয়া কেরানি তৈরীর শিক্ষা ব্যবস্থার অচলায়তনকে কোনদিনও ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টাই করে নি। রবীন্দ্রনাথের এই প্রধানতন কর্মসাধনাকেই তাঁর মৃত্যুর পর আমরা সার্বিক ভাবে এবং সর্বাত্মক বাবেই ব্যর্থ করে দিয়েছি। এখানেই আমাদের রবীন্দ্রভক্তির নোঙর। বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার মূল অভিমুখ কোনটি? না প্রাইভেট টিউটরের দেওয়া সাজেস্টেড নোট মুখস্থ করে কে কতো বেশি পার্সেন্ট মার্কস পেয়ে বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো। আজ দুই বাংলার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি উন্নত বিশ্বের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে ঠিক কত শতাব্দী পিছনে পড়ে আছে, ভেবে দেখি কি আমরা কখনো? কেন পড়ে আছে? আছে এই কারণেই যে, কবি তাঁর নিজের সামান্য শক্তিতে যে বিরাট উদ্যোগটি শুরু করে ছিলেন, আমরা সেই অভিমুখ থেকে প্রথম দিন থেকেই উল্টো অভিমুখে ছুটে চলেছি। এরপরেও যদি কেউ ভাবেন, রবীন্দ্রমূর্তির আড়ালে হারিয়ে যান নি আমাদের সাধের রবীন্দ্রনাথ, তবে সত্যিই বলার কিছু নাই।

শুধু শিক্ষাই কি? যেখানে আমরা এই মানুষটিকে আমাদের দেশ গড়ার কাজ থেকে সমূলে ছেঁটে ফেলে দিয়েছি? সামজিক যে সকল বিষয়েই এই প্রবাদপ্রতীম মানুষটি কিছু করার চেষ্টা করে গিয়েছিলেন, সেসবের কোনটারই কি আমরা দিয়েছি কোন মূল্য? সার্থক করে তুলেছি তাঁর সাধনার দিগন্তকে? রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর মাত্র ছয় বছরের ভিতর মানুষটির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাধনাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিয়েই না তবে আমরা কবির সোনার বাংলাকে কেটে দুটুকরো করেছি। করেছি নিজেরা সাম্প্রদায়িক হয়ে। কবির স্বদেশ তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই সাম্প্রদায়িকতাকেই শিরধার্য্য করে নিয়ে দেশভাগ করে সেই ভাগকেই স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়ে পার করে দিল আরও সাড়ে সাতটি দশক। এবং বেমালুম নির্বিকার বেহায়া ও নির্লজ্জের মতো। এরপরেও আমাদের বিশ্বাস করতে হবে আমারা রবীন্দ্রনাথের সার্থক অনুসারী? বিশ্বাস করতে হবে আমরা আমাদের কাজে ও সাধনায়, প্রজ্ঞা ও দর্শনে মানুষটিকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছি? আজ দুই বাংলার সমাজ ও রাজনীতির রূপ ও বিকাশের কোন জায়গাটিতে স্থান রয়েছে এই মানুষটির প্রজ্ঞা ও দর্শনের? আছে কি কোন প্রভাব? সামান্যতম কোন ভাবেও? বাঙালি জাতিগত ভাবেই কি রবীন্দ্রনাথকে তার যথাযোগ্য সম্মান দিতে পেরেছে এযাবৎ? ঘটা করে পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণ পালন করে আর বিদ্যলয়ের সিলেবাসে তাঁর কয়টি লেখা রাখলেই কি দেওয়া হয় যথাযোগ্য সম্মান?

মানুষটি তাঁর জীবদ্দশায় আবিশ্ব সমাজ ও সভ্যতার মাঝে যেভাবে আমাদের পরিচয়কে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, পেরেছি কি আমরা তার যথার্থ্য মূল্য দিতে? নাকি প্রতি পদেই তাঁর স্বপ্ন সাধ সাধনাকে তছনছ করতে করতেই আজ আমরা এসে পৌঁছিয়েছি একবিংশ শতকের এই পর্বে? তাঁর মূর্তিতে আর ছবিতে বছর ভর টন টন মালা দিলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ? কে কত বিশুদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইল, উদাত্ত আবৃত্তি করল, কে কত অনিন্দসুন্দর রবীন্দ্রনৃত্য পরিবেশন করলো, আর কে কত রবীন্দ্রনাথকে নির্ভুল কোট করে থিসিস জমা দিয়ে পণ্ডিতি ফলালো, এর মধ্যেই তো আমাদের রবীন্দ্রতর্পণের সমাপ্তি। তাই বলছিলাম রবীন্দ্রনাথকে ভাঙিয়ে খেতে খেতে মালায় ঢাকা রবীন্দ্রমূর্তির আড়ালেই প্রায় হারিয়েই গিয়েছেন আসল রবীন্দ্রনাথ। অন্তত তাঁর স্বজাতির জীবনদর্শন থেকে। স্বজাতির কর্মসাধনা থেকে। স্বজাতির স্বাজাত্যপ্রেম থেকে। তাঁর আপন স্বদেশ থেকেই। কাঁটাতারের দুই পারেই। এপারে ও ওপারেও।

৯ই মে ২০১৮

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত