ভাষা ব্যবহার একজন মানুষের শিক্ষা
ও রুচির পরিচয় বহন করে। ভাষার ব্যবহারের ভিতর দিয়ে ব্যক্তি চেতনার সৌকর্যও পরিস্ফূট
হয়ে থাকে। এবং ভাষা ব্যক্তি চরিত্রের দিকচিহ্ন স্বরূপও বটে। সেই ভাষাই আবার মানুষের
অন্তরের বহু নোংরা ও আবর্জনা, কদর্যতা ও হিংস্রতাকে বাইরে বের করেও নিয়ে আসতে পারে।
একজন মানুষের শিক্ষাদীক্ষা চেতনা ও সংস্কৃতির উপরেই নির্ভর করে ভাষার ব্যবহার। সেই
সূত্রেই পরিশীলিত ও অপরিশীলিত ভাষার জন্ম হয়। সুভদ্র ও অভদ্র ভাষা চলাচল করে। এবং সুস্থ
ও অসুস্থ ভাষাও নিজেকে জানান দিয়ে থাকে। অসুস্থ বিকারগ্রস্ত চেতনা যেমন অসুস্থ ভাষার
পথ প্রশস্ত করে তোলে। তেমনই সুস্থ ও সুন্দর চেতনা সুস্থ ভাষার রাজপথ গড়ে তোলে। এইভাবে
সমাজ ও সংসারে ভাষার সংস্কৃতি জায়মান থাকে। এবং সমাজ ও সংসার ততটাই উন্নত, ভাষার মাধুর্য্য
যতটা উন্নত। সমাজ ও সংসার ততটাই অধঃপতিত। ভাষার কদর্যতা যতটা তীব্র ও ব্যাপক।
সাধারণত সার্বিক শিক্ষার প্রসার ও সমাজিক সংস্কৃতির সুস্থতার
উপরেই নির্ভর করে কত বেশি পরিমাণ মানুষ ভাষার সুস্থতা বজায় রাখতে পারবে কি পারবে না।
যে ভুখণ্ডে শিক্ষার পরিসর যত বেশি সংকীর্ণ সেই ভুখণ্ডে ভাষার সৌন্দর্য্যও তত বেশি পরিমাণে
অবরুদ্ধ। তাই শিক্ষার প্রসার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষা বলতে জ্ঞান বিজ্ঞান মানবিকতার
চর্চা ইত্যাদি। শুধুমাত্র পুঁথিগত মুখস্থ বিদ্যাজনিত ডিগ্রী সার্টিফিকেট নয়। অনেক ডিগ্রীধারী
মানুষের ভাষাও কদর্য হতে পারে। আবার অনেক ডিগ্রীহীন মানুষের ভাষাও পরিশীলিত সুস্থ সুন্দর
হতে পারে। সবটাই নির্ভর করে মানবিক শিক্ষার পরিসরের উপরে। যে সমাজ সেই মানবিক শিক্ষার
পরিসরকে যত বেশি প্রশস্ত করে তুলতে পারবে। সেই সমাজ তত বেশি সুস্থ সংস্কৃতির জন্মও
দিতে পারবে।
এসবই তত্ব কথা। খাতায় কলমে সত্য। শুনতে ও বলতেও ভালো লাগে।
কিন্তু বাস্তব বড়োই রূঢ় ও কঠিন। অনেকেই বলবেন সে কথা। অনেকে এও বলতে চাইবেন, অর্থনৈতিক
অনিশ্চয়তা যেখানে যত বেশি, সেখানে ভাষা তত বেশি অপরিশীলিত। এটাই বাস্তব। প্রতিদিনের
জীবন সংগ্রাম যেখানে যত বেশি তীব্র ও ভয়াবহ। সেখানে ভাষা কখনোই পরিশীলিত সুস্থ সুন্দর
হতে পারে না। অর্থাৎ ভাষার সৌন্দর্য্য ও সৌকর্যের সাথে অর্থনীতির প্রসঙ্গ জড়িত। অনেকের
মতে সেটাই প্রধান নিয়ন্ত্রক, ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে। তাদের কথা সত্বঃসিদ্ধ হলে এটা প্রমানিত
সত্য যে, ধনতন্ত্র যে অর্থনৈতিক শোষণতন্ত্রের উপরে প্রতিষ্ঠিত, সেই শোষণতন্ত্রই অপরিশীলিত
ভাষার মূল জন্মদাতা ও চালিকা শক্তি। এর ফলে আমরা একটি সহজ অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি।
সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে, ভাষা ব্যবহারে মানবিক সৌকর্যের প্রকাশ
অধিকতর সত্য হয়ে উঠতে পারে।
সমাজের নানান শ্রেণীর মানুষের প্রতিদিনকার জীবন এই ধারণারই
সাক্ষ্য দেয়। অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অবস্থা মানুষের ভাষা ব্যবহারের উপর প্রবল ভাবে নঙর্থক
প্রভাব বিস্তার করে। পক্ষান্তরে সুনিশ্চিত অর্থনৈতিক অবস্থা সেই ভাষাকেই অনেক সুসংস্কৃত
করে তুলতে পারে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সকলেরই রয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয়। আর্থিক প্রাচুর্য্য
ও ধনৈশ্বর্যই সুস্থ ভাষার নিশ্চয়তা দেয় সবচেয়ে বেশি। বরং আদৌ তা নয়। মানুষের হাতে প্রয়োজনের
থেকে অনেক বেশি পরিমান ধনৈশ্বর্য থাকলে মানুষের পদস্খলনের সম্ভাবনাও কম থাকে না। এই
জন্যেই পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ধনতান্ত্রিক
অর্থনীতির বদলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি সমাজ সংসারে সুস্থ ভাষা ব্যবহারে অধিকতর নিশ্চয়তা
দিতে পারে।
এবার দৃষ্টি দেওয়া যাক আমাদের বাংলার দিকে। ব্রিটিশের প্রবর্তিত
অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। আর শোষণবাদী সমাজ ব্যবস্থার আবহমান ঐতিহ্য। মূলত এই দুটি স্তম্ভের
উপরে দাঁড়িয়ে আমাদের সমাজ। মধ্যবর্তী পরিসরে রয়েছে এক দিকে শ্রেণীভেদ জনিত জাতপাতের
সংস্কৃতি অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক উত্তরাধিকার। এই সবকিছু মিলে আমাদের সমাজব্যবস্থার
ভিত্তি। যে ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রণ আবার ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির হাতে। ফলে এক কথায়
সোনায় সোহাগা। এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার যে কায়েমী স্বার্থ। সেই স্বার্থ পুরণের দুইটি
চাবিকাঠি। এক অবরুদ্ধ সার্বিক শিক্ষা। এবং দুই, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ চর্চা। আমাদের
সমাজে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সযত্নে লালান পালন করা হয়। সেই কারণে শিক্ষার অধিকারকে
সংবিধানে স্বীকৃতি দিলেও, রাষ্ট্র সেই বিষয়ে দায়বদ্ধ নয়। আর সমাজের অন্যতম লক্ষ্যই
থাকে শিক্ষার অধিকারকে যতটা সম্ভব অধিকাংশের নাগালের বাইরে রাখা। রাষ্ট্র সেই বিষয়ে
সমাজকে সাহায্য করতেই দিনে দিনে শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারী ব্যায় বরাদ্দ সঙ্কুচিত করে
চলে ক্রমাগত। বিশেষ করে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি যদি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে
শুরু করে। এবং এরই সাথে, দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি সমাজকে সাম্প্রদায়িক
বিদ্বেষে বিভক্ত করে রাখার কাজটি করে চলে। ফলত, সমাজের এক দিকে বিপুল সম্পদ। ধনৈশ্বর্য
সহায় সম্পত্তি। এক দিকে সীমাহীন দারিদ্র্য। এক দিকে শিক্ষার অধিকার। এক দিকে শিক্ষাকে
সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রাখা। একদিকে অর্থনৈতিক শোষণ। এক দিকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চা।
এটাই আমাদের বাংলার সমাজ বাস্তবতা। কাঁটাতারের উভয় পারেই। এবং এই যে সমাজের আসল চিত্র।
সেই সমাজে অধিকাংশ মানুষের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রাম যতটা তীব্র। ততটাই অনিশ্চিয়তায়
ভরা। ততটাই মারাত্মক ভয়াবহ। সেখানে সেই বিপুল জনমানসের ভাষা ব্যবহারে শিক্ষিত পরিশীলিত
মার্জিত রুচির বহিঃপ্রকাশ আশা করাই কষ্টকল্পনা। কিন্তু সেই অবস্থার জন্য দায়ী কে?
নিশ্চয় সেই মানুষগুলি নয়। যাদের জীবনে পর্যাপ্ত আর্থিক সুরক্ষার
কোন নিশ্চয়তা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতই নয়। কারণ আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার কেন্দ্রে
রয়েছে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি। যার লক্ষ্যই হলো বিভেদ ও শোষণ। ফলে, সমাজের পরতে পরতে
জনমানসে ভাষা ব্যবহারের যে বিভিন্নতা দেখা যায়। তার জন্য সংশ্লিষ্ট মানুষের উৎকর্ষতা
ও অপকর্ষতার নেপথ্যে রয়েছে অর্থনীতির পরিকাঠামো। যে দেশের অর্থনীতি যত বেশি শোষণবাদী,
সেই দেশে অধিকাংশ জনমানসের ভাষা তত বেশি অপরিশীলিত হতে বাধ্য। ভাষা ব্যবহারের সাথে
অর্থনীতির বিষয়টা এমনই ওতপ্রতো ভাবে জড়িত। আমরা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ, ভাষা ব্যবহারের
বিষয়টি পারিবারিক শিক্ষা ও ব্যক্তি মানুষের নিজস্ব চরিত্রের সাথে সংযুক্ত বলে বিশ্বাস
করতে ও করাতে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো ও সমাজের শোষণবাদী চরিত্রের উপরে সমাজ ও
সংসার যতটা নির্ভরশীল, ততটাই নির্ভরশীল ব্যক্তি মানুষের ভাষা ব্যবহারের গতি প্রকৃতি।
বর্তমানে কাঁটাতারের উভয় পারেই ধনের অসাম্য যত বেশি প্রকটভাবে
বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমাজ ও সংসারের পরতে পরতে তার প্রভাবও তত বেশি প্রবল হয়ে উঠছে। আর সেই
সাথেই সমাজের সর্বত্র ভাষা ব্যবহারের ভিতর অসুস্থ ও বিকারগ্রস্ত মানসিকতাও তত বেশি
বেআব্রু হয়ে পড়ছে। এবং এই অবস্থায় যুক্ত হয়েছে আরও একটি শক্তি। সেটি প্রশাসনিক ক্ষমতা
দখলের রাজনীতি। এই রাজনীতির লক্ষ্য একটিই। ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণকে কুক্ষিগত
করে ননীমাখনের কায়েমী বন্দোবস্ত। আর রাষ্ট্রের শাসনভার দখল করতে না পারলে সেই কাজটি
সুষ্ঠ ভাবে করা সম্ভব নয়। ফলে সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির ভিতরে লড়াই যত
বেশি তীব্র হচ্ছে, ভাষা দূষণের মাত্রাও তত বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেকোন রাজনৈতিক দলের
জনসভায় উপস্থিত থাকলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। দেশব্যাপী এই রাজনীতির প্রভাব ব্যপক ভাবে
পড়ছে যুবসমাজের উপরে। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি আবার সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চাকেই তুরুপের
তাস হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে। ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভিতরে যত বেশি বিভেদ বাড়তে
থাকে। ভাষা দূষণও তত বেশি মাত্রায় ছড়াতে থাকে। এবং এই বিষয়ে শিক্ষিত অশিক্ষিত উভয় শ্রেণীর
মানুষই জড়িয়ে পড়তে পারে। এবং পড়েও। এইভাবেই রাজনীতির ঘেলা জলে আবর্তিত হতে থাকে বাংলার
সমাজ ও সংসারে ভাষা ব্যবহারের সংস্কৃতিও।
তাই কারুর অপরিশীলিত ভাষা ব্যবহারের সংস্কৃতির জন্য সেই ব্যক্তি
মানুষটির দিকে আঙুল তোলার আগে আমাদের ভাবা উচিত আমাদের দেশের সমাজবাস্তবতার কথা। সেই
সমাজবাস্তবতার অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, তার সাম্প্রদায়িক চরিত্র ও ক্ষমতা দখলের রাজনীতি
এবং শোষণবাদী সমাজের আবহমান ঐতিহ্য। এবং আমাদের রাষ্ট্রিক ভিত্তি। এই সব কিছুর যোগফলেই
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর ও বিভিন্ন আর্থিক সামর্থ্যের মানুষজনের ভাষা ব্যবহারের সংস্কৃতি
নির্ভর করে। সেই সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে ভাষা দূষণ নিয়ে কোন আলোচনাই ফলপ্রসু হতে পারে না।
আমাদের যদি সত্যিই এই ভাষা দূষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতেই হয়। তবে শুরু করতে হবে
অর্থনীতির একেবারে গোড়া থেকেই। শোষণবাদী সমাজে সেই কাজটি শুরু করাই সবচেয়ে চ্যলেঞ্জের।
সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে দেশের যুবশক্তি যতদিন না অব্দি এগিয়ে আসতে পারবে। ততদিন বাংলায়
ভাষা দূষণের সংস্কৃতি আরও বেশি পরিব্যাপ্ত ও অসহনীয় হয়ে উঠতে থাকবে। থাকবেই।
১লা সেপটেম্বর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

