রিলিজিয়নের ধর্ম
রিলিজিয়নের প্রধান কাজই হলো
মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা। অনেকেই সেকথা মানতে রাজি হবেন না, ঠিক। বরং বলতে চাইবেন, সব রিলিজিয়নই মানুষকে
নিজের কোলে আশ্রয় দেয় বলেই এক একটি রিলিজিয়নকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি মানুষের এক
একটি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে ঠিকই। কিন্তু সেই গড়ে ওঠা প্রতিটি সম্প্রদায়ই এক
এক ধরনের জীবনচর্চায় বিশ্বাসী
হয়ে অন্য ধরণের জীবনচর্চাকে ভ্রান্ত বলেই বিবেচনা করে। এবং নিজ সম্প্রদায়ের
জীবনচর্চাকে অভ্রান্ত জেনে সেই জীবনচর্চার চারদিকে একটি রিলিজিয়াস পাঁচিল তুলে
রাখে। যার ওপারের সবটাই পরিত্যাজ্য। এই যে একটা অপছন্দের সংস্কৃতি, এর হাত ধরেই
সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চার ভুমি তৈরী হতে থাকে। কোন রিলিজিয়নই বলে না, বাকি সব রিলিজিয়নই সমান
অভ্রান্ত। সমান সুন্দর। কোন রিলিজিয়নই বলে না, সব রিলিজিয়নই আমার আত্মীয়। বরং
বলে একমাত্র আমার রিলিজিয়নই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রিলিজিয়ন। আমার ঈশ্বরই জগতের মালিক।
সব রিলিজিয়নই এই এক কথা প্রচার করে আসছে। অথচ কোন রিলিজিয়নই একবার ভেবে দেখে
না, যদি সেই কথাই ধ্রুব
সত্য হয়,
তবে সেই
জগতের মালিকের অধীনে এত ভিন্ন রকমের অন্যান্য রিলিজিয়নের আমদানী হয় কি করে? যে ভিন্নতার ভিতরে এত
রকমের বিশ্বাস অবিশ্বাস আচার আরাধনা জীবনশৈলীর এমন গভীর পার্থক্য।
আসলে কোন রিলিজিয়নই স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে
শেখায় না। উল্টে অন্ধভাবে ভক্তি করতে প্রলুব্ধ করে। কোন রিলিজিয়নই যুক্তির
তোয়াক্কা করে না। সব রিলিজিয়নই মানুষের আবেগকে মূলধন করে বেড়ে ওঠে। এবং সেই আবেগকে
মূলধন করেই সব রিলিজনই মানুষের কাছ বশ্যতার দাবি করে। খোঁয়ারে বাঁধা গরুর মতো
মানুষের আবেগ এক একটি রিলিজিয়নের খুঁটিতে এমন শক্ত করে বাঁধা থাকে যে, সেই অধীনতা থেকে
মানুষের মুক্তি নাই। এবং সেই খোঁয়ারে বাঁধা গরুর মতোই রিলিজিয়াস ভাবাবেগে আবদ্ধ
মানুষের কাছে তার রিলিজিয়নের বাইরে আর কোন সত্য তার কাছে প্রত্যক্ষ হয় না। হয় না
বলেই সে অন্য কোন রিলিজিয়ন ও তার অন্ধ ভক্তদেরকে শ্রদ্ধা করতে শেখে না। ভালোবাসতে
সক্ষম হয় না। এইভাবে এক একটি রিলিজিয়ন বিশ্বব্যাপী এক একটি খোঁয়ার তৈরী করে, তাতে মানুষকে পৃথক করে
আটকিয়ে ফেলেছে।
পৃথক করে আটিকিয়ে ফেলার সবচেয়ে বড় ক্ষতি, মানুষের সাথে মানুষের
মিলনের। হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের মিলনের। মনের সাথে মনের মিলনের। একটা সংস্কৃতির সাথে
আরও একটা সংস্কৃতির মিলনের। ফলে এইভাবে এক মিলনহীন ভুবন তৈরী হয়ে উঠছে আমাদের
চারপাশে। মানুষের সাথে মানুষের মিলনের পথে সাম্প্রদায়িক রীতি রেওয়াজ মস্ত বড়ো
পাঁচিল তুলে সুউচ্চ বাধা হয়ে দঁড়িয়ে রয়েছে। যার ভিত দাঁড়িয়ে আছে যুক্তিবোধহীন
ভাবাবেগ ও অন্ধবিশ্বাসের উপরে। এই কারণে প্রতিটি রিলিজনই মানুষের উপরে রিলিজিয়নকে
প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোন রিলিজিয়নই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে না। করলে কোন
রিলিজিয়নই কাল্পনিক ঈশ্বরের মহিমা কীর্তনে হাজার হাজার বছর সময় নষ্ট করতো না। বরং
স্বীকার করতো প্রতিটি ঈশ্বরই মানুষের কল্পনার সৃষ্টি। ফলে কোনভাবেই মানুষের থেকে
শ্রেষ্ঠ নয়। শক্তিশালীও নয়। না, কোন রিলিজিয়নই এই প্রাথমিক সত্যকে স্বীকার করে না।
ফলে সব কয়টি রিলিজিয়নই মানুষের উপরে রিলিজিয়নকে
সত্য ও অভ্রান্ত বলে প্রতিষ্ঠিত করে বসে রয়েছে। সব মানুষই কোন না কোন রিলিজিয়নের
বশীভুত দাসানুদাস। যার সাথে অন্য রিলিজিয়নের দাসানুদাসদের স্বাভাবিক মিলনের কোন
অধিকার নাই। ঠিক এই কারণেই নারী পুরুষের বিবাহের ক্ষেত্রেও রিলিজিয়নগুলি পারস্পরিক
বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ভিন্ন রিলিজিয়নের দাসানুদাসদের ভিতর পারস্পরিক বিবাহ সমাজের
স্বীকৃতি পায় না সহজে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, আইনের সাহায্য নিয়ে সভয়ে পা
ফেলতে হয়।
মানুষের সাথে মানুষের মিলনে প্রধান অন্তরায়
সৃষ্টি করে মুখের ভাষা। কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসায় সেই অন্তরায় কাটিয়ে উঠতে
বিশেষ দেরি হয় না। পরস্পরের ভাষা শিখে নিতে খুব একটা কষ্ট হয় না মানুষের। ভাষার
বাধাটি প্রাকৃতিক। তাই তাকে অতিক্রম করা সহজ।
কিন্তু রিলিজিয়নের বাধাটি কৃত্রিম। তাই তার কঠোর বিধিনিষেধ প্রয়োজনে
মানুষের প্রাণসংহারেও পিছপা হয় না। তাকে কাটিয়ে ওঠা অনেক কঠিন।
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। মানুষ কখনোই একা থাকতে পারে
না। রিলিজিয়ন সমাজ গঠনে বিশেষ ভুমিকা নিয়ে থাকে। এটি ঐতিহাসিক সত্য। মানুষের
দৈনন্দিন জীবনচর্চা সেই রিলিজিয়নকে কেন্দ্র করেই রূপ নিতে থাকে। এইভাবেই এক একটি
অঞ্চলে এক একটি সমাজ সভ্যতা গড়ে উঠেছে। ফলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমাজ ও সভ্যতা
গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক রিলিজিয়নগুলির বিশেষ ভুমিকা রয়েছে। পরবর্তীতে এক একটি
রিলিজিয়ন শক্তিশালী হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতেও পরিণত হয়ে উঠেছে। এবং সাম্রাজ্যের
বিস্তার ঘটিয়েছে। এটাই মানব সভ্যতার ইতিহাস। রিলিজিয়নের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হয়ে
ওঠার সাথে রাজনীতির ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে। ফলে রিলিজিয়ন ও রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক
হয়ে উঠে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি করে পরনির্ভর করে তুলেছে। মানুষ রিলিজিয়নের দাস
ছিলই। দিনে দিনে রাজনীতিরও দাস হয়ে পড়েছে। এবং রিলিজিয়ন যেমন মানুষকে এক একটি
রিলিজিয়াস খোঁয়ারে বেঁধে রাখে, রাজনীতিও সেই মতো এক একটি রাজনৈতিক ঘরানায় মানুষকে
বিভাজিত করে আটকিয়ে রাখে। এবং সেখানেও মানুষের সাথে মানুষের হৃদয়ের সংযোগ, প্রাণের সংযোগ, বোধের সংযোগে রাজনৈতিক
মতবাদগুলি অটল প্রাচীরের মতো বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
রিলিজিয়ন ও রাজনীতি মানুষকে যেভাবে পরাধীন করে
রাখে, তেমনটি আর কিছুতে হয়
না। অনেকেই বলবেন অর্থনীতির কথা। অবশ্যই অর্থনৈতিক পরাধীনতা মানুষের উপর প্রায়
যমদূতের মতোই চেপে বসে থাকে। অস্বীকার করবার কোন উপায় নাই। কিন্তু মানু্ষ তার
শিক্ষা,
মেধা ও
সামর্থ্যের বলে সেই পরাধীনতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা অন্তত করতে পারে। কিন্তু রিলিজিয়ন
ও রাজনীতি সেই চেষ্টাটাও করতে দিতে রাজি নয়। বিশেষ করে রিলিজিয়ন। তার দোর্দণ্ড
প্রতাপ এমনই যে,
সে
ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে মানু্ষের ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে বসে থাকে। সাম্প্রদায়িকতার
শৃঙ্খলে মানুষকে আটকিয়ে রাখে। এবং মানুষের কাছে অন্ধ আনুগত্য দাবি করে থাকে। যেখানে
যুক্তির বদলে ভক্তিই শেষ কথা। আর ভক্তির আড়লে আড়ালে প্রচ্ছন্ন থাকে ভয়। যে কোন
রিলিজিয়াস ব্যক্তির ভক্তির অন্দরমহলে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, সেই ভক্তির ভিত দাঁড়িয়ে
রয়েছে মজবুত ভয়ের উপরে।
রিলিজিয়নের কাজই তাই মানুষের অবচেতনে যেভাবেই হোক ভয়ের চাষ করানো। প্রতিটি রিলিজিয়নের
ইতিহাস ও বর্তমান পর্যবেক্ষণ করলেই এই সারসত্যটি উঠে আসে।
মানুষের ভিতরে শিক্ষার চেতনা বিকাশের পথ ধরে
জ্ঞানের আলোর বিস্তারের সাথে সাথে, মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে। যে মানু্ষ যত বেশি প্রশ্ন
করতে সক্ষম হয়,
সেই মানুষ
তত বেশি স্বাধীনতা উদযাপন করতে পারে। কিন্তু রিলিজিয়ন মানুষের প্রশ্ন করার
স্বাধীনতাই হরণ করে বসে থাকে। তাই কোন রিলিজিয়নই প্রকৃত শিক্ষার আলো বিস্তার করতে
দিতে রাজি নয় কখনোই। কারণ রিলিজিন মাত্রেই ওয়াকিবহাল যে, মানুষের ভিতরে শিক্ষার আলো যত
বেশি ছড়িয়ে পড়বে, মানুষকে
রিলিজিয়নের খোঁয়ারে বেঁধে রাখা তত শক্ত কাজ হয়ে উঠবে। এবং একদিন অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এই কারণেই রিলিজয়ন ঈশ্বরকে খাড়া করে মানুষের ভিতরে ঈশ্বরভক্তির বীজ বপন করে তাকে
প্রকৃত শিক্ষার আলোক থেকে দূরবর্তী করে রাখতে চেষ্টা করে সব সময়। ফলে সব
রিলিজিয়নেরই মূল লক্ষ্য এক। মানুষকে শিক্ষার আলো থেকে যথাসম্ভব বঞ্চিত করে রাখা।
আর সেই কারণেই ঈশ্বরের আমদানী। 'ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন' বিশ্বাস করিয়ে দিতে
পারলেই,
মানুষ আর
কোন প্রশ্ন করতে শুরু করবে না। তাই মানুষকে অধিকতর অজ্ঞ করে রাখতে পারাতেই
রিলিজিয়নের সার্থকতা ও সাফল্য। রাজনীতি যার ক্ষীরটা অধিগ্রহণ করে।
ফলে মানুষকে আজকেও ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে হবে।
বিশ্বাস করতে হবে, তার
সম্প্রদায়ই জগতে শ্রেষ্ঠ। তার ঈশ্বরই এই জগতের মালিক। এবং সব কিছুই তাঁরই সৃষ্টি।
এবং অন্য সকল সম্প্রদায়ই বিধর্মী। নিকৃষ্ট অতয়েব পরিত্যাজ্য। তাদের ঈশ্বর
কাল্পনিক। তাদের জীবনশৈলী অনুকরণ যোগ্য নয়। তাদের সাথে কোনভাবেই মিলন সম্ভব নয়।
এবং যতদূর সম্ভব অন্য সম্প্রদায়কে অবদমিত করে রাখার ভিতর দিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের
শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হবে। এই শ্রেষ্ঠত্বই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চার চালিকা শক্তি
ও প্রাণভোমরা।
২রা মার্চ’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র
কর্তৃক সংরক্ষিত

