প্রাশাসনের দায় প্রশাসনের
দায়িত্ব
শেষ খবর
পাওয়া পর্য্যন্ত ভারতে করোনা আক্রান্ত রুগীর সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে।
মৃত্যু হয়েছে নিরানব্বই জনের। বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর পরিস্থিতির ভয়াবহতার দিকে
লক্ষ্য রাখলে ভারতের পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। প্রথমে চীন, তার পর ইতালী ও
স্পেন এবং সর্বশেষ আমেরিকায় করোনা সংক্রমণের ধারাবাহিকতার দিকে লক্ষ্য রাখলেই
বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে। চীন বাদে উল্লেখিত প্রতিটি দেশেই প্রাথমিক
পর্বে সেই দেশগুলির প্রশাসন পরিস্থিতির ভয়াবহতা কোন অভিমুখে এগোতে পারে সে বিষয়টি
আদৌ অনুমান করতে পারেনি। বুঝতে পারেনি, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঠিক কি কি করণীয়। তার ফলে
উদ্ভুত পরিস্থিতি বস্তুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। আর পরিস্থিতির উপর এই
নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়ে প্রতিটি দেশই ঠিক সেই ভুলটি করেছে, যে ভুলটি করা সবচেয়ে
মারাত্মক কাণ্ড হয়ে দেখা দিয়েছে। চীনে করোনা সংক্রমণের একেবারে প্রথম পর্যায় বাকি
কোন দেশই পরিস্থিতির ভয়াবহতা টের পায়নি। সেটা স্বাভাবিক বলে ধরে নিলেও, একথা বুঝতে অসুবিধা
হওয়ার কথা নয় যে বিশ্বব্যাপী করনো সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রধান অনুঘটকই হল
আন্তর্জাতিক বিমান পরিসেবা। একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই আন্তর্জাতিক বিমান পরিসেবা
বন্ধ করে দিলেই,
বহু
দেশই এই বিপর্যয় থেকে প্রাথমিক ভাবে রক্ষা পেত। প্রাথমিক ভাবে বলার কারণ এই যে, দেশের সব বিমানবন্দর
বন্ধ করে দিলেও যে করোনা সংক্রমিত মানুষ অন্য কোন পথে দেশে প্রবেশ করতে পারতো না, তা নয়। ফলে
আন্তর্জাতিক বিমান পরিসেবা বন্ধের সাথেই দেশের সব নৌ ও স্থল বন্দরও বন্ধ করা দরকার
ছিল। দরকার ছিল আন্তর্জাতিক সীমান সীল করে দেওয়া। একেবারে প্রথম দিকে এই
ব্যবস্থাগুলি সঠিক ভাবে গ্রহণ করলে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে
রাখা যেত।
না ইউরোপ
আমেরিকা সহ বিশ্বের প্রায় কোন দেশই এই পথে হাঁটে নি। ফলে করোনা সংক্রমণ দ্রুত থেক
দ্রুততর বেগে ছড়িয়ে পড়েছে এক দেশ থেকে আর এক দেশে। ইউরোপে ইতালী স্পেন ফ্রান্সের
পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশের মত জনবহূল এবং অপ্রতুল
স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দেশগুলির প্রশাসন যদি একে বারে প্রথমেই বাকি বিশ্ব থেকে নিজ
নিজ দেশকে আইসোলেট করে নিতে পারতো, তবে আশা করাই যায়, পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না।
এবার
একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক করোনা সংক্রান্ত একেবারে প্রাথমিক ঘটনা প্রবাহের দিকে।
২০১৯এর একেবারে শেষদিন ৩১শে ডিসেম্বর বিশ্বস্বাস্থ সংস্থা হু’র চীনের শাখায় প্রথম নিমুনিয়া সংক্রান্ত ঘটনার
কথা জানা যায়। সেই দিন থেকে জানুয়ারীর ৩ তারিখ অব্দি চীনে মোট ৪৪জনের সংক্রমণের
খবর পায় বিশ্বস্বাস্থ সংস্থা হু। জানুয়ারীর সাত তারিখে চীন প্রথম নতুন ধরণের এই
করোনা ভাইরাসের হদিশ পায়। এবং এই মাসেরই ১২ই জানুয়ারী চীন এই নতুন ধরণের করোনা
ভাইরাসের জেনেটিক তথ্য বিশ্বের কাছে হাজির করে। যাতে এই নিয়ে গবেষণা শুরু হতে
পারে। কিভাবে মোকাবিলা করা যাবে করোনাকে। ১৩ই জানুয়ারী থাইল্যাণ্ডে এবং ১৫ই
জানুয়ারী জাপানে প্রথম করোনা আক্রান্তের হদিশ মেলে। এবং জানা যায়, এই দুই ক্ষেত্রেই
সংক্রমণ চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকেই ছড়িয়েছে। অর্থাৎ উহান থেকে আগত বিমান
যাত্রীর মাধ্যমেই এই দুইদেশে করোনার প্রবেশ ঘটে। এরপরেই দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনা
আক্রান্তের হদিশ মেলে। এবং এই সব কয়টি ক্ষেত্রেই সরাসরি চীন থেকে আগত বিমান
যাত্রীর মাধ্যমই অনুঘটকের কাজ করে।
২৪শে
জানুয়ারী বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তাদের ওয়েবসাইটে এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক উড়ান
সংক্রান্ত একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। “Updated WHO advice for
international traffic in relation to the outbreak of the novel coronavirus
2019-nCoV” তথ্যসূত্র
এরপর
৩০শে জানুয়ারী বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান করোনা সংক্রমণকে পাবলিক হেল্থ
এমার্জেন্সী অফ ইনটারন্যাশানাল কনসার্ন হিসাবে ঘোষণা করেন। The
Director-General declared that the outbreak of 2019-nCoV constitutes a PHEIC
and accepted the Committee’s advice and issued this advice as Temporary
Recommendations under the IHR. তথ্য়সূত্র
এবং
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ঠিক এই দিনের রিপোর্টেই ভারতে প্রথম করোনা আক্রান্তের খবর
প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ভারতীয় প্রশাসন জানুয়ারীর শেষেই উদ্ভুত পরিস্থিতিতে করোনার
সংক্রমণের ভয়াবহতার বিষয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রচারিত সতর্কবাণীর বিষয়ে
ওয়াকিবহাল ছিল। তারা জানতো বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে পাবলিক হেল্থ অফ
ইনটারন্যাশানাল কনসার্ন হিসাবে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার গুরুত্ব সাধারণ জনতার কাছে
স্পস্ট নাও হতে পারে। কিন্তু একটি দেশের প্রশাসনের কাছে নির্বাচিত সরকারের কাছে
স্পষ্ট হবে না,
সেটা
ভাবাই যায় না। ফলে আমাদের ধরেই নিতে হবে সরকার ও তার প্রশাসন জানুয়রীর শেষেই
করোনার ভয়াবহতার বিষয়ে সম্যক ওয়াকিবহাল ছিল।
ফেব্রুয়ারী
১১ ও ১২ তারিখে জেনেভার সদর দপ্তরে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা আয়োজিত বিশ্বসম্মেলনে বিশ্বের
প্রায় চারশ জন বিজ্ঞানী যোগ দেন করোনা উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলার পথ খুঁজতে। ১৫ই
ফেব্রুয়ারী বিশ্বস্বাস্থ সংস্থার অধিকর্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করে
বলেন, “…. we must be guided
by solidarity, not stigma. I repeat this: we must be guided by solidarity, not
stigma. The greatest enemy we face is not the virus itself; it’s the stigma
that turns us against each other. We must stop stigma and hate!” তথ্যসূত্র
এবং এই
বিষয়ে আমরা পরবর্তীতে আবার ফিরে আসবো আলোচনা প্রসঙ্গে।
১৭ই
ফেব্রুয়ারী বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সবাধান করে দেওয়া হয় এই বলে যে, “It is
WHO’s view that all countries with community transmission should seriously
consider postponing or reducing mass gatherings that bring people together and
have the potential to amplify disease and support the recommended best practice
of physical distancing. Any decision will be supported through the use of WHO
tools, in particular the Risk Assessment for Mass Gatherings during COVID-19.” তথ্যসূত্র
অনেকেই
মনে করতে পারেন,
এই
সময়ে ভারতে করোনা সংক্রমণ সামাজিক সংক্রমণের স্তরে পৌঁছিয়ে ছিল না। তাদের বোঝা
উচিত, ছিল না বলেই তো
ভারতের পক্ষে অনেক বেশি সুবিধেজনক অবস্থান ছিল সরকারের প্রশাসন থেকে এই সময়ে
অনির্দিষ্ট কালের জন্য সব ধরণের সমাজিক ধর্মীয় রাজনৈতিক জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা
জারি করা। এবং সেই সাথেই সামজিক দূরত্বের বিষয়টির উপরে চুরান্ত গুরুত্ব দেওয়া।
২৬শে
ফেব্রুয়ারী বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অধিকর্তা প্রেস বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীন ভাবে
জানান,
“At
the same time, all countries, whether they have cases or not, must prepare for
a potential pandemic.” তথ্যসূত্র
অর্থাৎ
জানুয়ারীর শেষে করোনাকে পাবলিক হেল্থ এমার্জেন্সি অফ ইনটারন্যাশানাল কনসার্ন
ঘোষাণার পর ফেব্রুয়ারীর শেষেই করোনাকে বিশ্বব্যাপী মহামারী বলেই কার্যত সাবধান করে
দেওয়া হয়েছিল। আমাদের প্রশাসন তখন ট্রাম্প সাহেবকে নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের রাজনীতি
তখন প্রশাসনকে কব্জা করে দিল্লীতে দাঙ্গা লাগাতে ব্যস্ত। এবং আমাদের সকল
বিমানবন্দর নৌ ও স্থলবন্দর যথারীতি খোলা। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক উড়ানে করোনা
আক্রান্ত যাত্রীর অবাধ প্রবেশ ঘটছে দেশ জুড়ে। প্রশাসন নির্বিকার। আমাদের বিদেশ
দপ্তরে প্রতিদিন বিভিন্ন দেশের ভারতীয় দুতাবাস থেকে করোনা সংক্রান্ত খবর এসে
পৌঁছাচ্ছে। সেখবর আমরা জানতে পারি আর না পারি্ প্রশাসন কিন্তু জানতে পারছিল ইতালী
স্পেন ও ফ্রান্সে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এই সময় হঠাৎ করে কেমন হু হু করে বৃদ্ধি
পাচ্ছিল। আর এই সব দেশ থেকেই প্রতিদিন শত শত যাত্রী আবাধে প্রবেশ করছিল সারাদেশে।
আমাদের দৃষ্টি তখন মহামতী ট্রাম্পের ভারত ভ্রমণের নিবদ্ধ। আমাদের উদ্যোম তখন
সাম্প্রাদায়িক বিদ্বেষচর্চায় নিয়জিত। দাঙ্গা বিদ্ধস্ত দিল্লী, সাম্প্রদায়িক শক্তির
শয়তানিতে অগ্নিদগ্ধ।
মার্চের
৪ তারিখে ভারত সহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলির জন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে এক
বিশেষ সতর্কবার্তায় সবরকমের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। তথ্যসূত্র
এইদিনই
সংস্থার অধিকর্তা তাঁর প্রেস বিবৃতিতে প্রতিটি দেশের প্রশাসনের উদ্দেশে বলেন, “Our
message to all countries is: this is not a one-way street. We can push this
virus back. Your actions now will determine the course of the outbreak in your
country. This must be a top priority for every country. We are concerned that
in some countries, the level of political will does not match the level of the
threat we face.”
লক্ষ্মণীয়, এরপরেও সারাদেশে
আন্তর্জাতিক উড়ান বন্ধ করা হয়নি। যখন দেশ শুদ্ধ মানুষ জানতে পেরে গিয়েছে, ইউরোপ আগত যাত্রীদের
মাধ্যমেই এদেশে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতহারে। সরকার তখনও নিশ্চুপ।
প্রতিদিন শতশত বিমান যাত্রী প্রবেশ করছে ভারতে। পাসপোর্ট ভিসা দেখিয়েই। এইখানে আরও
একটি বিষয় পরিস্কার বুঝে নেওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক উড়ানে দেশে প্রবেশ করা
যাত্রীদের ভিতর যাদেরকে হোম কোয়ারিন্টিনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, তাদের মাধ্যমেই
করোনা সংক্রমণ বেশি ঘটে। কারণ খুব সহজ। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি হোম কোয়ারিন্টিনে
থাকলেও তার থেকে তার নিজের বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সংক্রমিত হওয়া আটকানোর কোন
ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা যথারীতি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা
নির্বাহ করার ভিতর দিয়েই করোনা সংক্রমণকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই সামাজিক স্তরে
প্রসারিত করে দিয়েছেন। বিশেষত ভারতের মতো এমন জনবহুল দেশে সেটি আরও দ্রুত ছড়িয়ে
পড়েছে। গোটা ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাসব্যাপী। অর্থাৎ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার যাবতীয়
সতর্কবাণী উপেক্ষা করেই সরকার ও তার প্রশাসন দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণকে নিশ্চিত
করেছেন।
১১ই
মার্চের প্রেস বিবৃতিতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান করোনাকে প্যানডেমিক ঘোষণা
করেন। “WHO has been assessing this outbreak around the clock
and we are deeply concerned both by the alarming levels of spread and severity,
and by the alarming levels of inaction. We have therefore made the assessment
that COVID-19 can be characterized as a pandemic.” তথ্যসূত্র
এরপর ১৩ই
মার্চ। যেদিন দিল্লীতে তাবলিগী জামাতের সেই সভা। যে সভা নিয়ে বর্তমানে গোটা দেশ
উত্তাল। খবরে প্রকাশ এই জমায়েতে ইরানসহ নানান দেশ থেকে প্রচুর মুসলিম এদেশে প্রবেশ
করেন। কিন্তু তারা বৈধ পাসপোর্ট ও ভারত সরকারের প্রদত্ত ভিসাতেই এদেশে প্রবেশ
করেন। এখানে স্মরণে রাখা দরকার, এর প্রায় একমাস আগেই ১৭ই ফেব্রুয়ারীতে বিশ্বস্বাস্থ্য
সংস্থার প্রেস বিবৃতিতে সমাজিক জমায়েত থেকে সমাজিক সংক্রমণের বিষয়ে আগাম সতর্কতা
জারি করে দেওয়া হয়েছিল। যে কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। সরকার ও প্রশাসন তারপরেও বিদেশ থেকে এদেশে
প্রবেশের উপর কোন রকম নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। বন্ধ করেনি আন্তর্জাতিক বিমান
পরিসেবা। ধর্মীয় ও সমাজিক জমায়েতের উপরেও কোনরকম নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় নি। হলে দিল্লীতে
১৩ই মার্চের ধর্মীয় সমাবেশ সংঘঠিত হতেই পারতো না। ফলে প্রশাসনের ছাড়পত্রসহ সরকারী
মদতেই দিল্লীর এই ধর্মীয় জমায়েত সংঘটিত হয়।
এরই সাথে
খবরে প্রকাশ এই একই দিনে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রক থেকে এই মর্মে জানানো হয় যে
করোনা ভারতে সামাজিক স্তরে এখনো হেল্থ এমার্জেন্সীর বিষয় নয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের
একটি মিটিংএ এই সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের একটি চিঠির উল্লেখ করে এই
বিষয়টি সামনে আনা হয়। এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দুঃখ করে বলেন, সময় মত সাবধান করে
দিলে আরও কিছু আগাম সতর্কতা গ্রহণ করা যেত। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সেই বিষয়ে তখনো যথেষ্টই উদাসীনতার
পরিচয় দিয়েছিল। নিজামুদ্দিনের ঘটনা নিয়ে শোরগোল করা মিডিয়া এই খবরগুলি মানুষের
সামনে তুলে ধরছে কি ঠিকমত?
এবার
আসুন দেখে নেওয়া যাক ঠিক এই ১৩ই মার্চ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে প্রেস বিবৃতিতে
ঠিক কি বলা হয়েছিল। “Any country that looks at the
experience of other countries with large epidemics and thinks “that won’t
happen to us” is making a deadly mistake. It can happen to any country.” তথ্যসূত্র
পাঠক, ঠিক এই দিনের ভিতর
ভারতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮২ জন। মৃত্যু হয়েছিল ২ জনের। কিন্তু আমাদের
সরকার ও প্রশাসন তখনও বিষয়টাকে যথেস্টই হালকা ভাবে গ্রহণ করেছিল হয়তো সত্যই
ভেবেছিল,
ভারতে
করোনা মহামারীর রূপ নেবে না। আমাদের কোন ভয় নাই।
আমরা
সকলেই জানি,
দেশের
সরকারকেও এরপর নড়েচড়ে বসতে হয়। প্রথমে জনতা কার্ফিউ পরে ২৪শে মার্চ রাত ১২টা থেকে
একুশ দিনের লকডাউন ঘোষণ করা ইত্যাদি। কিন্তু এই বিষয়ে সরকার থেকে যা যা করনীয়
সেগুলি কি ঠিক ঠাক করা হয়েছিল? হলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লক্ষ লক্ষ পরিয়ায়ী শ্রমিক
তাদের সাময়িক আস্তানা ছেড়ে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে লকডাউনের ভিতরেই হাজারে হাজারে শত শত
মাইল পায়ে হেঁটে নিজ নিজ রাজ্যে নিজের গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিত কি? সরকার যদি সময় মতো
তাদের প্রতিদিনের খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা করতো তাহলেও কি এরা লাখো লাখো মানুষ শুধু
মাত্র পায়ে হেঁটে শতশত মাইল পারি দেওয়ার কথা ভাবতো? লক্ষ্য করে দেখলে দেখা যাবে এরা
কিন্তু কেউই লকডাউন ঘোষণার পরের দিনেই রাস্তায় নেমে পড়ে নি। দিন কয়েক পরিস্থিতির
দিক নজর রেখে তারপরেই এমন অসীম সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
দিল্লীর আনন্দবিহারে যে লক্ষলক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক সমবেত হয়েছিল, তাদের ভিতর করোনা
সংক্রমণ ছড়ায়নি কে বলতে পারে। এবং ছড়ালে তার ফল এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। ঠিক
ইতালীর মতোই। না আমাদের দেশে এদের নিয়ে কারুর মাথা ব্যাথা নাই। কিন্তু এই ঘটমনায়
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা যে উৎকণ্ঠিত সেটি বোঝা যায় তাদের ৩০শে মার্চের প্রেস
বিজ্ঞপ্তিতেই। সংস্থার ইউরোপ শাখার স্বাস্থ পরিকাঠামো দপ্তরের বিশেষ পরামর্শদাতা
ডঃ সানটিনো সেভেরনি বলেন, “If during this pandemic we leave behind the
most vulnerable, we fail not only them, but all of us. COVID-19 is challenging
us as a community, and we must answer as one,” আরও বলা হয়, “We
strongly emphasize the need for inclusive national public health measures to
ensure migrants and refugees have the same access to services as the resident
population, in a culturally sensitive way.” এবং তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাবে
জানিয়ে দেন,
“Messages should make clear that migrants or refugees do not present
increased COVID-19 risks to countries in comparison to other international
travellers, but they are a more vulnerable group that needs special support –
particularly access to preventive and care services,” তথ্যসূত্র
কিন্তু
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে পরিযায়ী শ্রমিকদের এই দুর্দশার চিত্র বিশেষ গুরুত্ব সহকারে
দেখানো হয় না। এঁদের থেকে সরকারের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সত্যকে আলোকিত করা হয় না। এবং
এঁদের রাস্তায় নেমে আসা যে করোনা সংক্রমণকে এক ভয়াবহ মহামারীর দিকে ঠেলে দিতে পারে, সেই বিষয়টিকে ধামা
চাপা দিতেই দিল্লীর নিজামুদ্দিনের ১৩ই মার্চের জমায়েতের খবরটিকে এক পক্ষকাল পরে
খবরের শিরোনামে তুলে নিয়ে আসা হয়। দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক উষ্মাকে জাগিয়ে তুলে
সরকারী অপদার্থতাকে ঢাকা দেওয়ার জন্যেই। করোনা নিয়ে সমগ্র বিশ্ব যখন আতঙ্কের প্রহর
কাটাচ্ছে,
ভারতবর্ষে
তখনো করোনা নিয়ে সাম্প্রদায়িক তাস খেলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে না, সরকার
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই নিজামুদ্দিনের জমায়েতকে ছাড়পত্র
দিয়েছিল। এবং বিদেশীদের বৈধ ভিসাতেই দেশে ঢোকার অনুমতি দিয়েছিল। সরকার চাইলেই
করোনা মোকাবিলার কারণেই এই ধর্মীয় সভা বন্ধ করে দিতে পারতো। কিন্তু সরকার জানে কোন
কাজের কোন ফসল কখন কিভাবে তুলতে হয়। আমরা আগেই দেখিয়েছি ১৫ই ফেব্রুয়ারী
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা যেকোন সামাজিক জনসমাবেশের বিষয়ে আগাম সতর্কতা জারি করেছিল।
আমাদের সরকারের হাতে প্রায় এক মাস সময় ছিল দিল্লীর এই ধর্মীয় সমাবেশ বন্ধ করার।
কিন্তু সরকার সেপথে হাঁটে নি। মিডিয়া আজ দেশব্যাপী প্রচার করছে বিশেষ এক ধর্মীয়
সমাবেশের কারণেই নাকি এদেশে করোনা সংক্রমণ এমন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এখানেই
ভারতীয় রাজনীতির নোঙর। কারণ বর্তমান সময়ে ভারতবর্ষের রাজনীতির মূল অভিমুখই হলো
সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বিভেদের রাজনীতি। এবং সেই রাজনীতির অভিঘাত এমনই মারাত্মক
যে ভয়াবহ করোনারও এমন শক্তি নাই যে তার থেকে মুক্তি পায়। তাই সারা পৃথিবী কাঁপিয়ে
এসে ভারতে ঢুকে করোনাও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও বিভেদের রাজনীতির নাগপাশে জড়িয়ে
গিয়েছে। যে কথা প্রথমেই উল্লেখ করেছিলাম, সেটি আবারও পুনরুল্লেখ জরুরী এখানে। দেখা যাক ১৫ই
ফেব্রুয়ারী বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অধিকর্তা ঠিক কি বলেছিলেন: “…. we must be guided
by solidarity, not stigma. I repeat this: we must be guided by solidarity, not
stigma. The greatest enemy we face is not the virus itself; it’s the stigma
that turns us against each other. We must stop stigma and hate!” কিন্তু এটা ভারতবর্ষ। এখানে অন্য কোন নিয়ম খাটবে
না। এখানে ভারতীয় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারই বহাল থাকবে। তাতে করোনায় দেশ উজার হয়ে
গেলেও দেশবাসীর কিছু যাবে আসবে না। যারা বেঁচে থাকবে তারা সেই একই বিদ্বেষচর্চার
সংস্কৃতি নিয়েই বেঁচে থাকবে। ও অন্যদের সংক্রমিত করে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
যুগের পর যুগ।
এপ্রিল
৫’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

