বোতাম রহস্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বোতাম রহস্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বোতাম রহস্য




বোতাম রহস্য

শিশু বয়সের কচি কচি আঙুলে কবে যে আমরা জামা প্যাণ্টের বোতাম খুলতে শিখেছি কিংবা লাগাতে, আজ অনেকেরই সে কথা আর স্মৃতিতে ধরা দেয় না। অসমর্থ্য কচি কাঁচা নরম আঙুলে বোতাম খোলা আর লাগানোর রহস্যের সাথে যেদিন প্রথম পরিচয় হয়, সেদিনটি স্মরণে থাকুক আর নাই থাকুক। দিনটা মানুষের জীবনে বড়োদিন। শিশুর বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে এই বোতাম খোলা আর লাগানোর স্কিলও বাড়তে থাকে। শুধু তো খোলা আর লাগানোই নয়। কোথায় খুলতে হবে আর কখন লাগাতে হবে। জানতে হবে সেটিও। দিনে দিনে সমাজ সংসার শিশুর কচি মনে এই খোলা আর লাগানোর সময় ও স্থানের বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা পাকা করে দেয়। এটাই হয়তো বড়ো হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ। শুধু তো বর্ণপরিচয় আর সহজপাঠ হাতে ধরিয়ে দিলেই হবে না। বোতাম খোলা লাগানোর পাঠও দিতে হবে শিশুকে। সেও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। সৌভাগ্যের কথা তার জন্য আমাদের বিদ্যাসাগর রবি ঠাকুরের কাছে দৌড়াতে হয় না। সমাজ সংসার আপন অভিভাবকই যথেষ্ঠ।

এখন বর্ণপরিচয় সহজপাঠের প্রসঙ্গ যখন উঠলোই, তখন স্মৃতি খুব একটা প্রবঞ্চনা না করলে অনেকেই স্বীকার করবেন, সেও এক বোতাম খোলার পর্ব। শুধুই যে অক্ষরে বর্ণে হাতেখড়ি, তাইতো নয়। কল্পরাজ্যেরও একটা বোতাম খোলার পথ করে দিয়ে গিয়েছিলেন এই দুই মনীষী। সাথে ঠাকুরমার ঝুলি পৌরাণিক মহাকাব্যের হাত ধরে শিশুর কল্পরাজ্যের বোতাম খুলতে থাকে ক্রমশই। এরপর স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনটি। মায়ের কোল থেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে স্থানান্তরে অনেক শিশুই নিমরাজি থাকে। কিন্তু থাকলে কি হবে। সেও এক বোতাম খোলার পর্ব। দিনে দিনে শিশুও অভ্যস্থ হয়ে যায়। নতুন পরিবেশে নতুন সিস্টেমে।

এই যে নানান রকম সিস্টেমের ভিতর দিয়ে যাওয়া আসার পথেই বেড়ে উঠতে থাকি আমরা, এই সিস্টেমই কিন্তু এরপর দখল নিয়ে নেয় আমাদের। দিনে দিনে অভিভাবকদের ভুমিকা গৌণ হতে শুরু করে। অন্তত চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগেও সেই রকমই ছিল অবস্থাটি। ইদানিং অবশ্য এক সংসার এক কি দুই সন্তান সিস্টেমে অভিভাবকদের ভুমিকা অত শীঘ্র গৌণ হয়ে যায় না। আগেকার মতোন। ফলে একদিকে সিস্টেম অন্যদিকে অভিভাবক। এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে দ্রুতই একের পর এক বোতাম খোলায় হাত পেকে ওঠে বালক বালিকা কিশোর কিশোরীদের। তোমাকে যে নোট জোগাড় করে দিয়েছি, পুরো মুখস্থ করে নাও। কিন্তু ভুলেও সেই নোটের বোতাম খুলবে না কিন্তু বন্ধুদের সামনে। তাহলে সে’ই তোমাকে টপকে স্ট্যাণ্ড করে যাবে বাবা। আমার সব পরিশ্রম জলে যাবে। সত্যিই তো, বাবা মায়ের এত কষ্টের স্বপ্নে যে জল ঢালা যাবে না, সে কথা বুঝতে আর অসুবিধা হয় না সন্তানের। সেও সময় মতো জায়গা মতোন নোটের বোতাম খোলে আর বন্ধ করে ফেলে।

কিন্তু এরপরেও অনেক গুলো নানান ধরণের বোতাম খোলার বিদ্যা যে পুত্র কন্যারা কখন কিভাবে আয়ত্ত করে ফেলে, অভিভাবকদের সাধ্য থাকে না সে বিষয়ে জানার। বালক বালিকা কিশোর কিশোরীরা অভিভাবকের চোখের সামনে থেকেও আড়ালে থাকার বোতামটা খুলতে শিখে যায় এই সময়েই। ঠিক তখনই নিজে থেকেই  আরও একটা বোতাম লাগিয়ে দেয় তারা। অভিভাবক ও সন্তানের ভিতর সরাসরি সংযোগের হাইওয়েতে। তৈরী হয়ে ওঠে একটা জেনারেশন গ্যাপের। যার শুরু হয় এই একটা দিকে বোতাম খুলতে গিয়ে আর একটা দিকে বোতাম লাগানোর ফলেই। সবচেয়ে মজার কথা, যাদের কোলে চড়ে আমাদের প্রথম বোতাম খোলা লাগানোয় হাতেখড়ি হয়, তাদের সাথে জেনারেশন গ্যাপের বোতামটা আমরাই লাগিয়ে দিই। আরও মজার কথা সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে বেমালুম ভুলে যাই সেই ইতিহাসও। তাই সম্তানের কাছ থেকে আসা প্রথম আঘাতে আমরা যারপরনাই বিদ্ধস্ত বিপর্য্যস্ত হই ভিতের ভিতরে।

এইভাবেই বাবা মায়ের কোলে চড়া অবস্থা থেকে ক্রমান্বয়ে আমদের বোতাম খোলা আর লাগানোর পর্ব চলতে চলতে একদিন প্রেমের বোতাম খোলার সময় এসে যায়। প্রেমের বোতাম আবার খুললেই তো হলো না। সেই সাথে শরীরের বোতামও খোলাতে হয় পরস্পরের তবেই না প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা। কিন্তু এই পর্বটা সকলেরই সমান যায় না। ঠিক ঠাক বোতাম খোলা ও খোলানোর খেলার সবটাই তো আর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই খোলার এই পর্বে যখন তখন বোতাম লাগিয়ে দিয়ে দিক বদলের হাওয়াও মাপতে হয় সময়ে অসময়ে। বোতাম লাগানোর সেই পর্বে নিয়ন্ত্রণ স্বহস্তে থাকলে অসুবিধা হয় না। অসুবিধা হয়, নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে থাকলেই। মনের ঘরে তখন চোখে অন্ধকার নেমে আসার কথা। আর আসেও অধিকাংশ সময়ে। গোটা বিশ্বই যেন যৌবনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে মনে হয়। হতে পারে। যদি না হঠাৎ কেউ বুকের বোতাম খুলে পাশে এসে দাঁড়ায়। এই পর্বটাই আমাদের জীবনে ক্রিটিক্যাল পর্ব। যত তাড়াতাড়ি পেড়িয়ে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল।

সংসারের বোতাম খুলে ঢুকে পড়লেই আবার প্রেম ভালোবাসা আদরের মুখে আগুন। উদয়াস্ত সংসারের জোয়াল টানতে টানতে কখন যে একে একে খোলা বোতামগুলি আঁট হয়ে আটকিয়ে যেতে থাকে প্রথম প্রথম ঠাওর হয় না তত। যখন হয়, তখন জানলা দিয়ে বৌ পালানোর মতো দশা হতেই পারে। বলা যায় না কিছুই। সুখের কথা এই সম্ভাবনার বিষয়ে নারীকুল একটু বেশি মাত্রায় সচেতন থাকেন। জীবধর্মের তাগিদেই হয়তো। তাই আগে থেকেই সমূহ সর্বনাশের পথগুলোতে নানার রকম বোতাম লাগানোর বিষয়ে তাদের পারদর্শীতা প্রশ্নাতীত। বিশেষ করে নারী স্বাধীনতার এই যুগে। বহুবিবাহের যুগ আর নাই। বাগান বাড়ির সংস্কৃতি বজায় রাখার সামর্থ্য রাজনৈতিক নেতা অভিনেতা ছাড়া বিশেষ কারুর থাকেও না আজকাল। ফলে ফাঁপড়ে পড়তে হয় হরিপদ কেরানীকুলের। তাদের ভাগ্যে আর নতুন কোন বোতাম খোলার হদিশ পাওয়া শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। তাই বন্ধ বোতামের মাঝে হাঁসফাঁস করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠে মন।

যদিও বা কারুর ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার মতো মনের বোতাম খোলার সুযোগও আসে, তবে গৃহদাহ অবধারিত। ফলে গৃহশান্তির আশায় ভদ্রলোকের এক কথা। এক প্রেম। এক বিবাহ। এক নারী। আঙুর ফল টকের গল্প নয়। জ্ঞানবৃক্ষের ফল একবার খাওয়াই ভালো। বেশি লোভে হজমের গণ্ডগোল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অনেকেই হয়তো ভাবছেন বড্ড একপেশে ভাবনা। সেই পিতৃতন্ত্রের স্কুলে পাঠ নেওয়া শিক্ষায়। না। বোতাম খোলার স্বাধীনতা পুরুষের যত বেশি, সত্যিই নারীর ততটা নয়। এই সমাজ এই সংসার প্রথম থেকেই মেয়েদের সংস্কারের বন্ধ বোতামে সামজিক বিধি বিধানের নানান রকম তালাচাবি লাগিয়ে দেয়। সেই বোতাম খোলার সাহস সামর্থ্য ও সুযোগ মেয়েদের জীবনে সত্যই খুব কমই আসে। এমনকি আসলেও তাকে সাদরে বরণ করার মতো প্রশস্ত দিগন্ত উন্মুক্ত থাকে না আমাদের দেশাচারে। লোকাচারে। তাই অনেক সাবধানে সেই বোতাম খোলার জন্য হাত বাড়াতে হয় মেয়েদের। অনেকের পক্ষেই প্রাণ হাঁকুপাঁকু করলেও সাধ্য থাকে না। সেই পথে পা বাড়ানোর।

সমাজ আমাদের সকলেরই চারিদিকে অনেকগুলি বোতাম লাগিয়ে রেখে দেয়। সেটাই সামাজিক দস্তুর। বিশেষ করে ধর্মের দোহাই। ঐতিহ্যের দোহাই। সংস্কারের দোহাই দিয়ে। আমরা সাধারণ মানুষ সেই সব বোতামগুলি খোলার কথা ভাবতেই পারি না। এর সাথে আবার যখন হাত মেলায় রাজনীতি। সে এক সমূহ সর্বনাশ। ধর্মের বোতাম। সম্প্রদায়ের বোতাম। জাতের বোতাম। খোলা বারণ। খুললেই রে রে করে তেড়ে আসবে সমাজরক্ষক থেকে ধর্মরক্ষকের দল। তারপর গণতন্ত্রের বোতাম। যাকেই নির্বাচিত করো। তুমি যে তিমিরে। সেই তিমিরেই থাকলে পড়ে। নতুন কোন বিকল্প পথের বোতাম খোলার উপায় নাই গণতন্ত্রের ফানুসে। খুলতে গেলেই তুমি সমাজবিরোধী। দেশদ্রোহী। আরও কত রকমের উপাধি! কার সাধ্য সে বোতাম খোলে। গণতন্ত্রের বদ্ধ ময়দানে গোটা দেশটা লুঠ হয়ে যেতে দেখেও কিচ্ছুটি করার উপায় নাই। হয় রাম না হয় রহিম। হয় ডান না হয় বাম। লুটের হাতে থেকে দেশকে রক্ষা করার উপায় বন্ধ।

না শুধু সেখানেই যে তালাচাবি দেওয়া আছে তাই নয়। তালাচাবি দেওয়া আছে আমাদের চেতনার বোতামেও। সেই বোতামও খোলা বারণ। সংবিধানের রক্ষকরা যেমনটি বলবেন। যেভাবে বলবেন। তেমনটি করে যেতে হবে শুধু সংবিধান মাথায় রেখে। তাতে বদ্ধ চেতনার ভিতরে দগদগে ঘা হয়ে গেলেও, চেতনার বোতাম খোলা যাবে না কখনো। কোনভাবেই। এটিই সুমহান ভারতীয় ঐতিহ্য। চেতনার বোতাম খুলতে শিখো না বন্ধু। ওটা খুলে ফেললেই আর গড্ডালিকায় গা ভাসাতে পারবে না। সারা গায়ে ফোস্কা নিয়ে দগ্ধ হতে থাকবে জীবনভর। তোমার সামনে দিয়ে বাড়ি গাড়ী হাঁকিয়ে নেবে তোমারই বন্ধু পরিজন। তোমাকে আঙুল চুষতে হবে গাছ তলায় বসে। কিংবা সরকারী আতিথ্যে গারদের ওপারে। সেই আঙুল তখন আর কচিটি নাই। সেই প্রথম বোতাম খোলার দিনের মতো মাতৃক্রোড়ে বসে। দেশমাতৃকার কোলে তুমি তখন সমাজচ্যুত তোমার ঐ ধেড়ে আঙুলে। যে আঙুলকে গড্ডালিকা প্রবাহে বেঁধে রাখতে পারো নি। সময় মতো। বাকি সকলের মতো। বেকুবের মতো চেতনার বোতাম খুলে ফেলেছিলে অজায়গায়। অসময়ে। অসম্ভবের প্রয়াসে।

৩রা জুলাই’ ২০২০

কপিরাইর শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত