রাজ্যবাসীর ভাগ্য রাজ্যবাসীর
হাতেই
না। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। একথা বলে আর লাভ কি? কই? কোথাকার বিশ্বাস কোথায় গিয়ে ঠেকল শেষে? অসুরনাশিনী যে করোনানাশিনী হয়ে উঠতেও পারেন, সেকথা স্বয়ং মহামান্য আদালতও বিশ্বাস করতে পারলেন না। অবশ্য আদালতের কথাই যখন উঠল। তখন বিশ্বাসের জোর দেখা গিয়েছিল গত নভেম্বরেই। মানুষের বিশ্বাসকে শিরোধার্য্য করতে দেখা গিয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতকেই। যাবতীয় প্রমাণ, বিজ্ঞান যুক্তি এবং ইতিহাস খারিজ হয়ে গিয়েছিল সেই বিশ্বাসের কাছে। বিশ্বাসের জোর এতই। বিশ্বাসের উপরে ভর করে আধুনিক বিশ্বে প্রথম রায় দান করা হয়েছিল এই তো গত নভেম্বরেই। বাবরি মসজিদের তলায় রামমন্দিরের অস্তিত্বের প্রমাণ না মিললেও, বিশ্বাসের অস্তিত্ব যে ছিল সেকথা অনস্বীকার্য। আদালত সেই বিশ্বাসকেই ঐতিহাসিক শীলমোহর দান করেছিল। কিন্তু এবার অন্যকথা। এবারের প্রশ্ন কাল্পনিক চরিত্রের ব্যক্তিগত জন্মভুমিকে কেন্দ্র করে নয়। এবারে একেবারে জীবন্ত মানুষের জীবন মরণের প্রশ্ন। সরাসরি। হয় যুক্তি, বিজ্ঞান, বিচার বিশ্লেষণ, বুদ্ধি বিবেচনা। নয় মৃত্যু। সাক্ষাৎ মরণ। ফলে আদালত আর যাই হোক দুর্গতিনাশিনী মাদুর্গার উপরে আর বিশ্বাস করতে পারেন নি। তাই মণ্ডপে প্রবেশ বন্ধ। মায়ের দর্শন অগত্যা বাড়িতে টিভির পর্দায় সারতে হবে। কিংবা রাস্তা থেকে মণ্ডপের কাঠামো দেখেই বিদায় নিতে হবে দর্শনার্থীকে, পাঁচ দশ মিটার দুরত্বের ব্যবধানে। অসুরনাশিনী দুর্গতিনাশিনী আর যাই হোক ২০২০’তে এসে করোনানাশিনী হয়ে উঠবেন এমন বিশ্বাস আর মানুষের ভিতরে নাই। তাই আদালতকেও সেই কথা মেনে নিতে হয়েছে। কারণ আদালত এখন মানুষের বিশ্বাসের উপরেই জোর দিচ্ছেন বেশি করে। মানুষের বিশ্বাস অসুরনাশিনী কবে কি করেছিলেন ভেবে আর লাভ নাই। তিনি মণ্ডপসজ্জা বৃদ্ধি করতে পারলেও করোনানাশিনী যে হয়ে উঠতে পারবেন না, সেকথা জেনে গিয়েছে মানুষ। সেই কারণেই এবারের বর্ষায় করোনার থাবায় হু হু করে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলেও মাদুর্গার কোন ভক্তকেই অকালে অকালবোধন করতে দেখাও যায় নি।
ভক্তজন হয়তো বলবেন, অসুরদের খালি
চোখে দেখা যায়। তাই মাদুর্গা তাদের নাশ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ভক্তজনেরা বলবেন না,
দেশের সম্পদ বাইরে বেচে দেওয়া অসুরদেরকেও কি মাদুর্গা খালি চোখে দেখতে পান না? কোটি
কোটি পরিযায়ী শ্রমিকদের দিনের পর দিন শত শত মাইল পথ হাঁটানো অসুরদের শ্রীমুখও কি মাদুর্গার
চোখে ধরা পড়েনি? না, নাও পড়তে পারে। মাদুর্গার বয়সের কথাটিও তো বিচার করে দেখতে হবে।
এই বয়সে চোখে ছানি পড়তেই পারে। তাই হয়তো দিল্লী কিংবা তেলেনিপাড়া। দাঙ্গাবাজদের পতাকার
রঙও মাদূর্গার চোখে অধরাই রয়ে গিয়েছিল। না, তাই বলে আমরা একথাও বলবো না নিশ্চয় মাদুর্গা
দলবদল করে অসুরদের শিবিরেই নাম লিখিয়েছেন সাম্প্রতিক দশকে। মানুষের বিশ্বাস অতটা নীচে
নামবে না আশা করা যায়। যাই হোক বর্তমান ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর রাখলে একথা বুঝতে অসুবিধা
হয় না, মাদুর্গার আর সেদিন নাই। তিনি না পারছেন অসুরদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে,
না পারছেন মাইক্রোস্ককোপে চোখ রেখে করনানাশিনী হয়ে উঠতে। অসুর হোক কি করোনা। যা করবার
করতে হবে সেই মানুষকেই। মাদুর্গার উপরে ভরসা করে বসে থাকার উপায় নাই আর। যেভাবেই হোক
মানুষ এটা জেনে গিয়েছে। আর সেই কারণেই পথে মানুষের ঢল নামেনি। মণ্ডপে মণ্ডপে ব্যারিকেড
ভেঙ্গে ঢোকার প্রয়াসে জনতা পুলিশে খণ্ডযুদ্ধও বাধে নি। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলিও এই সুযোগটাকে
কাজে লাগিয়ে মানুষ খেপিয়ে তুলতে পারছে না। আতঙ্কের প্রহরে মাদুর্গার দুর্গতিনাশিনী
মিথ ভেঙে খান খান।
তাই দুর্গতিনাশের আব্দার নিয়ে আজ
আর মানুষ মাদুর্গার কাছে ছোটাছুটি করে না। প্রাণের দামের থেকে মাদুর্গার মিথের দাম
বেশি নয় নিশ্চয়। মানুষের কাছে মাদুর্গা তাই দুর্গতিনাশিনী নন। তিনি উৎসব বিলাসিনী।
বছরে একটি বার তিনি উপলক্ষ্য হয়ে এসে দাঁড়ালেই আমরা ধন্য হয়ে যাই। তাঁর নাম করে সম্বচ্ছর
নতুন কাপড় জামা। গয়নাগাটি। সাজসজ্জা। আসবাব পত্তর। রকমারি ভোগ্যপণ্য। সামর্থ্য অনুসারে
নতুন বাসা। এবং বয়সের ভারে একেবারেই নুয়ে না পড়লে নতুন মুখ নতুন সম্পর্কের হাতছানির
কল্পনা। কত কিছুর আয়োজন। উপলক্ষ্য ছাপিয়ে লক্ষ্যের অভিমুখে বাঙালির মিছিল। দুর্গার
আরাধনা নয় বিলাসের আরাধনা। বৈভবের আরাধনা। মিলনের আরাধনা। উৎসব আনন্দের আরাধনারই আর
একটি নাম দুর্গোৎসব। কিন্তু সেই উৎসবই তো মাটি। যদি মণ্ডপের ভিড়ে করোনা বাধিয়ে নিয়ে
আসতে হয়। তাই না সাধু সাবধান! আদালত আদালতের কাজ করেছেন। জনস্বার্থ রক্ষায়। জনহিতার্থেই।
সরকার সরকারের কাজ করেছে। লকডাউন
উঠিয়ে দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখে। তিন বাসের মানুষকে এক বাসে চাপতে বাধ্য না করলে
করোনা সংক্রমণ হু হু করে বাড়ানো যেত? এমন দ্রুত? রাজনৈতিক দলগুলিও বসে নাই। দ্রুতবেগে
সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে জনসমাবেশ মিটিং মিছিল অবরোধ। চলছে চলবে। জনতা পুলিশ খণ্ডযুদ্ধ,
বাদ নাই কোনটিই। সামনেই ভোট। সবার উপরে ভোট সত্য। তাই দলীয় কার্যালয়ে বসে বসে দিন নষ্ট
করার সময় কই। বিশেষ করে ক্ষমতা দখলের তাড়া যত বেশি ততই সময় কম। তাই আদাজল খেয়ে নেমে
পড়তেই হয়েছে মাঠে ময়দানে। যত ভিড় তত আশা। ভিড় বাড়ানোর সকল মেকানিজমে তা দেওয়ার নামই
তো রাজনীতি। সেই রাজনীতিতে যার সাফল্য যত বেশি দেখা যাবে, জনতাকে প্রলুব্ধ করতে তত
বেশি সুবিধা হবে তারই। তাতে করোনা নিশ্চয় কোন বাধা হতে পারে না। পারলে আদালত নিশ্চয়
নড়েচড়ে বসতো। না আদালত সেসব নিয়ে নড়েচড়ে বসেনি। ট্রেন বন্ধ রেখে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন
জীবনে নাভিশ্বাস উঠিয়ে দেওয়ার রাজনীতিটুকুও নিশ্চয় আদালতের নজরে নিয়ে আসেননি কেউই।
তাই আদালতও নীরব।
বিষয়টা ঠিক আদালত অবমাননারও নয়।
কোন সুস্থ মানুষই নিশ্চয় আদালতের রায়ের বিপরীতে হাঁটবেন না। কিন্তু ঠিক যে কারণে মণ্ডপে
দর্শনার্থীদের ভিড় ঠেকানোর জন্য আদালতের এই নির্দেশ। সেই ভিড় তো গত দেড় মাস ধরে লকডাউন
উঠে যাওয়ায় পথে ঘাটে রাজনৈতিক বিক্ষোভ মিছিলে, রাজনৈতিক জনসমাবেশে, দলীয় নেতাকর্মী
বনাম পুলিশের খণ্ডযুদ্ধে ঠিকই হচ্ছিল। হচ্ছেও। ভিড় হচ্ছে পরিবহনে। ভিড় হচ্ছে বাজার
দোকানে। ভিড় হচ্ছিল পুজোর কেনাকাটায়। দিনের পর দিন। প্রশ্ন তো একটিই। করোনা কি এই সকল
ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে শুধুমাত্র মণ্ডপে মণ্ডপেই ঠাঁই নিয়েছে? যে কারণে মণ্ডপের দশ পাঁচ মিটার
বাইরে জনতার ভিড় হলেও সেই বিষয়ে আদালতের কোন নির্দেশিকা নাই? আদলত কি তবে নিশ্চিত করোনা
সংক্রমণ শুধু মণ্ডপের ভিতর থেকে পাঁচ দশ মিটারের ভিতরেই সীমাবদ্ধ? যদি ধরেই নেওয়া যায়,
আদালতের কথা শিরোধার্য্য করে মানুষ প্রতিবারের মতো পথে নামলো। মণ্ডপের পাঁচ দশ মিটার
দূরেই ঠাকুর ও মণ্ডপ দর্শনে তৃপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরলো। সেই বিপুল জনস্রোতে করোনা প্রবেশ
করতে পারতো না কি? যে জনস্রোত মণ্ডপে ঢোকে প্রতিবছর। সেই একই জনস্রোত তো আদালতের রায়
মেনে মণ্ডপের পাঁচ দশ মিটার দূর অব্দি পৌঁছাতেও পারতো। আদালত তো আর মানুষকে পথে নামতে
বাধা দেয় নি। আদালত নীরব থাকলেও, মানুষ আদালতের রায় মেনে পথে নামার মতো নির্বুদ্ধিতার
পথেও হাঁটেনি কিন্তু। মানুষ বুঝতে পেরেছে, আদালত যাই বলুক এবারে এই পরিস্থিতিতে ঠাকুর
দেখতে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ আদালত এবং মাদুর্গা, কারুর
উপরেই ভরসা রাখতে পারেনি। ভরসা রাখছে নিজের উপরেই। মানুষ টের পেয়েছে, মাদুর্গা দর্শন
আর মণ্ডপ দর্শনের উপরেই উৎসব কিংবা ভক্তি, ধর্ম কিংবা পরব নির্ভর করে না। মানুষ বুঝতে
পারছে, মণ্ডপ কিংবা মাদুর্গার কাছে না গিয়েও উৎসব উদযাপন করা সম্ভব। আগে নিজের জীবন।
তারপর ধর্ম। আদালতের রায় তাতে কতটা সহায় হয়েছে, সেটি গবেষণার বিষয় হতে পারে। কেননা
পুর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, আদালত মানুষকে পথে নামতে নিষেধ করে নি। মানুষ পথে নামতেই
পারতো। আলো ঝলমল জনপথকে মণ্ডপের পাঁচ দশ মিটার দূরে দূরে উৎসব মুখর করে তুলতেই পারতো।
ইচ্ছা করলে। ভরসা একটিই মানুষ মিথের উপরে ভরসা করে নি। আদালতের রায়ের দূরত্বের মাপকাঠির
উপরে ভরসা করে নি। ভরসা করেছে নিজের বিচার বুদ্ধির উপরেই। সংক্রমণের ভয় মানুষকে বুঝতে
সাহায্য করেছে, ধর্ম বা মিথ জীবন রক্ষায় কাজে আসে না। কাজে আসে বিজ্ঞান সম্মত বাস্তববোধের
বিচার বিবেচনা।
আমারা আশা করতে চাই, মানুষ তার এই বিচারবুদ্ধি বিজয়াদশমীর সাথেই বিসর্জন দিয়ে দেবে না। ধরে রাখবে অন্তত আগামী বিধানসভা নির্বাচন অব্দি। কারণ সেখানেও ধর্ম এবং মিথ বিরাট আকার ধারণ করে প্রস্তুত হচ্ছে মানুষকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে। মানুষকে বুঝতে হবে করোনা থেকে বেঁচে গেলেই যে ধর্ম আর মিথ থেকে নিজেকে বাঁচানো যাবে তেমনটা নাও হতে পারে। এই ধর্ম এবং মিথ জীবন রক্ষায় যেমন কোন কাজে আসে না। ঠিক তেমনই জীবনের পক্ষে এর থেকে বড়ো ঝুঁকি কিন্তু করোনাও নয়। কারণ করোনা হলেই মৃত্যু অবধারিত নয়। কিন্তু রাজনীতির পরিসরে রাজনৈতিক আবর্তে ধর্ম ও মিথ যুথবদ্ধ হলে, তাতে মানুষের স্বাধীনতা ও বিকাশের মৃত্যু কিন্তু অবধারিত। তাই সাধু সাবধান। এই বিষয়ে কোন আদালতের রায়ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারবে না। সংবিধানে সেই প্রভিশন নাই বলে। ফলে মানুষকেই আত্মরক্ষার বন্দোবস্ত করতে হবে। আপন ব্যক্তিস্বা ধীনতার পরিসর থেকেই। অতএব রাজ্যবাসীর ভাগ্য রাজ্যবাসীর হাতেই।
২৩শে অক্টোবর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

