এমএসপি ও চলমান কৃষক আন্দোলন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
এমএসপি ও চলমান কৃষক আন্দোলন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

এমএসপি ও চলমান কৃষক আন্দোলন

 


সেদিন সকালে উঠে হঠাৎ জানতে পারা গেল। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে ক্ষমাভিক্ষা করে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এবং কৃষকদেরকেও তাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়ে নিজ ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করছেন। অনুরোধ করছেন আবার কৃষিকর্ম শুরু করে দেওয়ার। খুব ভালো কথা। অনেকেই দেশ প্রধানের সুরে সুর মিলিয়ে সেই রকমটিই আশা করতে শুরু করে দিলেন। কৃষক আন্দোলন তবে খতম হলো এবার। না, বাংলায় যেমন খতম কথাটির অর্থ হনন অর্থে ব্যবহৃত হয়। হিন্দুস্তানী ভাষায় কিন্তু ঠিক তেমনটি নয়। খতম অর্থে সেখানে সমাপ্তি বা শেষ। দিল্লীর অবরুদ্ধ সীমানা আবার খুলে যাবে মনে করেও অনেকের মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না। এক বছর ব্যাপী এই সুদীর্ঘ কৃষক আন্দোলনে দিল্লীর সীমান্তে রাজপথে অবস্থানরত কৃষকরা আন্দোলন চালিয়ে গেলেও তাদের কৃষিকর্মে কোনরকম অবহেলা করেননি। গোটা দেশের সকল দেশবাসীর মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য তাঁরা আজীবন যেমন প্রাণপাত পরিশ্রম করে থাকেন। বিগত এক বছরও ঠিক সেই রকম কিংবা তার থেকেও বেশি পরিশ্রম করেছেন। বেশি পরিশ্রমের কথা বলতে হলো কারণ, অনেকেই দিল্লীর সীমান্তে আন্দোলনরত কৃষকদের জমিতে লাঙল ঠেলেছেন। অনেকেই পরিবারের একজন কি দুজনকে দিল্লীর সীমান্তে আন্দোলনে পাঠিয়ে গোটা জমিতে কৃষিকার্যের তদারকি চালিয়ে গিয়েছেন। অনেকেই কৃষিজমিতে ফসল ফলিয়েই দিল্লীর সীমান্তে দৌড়িয়েছেন আন্দোলনে সামিল হতে। অনেকেই আন্দোলনের ফাঁকে ফাঁকে বাড়ি ফিরে কৃষিকর্ম সামলিয়ে এসেছেন। এটার বড়ো প্রমাণ দেশের কোথাও কৃষক আন্দোলনের প্রভাবে খাদ্যাভাবের সৃষ্টি হয়নি। ফলে কৃষকরা তাদের কৃষিকর্ম অবহেলা করে দিল্লীর সীমান্তে অবস্থান করে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, ভাবলে অত্যন্ত ভুল হবে। এমন কি, গত ডিসেম্বর জানুয়ারীর কঠিন শীতে দিল্লীর সীমান্তে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেও কৃষকদের মুখে হাসি ফুটতেই দেখা গিয়েছিল। কারণ কৃষিখেতে জল দেওয়ার কাজটি প্রকৃতি নিজেই করে দেওয়ায় কৃষকরা প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন। বৃষ্টি ভেজা রাজপথে পড়ে থেকেও তাদের মনে হয়নি এত কষ্ট করে দিনের পর দিন এইভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয়। বরং যত দিন গড়িয়েছে। তত তারা সংহত হয়েছেন ২০২৪ অব্দি আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। কৃষকদের নিজেদের কথাতেই জানা গিয়েছিল, যাঁরা সারা বছর রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে, উত্তর ভারতের হাড় কাঁপানো শীতেও কৃষিকর্ম চালিয়ে যান, তাঁদের পক্ষে মাসের পর মাস, প্রয়োজনে বছরের পর বছর দিল্লীর সীমান্তে রাজপথে পড়ে থাকা খুব একটা বড়ো কথা নয়। না, আমরা যারা শহুরে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, কিংবা বিত্তশালী নাগরিক। এবং পেটে দুই এক পাতা ইংরেজী জানা বিদ্যায় ডিগ্রিধারী শিক্ষিত। তাদের পক্ষে, দিনের পর দিন কি করে পিচরাস্তায় পড়ে থেকে অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব তাও আবার নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধারী দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকদল ও তার সরকারের বিরুদ্ধে, সেকথা সত্যিই বোঝা সম্ভব নয়। তাই আমাদের কাছে আজও এটা অনেকটাই একটা প্রহেলিকা। আর প্রহেলিকা বলেই, আমরা কৃষক বিরোধী কুৎসা প্রচারে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাববেই খুব সহজেই সুর মেলাতে পেরেছিলাম। এবং এখনো পারছি। এই যে একটা সচেতন প্রচার চালানো হচ্ছে নতুন করে। দেশ প্রধানের প্রতি অকৃতজ্ঞ কৃষকরা এখন আবার নতুন দাবি তুলেছে এমএসপি’র গ্যারান্টি দিতে আইন চালু করার। সেই অপপ্রচারে আমরা খুব সহজেই এবং অত্যন্ত আহ্লাদের সাথেই বিভ্রান্ত হচ্ছি নতুন করে।


সত্যিই তো আমাদের মনে হওয়ারই কথা। কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পেলে বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধি ঘটবে। এখন কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়াতেই শাকসবজী আনাজপাতির বাজারদর আকাশ ছোঁয়া। সেখানে তাঁরা যদি ফসলের ন্যায্য দাম পেতে শুরু করে, তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাই তো প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। ঠিক এই প্রচারেই আমরা নতুন করে বিভ্রান্ত হতে শুরু করছি। অথচ আমরা জানতে চাই নি। কৃষকরা যে তিনটি কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। যে আন্দোলনে এখন অব্দি ৭৩২ জন কৃষক শহীদ হয়েছেন। সেই আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। নতুন এই কৃষি আইনে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন তুলে দেওয়া হয়েছিল। তুলে দেওয়া হয়েছিল খাদ্যশস্য মজুতদারীতে সরকারী নিষেধাজ্ঞাও। যার ফলে খাদ্যশষ্যের পাইকারী বাজারকে বঞ্চিত করে যতদিন খুশি যতখুশি খাদ্যশস্য মজুত করে রেখে বাজারে কৃত্রিম উপায়ে খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধি ঘটালেও সরকারের কিছু করার থাকতো না। ঠিক যে উদ্দ্যশে আদানী আম্বানীরা বহু জায়গাতেই বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত করে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন বিশাল বিশাল গুদাম বানিয়ে ফেলেছে। এবং আরও বানানো চলছে।  যে সকল খাদ্যশস্যকে নতুন এই কৃষি আইন আসার আগে অব্দি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্য তালিকায় রাখা ছিল। সেই সকল খাদ্যশস্যকে সেই তালিকা থেকেই বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল নতুন এই আইনে্। সৌজন্যে তথাকথিত কৃষক দরদী সরকার। আমরা সত্যিই জানতে আগ্রহী ছিলাম না। কেন দিল্লীর সীমান্তে রাজপথে অবস্থানরত আন্দোলনকারী কৃষকরা এই তিন কৃষি আইনের সব কয়টি ধারাকেই আগাগোড়া বাতিল করার পক্ষে দাবি জানিয়ে আসছিল। সেই দাবির অন্যতম দাবি ছিল এইটি। অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্যের তালিকায় পূর্বের লিপিবদ্ধ সকল খাদ্যশস্যকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। সরকার যাতে পাইকারী ও খুচরো বাজারে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্যের মূল্যের উপরে সরকারী নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখতে পারে, তার আইনি ব্যবস্থা চালু করতে হবে পুনরায়। এবং কোন খাদ্যশস্যকেই মজুতদারী ব্যবসার পণ্যে যাতে পরিণত না করতে পারে কোন ব্যবসায়ী। অর্থাৎ কৃষকরা শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থেই এই কৃষক আন্দোলনে সামিল হয়নি। তাদের এই আন্দো‌লন সকল ভারতীয়ের অন্নসংস্থানের নিশ্চয়তার জন্যেও। না, সরকারপন্থী মিডিয়া এবং আমাদের মতো অন্ধভক্ত তথাকথিত দেশপ্রেমীরা সেই সত্যকে দেশের বৃহত্তর জনগণের কাছে পৌঁছাতে দিইনি। দিলে আদানী আম্বানীদের স্বার্থরক্ষা হয় না।


ফলে আজকেও বিশেষ করে দেশের বাকি অংশের কাছে আমাদের প্রচার চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কৃষকদের দাবি মতো সরকার যদি এমএসপি এক্ট চালু করে, তবে খুচরো বাজারে খাদ্যশস্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে বেড়িয়ে যাবে। এখন অনেকেই একটি প্রশ্ন তুলতে পারে। কৃষকরা যদি এতই জনদরদী হয়। যে, দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভেবে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দ‌োলন করতে থাকে। মজুতদারী ব্যাবসার বিরুদ্ধে আইন ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য সরকারের উপরে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। তবে তারা তাদের উৎপন্ন খাদ্যশস্যের উপরে ন্যায্য দাম পেতে এমএসপি এক্ট চালু করার দাবিতে অটল কেন? যে আইন চালু হয়ে গেলে ব্যাবসায়ীরা অতিরিক্ত মূল্যে খাদ্যশস্য কিনতে বাধ্য হবে। এবং তাদের মুনাফা রেখে আরও উচ্চমূল্যে সেই খাদ্যশস্য পাইকারী ও খুচরো বাজারে বিক্রী করবে। যার ফলে খাদ্যশস্যের দাম আরও চতুর্গুন বৃদ্ধি পাবে। ঠিক কথা। এই প্রশ্ন আমাদের মনে তখনই উদয় হয়। যখন আমরা সরকারপন্থী মিডিয়ার প্রচারে বিভ্রান্ত হতে ভালোবাসি। আমরা তখন ভেবে দেখতে চাই না। এই কৃষকরাই তো পাইকারী ও খুচরো বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ যাতে সরকারের হাতে থাকে, সেই ব্যবস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসতে এবং তা সঠিক প্রক্রিয়ায় কার্যকর করতেই সরকারকে বাধ্য করতে চাইছে। যেখানে সরকার নিজেই চাইছে খাদ্যশস্যের পাইকারী ও খুচরো বাজারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ যাতে কোনভাবেই আর সরকারে হাতে না থাকে। সেই নিয়ন্ত্রণ আদানী আম্বানীদের মতো শিল্পপতিদের হাতে তুলে দিতে চেয়েই তো সরকার এই নতুন কৃষি আইন চালু করতে চেয়েছিল। আর এইখানেই কৃষকদের সাথে সরকারের সংঘাত। ফলে আজকে যারা প্রচার করছি, কৃষকদের দাবি মতো এমএসপি এক্ট চালু হয়ে গেলে খাদ্যশস্যের মূল্য সাধারণের নাগালের বাইরে বেড়িয়ে যাবে। তারা আসলেই আদানী আম্বানী ওয়ালমার্টদের মতো বৃহত শিল্পমহলগুলির স্বার্থরক্ষায় তারস্বরে সুর মেলাচ্ছি সরকারপন্থী মিডিয়ার সুরে।


অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন ফিরিয়ে নিয়ে আসার গুরুত্ব হয়তো অনেকেরই কাছে এতক্ষণে পরিস্কার হয়ে গিয়েছে। পরিস্কার হয়ে গিয়েছে খাদ্যশস্যের অবাধ মজুতদারীর বিরুদ্ধে কৃষকদের আপত্তির মূল কারণ। কিন্তু অনেকের কাছেই হয়তো এখনো পরিস্কার হয়নি কৃষকদের এই দ্বিতীয় দাবিটি। এমএসপি এক্ট চালু করার বিষয়টি। আসলে এটি চলমান কৃষক আন্দোলনের দাবিগুলির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও। এটাই কিন্তু কৃষকদের সবচেয়ে পুরানো দাবি। নতুন এই কৃষি আইন সম্পর্কে কৃষকরা জানতে পারে ২০২০ সালের জুন মাস নাগাদ। যখন লকডাউনের সুযোগ নিয়ে সরকার অর্ডিন্যান্স জারি করে আইনটি চালু করে দেয় গত বছরের ৫ই জুন। কিন্তু উৎপাদিত ফসলের উপরে ন্যূনতম সহয়াক ম্যূল্যের আইন আনার দাবিটি বহু দশকের পুরানো দাবি। না, আমরা শহুরে মানুষ। নাগরিক বলয়ে চলাচল করি। সেকথা আমাদের জানারও কথা নয়। আমরা জানিও না। জানার আগ্রহও নাই। কিভাবে কৃষক তার ফসল উৎপন্ন করে। কিভাবে কৃষক তার ফসল বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রী করে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য হাতে কৃষক আর বাজারের থলি হাতে জনতার মাঝে ঠিক কারা থাকে গোটা বাজারের উপরে ছড়ি ঘোড়াতে। কিই বা তাদের স্বার্থ। কিভাবে তারা একদিকে কৃষকের গলা কাটে। আর এক দিকে আমাদের পকেট কাটে। কেনই বা প্রতি বছর এদেশের হাজার হাজার কৃষককে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়। এই সকল বিষয়ে আমরা কিন্তু সচেতন ভাবেই মূর্খ রয়ে যেতে ভালোবাসি। তাই আমরা একবারের জন্যেও কোনদিন ভেবে দেখারও প্রয়োজন বোধ করি নি। কেনই বা খাদ্যশস্য বাদে অন্যান্য প্রতিটি জিনিসের উৎপাদক তার উৎপাদিত দ্রব্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে পারলেও একমাত্র কৃষকরাই তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না? না, আমরা শহুরে নাগরিক। তায় উচ্চশিক্ষিত মনুষ্য প্রাজাতি। এতসব জটিলতার ভিতরে আমাদের আর কি দরকার? টিভি আছে খবরের কাগজ রয়েছে। আর এখন তো আইটি-সেলের হোয়াটসআ্যাপ ইউনিভার্সিটিই চলে এসেছে একেবারে হাতের মুঠোয়। রাউন্ড দ্য ক্লক আনলিমিটেড ইনটারনেটের দৌলতে। পিরিং পিরিং আওয়াজেই নিত্য নতুন সিলেবাসের হোমটাস্ক। শুধু শেয়ার করে যাও মুখস্থ করে নিয়ে। নো ভাবনা নো চিন্তা। বাকিটা শুধুই তোতাকাহিনী’র রকম ফের।


কৃষকদের এই এমএসপি’র দাবি’র ণত্ব ষত্ব বুঝতে গেলে আমাদেরকে একটু কয়েক দশক পিছনে ফিরতে হবে। আমাদের অনেকেরই হয়তো আর স্মরণে নেই। ভারতবর্ষের অর্থনীতির ধারাটি ছিল মিশ্রঅর্থনীতি। অর্থাৎ সাম্যবাদী অর্থনীতি আর পুঁজিবাদী অর্থনীতির একটি সংমিশ্রণ। অনেক রথীমহারথীর ভাষায় হয়তো একটি বকচ্ছপ ব্যবস্থা। সে যাই হোক। মিশ্রঅর্থনীতির সুযোগ এবং সুবিধেগুলি ভোগ করেই পাঞ্জাবসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব সফল হয়েছিল। কৃষকদের ভিতরে একটি সম্পন্ন কৃষক গোষ্ঠীও উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রধানত পাঞ্জাব সহ উত্তর পশ্চিম ভারতে। এবং সেই কৃষি বিপ্লবের হাত ধরেই ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চলই খাদ্যে সয়ম্ভর হয়ে উঠেছিল। যার প্রভাবে খাদ্যাভাবে মৃত্যুহার একেবারেই কমে গিয়েছিল বিশেষ করে ছয়ের দশকের পর থেকেই। মিশ্রঅর্থনীতির ফলেই সম্ভব হয়েছিল কৃষিতে নানান ধরণের সরকারী ভর্তুকির ব্যবস্থা করার। যার ফলে শস্তায় সার বীজ কীটনাশক জল বিদ্যুৎ সহ অন্যান্য উপকরণসমূহের কারণেই কৃষকের পক্ষে বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন অনেক সহজ হয়ে উঠেছিল। যার সরাসরি প্রভাবে খাদ্যশস্যের মূল্য উপভোক্তার নাগালের ভিতরেও থাকতো। কিন্তু হঠাৎই বাদ সাধলো, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে গড়ে ওঠা World Trade Organization ভারতের উপরেও চাপ আসতে থাকলো এই সংস্থায় যোগ দেওয়ার জন্য। বস্তুত বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতির অশ্বমেধ ঘোড়া ছোটানোর জন্যেই এই সংস্থার সৃষ্টি। এবং নব্বই দশকের গোড়াতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। দুই জার্মানির মিলন। পুর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে কমিউনিস্ট অর্থনীতির ভেঙ্গে পড়া ইত্যাদি পরপর ঘটে চলা ঘটনাগুলির প্রভাবে কংগ্রেস শাসিত ভারতবর্ষের নরসীমা রাওয়ের সরকার মিশ্রঅর্থনীতি ত্যাগ করে পুরোপুরি পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে বরণ করে নিতে উদ্যত হলো। ফলে যে অর্থনৈতিক সংস্কার সাধনের পথে পা বাড়ালো ভারতবর্ষ। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়। তাকে মনমোহিনী অর্থনীতিও বলা যেতে পারে। নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসাবে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বেই ভারতবর্ষ মিশ্র অর্থনীতিকে বিদায় জানিয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে গ্রহণ করলো আর্থিক সংস্কারের নাম করে। এবং যার ফলে ওয়ার্ল্ত ট্রেড অর্গানাইজেশনের উরুগুয়ে রাউণ্ডের সময়পর্বেই ভারতবর্ষও জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড ইন সার্ভিসেস-এ স্বাক্ষর করে যোগ দিল ওয়ার্লড ট্রেড অর্গানাইজেশনে


ডবল্যুটিও’তে য‌োগ দেওয়ার শর্তস্বরূপ গ্যাটস চুক্তির নির্দেশে ভারতবর্ষেও ধীরে ধীরে কৃষিতে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। ফলে দিনে দিনে কৃষকের উৎপাদন ব্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকলো। কৃষক আর সারে ভর্তুকি পাচ্ছে না। কীটনাশকে ভর্তুকি পাচ্ছে না। বীজের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিশ্রঅর্থনীতির রক্ষাকবচ না থাকায়, জল বিদ্যুৎ জ্বালানী তেল ইত্যাদিও মহার্ঘ্য হয়ে উঠতে থাকল বছরের পর বছর। যার ফলে দিনে দিনে কৃষিতে উৎপাদন ব্যায়ের বৃদ্ধিতে কৃষকের মূলধনেও টান পড়তে শুরু করলো। তার প্রধান কারণ, কৃষকই একমাত্র উৎপাদক, যে তার উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। বিক্রয়মূল্য ঠিক করে দেয় পাইকারী ক্রেতা। সে যে কৃষিপণ্যের যা দাম নির্ধারণ করে সেই দামেই কৃষককে তার উৎপাদিত শস্য বিক্রী করতে হয়। যার ফলে দিনে দিনে শস্যের উৎপাদন ব্যায় আর বিক্রয়মূল্যের ফারাক কমতে কমতে কৃষকের মূলধনেই টান পড়তে শুরু করে। এ একেবারেই অর্থনীতির গোড়ার কথা। পরবর্তী মরশুমের ফসল ফলানোর জন্য অগ্নিমূল্যের সার বীজ কীটনাশক জোগার করতে কৃষককে দারস্থ হতে হয় ঋণদাতার কাছে। এইভাবে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ঘেরাটোপে কৃষক জড়িয়ে পড়তে থাকে ঋণের জালে। এখন সেই জাল কাটতে গেলে কৃষককে তার উৎপাদন ব্যায়ের উপরে ন্যায্য মুনাফা ধরেই উৎপাদিত শস্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। যেখান থেকে কৃষক সূদসমেত তার ঋণ পরিশোধ করেও ন্যায্য মুনাফা ঘরে তুলতে পারবে। কিন্তু ভারতীয় কৃষি ব্যবস্থায় ঘটনাতো ঠিক উল্টো। কৃষকের উৎপাদিত শস্যের মূল্য নির্ধারিত হয় সেই শস্যের পাইকারী ক্রেতার দ্বারা। তাদের লক্ষ্যই থাকে যত বেশি শস্তায় কিনে সেই শস্য গুদামে তোলা যায়। আর যত বেশি মূল্যে তা বাজারে বিক্রী করা যায়। অধিকাংশ কৃষিপণ্যই পচনশীল। আর কৃষকের পক্ষে উপভোক্তার কাছে সরাসরি পৌঁছানোর কোন পথও খোলা নাই। অপরদিকে তাড়াতাড়ি হাতে নগদ জোগাড় না করতে পারলে ঋণের উপরে সূদ চড়তে থাকে। ফলে কৃষককে বাধ্য হয়েই ন্যায্য মূল্যের থেকে অনেক বেশি শস্তায় উৎপাদিত শস্যকে বিক্রী করে দিতেই হয়। ঠিক এইখানেই এমএসপি’র গুরুত্ব। এমএসপি অর্থাৎ কৃষকের উৎপাদিত শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য। এবং এখানেই কৃষকদরদী সরকারের ভুমিকা। কেননা এই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কে নির্ধারণ করবে? নিশ্চিত ভাবেই দেশের সরকারের কৃষি মন্ত্রকের নির্দিষ্ট দপ্তর। আর এইখানেই দুটি বড়ো প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন, কোন শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কত হবে সেটি কোন ফর্মুলায় ঠিক হবে? যাতে কৃষক আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অর্থাৎ প্রতিটি কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণের সঠিক প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা। এবং দুই, সেই নির্ধারিত সহায়ক মূল্যের নীচে কোন কৃষিপণ্য ক্রয়ের উপরে আইনী নিষেধাজ্ঞা। ঠিক এই দুইটি দাবি নিয়েই দশকের পর দশক কৃষকরা আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ফলে আজকে যাদের মনে হচ্ছে, দেশপ্রধানের প্রতি অকৃতজ্ঞতা বশতই কৃষকরা নতুন করে দাবি জুড়তে বসে গিয়েই এমএসপি এক্ট করার দাবি তুলছে। তারা হয় সম্পূর্ণ মূর্খ। নয়তো সম্পূর্ণ ভণ্ড। এবং মিথ্যেবাদী।


কৃষকদের বহু দিনের দাবি, স্বামীনাথান কমিশনের সুপারিশ মতোই কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণের। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনকারী শাসকদলটি নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই সুপারিশ চালু করার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েই কৃষকদেরকে বোকা বানিয়ে তাঁদের ভোট জোগার করে ক্ষমতা অর্জন করেছিল। কিন্তু স্বামীনাথান কমিশনের সুপারিশ মতো কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা তো দূরস্থান। বর্তমান সরকার কৃষকের উপরে নতুন তিনটি কৃষি আইন চাপিয়ে দিয়ে দেশের কৃষকদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। কৃষকরা বর্তমান শাসকদলের নির্বাচনী মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে ভরসা করে বসেছিল। শাসকদল ক্ষমতায় এলে তারা এমএসপি আইন করে কৃষকদের ন্যায্য দাবি পুরণ করবে। তারা দেশ প্রধানের কথাতেও বিশ্বাস করে বসে ছিল দুই হাজার বাইশ সালে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এবং শাসকদল ও দেশ প্রধানের দেওয়া মিথ্যা প্রতিশ্রুতিগুলির উপরে তাদের অগাধ আস্থায় তাঁরা সাত সাতটি বছর ধৈর্য ধরে বসেছিল। সেই ধৈর্য্যেরই বাঁধ ভেঙে যায় লকডাউনের সুযোগে তড়িঘরি করে কৃষক বিরোধী এই তিন কৃষি আইন প্রণয়ন করাতেই। আজকের কৃষক আন্দোলনের এই হলো মূল প্রেক্ষাপট।


আবার ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই দেশপ্রধানের মুখে শোনা গেল ‘এমএসপি আছে এমসপি ছিল এমসপি থাকবে’। শোনা গেল লোকসভা থেকে লালকেল্লায়। প্রচারিত হলো চ্যানেলে চ্যানেলে। খবরের শিরোনামে। একথা ঠিক এমএসপি ছিল। এমএসপি আছে। কিন্তু নতুন তিন কৃষি আইন অনুসারে সমগ্র কৃষি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রীত হতে শুরু করলে কোনভাবেই আর এমএসপি থাকতো না। তিন কৃষি আইন যাঁরাই ভালো করে পড়ে দেখেছেন। তাঁদের কাছেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল। তাই ‘এমএসপি থাকবে’, এই ধোঁকাবাজিতে কৃষকরা আর বিশ্বাস করতে পারেনি। এই কারণেই আরও, তিন কৃষি আইন বাতিলে তাঁরা রাস্তায় ধর্ণা দিয়ে বসেছিল। এখন দেশপ্রধানের ঘোষণা মত কৃষক বিরোধী সেই তিন কৃষি আইন বাতিল হয়ে গেলে, এমএসপি’র ভবিষ্যৎ নিয়ে আর চিন্তা’র কিছু থাকা উচিত নয়। এমনটাই মনে হতে পারে প্রথমে। কিন্তু সেই মনে হওয়ার আগে দেখে নেওয়া দরকার। এমসপি এতদিন কিভাবে ছিল। এমএসপি এখন কিভাবে আছে। সরকারী আইন অনুসারে মাত্র তেইশটি কৃষিপণ্যের উপরেই সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়কমূল্যের প্রস্তাবনা রয়েছে। এই মূল্যের বর্তমান অবস্থান জানা যাবে সরকারী তথ্য থেকেই। সরকারী এই তথ্য অনুসারে দেখা যায় ধানের উপরে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ২০২০-২১ মরশুমের নির্ধারিত হার কুইন্টাল প্রতি ১৮৬৮ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১-২২ মরুশুমে কুইন্টাল প্রতি ১৯৪০ টাকা ধার্য্য হয়েছে। খুব ভালো কথা। এখন শুধু ধানের কথাই যদি ধরা যায়। তবে দেখা যাবে সরকার নির্ধারিত এই মূল্যে ধান বিক্রী মূলত পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কিছু কিছু অংশেই সীমাবদ্ধ। সারা দেশের অন্যান্য অংশে এই মূল্যের থাকে সাতশো আটশো টাকা কম মূল্যেই কৃষকরা উৎপাদিত ধান বিক্রী করতে বাধ্য হচ্ছে। এখন এই যে কুইন্টাল প্রতি সাতশো আটশো টাকা থেকে কোথাও কোথাও নয়শ টাকা লোকসানেও ধান বিক্রী করে দিতে হচ্ছে কৃষকদের, এই লোকসান কৃষকরা আর বহন করতে পারছে না। বিশেষ করে স্বল্প পরিমান জমির মালিকরা। এমনকি বিহার, যে রাজ্যে ২০০৬ সাল থেকেই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সরকারী বন্দোবস্ত উঠে গিয়েছে। সেই বিহারে ধান ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে হাজার কিংবা এগারোশো টাকা কুইন্টাল দরে ধান কিনে নিয়ে পাঞ্জাবের কৃষি মাণ্ডিতে গিয়ে ১৯৪০ টাকা কুইন্টাল দরে ধান বিক্রী করে দিয়ে লাভের বখরা বুঝে নিচ্ছে। বিহারের মত প্রদেশ গুলির স্বল্প জমির কৃষকরা পাঞ্জাব হরিয়ানায় গিয়ে কৃষিজমিতে মজুরের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ নিজের রাজ্যে ধান চাষের লোকসান আর বহন করতে পারছে না। এই অবস্থা শুধুই ধান চাষীদেরই নয়। বাকি ২২টি কৃষিপণ্যেই কম বেশি এই অবস্থা। আর এই তেইশটি কৃষি পণ্যের বাইরে থাকা শস্যে তো ন্যূনতম সহায়াক মূল্যের কোন ব্যবস্থাই নাই। ফলে এই যে লোকসভা থেকে লালকেল্লায় ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে প্রচার করা হচ্ছে, এমএসপি ছিল, আছে। সেই কথা গোটা ভারতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। অধিকাংশ রাজ্যের কৃষকদের জানাই নাই। এই এমএসপি বিষয়টি কি? ফলে তাদেরকে বছরের পর বছর লোকাসনে উৎপাদিত ফসল বিক্রী করতে হচ্ছে। আর বছরে বছরে কৃষকদের আত্মহত্যার হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকছে। অর্থাৎ প্রতি বছর কৃষক আত্মহত্যার সাথে এই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। এখন যে যে রাজ্যের কৃষি মাণ্ডিগুলিতে ন্যূনতম সহয়াক মূল্যে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ক্রয়বিক্রয় হওয়ার কথা। সেই সেই স্থানের অধিকাংশ মাণ্ডিতেই ন্যূনতম সেই সহায়ক মূল্যের থেকে অনেক কমেই কৃষিপণ্য বিক্রী করতে বাধ্য হতে হয় কৃষকদের। আমাদের মতো শহুরে নাগরিকদের মনে হতেই পারে তা কি করে হবে? সরকার যেখানে ন্যূনতম দর বেঁধে দিয়েছে? কারণ আমাদের কারুরই পা মাটিতে থাকে না। আমরা চলি সরকারপন্থী মিডিয়ার পাঠশালায় অশিক্ষিত হতে হতে। তাই আমাদের জানাই নাই, অধিকাংশ কৃষিমাণ্ডিতেই সরকার কর্তৃক বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের থেকে অনেক কম দরেই কৃষিপণ্য বিক্রয় করতে বাধ্য হতে হয় কৃষকদের। কৃষকই একমাত্র উৎপাদক। যার উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণ করে কৃষিপন্যের পাইকারী ক্রেতা। এখন সেই পাইকারী ক্রেতা যেখানে যেখানে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের নীচে কৃষিপণ্যে দর ঠিক করে। সেখানে সেখানে লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই কৃষকদের পাইকারী ক্রেতার বেঁধে দেওয়া দরেই উৎপাদিত শস্য বিক্রী করতে হয়। আর এইটি সম্ভব হয় কারণ, এই এমএসপি’র উপরে সরকার কোনদিন কোন আইন প্রণয়ন করেনি। অর্থাৎ কৃষিপণ্যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কোন সরকারী আইন দ্বারা গ্যারান্টিকৃত নয়। আজকের আন্দোলনরত কৃষকরা তাই দাবি করছেন, সরকারকে সঠিক নীতিতে এমএসপি এক্ট তৈরী করতে হবে। এবং সেই আইন গোটা ভারতেই চালু করতে হবে। যাতে সারা ভারতবর্ষের প্রতিটি কৃষক প্রতিটি কৃষিপণ্যের উপরেই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনী গ্যারান্টি লাভ করে। এবং সেই সহায়ক মূল্য নির্ধারণে স্বামীনাথান মিশনের সুপারিশকৃত সিটু প্লাস ফিফটি ফর্মুলাটি ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ সরকারপন্থী মিডিয়া প্রচারিত শুধুমাত্র পাঞ্জাবী শিখ সম্প্রদায়ের বড়ো মাপের কৃষকদের স্বার্থেই এই কৃষক আন্দোলনের গল্পটা আদৌ সত্য নয়। উল্টে সারা দেশের কৃষকদের স্বার্থেই আন্দোলনরত কৃষকরা দিল্লীর সীমান্তে মাটি কামড়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এখনো। হ্যাঁ মূল নেতৃত্বে অবশ্যই সেই পাঞ্জাবী শিখ সম্প্রদায়ের বৃহৎ জমির মালিক কৃষকরাও রয়েছেন।


দেশপ্রধান কৃষকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২০২২ সালে কৃষকদের আয় দ্বিগুন হবে। যে প্রতিশ্রুতির উপরে অন্ধবিশ্বাসে কৃষকরা দলে দলে বর্তমান শাসকদলকে ভোট দিয়ে দিল্লীর মসনদে বসিয়েছিল। উত্তরপ্রদেশের মসনদে বসিয়েছিল। হরিয়ানার মসনদে বসিয়েছিল। উত্তরাখণ্ডের মসনদে বসিয়েছিল। কিন্তু উল্টে কৃষকদের আয় আজ অর্ধেক হয়ে গিয়েছ। সেই হিসেবটা একটু দেখা নেওয়া যাক। ২০২০-২১ কৃষি মরশুমে ধানের সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম সহয়কমূল্য ছিল কুইন্টাল প্রতি ১৮৬৮ টাকা। যেটি পরবর্তী ২০২১-২২ কৃষি মরশুমে ৭২ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৪০ টাকায়। এটা ঠিক খুব বেশি হলে এই দরে ধান বিক্রী করতে সমর্থ্য হওয়া কৃষকের সংখ্যা ৩%। বাকিদের কথা থাক। কিন্তু এই দরেই যারা ধান বিক্রী করতে সমর্থ্য হয়েছেন। তাঁদের ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত সার, বীজ, কীটনাশক, সেচের জল তোলার জন্য ইলেক্ট্রিক বিল, ট্র্যাকটর চালানোর জন্যে ডিজেল ইত্যাদি সকল উৎপাদন ব্যায় ঠিক একই মরুশুমে কি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে? হ্যাঁ সেই বিস্তারিত হিসেব শহুরে নাগরিকদের জানার কথা নয়। কিন্তু বিগত এক বছরে শহুরে নাগরিকদের ইলেক্ট্রিক বিল, গাড়ি চালানোর পেট্রল, রান্নার গ্যাসের সিলিণ্ডার, ইত্যাদির মূল্য কি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেটি জানার জন্য নিশ্চয় গুগুল সার্চ করে সরকারী ওয়েবসাইটের তথ্য খোঁজার দরকার পড়বে না আশা করি। ফলে খুব সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা সম্ভব। একজন কৃষকের, ফসল উৎপান করতে গিয়ে শস্যের উৎপাদন মূল্য কি পরিমানে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে বছরের পর বছর। আর এইখানেই মনে রাখতে হবে। মিশ্রঅর্থনীতির যুগপর্বের মতো ভারতীয় কৃষক আজ আর কিন্তু সার বীজ কীটনাশক ইত্যাদির কোনকিছুতেই সেই ভাবে সরকারী ভর্তুকি পায় না। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনে যোগ দেওয়ার শর্তসমূহে স্বাক্ষর করে রাষ্ট্রশক্তি সেই সব ভর্তুকি তুলে দিয়েছে দিনে দিনে। যার আঁচ প্রতিটি শহুরে নাগরিকের প্রতিদিনের পকেটেই ছাপ ফেলেছে। ওষুধ থেকে রান্নার গ্যাসে। প্রসঙ্গগত উল্লেখযোগ্য, খোদ আমেরিকায় কিন্তু এখনো কৃষি জমির সার থেকে শুরু করে নাগরিকের রান্নার গ্যাসে সরকারী ভর্তুকির ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে। তা থাকুক। ভালো কথা। আমেরিকায় অবশ্য কৃষিজমির মালিকানা বৃহৎ পুঁজির দখলে চলে গিয়েছে। ফলে তারা পুঁজির স্বার্থেই সরকারী ভর্তুকি আদায় করে নেবে। এটাই স্বাভাবিক। আর এই আসল খেলাটা ভারতবর্ষে কৃষকদের একটা বড়ো অংশ আজ টের পেয়ে গিয়েছে। টের পেয়ে গিয়েছে বলেই, আজ এক বছর ধরে লাগাতার চেষ্টা করেও ছলে বলে কৌশলে এবং ভয় দেখিয়ে ধমকেও তাদের ঐক্যে কোনরকম ফাটাল ধরাতে পারেনি শাসকদল ও তাদের সহযোগী মিডিয়া, এবং রাষ্ট্রযন্ত্র। এইখানেই চলমান কৃষক আন্দোলনের প্রাথমিক সাফল্য। পরবর্তী পর্যায়ে তাঁরা এই সাফল্য আরও কতদিন ধরে রাখতে পারবেন। সেটি ভবিষ্যতের বিষয়। কিন্তু বিশ্ব পুঁজিবাদের ইতিহাসে বর্তমান কৃষক আন্দোলন একটা নতুন সমীকরণের দিকে এগোনোর প্রয়াসে দিনে দিনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠছে। এই বিষয়টি আমাদের মতো শহুরে ভারতীয় নাগরিকদের নজর এড়িয়ে গেলেও বিশ্ব পুঁজি’র নিয়ন্ত্রকদের ঠিকই নজরবন্দিতে রয়েছে। এখন দেখার বর্তমান শাসকদলের পাশে কিভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বিশ্ব পুঁজির নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠী। সে গল্প জানতে এখনো হয়তো অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছু দিন। আপাতত লড়াই বেশ জমে উঠেছে।


২৭শে নভেম্বর’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত