বাস্তু ঘুঘুদের
রাজত্বে
স্কুল সার্ভিস কমিশনের ভিতরে যে বাস্তু ঘুঘুদের বাস।
সেটি সাধারণ রাজ্যবাসীর অজানা কোন বিষয় নয়। আবার সেই বাস্তু ঘুঘুদের ভিতরে হেভিওয়েট
ঘুঘুরা যে সিবিআই জেরার থেকে বাঁচতে আইনী রক্ষাকবচ নেওয়ার উদ্দেশে আইনের সাথেই ক্রমাগত
লুকোচুরি খেলে বেড়াবেন। সেটিও আশ্চর্য্য কোন বিষয় নয়। এবং বছরের পর বছর তদন্তের নামে
কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসক দলের ভিতরে যে সিবিআই সিবিআই খেলা চলতে থাকবে, সেটিও কোন
আশ্চর্য্যের বিষয় নয়। আশ্চর্য্যের বিষয় এটাই। রাজ্যের জনগণ রাজ্য জুড়ে এই বাস্তু ঘুঘুদের
রাজত্ব নিয়ে আদৌ উদ্বিগ্ন নন। এই রাজ্যে বাস করা প্রত্যেকেই জানেন, পরিবর্তনের রাজনীতিতে
তারা কোন পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন। সেই পরিবর্তনেই রাজ্যবাসীর বৃহত্তর অংশ সন্তুষ্ট।
না হলে পরপর তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে ক্রমাগত শাসকদলের শক্তি বৃদ্ধি হওয়ার কথা নয়।
টিভির পর্দায় চোখের সামনে শাসকদলের হেভিওয়েট নেতানেত্রীদের লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতে
দেখেও রাজ্যবাসীর বৃহত্তর অংশ সেই দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা ও নেত্রীদেরকেই বিপুল ভোটে নির্বাচনের
পর নির্বাচনে জয়ী করে চলেছে। এবং চোখ বুঁজে বলে দেওয়া যায়। স্কুল সার্ভিস কমিশনের হেভিওয়েট
বাস্তু ঘুঘুরা এই মুহুর্তে কোন নির্বাচনে প্রার্থী হলেও বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ফিরে আসবেন।
আর ঠিক এই কারণেই দুর্নীতিগ্রস্ত গণতন্ত্রের রাজনৈতিক পরিধিতে একটি কথাই বার বার বলা
হয়ে থাকে। গণতন্ত্রে জনগণই শেষ কথা বলে থাকে। অর্থাৎ জনগণের রায়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতানেত্রীরা
বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার একটিই অর্থ। জনগণের এক বড়ো অংশই দুর্নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে
নিয়েছে। এবং তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে কোন সার্ভিস কমিশনে কতজন বাস্তু ঘুঘু চড়ে বেড়াচ্ছেন।
তাতে রাজ্য জুড়ে দুর্নীতির কি বিপুল সম্ভাবনা খুলে গিয়েছে। এইসব বিষয় রাজ্যবাসীর বৃহত্তর
অংশকে আর উদ্বিগ্ন করে না কোনভাবেই। উল্টে জনসাধারণের বৃহত্তর অংশ রাজ্যজুড়ে এইরকম
ব্যাপক দুর্নীতির চর্চায় অত্যন্ত নিশ্চিন্ত। প্রশাসনের মাথায় একটি দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকদল
থাকলে। তবেই যে কোন রকমের দুর্নীতি করেও আইনকে কাঁচকলা দেখানো সম্ভব। জনতার একটা বড়ো
অংশের ভিতরে এই প্রত্যয়টুকু যত বেশি দৃঢ় হতে থাকে। সমাজে দুর্নীতির শিকড় তত গভীরে গিয়ে
পৌঁছাতে থাকে। না, শুধু তাই নয়। সেই শিকড় এক বিস্তৃত ভুখণ্ড জুড়েই দুর্নীতির শাখা প্রশাখা
বিস্তারে সমর্থ্য হয়। ঠিক যে সামর্থ্যই রাজনীতিতে দুর্নীতিকেই মূল নির্ণায়ক ভুমিকায়
প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। আর জনতার বৃহত্তর অংশই যে সিস্টেমের সমর্থনে দাঁড়িয়ে যায়।
ফলে সিবিআইয়ের জালে কয়টি বাস্তু ঘুঘু ধরা পড়লো। আর
হটাৎ করে কয়জনের বুকে উডবার্নমুখী ব্যথা উঠলো। আদালতে কয়টি বাস্তু ঘুঘু আইনি রক্ষাকবচ
পেয়ে গেল। আর কয়টি বাস্তু ঘুঘু আদালতের জামিনে রাজনীতির খোলা ময়দানে দাপিয়ে বেড়াতে
থাকলো। এসবের কোনটিই আর এই সময়ের প্রাসঙ্গিক বিষয় নয়। প্রাসঙ্গিক নয়, বাস্তু ঘুঘুদের
কয়জন শিবির বদলিয়ে সিবিআইয়ের জাল কেটে বেড়িয়ে গেল। সেই প্রসঙ্গও। ভারতবর্ষে সিবিআইয়ের
কাজ আজ আর দুর্নীতি দমন করা নয়। রাজনৈতিক পাশা খেলায় কিস্তিমাতের বোরেতেই সিবিআইয়ের
মূল প্রাসঙ্গিকতা। ফলে সেই সিবিআই সিবিআই খেলাটিও জনগণের কাছে সম্পূর্ণ বেআব্রু হয়ে
পড়েছে। ভালোই হয়েছে তাতে। হার্ড রিয়ালিটি সম্বন্ধে যাঁদের যত কম অভিজ্ঞতা ছিল। তাঁরা
তাঁদের অভিজ্ঞতার সেই নিদারুণ ঘাটতি ততটাই আজ পূরণ করে নিতে সমর্থ্য হয়েছেন। ফলে দুর্নীতির
বিরুদ্ধে থাকা জনচেতনাও আজ আর আকাশ কুসুম কল্পনা বিলাসী নয়। বরং দিনে দিনে তাঁরাও বুঝতে
পারছেন। বাস্তু ঘুঘুদের দিকে ঝুঁকে থাকাই বরং বেশি নিরাপদ। তাতে ভিটে মাটি ছাড়ার বিপদটা
আর থাকে না।
একটা সরকারী চাকরি পেতে গেলে বাস্তু ঘুঘুদের লক্ষ
লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হবে। এটাই অলিখিত নিয়ম। সৌজন্যে গণতন্ত্র! সৌজন্যে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন।
যে কোন সরকারী অনুদান পেতে গেলে কাটমানি দিতে হবে। স্থাবর সম্পত্তি কেনা বেচা করতে
গেলে শাসকদলের পাণ্ডাদের তোলা দিতে হবে। নির্বিঘ্নে ভোট দিতে গেলে শাসকদলের ঝাণ্ডা
ধরতে হবে। এই যে রীতি এবং নীতি। এর বিরুদ্ধে রাজ্যবাসীকে কি পথে নেমে বিক্ষোভ করতে
প্রতিবাদ করতে দেখা যায়? দেখা যায়, তবে কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরের ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে।
সেই রাজনৈতিক পক্ষ থেকে লিখে দেওয়া স্লোগান মুখস্থ করে। এই যে বিক্ষোভ। এটাকে জনবিক্ষোভ
বলা চলে না। একটি দল পুকুর চুরিতে ব্যস্ত। প্রতিবাদে সাগর চুরিতে অভ্যস্ত প্রধান প্রতিপক্ষের
ছাতার তলায় বাকি জনতা সমবেত। উদ্দেশ্য পরিস্কার। আমাদেরকেও চুরির অধিকার দিতে হবে।
শুধু একটি দলই পুকুর চুরি করে যাবে। বাকিরা কলা চুষবে। সেটা চলতে পারে না দিনের পর
দিন। রাজকোষ চুরির বখরা নয়। রাজকোষ চুরির অধিকার নিয়েই বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের পারস্পরিক
লড়াই। জনতাও সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় সেই লড়াইয়ে নানান শিবিরে বিভক্ত। ফলে বাস্তু ঘুঘুদেরই
পৌষমাস এই সময়ে। রাজনীতি আর গণতন্ত্রের এই একটি অর্থ। রাজকোষ চুরির অধিকার অর্জন। সেই
চুরির ভাগের ভাগ নিয়েই জনতার লড়াই। সেই ভাগের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতেই প্রত্যেকে
বাস্তু ঘুঘুদের পায়ে তেল ঢালতে ব্যস্ত।
ফলে জনবিক্ষোভের কোন সম্ভাবনাই এই দেশে নাই। জনতাই
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের পক্ষে নেই। জনতা জানে। প্রশাসন যত বেশি দুর্নীতির পীঠস্থান
হয়ে উঠবে। হরিরলুটের বাতাসার ভাগ তত বেশি কুড়িয়ে তোলা যাবে। জনতার সমস্ত আগ্রহ সেই
হরিরলুটকে ঘিরেই। জনতাকে শুধু আশা দিতে হবে। হরিরলুটের এই সংস্কৃতি বরং বিরোধী রাজনৈতিক
পক্ষগুলির হাতে বেশি পরিমানে সুরক্ষিত। ব্যাস, জনতা শিবির বদলাতে দুই বারও ভাববে না।
এক ফুলকে মাড়িয়ে জনতা অন্য ফুলের মধু খেতে দৌড় লাগাবে বুথে বুথে। বুথ জ্যাম করার কর্মীও
কম পড়ে যাবে সেই প্লাবনে। এটাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রকৃত মানচিত্র। বাস্তু ঘুঘুদের
বহু দিনের অধ্যাবসয়ে তৈরী করে তোলা। এই একটি বিষয়ে ঠগ বাছতে গাঁ উজার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা
ষোলআনা। তখন বিচার করতে হবে হরিরলুটের পরিমানের নিক্তিতে। কে কম খারাপ। কে কম দুর্নীতিগ্রস্ত।
কে কম বাস্তু ঘুঘু।
যে যত বড়ো বাস্তু ঘুঘু। সে তত বড়ো নেতা কিংবা নেত্রী।
রাজ্য কিংবা কেন্দ্র। গল্প কিন্তু একই। ফলে এই সিবিআই সিবিআই খেলা নিয়ে মিডিয়া টিআরপি
বাড়াতে যতই হইচই করুক না কেন। জনতার তাতে কিছুই এসে যায় না। জনতা জানে। কোন চরকায় কত
মণ তেল দিতে হয়। আর হবে। বাস্তু ঘুঘুরা পুকুর চুরি করুক আর সাগর চুরি করুক। জনতার দুই
দিকেই লাভ। হরিরলুটের বাতাসার ভাগ চেটেপুটে নিতে জনতার দৌড় দুই দিকেই।
জনতা শুধু জানে না। হরিরলুটের বাতাসা ফুরিয়ে গেলে কি হবে। গল্পটা ঠিক কোন দিকে মোর নেবে। এই সেদিন রিজার্ভ ব্যাংক প্রায় সত্তর হাজার কোটি টাকা অনাদায়ী ঋণ। ঋণ খেলাপি তহবিলে ফেলে দিয়েছে। এই কাজ প্রতিবছরই করতে হচ্ছে। ফলে হরিরলুটের বাতাসা দিয়ে জনতাকে আর কয়দিন বশীভুত করে রাখা যাবে। সে কথা কেউ জানে না। কিন্তু জনতার গল্পটা সেদিন কোন দিকে বাঁক নেবে, সেই বিষয়ে জনতা এখন দিবানিদ্রায়। ওদিকে লঙ্কায় লঙ্কাকাণ্ডের খবরে ঘুঁটে পুড়তে দেখেও এদিকে গোবরের হাসি শেষ হচ্ছে না। কিন্তু কথায় বলে চিরদিন সমান নাহি যায়। হরিরলুটের বাতাসার ভাগ শেষ হয়ে গেলে। বাস্তু ঘুঘুদের কি হবে। সেটা বড়ো কথা নয়। আসল প্রশ্ন একটাই। সাধারণ জনগণ ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সেই উত্তর আজ লঙ্কাবাসী খুঁজছে। কাল হয়তো রাজ্যবাসীকে খুঁজতে হবে। তার আগে বাস্তু ঘুঘুদের সাথে সিবিআইয়ের লুকোচুরি খেলায় আদালতের বাঁশি কখন কিভাবে কতটুকু বেজে ওঠে। সেই খেলাতেই মিডিয়ার যাবতীয় নজর। তাতে জনতার দিবানিদ্রায় এখনো কোন ব্যাঘাৎ ঘটেনি। ঘটার কথা থাকলেও। ঘটার কথাও নয়। যতক্ষণ বাস্তু ঘুঘুরা হরিরলুট দিয়ে যেতে পারবে। ততক্ষণ।
১৯শে মে’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

