আহাম্মকের দল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আহাম্মকের দল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

আহাম্মকের দল

 

আহাম্মক কাকে বলে? কি করে প্রমাণ হবে কে আহাম্মক আর কে নয়? ভদ্রলোক সারাজীবন এই একটি প্রশ্নের উত্তরের পিছনে ছুটছিলেন। অবশেষে যখন উত্তর খুঁজে পেলেন, তখন তার সত্য মিথ্যে যাচাই করে দেখে নিতে উদ্বুদ্ধ হলেন। উত্তরটা ছিল এই রকম, যে ব্যক্তির দাঁড়িতে আগুন দিলে দাঁড়ি পুড়তে শুরু করবে তিনিই আহাম্মক। তাই এমন সহজেই পরীক্ষা করে দেখে নেওয়ার সুযোগটি তিনি হাতছাড়া করতে চাইলেন না। ফলে যথারীতি আপন দাঁড়িতে আগুন দিয়েই জানতে পারলেন, তাঁর দাঁড়িও আগুনে পোড়ে। অতএব নিজের সম্বন্ধে এতদিনে তিনি নিশ্চিত হলেন। এবং আহাম্মক কাদের বলে সেইটিও জানতে পারলেন। না, এটিকে নেহাৎ কল্পকাহিনী বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। যুগে যুগে আহাম্মকরা ঠিক এইভাবেই নিজেদের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে থাকে। যখন গুজরাট জ্বলছিল ২০০২ সালে। কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি লুঠ হচ্ছিল সংগঠিত উন্মত্ততায় এবং প্রশাসন নীরব দর্শকের ভুমিকায় টানা ৭২ ঘন্টা। তখন যাদের সেই আহাম্মকি দাঁড়ি পুড়ছিল। একমাত্র তারাই বুঝতে পেরেছিল আহাম্মক কাদের বলে। ঠিক যেমন আজ দিল্লীর সীমানায় টানা চার মাস রাজপথ জুড়ে অবস্থানরত কৃষকরাও পরপর দুইবার গেরুয়াবাহিনীকে দুইহাত দিয়ে ভোট দিয়ে বুঝতে পেরেছেন তাঁরা কতটা আহাম্মক যে, ছয় বছরে কৃষকের আয় দ্বিগুন হওয়ার কথায় বিশ্বাস করে একটি চরম মিথ্যেবাদী জনবিরোধী সরকারকে নির্বাচিত করে ক্ষমতায় বসিয়ে রেখেছেন। আজ যে সরকার তাদেরই বুকের উপর বসে তাদেরই কন্ঠরোধে মরিয়া। পাঞ্জাব হরিয়ানা পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ রাজস্থানের সেই কৃষকরাই আজ তাদের সেই আহাম্মকি কর্মের প্রায়শ্চিত্য করতে পথে নেমেছেন। লক্ষ লক্ষ সংখ্যায় কোটিতে কোটিতে। আয় দ্বিগুনের পরিবর্তে আজ তাদের আয় প্রায় অর্ধেক কমে যাওয়ার পথে। উল্টে নতুন তিন কৃষি আইন তাদেরকে ভুমিদাসে পরিণত করার ফাঁদ পেতে হাঙরের মতো তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছে। তাই তারা আজ সন্ত্রস্ত। তাই তারা আজ সংহত। তাই তারা আহাম্মকের বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে এসে আজ সরকারের মুখোমুখি হয়েছেন। সরকারের জনবিরোধী কার্যক্রম কৃষক বিরোধী ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে সংঘবদ্ধ লড়াইয়ে সামিল হয়েছেন। অর্থাৎ নিজেদের আহাম্মকি কর্মের হদিশ তাঁরা টের পেয়ে গিয়েছেন।


কিন্তু আমরা বাঙালিরা? এই বাংলায় আমরা কতজন প্রকৃত আহাম্মক? সেই সংখ্যাটি জানা যাবে আগামী ২রা মে। ২০১৬ সালের আসাম। পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেরুয়াবাহিনীর নির্বাচনে জয়লাভ। তারপর সেই নাগরিকত্বের তালিকা থেকেই প্রায় পনেরো লক্ষ বাঙালি হিন্দুকে বাদ দিয়ে আজ তাদেরই ভিটে মাটি কেড়ে তাদেরকেই ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক করার কার্যক্রম চলছে। ২০১৭ সালের ত্রিপুরা। সরকারী কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি। যুবকদের চাকরির ঢালাও প্রতিশ্রুতি দান। রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া। এবং নির্বাচনে জয়লাভ। পরবর্তী পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৯৭% আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় বিনা নির্বাচনে জয়লাভ। এবং রাজ্যব্যাপী সরকারী সন্ত্রাস। জনগণের উপরে দমন পীড়নের ধারাবাহিক পর্ব। এবার লক্ষ পশ্চিমবঙ্গ। এখানেও আসামের মতো পূর্ববঙ্গ আগত শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। তোমরা আমাদের ভোট দাও। আমরা তোমাদের নাগরিকত্ব দেবো। যেন ভারতীয় গণতন্ত্রে বেনাগরিক জনগণের ভোটাধিকার রয়েছে! কি আশ্চর্য্য প্রতিশ্রুতি! এবং মানুষ যখন তা বিশ্বাস করতে শুরু করে দেয়, তখন আর জানতে বাকি থাকে না দেশে আহাম্মকের সংখ্যা কত।


দিল্লীর সীমানায় আন্দোলনরত কৃষকদের ভিতর এখন অব্দি ৩৬৫ জনের বেশি কৃষক শহীদ হয়েছেন। সরকার তাতে শোকতপ্ত নয়। সরকার সেই আন্দোলনরত কৃষকদের ন্যায্য দাবি মেটাতে রাজি নয়। কিন্তু সেই একই সরকার পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের জন্য কেঁদে আকুল। তাঁদেরকে পিএম কিষান প্রকল্পের বকেয়া ১৮ হাজার টাকা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডবল ইঞ্জিন সরকার গড়ার ডাক। অথচ সারা ভারতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই একই পিএম কিষান প্রকল্পে সরকারী ব্যায় বরাদ্দ কমাতে কমাতে চলতি পর্বে প্রায় অর্ধেক করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্প চালুর সময় সারা ভারতে যতজন কৃষক এই প্রকল্পে বছরে ৬০০০ টাকার তিনটি কিস্তির প্রথম কিস্তির ২০০০ টাকা পেয়েছিলেন, তাঁরা কিন্তু সকলেই পরবর্তী কিস্তিগুলির টাকা ঠিকমত পাননি। ঠিকমত কিস্তির প্রাপ্য টাকা পাওয়া কৃষকের সংখ্যা দিনে দিনে কমেই চলেছে। না এতসব সংবাদ প্রতিদিনের সান্ধ্য টিভিতে বা প্রভাতী সংবাদপত্রের হেডলাইন করা হয় না। হলে ভোট প্রচারের ময়দানে নগদ অর্থ দিয়েও লোক জোগার করা মুশকিল হতো। তাই বাংলার কৃষকদের জন্য নিয়মিত প্রতিদিন কুম্ভীরাশ্রু প্রদর্শন চলছে সুউচ্চ মঞ্চের জেড প্লাস ক্যাটাগরির শীততাপ নিয়ন্ত্রীত নিরাপত্তার বলয় থেকে। এবং বাংলায় আহাম্মকের সংখ্যা বাড়ানোর এই কর্মযজ্ঞে তাই নিষ্ঠার কোন অভাব নেই। অভাব নেই নিরন্তর প্রয়াসেরও।


২০১৪ সালের বছরে দুই কোটি চাকুরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ঢাউস বেলুন চুপসিয়ে গিয়েছে। সারা ভারত জুড়েই। উল্টে বিগত সাত বছরে কয়েক কোটি চাকুরিজীবী বেকার হয়েছেন। যারা হয়েছেন, তাঁরাই বুঝতে পেরেছেন, দাঁড়িতে আগুন দিলে কি ঘটে। গেরুয়াবাহিনীর সরকার সারা দেশেই নতুন কোন শিল্প উদ্যোগ চালু করতে পারেনি। সৃষ্টি হয়নি নতুন কর্মসংস্থান। নোটবাতিলের ফলস্বরূপ বহু মানুষের উপার্জন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। উল্টে একের পর এক সরকারী সংস্থা নির্দিষ্ট কয়েকজন শিল্পপতিকে জলের দরে বিক্রী করে দিয়ে কর্মসংস্থানের এযাবৎ চালু পরিসরটিকেও ক্রমান্বয়ে সঙ্কুচিত করার প্রয়াস চলছে। ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতেই পশ্চিমবঙ্গ দখলের লক্ষে আবারো নতুন এক প্রতিশ্রুতি। প্রতি ঘরে একজনকে চাকুরি দেওয়ার। এবং আগামী ২রা মে জানা যাবে প্রতি ঘরে ঠিক কতজন আহাম্মকের বাস।


কথায় বলে ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে। তাই আসামে এন- আর- সি’র লাইনে বাঙালির যখন নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির দিবা নিদ্রায় তখন কোন ব্যাঘাৎ ঘটেনি। ত্রিপুরায় মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনের উপরে যখন গেরুয়া সন্ত্রাস নেমে এসেছে, এই বঙ্গের বাঙালির তখনো চৈতন্য হয়নি। পাঞ্জাব হরিয়ানা পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ রাজস্থানের কৃষকরা যখন নতুন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে সামিল, এই বাংলার কৃষকরা তখন সুউচ্চ মঞ্চ থেকে প্রচারিত হিন্দু মুসলমান তত্ব শুনতে অধিকতর ব্যস্ত। ভারতবর্ষ জুড়ে কর্মপ্রার্থী যুবক যুবতীরা যখন ধীরে ধীরে কর্মের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হতে চাইছে, এই বাংলার যুবক যুবতীরা তখন জয়শ্রীরাম ধ্বনি দেওয়ার ডাক শুনতে পাচ্ছে। তাদের ভিতর আশা জাগিয়ে তোলার কাজ চলছে, ডবল ইঞ্জিন সরকার হলেই তাদের কর্মসংস্থানের সুরাহা হয়ে যাবে। শুধু ডবল ইঞ্জিন সরকার গড়তে জয়শ্রীরাম ধ্বনির প্রয়োগ করতে হবে পাড়ায় পাড়ায় এবং বুথে বুথে। দিকে দিকে গড়ে তুলতে হবে মোদীপাড়া। বাংলার দখল ছেড়ে দিতে হবে গুজরাটিদেরই হাতে। কারণ ব্যবসাটা তারাই ভালো বোঝে বাঙালিদের থেকে।


ওদিকে হিন্দু জাগরণের আর এক কাণ্ডারী বাংলা জুড়ে জনসভার পর জনসভায় প্রতিদিন বাংলায় উত্তরপ্রদেশ মডেল প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়ে চলেছেন। বাংলার নারীরা নাকি এতটাই অরক্ষিত, যে তাদের সুরক্ষার জন্যই উত্তরপ্রদেশ মডেলেই সমাজ ও প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। এখন বাংলার নারীরা বাংলায় উত্তরপ্রদেশ মডেলের সমাজ ও প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় কতটা কি ভুমিকা রাখেন, বোঝা যাবে আগামী ২রা মে। আপাতত, সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী নারী সুরক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশের তুলনামুলক অবস্থানের খোঁজটুকু নিয়ে রাখলেই ভালো। নয়ত বাংলায় আহম্মকের মিছিল আরও লম্বা হয়ে উঠতেই পারে।


বাঙালি আর আহাম্মক কি প্রায় সমার্থক? অন্তত গত এক দশকের বাংলার দিকে তাকালে সেরকম মনে করার মতো কারণের অভাব নেই। এক দশক আগে পরিবর্তনের সেই ঐতিহাসিক ডাকে যেভাবে ঘরে ঘরে নিঃশব্দ বিপ্লব সংঘটিত হয়ে আহাম্মকির মিছিলে জনপ্লাবন নেমে এসেছিল, এই দশ বছরেও যদি তাতে জনগণের চৈতন্য না হয় তবে সে সমস্যা জনগণেরই সৃষ্টি করা। রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা নেহাতই অনুঘটক মাত্র। আহাম্মকদের পালকে একদশক একদল শাসন করেছে। আহাম্মকদের পালকে পরবর্তী দশক আর একদল শাসন করার জন্য উঠে পড়ে আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে। তাই মূল যুদ্ধটা সেই দুই দলের ভিতরেই সংঘটিত হচ্ছে। বাংলায় কার পাল্লায় আহাম্মকের দল কতটা ভারী।


৫ই এপ্রিল’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত