দেখ খুলে তোর তিন নয়ন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দেখ খুলে তোর তিন নয়ন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

দেখ খুলে তোর তিন নয়ন



দেখ খুলে তোর তিন নয়ন

অনেকেই আমরা মনে করি বুদ্ধিজীবীরাই সমাজের রোল মডেল। অনেকেই সেই কারণে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বুদ্ধিজীবীদের ভুমিকা নিয়ে কটাক্ষ করে থাকি। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারি, সত্যিই বুদ্ধিজীবীরা এখনও সমাজের রোল মডেল হয়েই আছেন। পরিবর্তনের হাত ধরে বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে চোখবন্ধ করে শাসকদলের তল্পিবহন করার ভুমিকায় অবতীর্ণ, সেটাকেই রোল মডেল করে রাজ্যবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও চোখকান বন্ধ করে শাসকদলের উন্নয়নের তত্বকেই মেনে নিচ্ছেন। হ্যাঁ এটাই পশ্চিমবঙ্গের গ্রাউণ্ড রিয়ালিটি। আর তাই বর্তমান সমাজরাজনীতির সেই বাস্তবতাকেই মাথায় রেখেও- এখনো যাঁদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি; তাঁদেরই পুরোধা কবি শঙ্খ ঘোষকে লিখতে হয় “দেখ খুলে তোর তিন নয়ন, রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন। কবির চিন্তা বুদ্ধিজীবীদের শীতঘুম নিয়ে নয়, কবির চিন্তা বুদ্ধিজীবীদেরকে রোল মডেল করে জনতার চোখকান বন্ধ করে রাখাটাই। তাই জনতার চোখ খোলাতে গিয়েই ক্ষমতার রোষানলে পড়তে হয় কবিকে। জীবনানন্দের ভাষায় শকুন আর শেয়ালের খাদ্য হয়ে। ওদিকে শীতঘুম দেওয়া বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এই বিতর্কে যে নিজেদের স্বস্তির ঘুমকে অস্বস্তির অশনিসংকেতে বিঘ্নিত করবেন না, সেতো বলাই বাহুল্য। তাই তাঁদের শীতঘুমেরও ব্যাঘাৎ ঘটে নি কোন।

কিন্তু তিনি শঙ্খ ঘোষ। আমরা রবীন্দ্রনাথকে দেখিনি। পড়েছি। আমরা শঙ্খ ঘোষকে দেখছি। পড়ছি। আজকের রাজনীতির ঘোলাজল পেড়িয়ে বাংলার ইতিহাসে এই সময় যে কলঙ্কিত অধ্যায়ে স্থান পাবে, সেখানে কবির নাম লেখা থাকবে বাংলার বিবেক ও চেতনার আলোতেই। এই সময় বিবেক ও চেতনার যে আদর্শিক পরিসরটিকেই অবরুদ্ধ করে রেখেছে, সেই পরিসরটিকেই প্রায় একক হাতে সজীব রাখার যুদ্ধ করে চলেছেন আমাদের কবি। এখানেই কালের পরিমিতিতে একজন প্রকৃত কবির প্রকৃত পরিচয়। আজকের শীতঘুম দেওয়া বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অবশ্য এসবেও কিছু এসে যায় না। তাঁদের লক্ষ্য ও অধ্যাবসায় চৌদ্দোপুরুষের অন্নসংস্থানেই সীমাবদ্ধ। তাই শঙ্ঘ ঘোষের অসম্মানেও গর্জে উঠতে পারেনা মেরুদণ্ডহীন আজকের জনচেতনা।

আজকের জনচেতনা পরিচালিত হয় রাজনৈতিক দলগুলির কর্মসূচী ভিত্তিক। স্বাধীনতা উত্তর বাংলার সমাজ, রাজনীতির ঘূণপোকায় এমনভাবেই কীটদষ্ট হয়ে গিয়েছে যে তার আর নিজস্ব কোন স্বরলিপি নেই। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম রিজওয়ানুর পর্বেও তার ব্যতিক্রম ঘটেছিল না। একটি সমাজের সুস্থতার পক্ষে এর থেকে বড়ো প্রতিবন্ধকতা আর কিছুই হতে পারে না। বাংলার রাজনীতি সমাজের কন্ঠরোধ করে গোটা সমাজটিকেই রাজনৈতিক দলগুলির ভোটারে বিভক্ত করে ফেলেছে। আর এই কাজেই সহায়ক ভুমিকা নিয়ে চলেছেন বাঙালি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। শাসকদল ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের পারস্পরিক জোটবন্ধন এই সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। এর বাইরে রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ জনতার কন্ঠ জনতার স্বরলিপি চর্চার মতো পরিসর আজ আর নাই এই বঙ্গে। ফলে আজকে শঙ্খ ঘোষের এই অসম্মান রাজনৈতিক তরজার বাইরে বিশেষ রেখাপাত করার মতোন অবস্থাতেও নাই।

বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের এই দেউলিয়া অবস্থার পেছনে বহু কারণের মধ্যে প্রধানতম একটি কারণ, নকশাল আন্দোলনের সামূহিক ব্যর্থতা। পুরো একটি প্রজন্মের মেধাকে অত্যন্ত সুচিন্তিত রণকৌশলে শিকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলে বিনাশ করে দেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। সমাজের শ্রেষ্ঠ মেধার অপসারণে যে শূন্যস্থানের সৃষ্টি হয়েছিল, ঠিক সেই জায়গাটিই দখল করে নেয় মধ্যমেধার সুবিধাভোগী সুযোগসন্ধানী শ্রেণী। তারা ও তাদেরই প্রজন্ম আজকের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। রাজনীতির যে কৌশল সেদিন বাংলার জনমানস থেকে তার শ্রেষ্ঠ মেধাগুলিকে অপসৃত করেছিল, সেই কৌশলই আজ বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে ঢাল বানিয়ে জনমানসে রাজত্ব করার প্রকৌশলে সিদ্ধিলাভ করেছে। এই সংস্কৃতির সূচনা একেবারেই হাল আমলেরও নয়। সত্তরের দশকের থেকে শিক্ষা নিয়েই রাজনীতি এই কৌশলটিকেই পাখির চোখ করে নিয়েছে। যাতে নকশাল আন্দোলনের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি আবার না ঘটে। তাই কবি শঙ্ঘ ঘোষ যে তিন নয়ন খোলার ডাক দিয়েছেন, সেই ডাক সত্যিই জনমানস অব্দি পৌঁছানোর মতো কোন মেকানিজম আজ আর নাই এই বাংলায়। আজকের বুদ্ধিজীবী ও জনতা সুযোগের সন্ধান, সুবিধার বাস্তবায়ন, ও স্বার্থের সুরক্ষায় অদ্বিতীয়। তাদের মূল ধ্যানজ্ঞান এই ত্রিমুখী অভিমুখে এতটাই সুদৃঢ় ভাবে নিবদ্ধ যে সেখান থেকে সম্বিত ফেরানো কোন কবির পক্ষেই সম্ভব নয় আর।

তাই বলে কি থেমে যাবে কবির কলম? অবরুদ্ধ জনকন্ঠের ভাষ্য তো কবির কলমকেই আশ্রয় করতে চাইবে। কবি কি নিস্তব্ধ নিরবতায় সেই ভাষ্যকে কবরে পাঠিয়ে দিতে পারেন কখনো? না কোন প্রকৃত কবির পক্ষেই সম্ভব নয় সেরকম আত্মপ্রবঞ্চনার পথে নিজেকে স্তব্ধ করে দেওয়া। তাই প্রকৃতই যিনি কবি, তিনি শুধুমাত্র বিশ্বস্ত থাকেন তাঁর নিজস্ব কলমের কাছেই। আজীবন জীবনসাধনায় তিলে তিলে অর্জন করা সেই কলমই কবির কাছে ধ্রুবসত্য। সেখান থেকে কোন ভয় বা প্রলোভনই তাঁকে বিচ্যুত করতে পারে না কোনদিন। পরবর্তী কালে শঙ্খ ঘোষের জীবনসাধনা নিয়ে গবেষণা শুরু হবে যেদিন, সেদিন এই শাশ্বত সত্যই কবির জীবনীতে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসেরই মান্যতা পাবে। আজকের এই কোলাহল যদি মনে করে বিড়ম্বিত করা গেল কবিকে, তবে সে হবে মূর্খের স্বর্গে বাস করার মতো বিষয়। আজকের রাজনীতি তার ক্ষমতার আস্ফালনে যদি মনে করে ভোঁতা করে দেওয়া গেল কবির কলমকেই, ভোটের ফলাফল দিয়েই জনতার তিন নয়নকে অবরুদ্ধ করে রাখা যাবে চিরকাল, তবে সেও হবে মূর্খের স্বর্গে বাস করার মতনই বিষয়।

এইখানেই প্রশ্ন ওঠে, কবির কথা মতো বন্ধ চোখের পাতা তবে খুলবেই বা কি করে? আর খোলাবেই বা কে? সুবিধাভোগী শাসকপন্থী বুদ্ধিজীবীরা নয়। বিপক্ষীয় রাজনৈতিক শিবিরগুলির রাজনৈতিক কর্মসূচীও নয়। তাহলে আর বাকি থাকলো কে? বাকি থাকলো কাল। বাকি থাকলো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বাকি থাকলো সমাজের বিবর্তন। বাকি থাকলো জনমানসের অবরুদ্ধ কন্ঠের অবদমিত ক্ষোভের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। রাজনৈতিক দলগুলি সেই ক্ষোভের পালে হাওয়া লাগিয়েই তো ক্ষমতা দখলের ছক কষে। ঠিক যেমন ঘটেছিল সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম পর্বে। ফলে সেই থোরাবড়ি খাড়া আর খাড়া বড়িথোর। তাহলে উপায়? ঠিক এইখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিতে পারেন সংখ্যালঘু হলেও বুদ্ধিজীবীদের যে কয়জন আজও বন্ধক রাখেন নি নিজের বিবেক চেতনা আদর্শকে রাজনীতির স্বার্থের কাছে, আজও যে কয়জন অবশিষ্ট আছেন খাড়া হয়ে নিজের শিরদাঁড়ার উপরেই ভরসা করে। তাঁরা যদি ক্রমশ জোটবদ্ধ হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার রাজনীতি স্বভাবতই তাঁদেরকেও বিভিন্ন শিবিরে বিভক্ত রাখতে স্বচেষ্ট হবে নানান ছলে ও বলে। সেই কৌশলকে পরাজিত করে আজও যাঁদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি, তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। দাঁড়াতে হবে শঙ্খ ঘোষদের পাশে। জোট বাঁধতে হবে সত্যের। আদর্শের। প্রতিবাদের। প্রতিরোধের। তবেই খুলতে থাকবে তিন নয়ন একে একে। রাজনীতির ঘূণপোকায় কীটদস্ট সমাজের ক্ষতে লাগাতে হবে নৈতিক আদর্শের মলম। সে ব্যক্তিবিশেষের কাজ নয়। সমষ্টির কাজ। গড়ে তুলতে হবে সেই সমস্টি। কিভাবে আর কোন পথে, কবে আর কতদিনে, সে কথা সময়ই বলতে পারে। কিন্তু এই একটি মাত্র পথই পড়ে রয়েছে আমাদের। বাকি সব অবরুদ্ধ পথে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন। দাঁড়িয়ে আছে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। দাঁড়িয়ে আছে রাজনীতি। দাঁড়িয়ে আছে গোষ্ঠী স্বার্থ। সেখান থেকে সমাজের অভিমুখ ফেরানোর ডাক দিয়েছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। আজ হোক কাল হোক তাঁর এই ডাকে সাড়া দিয়ে ঘুড়ে দাঁড়ানোর পথ কাটতে হবে আমাদেরকেই। শকুন আর শেয়ালের ভয়ে শামুকের মতো গুটিয়ে থাকলে আর চলবে না। এগোতে হবে।

২রা জুন ২০১৮

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত